স্বার্থপরতার সংস্কৃতিতে সুস্থতা নেই

আনিসুর রহমান এরশাদ

নভেল করোনাভাইরাস স্বাস্থ্য সচেতনতার নতুন তরঙ্গ তুলেছে। করোনা দেখিয়েছে- দৃশ্যমান শত্রুর চেয়ে অদৃশ্য শত্রু শক্তিশালী, মিসাইলের চেয়ে ডাক্তার গুরুত্বপূর্ণ এবং সামরিক উদ্ভাবনী ও প্রযুক্তিগত খাতের চেয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা বেশি প্রয়োজন। করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সামনের সারিতে তালিকাভুক্ত বা ভাড়াটে সৈনিক নেই, আছেন চিকিৎসক-নার্সরাই। বহু শতাব্দীর চিন্তা-বিশ্বাস-মূল্যবোধে কুঠারাঘাত করেছে করোনা। নতুন অভিজ্ঞতা উদ্বেগহীনভাবে আনন্দে অপরকে জড়িয়ে ধরা থেকে বিরত রাখছে, মুখোশ খুলে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেয়ার ক্ষেত্রে নতুন ভাবনা হাজির করেছে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এমন খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়াচ্ছে। এখন মানব জাতি নতুনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, টেকসই বিশ্বায়নের সন্ধান করছে, মৌলিক পরিবর্তনে মনোযোগী হচ্ছে, চেনাজানা বিশ্বের আমূল পরিবর্তন চাচ্ছে, মহাযুদ্ধের চেয়েও জগৎকে পাল্টে দিচ্ছে, জীবনবোধ ও চাহিদায় স্থায়ী পরিবর্তন আনছে। বুঝতে শিখছে, আর্থিক স্বাধীনতায় জীবনের নিরাপত্তা নেই, শুধু প্রতিযোগিতায় মুক্তি নেই, আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতার সংস্কৃতিতে সুস্থতা নেই।

সার্বিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এখনো অদ্ভুত আঁধারেই রয়ে গেছে বিশ্ববাসী। করোনার তাণ্ডবে অদৃশ্য কারাগারে বন্দী মানুষের দীর্ঘশ্বাস বাড়ছে। ঠিক যেন খাঁচায় বন্দি পাখির মতো অবরুদ্ধ! আগ্রাসী ছোবলে বিপর্যস্ত দেশগুলোতে নেই নেতাদের ফাঁকা বুলি, হম্বিতম্বি, বাগাড়ম্বর। গোটা বিশ্বই আজ টালমাতাল। থেমে গেছে কর্মব্যস্ততা; সব মনোযোগ যেন করোনাকে ঘিরে! সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে কোলাহল ভুলে নিরব ঘরে বন্দিরা। একটি ভাইরাসে পাল্টে যাওয়া পৃথিবী পেয়েছে মৃত্যুপুরীর চেহারা! মানুষের মুখের হাসি মুছে গিয়ে ভর করেছে তীব্র আতঙ্ক, মৃত্যুভয়, অজানা শঙ্কা! এমন দুর্দিনেও লোভ ও ভোগের লাগাম টেনে ধরতে না পারায় স্বার্থপর ও ধান্ধাবাজদের মুখোশ খুলে গেছে। দুর্ভোগেও দুর্নীতিবাজ ও মুনাফালোভীরা লাভের ছক কষে অমানুষ বলে চিহ্নিত হচ্ছেন। তবে পরের কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ আলোকিত মানুষেরা ঝুঁকি নিয়েও বিপদগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার জয়গান গেয়ে চলছেন; যা আশার আলো জাগাচ্ছে।

করোনার বিরূপ প্রভাব পড়েছে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে, পুঁজিবাজারে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, আমদানি-রপ্তানিতে, উৎপাদন ও ভোগে, ক্রীড়া বিশ্বে, পর্যটন ও অভিবাসনে, প্রযুক্তি পণ্যে, বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহে ও দামে। ব্যাংক খাতে কমেছে লেনদেন এবং আমানত ও ঋণ আদায়। রেমিটেন্সে অশনিসংকেত। কাজ ও ভিসা হারিয়ে চরম বিপাকে পড়া প্রবাসীদের প্রতিটি রজনী কাটছে বিনিদ্র। রফতানিমুখী বিভিন্ন খাতের পণ্য উৎপাদন নিয়ে দু:শ্চিন্তায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। ঝুঁকিতে রয়েছেন অনানুষ্ঠানিক ও সেবা খাতের কর্মীরা। চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে জীবন পার করছেন অসংগঠিত ক্ষেত্রের বহু শ্রমজীবী মানুষ। চাহিদা কমে যাওয়ায় কৃষক আর ছোটবড় খামারিরা পানির চেয়ে কম দামে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন; দুঃশ্চিন্তায় তাদের গলা দিয়ে খাবারও নিচে নামছে না। সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত, অনেকের আয় কমে যাচ্ছে, কর্মহীন হয়ে পড়ছে, রুটিরুজি হারিয়ে বহু মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে।

বন্ধ হয়েছে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির, মার্কেট-হোটেল, সিনেমা হল, গণপরিবহন। কর্মীদের বাসায় বসে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। মানুষের আনাগোনা কমে গেছে। মানুষ এখন ঘরেই সময় কাটাচ্ছেন বেশি। সামাজিকতা ও সম্পর্কের নতুন বিন্যাস হচ্ছে। অনলাইন নির্ভরতাও অনেক বেশি বাড়ছে। আগামীতে অনেক কিছুই বদলে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মানুষ দীর্ঘ সময় সামাজিক অনুষ্ঠান, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ভিড়-সমাবেশ, শপিংমল কিংবা সিনেমাহলে যাওয়া এমনকি গণপরিবহনে চড়াও কমিয়ে দেবে। এখনই করোনা নিঃশব্দে প্রভাব ফেলছে মনে, বদলে দিচ্ছে মানসিক গঠন। করোনা সব অঙ্গনেই স্থবিরতা সৃষ্টি করেছে। কোথায় গিয়ে এর শেষ হবে, তা বলা যাচ্ছে না।

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *