অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করলেন অধ্যাপক ড. শাহজাহান খান

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যানের শিক্ষার্থী। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিও থেকে উচ্চতর ডিগ্রি। বাংলাদেশে শিক্ষকতা। পরে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডে পরিসংখ্যানের অধ্যাপক ও গবেষক। একদিকে আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান গবেষণায় দীর্ঘ একাডেমিক অবদান, অন্যদিকে টুউম্বাতে মুসলিম কমিউনিটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, বহুসাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও আন্তঃসম্প্রদায়িক যোগাযোগে কয়েক দশকের কাজ। এই দীর্ঘ যাত্রার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালে পেলেন অস্ট্রেলিয়ার মেডেল অব দ্য অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া—ওএএম।

তিনি অধ্যাপক ড. শাহজাহান খান। ২০২৬ সালের অস্ট্রেলিয়া ডে অনার্সে তার নাম ঘোষণা করা হয় ওএএম-এর প্রাপক হিসেবে। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি নথিতে পুরস্কারটির কারণ হিসেবে লেখা হয়েছে—’ফর সার্ভিস টু দ্য ইসলামিক কমিউনিটি অব অস্ট্রেলিয়া’। অর্থাৎ তার এই রাষ্ট্রীয় সম্মানকে শুধু একজন পরিসংখ্যানবিদের একাডেমিক সাফল্যের স্বীকৃতি নয়, তার দীর্ঘ কমিউনিটি সেবা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে গভর্নরস হাউসে অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া মেডেল (ওএএম) প্রদান ও সম্মাননা-পত্র পাঠের অনুষ্ঠান হয়। কুইন্সল্যান্ডের গভর্নর ড. জ্যানেট ইয়ং এসি পিএসএম তার হাতে পদক তুলে দেন। ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ অস্ট্রেলিয়া ডে উপলক্ষে তার এই সম্মান ঘোষণা করা হয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়ার অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া একটি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বা স্বীকৃতি জানানোর ব্যবস্থা, যার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে ওএএম বা মেডেল অব দ্য অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষ স্বীকৃতিযোগ্য সেবার জন্য প্রদান করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার গভর্নর-জেনারেলের সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ওএএম দেওয়া হয় বিশেষ স্বীকৃতির উপযুক্ত সেবার জন্য। পুরস্কারের জন্য মনোনয়নগুলো স্বাধীনভাবে গবেষণা ও পর্যালোচনার পর কাউন্সিল ফর দ্য অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়ার বিবেচনায় যায়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কানাডা
অধ্যাপক শাহজাহান খান ১৯৫৩ সালে গোপালগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। পরিসংখ্যান বিষয়ে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি অনার্স ও এমএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিও থেকে স্ট্যাটিস্টিকসে এমএসসি ও পিএইচডি অর্জন করেন। অর্থাৎ তার একাডেমিক বিকাশের প্রথম পর্ব বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এবং পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা-পর্ব কানাডার বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় সম্পন্ন হয়।

উচ্চশিক্ষা শেষে তার কর্মজীবন একাধিক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়। ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিও, কিং ফাহদ ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেলস, ইউনিভার্সিটি অব বাহরাইন এবং সুলতান কাবুস ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তার দায়িত্ব পালনের সুযোগ হয়েছে। তিনি ১৯৯২ সালে কানাডায় পিএইচডি শেষ করার পর অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসী হন এবং ১৯৯৩ সালে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডে যোগ দেন। তিনি ইউএসকিউতে ১৯৯৩ সাল থেকে লেকচারার হিসেবে কাজ করেন এবং ২০১১–২০২২ সময়কালে ফাউন্ডিং প্রফেসর অব স্ট্যাটিস্টিকস ছিলেন।

ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড: শিক্ষকতা থেকে একাডেমিক নেতৃত্ব
ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড বা ইউএসকিউতে অধ্যাপক শাহজাহান খানের কর্মজীবন ছিল দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক। তিনি ১৯৯৩–২০১১ পর্যন্ত লেকচারার, ২০১১–২০২২ পর্যন্ত ফাউন্ডিং প্রফেসর অব স্ট্যাটিস্টিকস এবং ২০২২ সাল থেকে এমেরিটাস প্রফেসর। একাডেমিক বোর্ডের সদস্য এবং ২০১৩–২০১৯ পর্যন্ত মাল্টিকালচারাল স্টাফ নেটওয়ার্কের চেয়ার হিসেবে ভূমিকা রাখেন।

তার আরও একাডেমিক দায়িত্বের মধ্যে ছিল- স্ট্যাটিস্টিকসের ডিসিপ্লিন চেয়ার, মাস্টার অব সায়েন্স রিসার্চের ডিরেক্টর, একাডেমিক সিনেটের নির্বাচিত সদস্য এবং স্ট্যাটিস্টিক্যাল কনসাল্টিং ইউনিট প্রতিষ্ঠা। গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন সায়েন্স ও এমএসসি ইন ম্যাথমেটিকস অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস প্রোগ্রাম উন্নয়নে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০২২ সালে তিনি ইউএসকিউর এমেরিটাস প্রফেসর হন।

২০২৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক এক অনুষ্ঠানে তাকে প্রফেসর এমেরিটাসের সম্মাননা প্রদান করা হয়। ইউএসকিউ জানিয়েছে, এই স্বীকৃতি ছিল বিশ্ববিদ্যালয় ও স্ট্যাটিস্টিকস স্কলারলি কমিউনিটিতে তার অবদান এবং মাল্টিকালচারালিজম ও কালচারাল ডাইভার্সিটিতে তার ভূমিকার স্বীকৃতি। তিনি ইউএসকিউর প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একাডেমিক হিসেবে এই এমেরিটাস স্বীকৃতি পান।

গবেষণা: পরিসংখ্যান থেকে স্বাস্থ্য ও পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের প্রমাণ বিশ্লেষণ
অধ্যাপক শাহজাহান খানের গবেষণাকর্মের পরিধি দীর্ঘ। তার তিনটি বই, তিনটি বুক চ্যাপ্টার এবং ২৫০টির বেশি পিয়ার-রিভিউড রিসার্চ পেপার রয়েছে। তার জার্নাল আর্টিকেলের সংখ্যা ২৬০টির বেশি। তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে স্প্রিঙ্গার নেচার থেকে প্রকাশিত Meta-Analysis Methods for Health and Experimental Sciences বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মেটা-অ্যানালাইসিস হলো বিভিন্ন গবেষণার ফলকে পরিসংখ্যানগতভাবে সমন্বিত করে সামগ্রিক প্রমাণ বিশ্লেষণের একটি পদ্ধতি। ফলে তার গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র পরিসংখ্যানকে স্বাস্থ্য ও পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের গবেষণা-প্রমাণ বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

তার সম্পাদনা ও গবেষণা-নেতৃত্বও উল্লেখযোগ্য। ২০০৫ সাল থেকে তিনি Journal of Applied Probability and Statistics-এর ফাউন্ডিং চিফ এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি Journal of Statistical Research ও Pakistan Journal of Statistics-এর গেস্ট এডিটর এবং Journal of Statistics and Applications-এর এডিটর। তিনি শুধু গবেষণা প্রকাশ করেননি; নতুন গবেষক তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছেন। ২০ জন পিএইচডি ও ৩ জন এমফিল শিক্ষার্থী তত্ত্বাবধান করেছেন। তিনি ১৮টি রিসার্চ ওয়ার্কশপ, ২৮টি কি-নোট অ্যাড্রেস এবং ৬০টির বেশি ইনভাইটেড টক দিয়েছেন। বিভিন্ন দেশে গবেষণা কর্মশালা পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে তার একাডেমিক যোগাযোগের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান জগতে নেতৃত্ব
অধ্যাপক শাহজাহান খানের আন্তর্জাতিক পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইসলামিক কান্ট্রিজ সোসাইটি অব স্ট্যাটিস্টিক্যাল সায়েন্সেস বা আইএসওএসএস। তিনি ২০০৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার নেতৃত্বের সময়ে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে মালয়েশিয়া, মিসর, কাতার, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান সম্মেলনের আয়োজন হয়েছে।

তার পেশাগত পরিচয় শুধু কোনো একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নয়। তিনি ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের ইলেক্টেড মেম্বার, রয়্যাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল সোসাইটির ফেলো, ইনস্টিটিউট অব ম্যাথমেটিক্যাল স্ট্যাটিস্টিকসের মেম্বার এবং স্ট্যাটিস্টিক্যাল সোসাইটি অব অস্ট্রেলিয়া ও স্ট্যাটিস্টিক্যাল সোসাইটি অব কানাডার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশে তিনি বাংলাদেশ স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এবং আইএসওএসএস-এর লাইফ মেম্বার।

বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও তার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিস্তৃত। টোকিও ইউনিভার্সিটি, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর, কার্লটন ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব মালায়া, ইউনিভার্সিটি সায়েন্স মালয়েশিয়া, ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি মালয়েশিয়া, ইউনিভার্সিটি পুত্রা মালয়েশিয়া, বোগর এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব দ্য পাঞ্জাব ও করাচি ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভিজিটিং সায়েন্টিস্ট বা ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। এই বহুদেশীয় একাডেমিক নেটওয়ার্ক তাঁর কর্মজীবনের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

স্ট্যাটিস্টিকসের বাইরে: টুউম্বাতে একটি কমিউনিটির প্রতিষ্ঠান নির্মাণ
টুউম্বা শহরে মুসলমানদের উপস্থিতির ইতিহাস উনিশ শতকের শেষভাগে হলেও প্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠা করতে এক শতাব্দীরও বেশি সময় লেগেছে। ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডে মুসলিম শিক্ষার্থী ও কর্মীদের জন্য ১৯৯৩ সাল থেকে নামাজের সুবিধা তৈরির সঙ্গে অধ্যাপক খানের ভূমিকা ছিল। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউএসকিউ ইসলামিক সেন্টারের ফাউন্ডিং কো-অর্ডিনেটরও ছিলেন তিনি। ১৯৯৪ সালে ইসলামিক সোসাইটি অব টুউম্বা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অধ্যাপক শাহজাহান খান ছিলেন এর ফাউন্ডিং প্রেসিডেন্ট। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল মুসলিমদের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি মুসলিম ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে বোঝাপড়া ও সদিচ্ছা বৃদ্ধি করা।

এই কাজের পরবর্তী বড় ধাপ ছিল টুউম্বার প্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠা। ২০১৩ সালে তৎকালীন ইউএসকিউ ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর জ্যান থমাস একটি সম্পত্তির সঙ্গে অধ্যাপক খানকে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে মুসলিম কমিউনিটি সেই সম্পত্তি কিনে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে। গার্ডেন সিটি মসজিদ ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে মসজিদটি শুধু মুসলিম ইবাদতখানা হিসেবে নয়, বৃহত্তর সমাজের সঙ্গেও যোগাযোগের একটি স্থান হিসেবে কাজ করে। এটি সব ধর্ম ও পটভূমির মানুষের জন্য উন্মুক্ত এবং স্থানীয় মুসলিম কমিউনিটির সঙ্গে বৃহত্তর সমাজের যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি করে।

আগুন, সংকট ও পুনর্গঠন
২০১৫ সালে গার্ডেন সিটি মসজিদ দুবার অগ্নিসংযোগের শিকার হয়। জানুয়ারির প্রথম হামলায় কমিউনিটি হল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে ১৫ এপ্রিল রাতে দ্বিতীয়, আরও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মূল মসজিদ ভবনটি এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে তা পুনরায় ব্যবহারযোগ্য ছিল না। সে সময় অধ্যাপক শাহজাহান খান টুউম্বা মুসলিম কমিউনিটির মুখপাত্রদের একজন হিসেবে গণমাধ্যমে কথা বলেন। হামলাটি টুউম্বার বৃহত্তর মানুষের প্রতিফলন নয় এবং তিনি শহরটিকে আরো শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

দ্বিতীয় অগ্নিকাণ্ডের মাত্র দুই দিন পর নির্ধারিত মসজিদ ওপেন ডে ও ওয়ার্ল্ড ফুড ফেস্টিভাল বাতিল না করে আয়োজন করা হয়। ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডের রিক্রিয়েশন সেন্টারে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে ৫,০০০-এর বেশি মানুষ অংশ নেয়। ঘটনাটি টুউম্বার বিভিন্ন মানুষকে একত্র করেছিল। এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিবেশী খ্রিস্টান গির্জাগুলোর সহায়তা। প্রথম অগ্নিকাণ্ডের পর নিকটবর্তী গির্জাগুলো মেরামতের ব্যয় বহনে সহায়তা করেছিল। অর্থাৎ মসজিদটির ইতিহাস কেবল মুসলিম কমিউনিটির নিজস্ব উদ্যোগের ইতিহাস নয়; স্থানীয় বৃহত্তর সমাজের অংশগ্রহণও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

পরবর্তীতে নতুন মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিকল্পনা, নকশা, অনুমোদন এবং অর্থসংগ্রহের ধারাবাহিকতায় পুনর্নির্মাণ শুরু হয় ২০১৮ সালে। ২০১৯ সালে লক-আপ স্টেজ এবং পরবর্তী সময়ে অভ্যন্তরীণ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। নতুন ভবনে নারীদের জন্য পৃথক মেজানাইন লেভেল এবং প্রায় ১০০ জন নারীর নামাজ পড়ার জায়গাসহ বিভিন্ন সুবিধা যুক্ত হয়েছে। ২০২২ সালে কুইন্সল্যান্ডের গভর্নর ড. জ্যানেট ইয়ং গার্ডেন সিটি মসজিদ পরিদর্শন করেন। তার সরকারি বক্তব্যে তিনি অধ্যাপক শাহজাহান খানকে টুউম্বা ইসলামিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা এবং ইউএসকিউ-এর একজন সম্মানিত একাডেমিক হিসেবে উল্লেখ করেন। গভর্নর আরো বলেন, টুউম্বাতে ইসলাম সম্পর্কে বৃহত্তর সমাজের বোঝাপড়া ও অ্যাপ্রিশিয়েশন বৃদ্ধিতে অধ্যাপক খান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

মাল্টিকালচারালিজমের সঙ্গে একাডেমিক কাজের সংযোগ
অধ্যাপক খানের কমিউনিটি কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকেও বিচ্ছিন্ন ছিল না। তিনি ২০১৩–২০১৯ পর্যন্ত ইউএসকিউ মাল্টিকালচারাল স্টাফ নেটওয়ার্কের চেয়ার ছিলেন এবং ২০০০–২০১৪ পর্যন্ত ইসলামিক সেন্টারের কো-ফাউন্ডার অ্যান্ড কো-অর্ডিনেটর ছিলেন।
ইউএসকিউ-এর ২০২৩ সালের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় তার এমেরিটাস প্রফেসর হওয়ার কারণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় ও স্ট্যাটিস্টিকস স্কলারলি কমিউনিটিতে তার অবদানের পাশাপাশি “চ্যাম্পিয়নিং অব কালচারাল ডাইভার্সিটি অ্যাক্রস দ্য কমিউনিটি”-এর কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ তার একাডেমিক ও কমিউনিটি নেতৃত্ব—দুটি ধারাকেই বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব স্বীকৃতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে।
তার কমিউনিটি সার্ভিসের জন্য কুইন্সল্যান্ড কালচারাল ডাইভার্সিটি অ্যাম্বাসেডর অ্যাওয়ার্ড (২০১৪), কুইন্সল্যান্ড পুলিশ সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড (২০১৭), ইউএসকিউ ভাইস-চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড অব এক্সিলেন্স ফর কমিউনিটি সার্ভিস (২০১৩) এবং ইউএসকিউ অ্যাওয়ার্ড অব এক্সিলেন্স ফর ডাইভার্সিটি অ্যান্ড ইনক্লুশন (২০১৮)-সহ বিভিন্ন স্বীকৃতি রয়েছে।

ওএএম: কোন কাজের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি?
অস্ট্রেলিয়ার ইসলামিক কমিউনিটিতে তার সেবার জন্যই এই স্বীকৃতি। তিনি ১৯৯৪–২০২২ পর্যন্ত ইসলামিক সোসাইটি অব টুউম্বার ফাউন্ডিং প্রেসিডেন্ট, ২০১৩–২০২৫ পর্যন্ত গার্ডেন সিটি মসজিদের ফাউন্ডিং চেয়ারম্যান এবং ২০১৪–২০২৫ পর্যন্ত অ্যানুয়াল ইন্টারন্যাশনাল ফুড ফেস্টিভাল অ্যান্ড মসজিদ ওপেন ডে-এর অর্গানাইজার ছিলেন। মুসলিম কমিউনিটি কো-অপারেটিভ অস্ট্রেলিয়ার ডিরেক্টর হিসেবেও ২০১৪–২০১৭ পর্যন্ত কাজ করেছেন।

ইসলামিক কাউন্সিল অব কুইন্সল্যান্ডের এক্সিকিউটিভ কমিটি মেম্বার হিসেবে তার ভূমিকা ছিল, ২০০৬–২০০৭ এবং ২০১৪–২০১৬ সময়ে ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব এবং অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন অব ইসলামিক কাউন্সিলসের কমিটি মেম্বার ও ২০১৬ সালে ইন্টারিম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। অর্থাৎ দীর্ঘকালীন ইসলামিক কমিউনিটি লিডারশিপ, বৃহত্তর মাল্টিকালচারাল এনগেজমেন্ট এবং তার একাডেমিক পরিচয়ের সঙ্গে কমিউনিটি ইনস্টিটিউশন-বিল্ডিংয়ের সমন্বয় ঘটেছে। তবে পুরস্কারের সাইটেশনের ভাষা অনুসারে এর মূল ফোকাস ছিল ইসলামিক কমিউনিটি সার্ভিস।

বাংলাদেশে ফিরে নতুন দায়িত্ব
অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘ কর্মজীবনের পর অধ্যাপক শাহজাহান খান বাংলাদেশেও একাডেমিক নেতৃত্বে যুক্ত হন। তিনি ২০২২ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ভাইস-চ্যান্সেলর ছিলেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘ সময় কাজ করার পর বাংলাদেশে ফিরে দেশের জন্য কাজ করতে চেয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের এক্সপ্যাট্রিয়েট ফেলো।

নামে শিক্ষাবৃত্তি
অধ্যাপক শাহজাহান খানের সঙ্গে ইউএসকিউ-এর সম্পর্ক এমেরিটাস প্রফেসরশিপে শেষ হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপ তথ্যের মধ্যে “প্রফেসর শাহজাহান খান স্কলারশিপ” নামে একটি স্কলারশিপের অস্তিত্ব রয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট স্টাডির জন্য সহায়তা করে।
২০২৩ সালে ইউএসকিউ তার নামে এই স্কলারশিপ চালুর ঘোষণা দেয়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তার একাডেমিক অবদান ও কমিউনিটি নেতৃত্বের স্বীকৃতির অংশ হিসেবেই তার নামকে স্কলারশিপের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। একজন শিক্ষকের নামে স্কলারশিপ প্রতিষ্ঠিত হওয়া তার ব্যক্তিগত পুরস্কারের চেয়ে ভিন্ন ধরনের স্বীকৃতি। এটি ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের জন্য তার নামকে একটি একাডেমিক লিগেসির সঙ্গে যুক্ত করে।

বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসে তার অবস্থান
বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের অধ্যাপক শাহজাহান খান এক্সপ্যাট্রিয়েট ফেলো। তার আন্তর্জাতিক প্রফেশনাল মেম্বারশিপের তালিকায় রয়্যাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল সোসাইটির ফেলো এবং ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের ইলেক্টেড মেম্বার।
তার গবেষণা ও পেশাগত নেতৃত্বের জন্য তিনি আইএসেসিও-আইএসওএসএস গোল্ড মেডেল (২০০১), আইএসওএসএস গোল্ড মেডেল (২০০৭) এবং বাংলাদেশ স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের কিউ এম এইচ হোসেন গোল্ড মেডেল (২০১২) পেয়েছেন।
এগুলো তার কর্মজীবনের ধারাবাহিকতা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ওএএম তাঁর প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়; বরং বহু বছর ধরে অর্জিত একাডেমিক, পেশাগত ও কমিউনিটি স্বীকৃতির দীর্ঘ তালিকায় এটি সর্বশেষ সংযোজন।

একজন প্রবাসী বাংলাদেশির গল্পের চেয়েও বেশি
অধ্যাপক শাহজাহান খানের গল্পকে শুধু “প্রবাসে একজন বাংলাদেশির সাফল্য” হিসেবে দেখলে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো আড়ালে থেকে যাবে। কারণ তার যাত্রার শুরু বাংলাদেশে হলেও তার কর্মপরিসর বিভিন্ন দেশে। তার গবেষণা কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন একাডেমিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। তার কমিউনিটি কাজ আবার একটি নির্দিষ্ট শহর—টুউম্বা—কে কেন্দ্র করে তৈরি হলেও তার সঙ্গে মাল্টিকালচারাল অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতা যুক্ত হয়েছে। আর তার ওএএম প্রাপ্তি এই বহুমাত্রিক জীবনের একটি নির্দিষ্ট দিককে সামনে আনে: অস্ট্রেলিয়ার ইসলামিক কমিউনিটিতে দীর্ঘ সেবা।

তার জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—একজন একাডেমিকের প্রভাব গবেষণাগার, শ্রেণিকক্ষ বা জার্নালের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকতে হয় না। গবেষক চাইলে তাঁর পেশাগত জ্ঞান ও সামাজিক অবস্থানকে ব্যবহার করে শিক্ষার্থী, সহকর্মী এবং বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজেও যুক্ত হতে পারেন। অধ্যাপক শাহজাহান খানের ক্ষেত্রে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডের ইসলামিক সেন্টার থেকে টুউম্বা মসজিদ, মাল্টিকালচারাল স্টাফ নেটওয়ার্ক থেকে আন্তর্জাতিক স্ট্যাটিস্টিকস কমিউনিটি—বিভিন্ন ক্ষেত্রের কাজ তার দীর্ঘ কর্মজীবনের বিস্তৃত সামাজিক পরিসরকে দৃশ্যমান করে।

তার ওএএম কেবল একটি পদক নয়; এটি তার জীবনের একটি নির্দিষ্ট অধ্যায়ের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। গোপালগঞ্জে জন্ম নেওয়া একজন শিক্ষার্থীর পরিসংখ্যানের উচ্চশিক্ষা থেকে আন্তর্জাতিক গবেষণা, অস্ট্রেলিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্ব, একটি মুসলিম কমিউনিটির প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, সংকটের সময়ে কমিউনিটি নেতৃত্ব, বাংলাদেশে একাডেমিক প্রত্যাবর্তন এবং অবশেষে অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রীয় অনার্স ব্যবস্থায় স্থান পাওয়া—এই দীর্ঘ পথটি একই জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ের সমষ্টি।

তার গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—জ্ঞানচর্চা, প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং কমিউনিটি সেবা—তিনটি ক্ষেত্রকে তিনি একই কর্মজীবনের বিভিন্ন স্তরে বহন করেছেন। ২০২৬ সালের ওএএম সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হয়ে যুক্ত হলো তার পরিচয়ের সঙ্গে। আমরা তার নেক হায়াত ও কল্যাণ কামনা করি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top