জাতির প্রত্যাশা পূরণে কাঙ্খিত শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন

মানুষের জন্য ভালো জীবন এবং ভালো জীবনের জন্য ভালো সমাজ প্রতিষ্ঠার মানবিক লক্ষ্য নিয়েই জ্ঞান চর্চার সূত্রপাত হলেও আজকে জ্ঞানচর্চা যতটা মানুষের জন্য মানবতা প্রতিষ্ঠার জন্য তার চেয়ে বেশি মুনাফার জন্য, ধ্বংসের মধ্য দিয়ে স্বার্থ হাসিলের জন্য ; যা ভালো জীবনের সন্ধান দিতে পারছে না।তাই মানুষের শুভ বুদ্ধির উন্মেষ ও প্রসার ঘটিয়ে পৃথিবীকে সুন্দর ও বাসযোগ্য করার চিন্তা -চেতনা কিংবা বোধ হৃদয়ের গভীর তলদেশ থেকে উঠায়ে আনতে নবীন প্রজন্মকেই এগিয়ে আসতে হবে ।

সমাজে বসবাসকারী অগণিত মানুষ যাবতীয় বিষয়কে যেভাবে দেখেন একজন বিশ্বাসী; শিক্ষিত, সচেতন , দেশপ্রেমিক মানুষ সে দৃষ্টিতে কিংবা সেভাবে দেখবেন না। তিনি এর গভীরে প্রবেশ করবেন ,অর্ন্তদৃষ্টিকে শক্তিশালী করবেন । ফলে উভয়ের দেখা ও অনুভব করার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক । কেননা একজন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে কান্ডজ্ঞান, প্রচলিত রীতিনীতি,ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে । অন্যদিকে একজন বিশ্বাসী বিবেকবান মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে যুক্তিবাদীতা , বিচারধর্মীতা ও আদর্শের ওপর ভিত্তি করে ।

ফলে এ’ দুঃসময়ে দেশ ও জাতিকে বাঁচানো সম্ভব, এযুগের দাবি পুরণে সক্ষম যোগ্য ,সৎ ,দেশপ্রেমিক, সাহসী ও চিন্তাশীল নবীনদের মাধ্যমেই । তাই মেধা ও মননের স্ফূরণ ঘটিয়ে তারুণ্যের উচ্ছাস বৃদ্ধিতে সর্বপর্যায়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি অব্যাহত থাকা জরুরি ।

অথচ আমাদের ত্র“টিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা সন্ত্রাসের অন্যতম কারণ । দুর্নীতি শিক্ষিত মানুষদের দ্বারাই বেশী হচ্ছে। আর দুর্নীতির ফলে সন্ত্রাস বাড়ছে। শিক্ষার উদ্দেশ্য কি দুর্নীতিযুক্ত মানুষ গড়া? না। শিক্ষার উদ্দেশ্য দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন করা। এ সম্পর্কে সিজার বলেন, “Three kinds of progress are significant, There are progress in knowledge and technology. Progress in socialization of man & progress in spirituality. The last one is the most important.”

জাতির উন্নতির জন্য নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন , দেশপ্রেমিক শিক্ষিত প্রজন্ম প্রয়োজন । সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্টের প্রশাসন বিভাগ এবং বিচার বিভাগের ক্ষমতার বাইরে যেসব মূল্যবোধ বলবৎ করার দায়িত্ব মানুষের বিবেকের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে সেগুলোকে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ বলে । যেমন মহানুভবতা, ক্ষমা ও বিনয়,পরার্থপরতা, ইত্যাদি। এখন আমাদের শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে কি আদৌ এ বৈশিষ্টগুলো আছে ?

আমরা জানি শিক্ষা বিশেষ করে “সুশিক্ষা” জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষা ছাড়া মানব জীবনে উন্নতি সাধন করা অসম্ভব। শিক্ষা যেকোন সমাজের সভ্যতার নির্দেশক। ইহাই সমাজের প্রগতির হাতিয়ার। এই কারণেই প্রগতির ধারবাহিকতা রক্ষা করা এবং সেই সমাজকে উন্নতির পথে আগাইয়া নেওয়ার হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করার জন্য যেকোন দেশের পক্ষে শিক্ষার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আরো সুনির্দিষ্টভাবে শিক্ষার এই ভূমিকা অপরিহার্য মর্যাদা লাভ করেছে। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষিত মানুষ গুলো জাতিকে নিয়ে দেশকে নিয়ে ইতিবাচক কিছু ভাবছে কি ?

নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের চাদরে জড়ানো উজ্জল ভাবমূর্তি নিয়ে বিশ্বের বুকে নিজের অস্তিত্বকে বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষণা করবে এমন বাংলাদেশই প্রত্যাশিত। কিন্তু কি ভাবছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ? বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা। তাদের ভাবনায় দেশ দেশের মানুষ কতটুকু স্থান দখল করে আছে ? অথবা প্রত্যাশিত নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধই বা কত অংশ আছে ?

বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের ছাত্রদের প্রায় শতভাগের চিন্তাজগতে দেশ ও জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে নিজের স্বার্থ বিদ্যমান। তদের ভাবনার সিংহভাগ জুরে রয়েছে ভাল চাকরি ,বাড়ি-গাড়ি বা বিদেশ পাড়ি জমানোর ভাবনা । তারা ভাবছে একটা ডিগ্রী কিংবা একটা সার্টিফিকেটের কথা। আর প্রত্যাশিত ডিগ্রী বা সার্টিফিকেট যেভাবেই হোক অর্জন করলেই হল । যেকারনে প্রায় সকল পাবলিক পরীক্ষায়ই অসৎ উপায় অবলম্বনের দায়ে ছাত্র ছাত্রী এমনকি শিক্ষকও বহি:ষ্কারের নজির দেখা যায়। ছাত্র ছাত্রীদের প্রবনতা উপলব্দি করে এক শ্রেণীর চতুর ব্যবসায়ী গড়ে তোলেছে সার্টিফিকেটের দোকান খ্যাত অসংখ্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং স্কুল।

জ্ঞানার্নজন নয় বরং সার্টিফিকেট এবং অর্থ উপার্জনই বর্তমানে শিক্ষার উদ্দেশ্য বলে মনে হয়। তাই যেকোন ভাবে এই অর্থ উর্পাজনের হাতিয়ার নিজের দখলে আসলেই হল। এই মানসিকিতা গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে ছাত্রদের মাঝে। শিক্ষার্থীদের পবিত্র হাতে শিক্ষার উপকরনের পরিবর্তে শোভা পাচেছ পিস্তল রিভলভার কিংবা এ-কে ৪৭। ছাত্র আন্দোলন ‘৫২ কিংবা ‘৬৬ এর গৌরবময় পথ পরিহার করে অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচেছ। নির্যাতিত,নিষ্পেষীত এবং বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী আসাদ কিংবা নূূর হোসেনকে আর দেখা যায় না। তাদের স্থান দখল করেছে খুনি ও নিপীড়করা।

যদিও এ কথা সন্দেহাতীতভাবে সত্য যে, সমষ্টিগতভাবে আমাদের সামগ্রিক জীবনের তাৎপর্য ও স্বার্থকতা অনেকাংশে শিক্ষার মৌলিক ভিত্তি সঠিকভাবে নির্ধারণের ওপরই নির্ভরশীল। অথচ আমাদের এ উদ্দেশ্যহীন শিক্ষা প্রকৃতপক্ষে কোন ধরনের শিক্ষা। শিক্ষার পিছনে একটা লক্ষ্য অবশ্যই থাকতে হবে তা না হলে সেই লক্ষ্যহীন শিক্ষার বদৌলতে একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন তো দূরে থাক- ব্যক্তি তার নিজের জীবনেই পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে না তাই আবারো বলছি শিক্ষার পিছনে একটা লক্ষ্য থাকা চাই।

শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ কিছু অর্জন করতে চায় সেই অর্জনটা বৈষয়িক হতে পারে, মানসিক হতে পারে, আত্মিক হতে পারে অথবা একাধারে বৈষয়িক, মানসিক এবং আত্মিক লক্ষ্যও হতে পারে। আর এ লক্ষ্য নির্ণীত হয় একটা জাতির বা জনগোষ্ঠীর মৌলিক জীবন দর্শন দ্বারা। কোনো একটা জাতি বা জনগোষ্ঠী যে ধরনের জীবন দর্শনে বিশ্বাসী সেই আলোকে তার শিক্ষাব্যবস্থাকে গড়ে তুলবার চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক তা না হলে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্থাৎ সেই জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত হতে পারে। বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতা তার উজ্জল দৃষ্টান্ত ।

বর্তমানে বি.সি.এস. শিক্ষাথীদের প্রধান টার্গেট? কিন্তু কেন ? ন্যূনতম যোগ্যতা আছে এমন শিক্ষার্থীসহ অধিকাংশের প্রধান টার্গেট বি.সি.এস। এমন হল কেন? শুধু কি সম্মান বা মর্যাদার টানেই তারা বি.সি.এস. ক্যাডার হতে আগ্রহী? আগ্রহের কারন যা তা হল একই সাথে ক্ষমতা এবং অর্থ উর্পাজনের সুযোগ। সরকারের বড় বড় আমলাদের অর্থ-সম্পদ সরকার প্রদত্ত বেতন এবং সুযোগ সুবিধার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।

ডাক্তাররা অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগিতায় ব্যাস্ত। সরকারি হাসপাতলের চাকরি পরিণত হয়েছে পার্ট টাইম জবে । প্রাইভেট ক্লিনিক হয়ে যাচ্ছে প্রধান এবং ফুল টাইম জব। ফলে সরকারি হাসপাতাল গুলোতে রোগিদের আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়ে যাচেছ। প্রকৌশলীরা দূর্বল অবকাঠামো গড়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচেছ। সুযোগ পেলেই বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কর্তব্য ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাশ নিচ্ছে। ফলে অনিশ্চতার দিকে চলে যাচেছ লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবন। নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ছাত্রদের ব্যবহার করছে যেকারনে ছাত্রদের মধ্যে সৃষ্টি হচেছ বিভিন্ন দল উপদল। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ, ভর্তি পরীক্ষা, বিভিন্ন পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম এবং দূর্নীতি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

আর ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিভঙ্গি কি? দেশের অসংখ্য মানুষ যখন দু মুঠো ভাতের অভাবে অর্ধমৃত; ব্যবসায়ীরা তখন চাল ডাল গুদামজাত করে কৃত্রিম খাদ্য সংকট সৃষ্টি করছে। যার ফলে দেশে সৃষ্টি হয় কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ। অর্থাৎ এ এক ভয়াবহ চিত্র দেখছি আমরা ।

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর (দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বিনিময়ে) স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটেিিছল। দীর্ঘ ৩৮ বছরে পদার্পন করেও আমরা ইংরেজ দাাদা বাবুদের প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থার অধীনেই আছি। আমাদের কেউ কেউ আবার সেই শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে থেকেই “ডিজিটাল বাংলাদেশ” গড়ার স্বপ্ন দেখছি এটা সত্যিই দুঃখজনক। স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমরা আমাদের নিজস্ব চাহিদা মোতাবেক তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য শিক্ষানীতি এ দেশের জনগণকে উপহার দিতে পারিনি এটা আমাদের চরম ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই নয়। কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাব্যবস্থার অভাবেই প্রত্যাশিত মানের নবীন প্রজন্ম গড়া সম্ভব হচ্ছেনা ।

জাতির দায়িত্বশীল নেতারা অধিকাংশই শিক্ষিত । অথচ তাদের ভাবনা কি ? আমাদের নেতা রাজনীতিবিদ দায়িত্বশীলরা আজ দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে পরিচিত । সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি দমন অভিযানে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিই সাবেক সাংসদ এবং মন্ত্রিদের কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। দুর্গত এবং দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের ত্রানের বিস্কুট সখের ঘোড়াকে খাওয়াচ্ছে অপরদিকে মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে। অথচ এসকল বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাদের প্রধান প্রতিশ্রুতি। নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে বিকিয়ে দিতেও কার্পণ্য করে না। এরাই আমাদের দায়িত্বশীল। কি মূল্য আমাদের এই শিক্ষার? দেশ ও জাতিকে যদি শিক্ষিত মানুষেরা ভালো কিছুই দিতে না পারে ।

আমাদের মনে রাখতে হবে ,শিক্ষার উদ্দেশ্যই হল ভালত্ব ধারণার উপলব্ধি , আত্মার উন্নয়ন ও চেতনার সমৃদ্ধি। শিক্ষা ন্যায়কে উদ্ভাসিত করে। ব্যক্তিকে তার কর্তব্য ও দায়িত্বপালনে সম্পূর্ণ উপযুক্ত করে তোলে। প্রকৃত শিক্ষা নারী পুরুষ সবাইকে সামাজিক অর্থনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিকভাবে যোগ্য করে তোলে। শিক্ষা মানুষের কুপ্রবৃত্তিকে মূলোৎপাটন করে। একটি প্রদীপকে পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার যেমন গ্রাস করতে পারে না তেমনি যিনি শিক্ষিত তাকে অন্যায় অপকর্ম গ্রাস করতে পারে না। শিক্ষার উদ্দেশ্য মহৎ হলেও বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের আচার আচরণ ও কার্যক্রমে মহত্ত্বের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।

শিক্ষার উদ্দেশ্য এখন বলা যায় পুরোটাই বাণিজ্যিক। শিক্ষা নিয়ে চলছে এখন বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা। যার ফলে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কোচিং , প্রাইভেট স্কুল , কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় । যে কারনে অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা শিক্ষাগত যোগ্যতাকে অর্থনীতিক আয়ের একটা মাধ্যমে হিসেবে মনে করে। নৈতিক ও মানবিক মুল্যেবোধহীন শিক্ষায় শিক্ষিত একজন ব্যক্তি যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে , তখন তার মধ্যে নিজ স্বার্থ সিদ্ধি ছাড়া অন্যান্য উদ্দেশ্য গৌণ হয়ে যায়। এজন্যই স্বার্থসিদ্ধিতে একজন কর্মকর্তা নীতিবহির্ভূত যেকোন অন্যায় করতেও দ্বিধা করে না। যে কারনে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাহাড় সমান দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। এই অবস্থার পরির্বতনের জন্য কারো কি কিছুই করার নেই ?

অবশ্যই আছে । শিক্ষাকে বাণিজ্যকীকরণ থেকে মুক্ত করে শিক্ষার সঠিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে শিক্ষার্থীকে অভিহিত করতে হবে। শিক্ষার্থীকে নৈতিকতা, ত্যাগ , জনকল্যাণ , উদারতা , মহানুভবতা এবং সততা শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষক মহোদয় গণ শিক্ষার্থীদের সামনে নিজেদেরকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করবেন। শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে পরিশুদ্ধ মানুষ তৈরি করা ।

নৈতিক এবং মানবিক মূল্যেবোধ সমূহ (যেমন-সততা, ন্যায়, মায়া, মমতা , সহিষ্ণুতা, পরোপকার, ত্যাগ, ) শিক্ষার্থীর চরিত্রে এসব গুণ প্রতিফলিত হল কিনা তা পরীক্ষার ব্যবস্থা করার সাথে সাথে এসব বিষয়ের উপর নির্দিষ্ট নম্বার রাখা যেতে পারে। শিক্ষার্থী কোনো অনৈতিক এবং অপরাধমূলক কর্মকান্ড করলে তাকে শারীরিক শাস্তি প্রদানের সাথে সাথে ব্যবহারিক বিষয় থেকে নম্বার কমিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। যাতে সত্যিকার অর্থে একজন শিক্ষার্থী সৎ এবং নৈতিকতা সম্পন্ন হতে পারে।নাহলে এ জাতির কপাল থেকে কলংক তিলক কখনই মুছা সম্ভব হবে না ।

এখন কথা হলো আমাদের শিক্ষাব্যাবস্থাটা কেমন হবে ? শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কোন একটা জাতি বা জনগোষ্ঠীর জীবন-দর্শনের প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল এই বিষয়টিকে যদি আরো সুস্পষ্ট করতে চাই তাহলে আমরা এভাবে বলতে পারি যে, কোন জাতি বা জনগোষ্ঠী যদি হয় সেকুলার বা ধর্মহীন হয় কিংবা ধর্মের প্রতি উদাসীন তাহলে বৈষয়িক কিংবা জাগতিক উন্নতিকে সে তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য মনে করবে এবং তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে সে আলোকেই গড়ে তুলবার চেষ্টা করবে। আবার কোন জাতি যদি হয় ধর্মপরায়ন (Pious) তাহলে সে জাতি তার ধর্ম বিশ্বাসের আলোকে তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে গড়ে তুলবার চেষ্টা করবে। আবার কোন জাতি ধর্ম পরায়ন হওয়া সত্ত্বেও সে জাতির ধর্মটি যদি সন্ন্যাসবাদী (Asceticism) বা বৈরাগ্যবাদী তাহলে জগৎ সংসারের প্রতি অনাসক্তি সৃষ্টি এবং আত্মার মুক্তি বা মোক্ষ লাভই হবে সে জাতির শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য।

পক্ষান্তরে ধর্মটি যদি হয় পূর্নাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা (A complete code of life) তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য হবে জগৎ ও জীবনের সুসামঞ্জস্যপূর্ণ সামগ্রিক বিকাশ। যে কোন জাতির শিক্ষা ব্যবস্থা সে জাতির বিশ্বাস, জীবনাচার ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে, পরিচর্যা করে এবং প্রজন্মকে বিশ্বাস ও আদর্শের আদলে গঠন করে। তাই যদি জাতি হিসেবে আমাদের শিক্ষা দর্শন বলি কিংবা শিক্ষানীতি যা-ই বলি না কেন সে নীতিটা আমাদের সমাজ ও বাস্তবতার নিরিখে কোন ধরনের হওয়া উচিৎ সে বিষয়টি যৌক্তিকভাবে প্রতিপাদন করা প্রয়োজন ।“শিক্ষা নীতি” বা শিক্ষা ব্যবস্থা নামক conceptটি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা প্রদান কিংবা “শিক্ষা” বলতেইবা আমরা কি বুঝব সে ব্যাপারে ধারণা স্পষ্ট করণ (Concept of clarification) সঙ্গত মনে করে আলোচনা শুরু করছি।

বাংলা “শিক্ষা” শব্দটি সংস্কৃত “শাস” ধাতু থেকে উদ্ভুত হয়েছে। এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো শাসন করা, নিয়ন্তণ করা, নির্দেশ বা উপদেশ দেওয়া। আবার অনেক সময় শিক্ষার সমার্থক হিসেবে “বিদ্যা” শব্দটিও ব্যবহার করা হয় সেটিও সংস্কৃত “বিদ” ধাতু থেকে উদ্ভুত। যার অর্থ হলো জানা বা জ্ঞান অর্জন করা। অতএব, শাব্দিক অর্থে “শিক্ষা” বলতে বিশেষ কোন জ্ঞান অর্জনে বা কৌশল আয়ত্ত্ব করাকে বোঝায়। এটাই শিক্ষার সংকীর্ণ (Narrow) অর্থ যা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও পাঠ্যপুস্তক কেন্দ্রিক জ্ঞান আহরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অপরদিকে ব্যাপক অর্থে শিক্ষা বলতে বোঝায় জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর সব রকমের সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন করাকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষার লক্ষ্য হলো যে শিক্ষার্থীর দৈহিক, মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক জীবনের সুষম বিকাশ সাধন করা এর ব্যাপ্তি দীর্ঘকালব্যাপী ইহা বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্যকোন প্রতিষ্ঠানের আওতায় সীমাবদ্ধ থাকে না।

আর তাইতো মহাকবি মিল্টন এর মতে, “Education is the harmonious development of body, mind & soul”. আবার শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো “Education” যাহা ল্যাটিন শব্দ Educare, Educure & Educatum  থেকে এসেছে। Educure – To lead up নিষ্কাশন করা এই অর্থে শিক্ষা হলো “Pack the information in & draw the Talent out” অর্থাৎ ব্যক্তির প্রতিভা বা প্রবণতাকে বের করে আনা সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ। Educatum – to control নিয়ন্ত্রণ করা। আর এখানেই এসে আমরা শিক্ষার সংস্কৃত “শাম” ধাতু এবং Education এর মূল ল্যাটিন Educatum এর মাঝে অর্থের মিল খুঁজে পাই। এক্ষেত্রে ব্যক্তিকে সকল প্রকার অনৈতিক কার্যকলাপ থেকে নিয়ন্ত্রণ বা শাসন করাকেই বুঝানো হয়।

সুতরাং ব্যুৎপত্তিগত (Etimologicas) অর্থে আমরা “Education” শব্দটিরও দুটি অর্থের কথা বলতে পারি। একটি হচ্ছে পরিচর্যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে জীবনোপযোগী কৌশল বা দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা এটি সংকীর্ণ অর্থে Educationকে নির্দেশ করে। অপরটি হলো পরিচর্যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত শক্তি ও সম্ভাবনার বিকাশ ঘটানো যা ব্যাপক অর্থে Educationকে নির্দেশ করে। সুতরাং ব্যুৎপত্তিগত অর্থের ভিত্তিতে আমরা শিক্ষার একটা সংজ্ঞা দাঁড় করাতে পারি এভাবে যে শিক্ষা হলো একটি পদ্ধতি/প্রক্রিয়া যেখানে জ্ঞান প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে যুগোপযোগী করে গড়ে তুলা হবে এবং সাথে শিক্ষার্থীর মাঝে যে সুপ্ত প্রতিভা রয়েছে সেটাকে বিকাশ সাধনে সহায়তা প্রদান করে।

আর নীতি (Policies) হচ্ছে একটি ন্যায়সঙ্গত সুপরিকল্পিত কার্যব্যবস্থা। ব্যাপক অর্থে কোনো কার্যপরিকল্পনায় কি পরিবর্তন কিংবা পরিবর্ধন বা সংযোজন করা হবে তা পূর্ণ কর্তৃত্বের মাধ্যমে নির্ধারণ করাকে নীতি বলে। তাহলে “শিক্ষানীতি” বলতে আমরা বুঝব শিক্ষার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার একটি প্রক্রিয়াকে। অর্থাৎ কোনো সুপরিকল্পিত ও বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করার মাধ্যমে শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব সেই সুপরিকল্পিত পদক্ষেপটিই হলো শিক্ষা নীতি বা Strategy।

এবার আমাদের শিক্ষানীতি কি হওয়া উচিত এ নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সভা সমিতি ও গোল টেবিল বৈঠকে আলাপ আলোচনা হচ্ছে বিভিন্ন জন বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করছেন। তাছাড়া শিক্ষা সম্বন্ধে আগ্রহী সাধারণ বা আম জনতার মধ্যেও এ নিয়ে চলছে নানা রকম জল্পনা কল্পনা। সভা-সমিতি গোল টেবিল বৈঠকে বিভিন্ন বক্তার অভিমত কিংবা সাধারণ জনগণের মাঝে এ নিয়ে সাড়া জেগেছে এটি সত্যিকার অর্থে শুভ লক্ষণ এবং জাতি হিসেবে আমাদের সচেতনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ইঙ্গিত বহন করে সে জাতির শিক্ষা নীতি কি হবে।

কথায় আছে “নানা মুনীর নানা মত” ব্যক্তিগতভাবে যে যা-ই বিশ্বাস করুক না কেন কিংবা আদর্শ বা মতবাদ ভিত্তিক দলীয় রাজনীতির প্রয়োজনে কোন কোন দল বা গ্রুপের বিশ্বাস যাই হোক না কেন জাতি হিসেবে আমরা বাংলাদেশীরা বা বাঙ্গালী যা-ই বলি না কেন সেকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ নই। ব্যক্তিগতভাবে বা সমষ্টিগতভাবে কয়েকজন যদি ধর্মনিরপেক্ষ জাতি হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করা হয় তাহলে এক ধরনের যৌক্তিক অনুপপত্তি (Logical fallacy) ঘটবে। সত্যিকার অর্থে মুসলিম, হিন্দু (সনাতন), ইহুদী, নাসারা, বৌদ্ধ কেউই কিন্তু ধর্ম নিরপেক্ষ নয় ধর্মের প্রতি উদাসীন নয়।

আমরা যদি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে দেখে বিবেচনা করি তাহলে দেখতে পাবো এদেশের জনগোষ্ঠীর শতকরা প্রায় ৮৫-৯০ ভাগ লোক ধর্মের মাঝে তাদের নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। তাহলে আমরা পেলাম যে ধর্মনিরপেক্ষতা বা ধর্মের প্রতি উদাসীনতার অবকাশই এ জাতির সমাজ ব্যবস্থায় নেই। পক্ষান্তরে আমাদের ধর্ম জীবনকে মায়া মনে করে না কোনো প্রকার সন্ন্যাসবাদকে প্রশ্রয় দেয় না। এজন্যই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য কেবল বৈষয়িক প্রগতি অথবা কেবল মোক্ষলাভ বা আত্মিক মুক্তি হতে পারে না।

যেহেতু বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ লোক যেহেতু মুসলমান সেহেতু এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাও তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ তথা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা কেন্দ্রীক হওয়া উচিত। তাহলে আমরা বলতে পারি দৈহিক, মানসিক ও আত্মিক দিক দিয়ে জীবনকে তাৎপর্যপূর্ণ করে গড়ে তোলাই হবে আমাদের শিক্ষা দর্শনের মূল কথা। যৌক্তিকভাবে শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের চিন্তা-চেতনা ও মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে এরকম একটা শিক্ষানীতির দাবী আমাদের জাতির দীর্ঘদিনের মৌলিক দাবী। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে দু দু’বার দীর্ঘকাল উপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী শাসন শোষনের যাঁতকলে পিষ্ঠ হয়ে বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই যে দাস মনোবৃত্তির জন্ম হয়েছিল স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরও আমরা এখনোতার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারিনি।

আর সেই ব্যর্থতার গ্লানি না মুছেই আমরা “ডিজিটাল বাংলাদেশ” গড়ার স্বপ্ন দেখছি যা রীতিমত অবাক করার বিষয়। এক শ্রেণীর তাঁবেদার বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ আবার এটাকে সফলতার চাবিকাঠি দাবী করে প্রগতির নামে পশ্চিমা সমাজ ব্যবস্থা ও জীবন দর্শনের আলোকে উদ্ভাবিত এই শিক্ষা ব্যবস্থার অন্ধ অনুকরণ করেই নিজেদের শিক্ষাভিমান চরিতার্থ করার মতো নির্লজ্জ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ শিক্ষা ব্যবস্থা আমদানী/রপ্তানী করার মতো কোন বস্তু নয়। “শিক্ষা কতগুলো দক্ষতা অর্জন প্রক্রিয়া সমাজ ও ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। তাই শিক্ষার ক্ষেত্রে সাধারণ সমতার ধারণা সম্ভব নয়।”

মাকড়সা যেমন নিজের নাভী থেকে সুতা বের করে জাল বা ঘর তৈরি করে তেমনি কোন জাতির শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠা উচিত একেবারেই অভ্যন্তরীন ও অন্তরের তাগিদ থেকে। কোন দেশের শিক্ষা কিরূপ হবে তা নির্ভর করে সে দেশের ঐতিহ্য সংস্কৃতি তার মূল্যবোধ ও সামগ্রিক জীবনবোধের ওপরে। যদি তার ব্যত্যয় ঘটে তাহলে চিরকালই দাস হয়ে থাকতে হবে যার প্রভাব পড়েছে আমাদের শিক্ষানীতিতে। কেননাা একজন মনীষীর মন্তব্যটি এই মূহুর্তে খুবই মনে পড়ছে তিনি বলেছিলেন যদি কোন জাতিকে তোমার দাস বা অনুগত করে রাখতে চাও তাহলে সে দেশ বা জাতির সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে ধ্বংস করে দাও।

মূলত যা রোগের কারণ তাকেই আমরা রোগের প্রতিষেধক বা মহৌষধ হিসেবে ব্যবহার করার দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করছি। যে শিক্ষা প্রণালী আমাদের দেশে চালু রয়েছে কিংবা কায়েমী স্বার্থবাদী এবং তথাকথিত বুদ্ধিজীবী মহল যে শিক্ষা ব্যবস্থার রূপরেখা প্রনয়নের জিগির তুলছেন সে শিক্ষা নৈতিকতা বর্জিত শিক্ষা। এই ধরনের শিক্ষা শিক্ষার্থীদের অন্তরে ও আত্মায় কোন মহৎ আত্মিক ও সামাজিক মূল্যবোধ ন্যায়-অন্যায়, ঔচিত্য-অনৌচিত্যবোধ জাগ্রত করে না। এই শিক্ষা সম্পদ এবং ক্ষমতা অর্জনের উপযোগী বুদ্ধি সরবরাহ ও পেশাগত চাহিদা পূরণের চেষ্টা করে মাত্র। আজকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে ধর্ষণে সেঞ্চুরীসহ সকল প্রকার দূর্নীতি ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এই ধরনের শিক্ষা নীতিরই অবশ্যম্ভাবী ফল।

আজ বহু পাশ্চাত্য শিক্ষা বিজ্ঞানী যেখানে বলতে বাধ্য হচ্ছেন পশ্চিমের এই শিক্ষা জ্ঞানকে বিভিন্ন কক্ষে কক্ষে আলাদা স্থান নির্দেশ করছে। এক কোঠা থেকে আরেক কোঠায় যাওয়ার পথ নেই বলা চলে। তাদের মতে আজকের এই শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষের গোটা জ্ঞানের ভান্ডারকে সমন্বিত ও সুসংহত করে এক অখন্ড রূপ দান করে না। ফলে শিক্ষার্থীরা সমগ্র বিশ্ব সম্পর্কে কোন ধারণা অর্জন করে না বিশ্বকে দেখে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিচ্ছিন্ন খন্ড খন্ডরূপে।অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের দেশে যারা পাশ্চাত্য শিক্ষার ধারক এবং অন্ধ অনুরাগী তাদের বোধোদয় হচ্ছে না। পাশ্চাত্যের ন্যায় তারাও ধর্মীয় তথা আমাদের জীবন আদর্শকে শিক্ষাক্ষেত্রে পালন করতে দিতে নারাজ। পাশ্চাত্যের সুরে সুর মিলিয়ে তারা বলেন ধর্ম হচ্ছে মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপার।

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত। একটি হচ্ছে সাধারণ শিক্ষা আর অন্যটি হচ্ছে ধর্মভিত্তিক শিক্ষা বা মাদরাসা শিক্ষা। মাদরাসা শিক্ষারও অনেকগুলো ধারা রয়েছে যেমন- আলিয়া, কওমী, ক্যাডেট-মাদরাসা ইত্যাদি। সাধারণ শিক্ষা হলো তাই যে শিক্ষায় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সন্তানদের বা ভাই বোনদের ইংরেজ প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থায় পাঠদান করা হয়। সাধারণ শিক্ষায় ধর্মীয় ও নৈতিকতার প্রশিক্ষণ নেই বললেই চলে। অথচ নৈতিকতা বর্জিত শিক্ষা প্রকৃত পক্ষে শিক্ষার মর্যাদা লাভ করতে পারে না। ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধ থেকে নৈতিকতার উদ্ভব আর সেই ধর্মীয় মূল্যবোধ বর্জিত শিক্ষা পদ্ধতিতে মানুষ যতই উচ্চ শিক্ষিত হোক অনৈতিক কাজ করতে সে দ্বিধা করবে না।

এ প্রসঙ্গে Russell B. কর্তৃক স্যামুয়েল বাটলারের খ্রিষ্টান ধর্ম প্রবর্তিত “The way of all Flesh” উপন্যাসের ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। এখানে ঔপন্যাসিক দেখিয়েছেন যে ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুতি ঘটলে মানুষের অধঃপতন ঘটে সে সকল প্রকার হীন ও ঘৃণ্য কাজ করতেও দ্বিধা করে না উপন্যাসের নায়কের ক্ষেত্রে যেমনটি ঘটেছে উপন্যাসের নায়ক খ্রিষ্ট ধর্ম থেকে বিচ্যুত হওয়ার ফলে তার গৃহপরিচারিকাকে ধর্ষণ করতে প্রলুব্ধ হয়েছে। এই ঘটনাটি থেকে বলা যায় যে যদি ধর্মীয় মূল্যবোধ তার মাঝে থাকত তাহলে ধর্ষণের মতো অনৈতিক কাজ করতে সে প্রলুব্ধ হতো না।

আর শিক্ষা ব্যবস্থায় যদি ধর্মীয় বিষয়ে পাঠদান না তরা হয় তাহলে ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত কোত্থেকে? যদি ধর্মীয় বিষয় শিক্ষা দান করা থেকে শিক্ষার্থীদের বিরত রাখা করা হয় তাহলে সেই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করার পরও যে দূর্নীতি করবেনা এর কোন নিশ্চয়তা নেই। যেমনটি আমরা বিগত কয়েক বছরের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখতে পাই। আমরা যদি বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাবো যে প্রত্যেক সরকারই নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে শিক্ষা নীতি প্রনয়ন করার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন।

“যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা” এই নীতিতে বিশ্বস্ত হয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলকভাবে এক সরকারের করে যাওয়া শিক্ষা নীতি ও কমিশন ভেঙ্গে নতুন নীতি ও কমিশন গঠন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন কিছু নয়। এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষাক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য করি কুদরত-এÑখুদা কমিশন, শামসুল হক কমিশনসহ অনেক কমিশন গঠিত হয়েছে যেগুলোর বেশিরভাগই এদেশের ঐতিহ্য ও ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী। পাঠ্যক্রম পাঠ্যসূচীসহ পরীক্ষা পদ্ধতিতেও আমরা লক্ষ্য করি নানা বৈচিত্র্য কিন্তু দেখা গেছে এতেও দেশে শান্তি ফিরে আসে নি।

মোট কথা হলো শুধু কমিশনের পর কমিশন কিংবা নতুন নতুন সিলেবাস প্রণয়ন করলেই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হাসিল ও দেশে শান্তি ফিরে আসবে না যদি না এগুলোর পাশাপাশি বিশেষ বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এগুলোর পাশাপাশি নৈতিক চরিত্রের উৎকর্ষের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন- গুণীজন তথা সৎলোকদের সমন্বয়ে আধুনিক শিক্ষিত ইসলামী চিন্তাবিদগণ ও বিজ্ঞ আলেম ওলামাগণের মতামতের ভিত্তিতে যে শিক্ষাব্যবস্থা ইসলামী তাহজীব ও তমুদ্দুনের মিলন ঘটবে সে শিক্ষাই কেবল পারে জাতি হিসেবে বাংলাদেশীদের শান্তি দিতে। সবচেয়ে বড় যে কথাটি হলো আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের আলোকে একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি তৈরি করতে হবে। আমদানীকৃত ভাড়া করা পশ্চিমা সংস্কৃতির শিক্ষাব্যবস্থা কখনো আমাদের সংস্কৃতির জাতি গোষ্ঠীর শান্তি বয়ে আনতে পারে না।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদ্যমান সমস্যাগুলির প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করত আমরা মনে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার উল্লেখিত সমস্যাগুলি কাটিয়ে উঠতে না পারলে দেশ হিসেবে আমরা স্বাধীন একথা দাবী করলেও জাতি হিসেবে আমরা এখনো পরাধীন। যে জাতির নিজস্ব কোন সংস্কৃতি শিক্ষানীতি থাকবে না সে জাতি আবার স্বাধীন হলো কিভাবে? আমরা স্বাধীন নই একথা আমি এজন্যই বলছি যে, আমরা আজও ব্রিটিশদের প্রভাব থেকে রেহাই পাইনি। আমরা আজও তাদেরই শিক্ষাব্যবস্থা ধরে রেখেছি। তাদেরই অনুসরণ অনুকরণ করছি এটা আমাদের জন্য লজ্জাকর।

যদি আমরা সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতা লাভ করতে চাই তাহলে পশ্চিমা প্রভাব মুক্ত হয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে যেখানে ইহলৌকিকা ও পারলৌকিক জ্ঞানের সমন্বয় থাকবে। আমরা যদি আমাদেরই ভূ-খন্ডের অতীত ঐতিহ্যের দিকে তাকাই তাহলে দেখি যে শিক্ষা ক্ষেত্রে এ ধরনের সমন্বয় ঘটানোর মধ্য দিয়ে মুঘল আমল (১৫৬৭-১৭৫৭) সে যুগের শিক্ষা সংস্কৃতিতে এক সোনালী অধ্যায় রচনা করতে সক্ষম হয়েছিল। মুগল সাম্রাজ্যের (১৫৬৭-১৭৫৭) প্রায় দু’শ বছর সাহিত্যকলা বিজ্ঞান দর্শন শিল্প বাণিজ্য ক্ষেত্রে যে সর্বাঙ্গীন উন্নতি সাধিত হয়েছিল তা ভারত বর্ষের ইতিহাসে আর কখনো সম্ভব হয়নি।

এ শিক্ষা শুধু বৈষয়িক নয় ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জ্ঞানের সমন্বয়ে গঠিত ছিল। বিষয় বিন্যাসে ধর্মীয় জ্ঞান ও গবেষণাধর্মী বিষয় অন্তর্ভূক্ত ছিল। প্রাথমিক স্তরে প্রথমে উচ্চারণের সাথে বর্ণমালার জ্ঞান দেয়া হতো। অত:পর গননা ও প্রাথমিক পাটিগণিত এবং ছোট ছোট বাক্য পড়া ও লিখার নিয়ম শেখানো হতো। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ্যসূচেিত অন্তর্ভূক্ত ছিল ন্যায় শাস্ত্র জ্যোতিবিদ্যা, অনুষ্ঠান পদ্ধতি হিসাব বিজ্ঞান, কৃষি বিজ্ঞান অর্থনীতি ও ইতিহাস। শিক্ষার সাথে সর্বস্তরে ধর্ম শিক্ষার নিবিড় গড়ে তোলা হয়েছিল সে যুগে। পরীক্ষা পদ্ধতি ছিল শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাইয়ের মাপকাঠি। যদিও সে যুগে কেন্দ্র ও সরকারের পরিচালনাধীনে পরীক্ষা গ্রহণের পদ্ধতি চালু ছিল না।

যারা পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুরাগী তারা প্রগতির অজুহাত দিয়ে আমার এই মতের সাথে একমত নাও হতে পারেন এটাই বাস্তব তথাপি আমাদেরকে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য ফিছনে ফিরে তাকানো উচিত। অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের মাঝে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। ইতিহাসের মাঝেই মানুষের সাফল্যের সম্পূর্ণ যথাযথ অর্থপূর্ণ বিবরণ লাভ করা যায়। মানুষের উচিত নতুনকে খোঁজার জন্য পুরাতনকে বিশ্লেষণ করা। জর্জ বার্ণাডস বলেন- “The past is not behind the group it is within the group”. তাছাড়া আমরা যদি আধুনিক চীনের রূপকার নীতি শিক্ষক কনফুসিয়াসের শিক্ষা দর্শনের কথা বলি সেখানে তিনি ইতিহাসকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছিলেন।

আমরা যদি মাদরাসা শিক্ষার কথা বলি তাহলে আমরা দেখতে পাবো মাদরাসা শিক্ষা চতুর্মখী ষড়যন্ত্রের শিকার। কলিকাতা মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পিছনেই ষড়যন্ত্রের বীজ নিহিত ছিল। ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী এদেশের বৃহত্তর জনগণকে খুশী করার জন্য কলিকাতা আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ প্রতিষ্ঠানটি তারা ইসলামী শিক্ষার উৎকর্ষের নিমিত্তে তৈরি করেনি বরং এটি প্রতিষ্ঠা করেছিল তাদেরই নিজস্ব প্রয়োজনের তাগিদে। আজ মাদরাসা থেকে ভালো মানের কোন ইসলামী ব্যক্তিত্ব তো তৈরি হচ্ছেই না বিপরীত পক্ষে আধুনিক শিক্ষিত ও যুগোপযোগী আলেমও বের হচ্ছে না। তাই  মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়েও নতুন করে ভাববার সময় এসেছে।

অনেক তথাকথিত বু্িদ্ধজীবী যারা পাশ্চাত্য শিক্ষার অন্ধ অনুরাগী তারা মাদ্রাসা শিক্ষা তথা ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার বিরোধীতা করতে গিয়ে বলেন এ শিক্ষা মান্ধাতার আমলের শিক্ষা। এ শিক্ষা প্রগতির অন্তরায় এমনিভাবে তারা যুক্তি উপস্থাপন করতে গিয়ে এও বলেন যে মাদ্রাসায় কি কোনো ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, ‘মেডিকেল কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কি কোনো ইঞ্জিনিয়ার বের হয়েছে? অথবা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কি কোনো ডাক্তার বের হয়েছে? আর এসব হচ্ছে মাদ্রাসা বিরোধী শত্রুদের কথা।

আসল কথা হচ্ছে মেডিকেল থেকে যেমন ডাক্তার বের হবে তেমনি ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ার বের হবে এটাই স্বাভাবিক। এর ব্যতিক্রম দাবি করা যেমন চরম আহাম্মকী ছাড়া কিছুই নয় ঠিক তেমনি মাদ্রাসা থেকে আলেম ওলামা ফকীহ ইসলামী চিন্তাবিদ ছাড়া ডাক্তারের আশা করাটাও চরম বোকামী ও আহাম্মকীর পরিচায়ক।

মুঘল আমলের শিক্ষাব্যবস্থা আজকালের প্রগতিবাদীদের শিক্ষাব্যবস্থার ন্যায় এত আধুনিক না হলেও তখনকার শিক্ষানীতিকে কেউ কেউ প্রাক ছাপাখানা যুগের ইউরোপীয় শিক্ষাব্যবস্থার সাথে তুলনা করেছেন। উল্লেখ্য যে, শিক্ষা কোর্স সমাপ্ত করার পর একজন মুসলিম যুবক ব্যকরণ, ন্যায় শাস্ত্র ও দর্শনসহ শরীআ ও ব্যবহারিক জ্ঞান বিজ্ঞানে বর্তমান যুগের অক্সফোর্ড হতে ডিগ্রীপ্রাপ্ত গ্রাজুয়েট সমান দক্ষতা লাভে সমর্থ হতেন।

এক্ষেত্রে আরো তথ্য পাওয়া যায় যে অক্সফোর্ড হতে যুবকগণ সদ্য যে জ্ঞান নিয়ে বের হয়ে আসেন, মুসলিম যুবকগণ শুধুমাত্র সাত বছর শিক্ষাকালেই তদনুরূপ জ্ঞান আহরন করতেন এবং তারা থেলিস, সক্রেটিস, এরিস্টটল, প্লেটো, গেলেন ও ইবনে সিনা সম্বন্ধে পান্ডিত্যের পরিচয়দানে সমর্থ হতেন। এ শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে পন্ডিত ধর্মবেত্তা বিচারক, প্রশাসক, প্রকৌশলী, পদার্থবিদ, অধ্যাপক, গণিতবিদ ও আমলা স্ব স্ব ক্ষেত্রে যোগ্যতার পরিচয় রাখেন। “ব্যঙ্গনামা” পুঁথি সাহিত্য রচয়িতা নসরুল্লাহ খাঁ (১৫৬০-১৬২৫) আম্বিয়া বাণী নামক গ্রন্থ প্রণেতা হায়াত মাহমুদ এবং বিখ্যাত মহাকাব্য “পদ্মাবতী”র রচয়িতা মহাকবি আলাওল (১৬০৭-১৬৮০) ও এ স্বর্ণময় যুগের অন্যতম পুরোধা হিসেবে গন্য হতেন।

আমরা জানি মহাগ্রন্থ আল কোরআনের প্রথম তাগিদ ছিল শিক্ষা সম্বলিত। তাতে আল্লাহ পাক তার প্রিয় হাবীবকে এভাবে নির্দেশ প্রদান করেছিলেন যে, ইকরা অর্থাৎ আপনি পড়ুন। কোরআনের সর্বপ্রথম বাণী দ্বারাই প্রমাণিত হয় যে ইসলামে শিক্ষা গ্রহণের গুরুত্ব অপরিসীম। মানবতার মহান শিক্ষক মোহাম্মদ (সা) বলেন প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর ইলম অর্জন করা ফরজ। এখানে দ্বীনি ইলম যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে না হলেই নয় তাকে বোঝানো হয়েছে এই ফরজ ইলম অর্জনের পর একজন মানুষ যত ডিগ্রী লাভ করুক তাতে ইসলামে কোন নিষেধ নেই।

জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখাই ইসলাম সমর্থিত যদি সে জ্ঞানের চর্চা ও অনুসরণ মানুষের সামগ্রিক জীবনের কল্যাণ নিশ্চিত করে এবং তাতে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান থাকে। শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ এরকম যে এর অধীনে সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জনকারী একজন একজন ব্যক্তি অথচ তাকে যদি তাসমিয়াহ সহ সূরা ফাতিহা বলতে বলা হয় তাহলে বলা তো দূরের কথা মনে হয় যেন আকাশ ভেঙ্গেই মাথায় পড়ল!

এরকম এক অবস্থায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ঢেলে সাজিয়ে এমন একটি কমিশন গঠন করা উচিৎ যে কমিশন প্রণীত শিক্ষানীতির মাধ্যমে আমরা একজন মুসলিম বিজ্ঞানী মুসলিম চিকিৎসক, আল্লামা ইকবালের মত একজন মুসলিম দার্শনিক ও মুসলিম ইঞ্জিনিয়ার, মুসলিম বিচারক, মুসলিম আইনজীবী, মুসলিম সাহিত্যিক জাতিকে উপহার দিতে পারব। আর এটা যদি আমরা করতে পারি তাহলে আমার মনে হয় জাতি হিসেবে আমাদের দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার গ্লানি মুছে আমাদের এদেশকে সত্যিকারের সোনার বাংলায় রূপদান করতে পারব ইনশাল্লাহ।

আর এর জন্য আমাদের শিক্ষা কমিশনের মূলনীতিতে যে বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে তা হলো নিম্নরূপঃ
১. আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মন মগজে দৃঢ়ভাবে প্রবেশ করাতে হবে।
২. গোটা কারিকুলাম ও পাঠ্যসূচীকে আমাদের মূল্যবোধের আলোকে ঢেলে সাজাতে হবে।
৩. আধুনিক বিশ্বের প্রযুক্তিগত উন্নতির দিকটি মাথায় রেখে পাঠ্যপুস্তক প্রনয়ন করতে হবে।

৪. প্রাথমিক পর্যায়েই শিশুদেরকে নৈতিকতা শিষ্টাচার ও ধর্মীয় মূল্যবোধ শিক্ষাদানের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
৫. ইতিহাসের সঠিক চিত্র পাঠ্যপুস্তকে তুলে ধরতে হবে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইতিহাস বিকৃত করা যাবে না এবং তা পাঠ্যসূচীর অন্তর্র্ভূক্ত করা যাবে না।
৬. এর জন্য যেটি করতে হবে তা হলো দেশপ্রেমিক ও নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকদেরকে প্রাধান্য দিতে হবে।
৮. শিক্ষাঙ্গনকে যদি জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করতে হয় তাহলে অস্ত্রের ঝঞ্জানি বন্ধের জন্য দলীয় রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করতে হবে।
৯.  ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত হানে এরকম কটুক্তিমূলক কথা-বার্তা সিলেবাসের অন্তর্ভূক্ত করা যাবে না। যেমন – “বিসমিল্লায় গলদ”, “মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত” ইত্যাদি।

নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার  ত্রুটিগুলো দূর করে উপরোক্ত পরামর্শগুলোর আলোকে যদি একটি শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা দাঁড় করানো যায় তাহলে আমাদের এ দেশ একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। এছাড়া এ দেশ , এ জাতির উন্নতি-অগ্রগতি,সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি সুনিশ্চিত করা কখনই সম্ভব হবে না ।

তথ্যসূত্র

১. আদর্শ শিক্ষা সংখ্যা, মাসিক দারুস সালাম ,২য় সংখ্যা
২. Russell B. Education & Social order London union Paper back 1932
৩. ইসলামী ফাউন্ডেশন পত্রিকা ১ম ও ২য় সংখ্যা, ১৯৯৭
৪. শিক্ষাবার্তা ,৯ম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০০৮, বার্নাড রাসেলের শিক্ষা দর্শন, আনোরুল্লাহ ভূঁইয়া

৫. মাও. এ. রহীম ,বাংলার মুসলমানদের ইতি,১৯৭৬. ১১১/১২
৬. আজিজুর রহমান মল্লিক, ব্রিটিশ পলিসী এন্ড মুসলিম অব বেঙ্গল, অনুবাদ দিলওয়ার হোসেন ঢাকা ১৯৮২
৭. আমাদের শিক্ষানীতি  : একটি পর্যালোচনা, মোঃ শামসুল ইসলাম
৮. নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন প্রজন্মের প্রত্যাশা: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ,ফরাজী মো: কামরুল হাসান

৯. রিপাবলিক, প্লেটো
১০. মধ্যযুগের রাষ্ট্রচিন্তা, এমাজউদ্দিন আহমেদ
১১. এনসাইক্লোপিডিয়া অব সোশ্যাল সায়েন্স
১২. সম্পাদকীয় ,অন্বেষণ-২ (একটি নিবন্ধ সংকলন )

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.