বাবার শর্তহীন ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কোনো তুলনা হয় না

আনিসুর রহমান এরশাদ

বাবার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও স্যালুট জানাচ্ছি। আসলে বাবা মানেই আপনজন, বাবা মানেই নির্ভরতা, বাবা মানেই প্রখর রোদে ছায়া দেয়া উঁচু বটবৃক্ষ, প্রখর রোদে শীতল ছায়া, অন্ধকারে পথের দিশা। বাবার বুক পরম নির্ভরতার, যেখানে এক নিমিষেই পৃথিবীর সব ভয় জয় করে নিতে পারে সন্তান। অনেক আদর-একটু শাসন, আশ্রয়-প্রশ্রয় আর মমতায় মাখা বাবা বুকে স্বস্নেহে আগলে রাখে পরম ধনকে।

বাবা হচ্ছেন- সন্তানের জনক, অভিভাবক, পুরুষ জন্মদাতা, আব্বা, পিতা। বাবা শব্দের সমার্থক শব্দ- জার্মান ভাষায় ‘ফ্যাট্যা’,ড্যানিশ ভাষায় ‘ফার’,আফ্রিকান ভাষায় ‘ভাদের’, চীনা ভাষায় ‘বা’, ক্রি (কানাডিয়ান) ভাষায় ‘পাপা’, ক্রোয়েশিয়ানরা বলে ‘ওটেক’, ব্রাজিলিয়ান ও পর্তুগিজ ভাষায় ‘পাই’, ডাচ ভাষায় ‘পাপা’ ‘ভাডের’ ও ‘পাপাই’, ইংরেজি ভাষাতে ‘ফাদার’ ‘ড্যাড’ ‘ড্যাডি’ ‘পপ’, ‘পপা’ বা ‘পাপা’, ফিলিপিনো ভাষায় ‘তাতেই’ ‘ইতেই’ ‘তেয়’ ও ‘আমা’, হিব্রু ভাষায় ‘আব্বাহ’, হিন্দি ভাষায় ‘পিতাজী’, ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় ‘বাপা’ কিংবা ‘আইয়্যাহ’, জাপানিজ ভাষায় ‘ওতোসান’ ‘পাপা’, পূর্ব আফ্রিকায় ‘বাবা’, হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় পাপা ও বাবা ‘এদেসাপা’ ইত্যাদি। যে যেভাবেই ডাকুক,বাবা বাবাই; বাবার কোনো তুলনা হয় না। বাবা মানেই মাথার ওপর এক টুকরো ছাদ, মাথার ওপর বিশাল আকাশ।

শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যে শব্দগুলো সবার আগে তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে তার অন্যতম হচ্ছে বাবা। এ যেন সন্তানের কাছে চিরন্তন আস্থার প্রতীক। শিশু যখন বাবা উচ্চারণ করতে শেখে তখন বাবার মন পুলকে ভরে যায়, বাবার হাস্যোজ্জ্বল সেই অনুভূতি অবুঝ শিশুর হৃদয়কেও আন্দোলিত করে। বাবা ছোট্ট একটি শব্দ হলেও এর ব্যাপকতা বিশাল। ডাকটার মাঝেই লুকিয়ে থাকে কী গভীর ভালবাসা, নিরাপত্তা, নির্ভরতা। একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে প্রিয় এবং সর্বাধিকবার উচ্চারণ করতে হয় যে শব্দগুলো তার মধ্যে বাবা অন্যতম। যার কারণে এই পৃথিবীর রং, রূপ ও আলোর দর্শন; সেই বাবা শব্দটির সঙ্গেই অপার স্নেহ আর মমতার মিশেলে এক দৃঢ় বন্ধনে জড়িয়ে থাকি সন্তান। সন্তানের কাছে বাবা পথপ্রদর্শক ও বন্ধুর মতো। বাবার ভালোবাসা, বাবার স্নেহ, বাবার আদর অতুলনীয়। বাবাই সন্তানকে দেন ভরসা, জীবনে চলার পথে দেন বলিষ্ঠ সাহচর্য, দেন সঠিক পথের দিশা, ভাল কাজে দেন অনুপ্রেরণা, দেন জীবনে এগিয়ে যাওয়ার ছবক। জন্মের পর থেকেই যে মানুষটি তার নিঃস্বার্থ স্নেহ-ভালোবাসা আর দায়িত্বশীলতার শৃঙ্খলে বেঁধে সন্তানের জীবনকে নিরাপদ ও সুন্দর রাখতে চায়, তিনি হলেন বাবা। সন্তানকে স্বনির্ভর ও সম্পন্ন মানুষ করার স্বপ্ন-সাধনাই যে মানুষটির জীবনের প্রধান ব্রত হয়ে দাঁড়ায় তিনি হলেন বাবা। বাবার আদর আহ্লাদে হাজারও স্মৃতি নিয়ে বেড়ে ওঠে সন্তান, বাবার হাত ধরেই ছোটবেলায় দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণ করে পৃথিবীকে চেনে।

সদ্য জন্ম নেয়া সন্তান বুকে নিয়ে বাবার যে সুখ তা এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম জিনিস, সবচেয়ে ভালোলাগার জিনিস। সন্তানকোলে বাবার ভালোবাসায় বেহেশতি সুখ, সন্তানের মুখে হাসি দেখলেই একজন বাবা হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একজন সুখী মানুষ। পরম বন্ধু বাবার হাত ধরেই বেঁচে থাকার মানে একটু একটু করে বুঝতে শেখা। তবে এ পরম বন্ধুত্বের কোথায় যেন ছড়িয়ে আছে খানিক গাম্ভীর্যের মেঘ, কিন্তু ওই মেঘেই ধরা দেয় পৃথিবীর অপার সৌন্দর্য। বাবা সন্তানকে শিশুকাল থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত সাহায্য করেন, সন্তানের মুখে হাসি ফুটাতে আত্মত্যাগ করেন, সুস্থ ও সবল রাখতে যত্ন করেন, সম্মানিত ও দক্ষ-যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়তে খরচ করেন, বিপদে-আপদে পাশে থেকে উৎসাহিত-অনুপ্রাণিত করেন, প্রেমময় মনোযোগে যুক্ত রাখেন, সন্তানের মঙ্গলে পেরেশান থাকেন, আবেগগত চাহিদাগুলো পূরণে আন্তরিক থ‍াকেন, সহমর্মী হন ও অনুভূতি বুঝতে আন্তরিক থাকেন। বাবা আছেন তো, সন্তান চিন্তাহীন-ভাবনাহীন। বাবা থাকলে যত চিন্তা সব বাবা নিয়ে নেন, কোনো ভয়ই কাজ করে না৷ ভীষণ বড় বড় অপরাধ ক্ষমা করে কাছে টেনে নেন বারবার। সন্তানকে সন্তানের মতো মেনে নিয়েই ভালোবাসেন। বাবাই শিখান- সৌন্দর্য নয়, গুণই মানুষের পরিচয়। অনেক মেয়েরই ছোটবেলা, মাঝারি বেলার নায়ক বাবা। ছোটবেলা থেকে সবচেয়ে সুন্দর উপহারগুলো পাওয়া যায় বাবার কাছ থেকে। অনেকেই জীবনের প্রতি মুহূর্তে বাবার মতো হওয়ার চেষ্টা করে যান।

সন্তানের দুঃসময়ে বাবা ডেকে নিয়ে বুকে চেপে রাখেন, চেষ্টা করেন সব কষ্ট ঘুচিয়ে দেয়ার। হাজার কষ্ট সয়ে তিলে তিলে সন্তানকে বড় করেন একজন বাবা। ছোট-বড়, অখ্যাত-বিখ্যাত সকলের কাছেই বাবা অসাধারণ। বাবার স্নেহ-ভালোবাসা সকলেরই প্রথম চাওয়া আর পাওয়া। একজন আদর্শ বাবা তার সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল না হয়ে পারে না। বাবা সারাটা জীবন সংসারে চরম কষ্ট হাসিমুখে স্বীকার করে যান , সব মুখে হাসি ফোটানোর জন্যে। সবকটা বিপদে বুকে আগলে রাখেন নির্ভীক নাবিকের মতো। চাঁদনী রাতে বাবা কোলে নিয়ে চাঁদের বুড়ির গল্প শোনান। কখনও রাক্ষস আর ডাইনীর গল্প শুনান। প্রত্যেকটা বাবার কাছেই নিজের মেয়েটা যেন রাজকন্যা, আর ছেলে রাজপুত্র। সে সুন্দর হোক বা কালো কুৎসিত হোক। সন্তান যখন নতুন কোন ড্রেস পরে বাবার সামনে এসে বলে..”বাবা আমাকে কেমন লাগছে?” বাবা তখন ঠটের কোণে উজ্জ্বল হাসি এনে বলে..”আমার মা কে তো আজ সত্যি সত্যি রাজকন্যার মতো লাগছে। প্রত্যেকটা বাবা তার রাজকন্যা ও রাজপুত্রকে ঘিরে স্বপ্ন দেখে। তার রাজপুত্র ও রাজকন্যা একদিন অনেক বড় হবে ধুমধাম করে বিয়ে দিবে। একসময় নাতী নাতনী হবে, বাসার সামনে খোলা মাঠে নাতী, নাতনীদের সাথে নিজের চোখ বেধে চোর হয়ে কানামাছি খেলবে।

আদম (আ:) মানুষের আদি পিতা, খ্রিস্টান ধর্মে ঈশ্বরকে পিতা বিবেচনা করা হয়। খ্রিস্টান সম্প্রদায় গীর্জার পুরোহিত মহাশয়কে সচরাচর “ফাদার” বা পিতা হিসাবে সম্বোধন করে থাকে। পিতার সেবা ও পরিচর্যা সুখকর, জগতে সুখ দায়ক। পিতাই স্বর্গ, পিতাই ধর্ম এবং পিতাই পরম তপস্যা, পিতা প্রীত হলে সকল দেবতা প্রীত হন’ শাস্ত্রের এ বাণী থেকে উপলব্ধি থেকে করা যায় বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা ও দায়িত্ব কতটুকু। গ্রীক কবি হোমার আরও বাড়িয়ে বলেছেন- ‘সেই জ্ঞানী সন্তান, যে তার বাবাকে জানে।’ বাবাহীন জীবন ধূসর মরুর ঊষর বুক, শ্বাপদ সংকুল বনে দুরু দুরু হৃৎকম্পন; বাবাহীন জীবন ছোট্ট ডিঙ্গি নিয়ে উত্তাল সাগর পাড়ি দেয়ার দুঃসাহসিক চেষ্টার নাম। বাবার আর্দশ, বাবার সততা, বাবার নৈতিকতা সন্তানকেও প্রভাবিত করে।

সাহিত্যে, গীত-আনন্দ ও লোককথা-শিল্পকর্মে বাবা স্থান করে নিয়েছেন এক দায়িত্বশীল স্নেহময় পুরুষ হিসেবে। বাবাকে নিয়ে নানা কাব্য তো আছেই, আছে অসংখ্য গান। ‘মন্দ হোক আর ভালো হোক বাবা আমার বাবা, পৃথিবীতে বাবার মতো আর আছে কেবা;’ ‘কাটে না সময় যখন আয় খুকু আয়;’ ‘বাবা আমার মাথার মুকুট চোখের মণি মা, তাদের ছাড়া এই পৃথিবী ভাবতে পারি না’- আরও কত কি। কাটে না সময় যখন আর কিছুতে, বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না… মনে হয় বাবার মতো কেউ বলে না আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয়… এই গানের সুর যখন কানে এসে লাগে এমন কোন সন্তান নেই যার বাবার কথা এবং এমন কোন বাবা নেই যার সন্তানের কথা মনে না পড়ে। মনে হয় অতীতের গহব্বর থেকে কথাগুলো মধুরতম সুর হয়ে হৃদয়ে পরশ বুলিয়ে দিয়ে যায়। বাবাকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন শামসুর রাহমান, আবুল হাসান, আর ভিনদেশী কবি পাপাকংগোস।

বাবাকে নিয়ে কিছু গল্প রয়েছে এমন যে: ‘বাবাদের শার্টগুলো বেশিরভাগ সময় মাদের শাড়ি থেকে দামি হয় না, বাবাদের ওয়ারড্রব ভর্তি শার্ট-প্যান্ট থাকে না। বাবাদের জুতা চলে বছরের পর বছর, মোবাইলটা একেবারে নষ্ট না হলে বদলান না, ঘড়িটা বৃদ্ধ হয়, তবুও হাতেই থাকে। একা খেতে হলে সবচেয়ে সস্তা হোটেল খোঁজেন, একা কোথাও গেলে বাসে চড়েন। রোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সঞ্চয় করেন। অথচ স্ত্রী-সন্তানকে সাধ্যের সব চেয়ে দামি জিনিসগুলো কিনে দেন। বাবারা একান্ত বাধ্য না হলে কখনও না বলেন না। নিজের জন্য সবচেয়ে কৃপণ বাবাটা তার স্ত্রী-সন্তানের জন্য সবচেয়ে বেশি বেহিসাবি। বেশিরভাগ বাবাই ভালোবাসি শব্দটা বলতে জানেন না, করতে জানেন। তারা আজীবন তাদের ভাগের বিলাসিতার ভাগ দিয়ে স্ত্রী-সন্তানকে ভালোবেসে যান… পৃথিবীতে অসংখ্য খারাপ পুরুষ আছেন, অসংখ্য খারাপ জন্মদাতাও আছেন। কিন্তু একটাও খারাপ বাবা নেই…।’

বাবা শুধু একজন মানুষ নন, স্র্র্রেফ একটি সম্পর্কের নাম নয়। বাবার মাঝে জড়িয়ে আছে বিশালত্বের এক অদ্ভুত মায়াবি প্রকাশ। বাবা নামটা উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে কোন বয়সী সন্তানের হৃদয়ে শ্রদ্ধা কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার এক অনুভব জাগে মানুষটি কতভাবে অবদান রেখে যান সন্তানের জন্য, যার চুলচেরা হিসাব করে কেউ বের করতে পারবেন না। বাবার কাঁধটা কি অন্য সবার চেয়ে বেশি চওড়া? তা না হলে কি করে সমাজ সংসারের এত দায়ভার অবলীলায় বয়ে বেড়ান বাবা। বাবার পা কি অন্য সবার চেয়ে অনে বেশি দ্রুত চলে? নইলে এতটা পথ এত অল্প সময়ে কি করে এত শক্ত করে সব কিছু আগলে রাখেন বাবা। আর বাবার ছায়া…? সেটাও শেষ বিকেলের বটগাছের ছায়ার চেয়েও বড়। বড় যদি না হবে তবে জীবনের এত উত্তাপ থেকে কি করে সন্তানকে সামলে রাখেন বাবা আর বাবার চোখ? সেটাও কি দেখতে পায় কল্পনার অতীত কোনো দূরত্ব। তা না হলে কি করে সন্তানের ভবিষ্যত ভাবনায় শঙ্কিত হন বাবা।

প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের উচিৎ হচ্ছে; বাবার সাথে এবং বাবার স্বজন-নিকটাত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার করা, নিজেদের পিছনে যে অনেকে প্রেমপূর্ণ-কর্মব্যস্তময়-যত্নশীল সময় ব্যয় করেছে তার জন্য কৃতজ্ঞতা পোষণ করা, অন্যদের স্নেহ-ভালোবাসাময় অবদানকে উপলব্ধি করা এবং স্বীকার করা, নিজের পক্ষ থেকে অন্যদেরকে মূল্যবান গণ্য করে আন্তরিক সাহায্য-সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া এবং যত্ন নেওয়া। অন্যকে সমাদর মন থেকে আসতে হয়, জোর করে হয় না। বাবাকে ভালোবাসার অর্থ তিনি দূরে থাকলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা, উৎসাহজনক কথা লিখে ফ্যাক্স-ইমেইল-চিঠি পাঠানো, টেলিফোনে বা মোবাইলে কল করে দরদপূর্ণ ভাষায় কথা বলা, সাক্ষাৎ করে আনন্দকে বাড়ানো, প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য-দ্রব্য উপহার পাঠানো, বস্তুগত চাহিদাগুলো জুগিয়ে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করা, অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ না করা, বড় অকৃতজ্ঞ না হওয়া, বাবাকে ভুল না বুঝা।

বাবা নিয়ে সব সন্তানের অনুভূতিটা সমান হয় না। আবার সব বাবাও পারেন না সন্তানের প্রতি তাদের আবেগকে একইভাবে প্রকাশ করতে। বাবা সন্তানের জন্য মঙ্গল কামনা করে যান তার জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত। প্রকাশভঙ্গি যাই হোক সন্তানের জন্য পৃথিবীটাকে বাসযোগ্য করে তুলতে চেষ্টার কোনো কমতি থাকে না তার। তাই বাবা যাদের বন্ধু তারাই জানে কি করে নিজের সব ভাবনাকে বাবার হাতে সঁপে দিয়ে হাল্কা হতে হয়। কি করে বাবার নির্ভরতার ছায়ায় থেকে, তার চোখে দেখা সুন্দর ভবিষ্যতটাকে নিজের করে নিতে হয়। অন্যদিকে বাবা যাদের কাছে দূরতম গ্রহের বাসিন্দা, তারা শত অর্জনের মাঝেও নিশ্চিতভাবেই বঞ্চিত হন অমোঘ এক প্রাপ্তি থেকে। বাবার সঙ্গে সন্তানের যে সহজ স্বাভাবিক সম্পর্ক তাতে দু’জনেরই কিছু না কিছু করার ব্যাপার রয়েছে। বাবা হয়ত সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে ক্লান্ত শরীর আর মন নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। সে ক্ষেত্রে ভালোবাসার বার্তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে সন্তানকেই। আবার সন্তান যখন মনের মাঝে ঘরবসতি গড়ে দিনে দিনে নিভৃতচারী হয়ে উঠছে তখন তার ভাবনাগুলো ভাগাভাগি করতে সামনে এগোতে হবে বাবাকে। সন্তান যত বড়ই হোক না কেন তার অভিমান আর অবহেলার পরিমাণ যত বিশালই হোক বাবার স্নেহ সব সময় তার জন্য এক পরম আশ্রয়। বেঁচে থাকার আনন্দে, কষ্টের তীব্রতায়, কঠিন সমস্যায় বাবাই হয়ে ওঠেন বিপদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু বা সহায়। অন্যদিকে সন্তানকেও ভাবতে হবে বাবার কথা। তার আবেগ অনুভূতি আর পরিণত বয়সের চাওয়া পাওয়াগুলোর দিকে বাড়তি নজর দিতে হবে।

একজন সন্তানের কাছে বাবা হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানুষ। ব্যক্তি জীবনে মানুষ খারাপ হতে পারে, নিকৃষ্ট হতে পারে, কিন্তু সন্তানের কাছে সব বাবাই ভাল। আমরা শিশুকালে হামাগুড়ি থেকে প্রথম উঠে দাঁড়াই যে হাত ধরে তা বাবার হাত। হাঁটি হাঁটি পা পা করে চলতে শিখি বাবার হাত ধরে। প্রথম যে কথা বলি তা বাবার ভাষায় কথা বলি। এভাবে সব শুরুই হয় বাবাকে দিয়ে। বাবা হয়ে উঠে একজন সন্তানের আদর্শ মানুষ। বাবার অবদান অপরিসীম, আমাদের জীবনের কারিগর। বাবার উপদেশ বা আদেশ আমাদের পথ চলার পাথেয়। আব্বুকে আমরা কেউ ডাকি বাবা বলে, কেউ আব্বা, কেউবা আব্বু আবার কেউ ডাকে ড্যাড বা ড্যাডি। যে নামেই ডাকি না কেন, বিশ্বজুড়ে এ ডাকটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সব সন্তানের নিঃস্বার্থ আবেগ, ভালোবাসা। বাবা একটু চোখের আড়াল হলেই সন্তানের মনে হয় পৃথিবীর কী যেন হারিয়ে ফেলেছি। অস্থির লাগে, উৎকণ্ঠা জাগে মনে। বাবার কাছে সন্তানই সব। আদর, ভালোবাসা, মায়া-মমতায় জড়িয়ে রাখেন আষ্টেপৃষ্ঠে। সন্তানের জন্য তার কত উৎকণ্ঠা, ত্যাগ-তিতিক্ষা! এক কথায় অতুলনীয়। হয়তো বাবা বলেই সম্ভব। কেননা তার সঙ্গে সন্তানের যে রক্তের বন্দন! মায়ার বন্দন! তাই তো সন্তানও বাবাকে ভালোবাসে পরম শ্রদ্ধায়। তাকে তুলে রাখে হৃদয়ের মণিকোঠায়। যারা বাবার কাছ থেকে দূরে থাকে, তারাও বিভিন্নভাবে চিঠিতে, ফোনে বাবাকে কাছে রাখে। যাদের বাবা নেই, তারাও স্মৃতি গেঁথে রাখে সব সময় মনে।

পিতার সেবা করা প্রত্যেক সন্তানের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। আমরা যেন ভুলে না যাই বাবার অপত্য স্নেহের মাঝে বেড়ে উঠা আমাদের শৈশব আর কৈশোরের দিনগুলো। যাদের বাবা বেচে আছে বাবাকে সম্মান করুন আপনার জীবন পরির্বতন হয়ে যাবে। বাবার সঙ্গে পুরাতন স্মৃতিচারণ করুন। দেখবেন তার পুরাতন স্মৃতি কিন্তু আপনাকে ঘিরেই। এতে আপনারও ভালোলাগবে। বাবাকে নিয়মিত পকেট মানি দিন। দান-খয়রাত করতে চাইলে সহযোগিতা করুন। সময় পেলে আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় বেড়াতে নিয়ে যান। বিশেষ করে তার বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে, পুরাতন আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিন। পারিবারিক কোনো বিষয়ে তার পরামর্শ গ্রহণ করুন। তাকে বোঝান যে আপনি এখনও বাবাকে ছাড়া কিছু করেন না। যাদের বাবা নেই-তারা বাবার জন্য আশির্বাদ করুন, প্রার্থনা করুন। প্রত্যাশা করি পৃথিবীর সব সন্তানরাই সুখে থাকুক বাবাকে নিয়ে। শেষ বয়সে কোনো বাবাকে যেন অসহায়ের মত জীবনযাপন করতে না হয়। যে বাবার জন্য আমরা পৃথিবীর আলো দেখেছি সেই বাবাকে যেন কেউ কষ্ট না দেয়। ভালো থাকুন বাবা, সুস্থ থাকুন বাবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *