স্টাডি সার্কেলে সবাই শিক্ষক সবাই শিক্ষার্থী

স্টাডি সার্কেল বা পাঠচক্রর মানেই হচ্ছে- যৌথভাবে জ্ঞান চর্চা; যেখানে সবাই শিক্ষক সবাই ছাত্র। ব্যস্ততার কারণে অনেকের পক্ষেই জ্ঞানগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও আত্মোন্নয়নের জন্য সময় ব্যয় করাও দুরূহ হয়ে পড়ে। কর্মের চাপে পিষ্ঠ হবার ফলে যে সময়ে তার বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে অজ্ঞতা শুধরে আত্মবিশ্বাসী হবার কথা; সেই সময়ে জ্ঞানবিমুখতায় বাড়ে নিজের ওপর আস্থাহীনতা।

স্টাডি সার্কেলে ভবিষ্যতেও জ্ঞানের অগম্য বিষয়গুলোতে বিশেষজ্ঞ মতামত দিতে নিমন্ত্রণ করা যেতে পারে বিভিন্ন সেক্টরের এক্সপার্টদেরকে। যেখানে আলোচনা হবে, ইতিবাচক পর্যালোচনা হবে, গঠনমূলক সমালোচনাও হবে। এসবের মাধ্যমে একজন শুভবোধ সম্পন্ন সংবেদনশীল মানুষ চিন্তাশীল মননের অধিকারী হবে; মানবিক গুণাবলী অর্জনের পাশাপাশি জীবন ও জগত বুঝতে জ্ঞানগতভাবে প্রস্তুত ও সক্ষম করবে।

স্টাডি সার্কেলের মাধ্যমে সৃষ্টি হতে পারে সৃজনশীল চিন্তার; এটি কোনো নীরস একঘেয়ে প্লাটফর্ম হওয়া ঠিক না। বিশেষজ্ঞদের ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ের শক্তি নবীনদের মাঝেও ডেভেলপ করবে। বিভিন্ন আঙ্গিকে পর্যালোচনার জন্য ভিন্নধর্মী ব্যাখ্যাকে গ্রহণের উদারতা তৈরি হবে। হৃদয়গ্রাহী প্রেজেন্টেশনের জন্য যে সীমাবদ্ধতা, তা কাটিয়ে উঠার সক্ষমতা বাড়বে। এজন্য অনেক পথ যেতে হবে, তাড়াহুড়া করা সমীচীন হবে না।

স্টাডি সার্কেলে বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করার সুযোগ অন্যদেরকে আলোকিত করে, আর অন্যের মতামত জানার মাধ্যমে সমস্যার গ্রহণযোগ্য সর্বোত্তম সমাধান বের করা সম্ভব হয়। স্টাডি সার্কেলের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা, সহযোগিতার সংস্কৃতি তৈরি হয়; যা প্রত্যেককে ভবিষ্যতে পরমতসহিষ্ণু, পরোপকারি, জনসেবাপরায়ণ ও সংবেদনশীল বানায়।

যেকোনো স্টাডি সার্কেলের সদস্যদের সাধারণ আগ্রহ হতে পারে- তারা জানতে চাইবে, বুঝতে চাইবে, প্রশ্ন করতে চাইবে, প্রশ্নের জবাব খুঁজবে, সমস্যার বিশ্লেষণ করবে সমাধানের জন্য। কোনো কোনো সেশন হয়তো বেশি অর্থপূর্ণ হয়, বেশি ফলপ্রসূ হয়; কোনোটা হয়তো কম হয়! তবে নিজে স্বতস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করা এবং অন্যকেও অংশগ্রহণে উৎসাহিত করার মাধ্যমে গুণগত পরিবর্তন আসে; ক্রমশ মান উন্নত হয়। লেগে থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, ধারাবাহিকতা খুব বেশি প্রয়োজন।

বিষয়ের জটিলতা ও গভীরতা অনুযায়ী আলোচনা চলার কাল প্রলম্বিত হতে পারে; তবে একটা নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ করা উচিত। প্রতিটি স্টাডি সার্কেলে দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন বিশেষজ্ঞ মূখ্য ভুমিকা পালন করে পূর্বনির্ধারিত কোনো বিষয়ে লেকচার দিবে, আলোচনার শেষে প্রশ্নোত্তর হবে। পরে উপস্থিত সবাই উপস্থাপিত বিষয়বস্তুর উপর সক্রিয় আলোচনা করবেন। মূল আলোচক লিখিত স্ক্রিপ্টও দিবেন। এভাবে জীবন ও জগতের রহস্য গভীর উপলব্ধির জন্য প্রত্যেকেই জ্ঞানগতভাবে প্রস্তুত ও সক্ষম হবেন।

‘স্টাডি সার্কেলের’ ধারণাটি নতুন কোনো বিষয় নয়, যুগে যুগে বিভিন্ন আঙ্গিকে এর ব্যবহার ছিল। প্রাচীন গ্রীস বা ভারতীয় সভ্যতায় যৌথ পাঠগ্রহণের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়। সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি এমনসব বিষয়ের জটিল ও তাত্ত্বিক দিকগুলোকে যৌথভাবে বিচার বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে সঠিক ধারণায় পৌঁছানোর সহজ জায়গা হচ্ছে পাঠচক্র।

নানান ধরনের পাঠচক্র আছে। ধর্মীয় পাঠচক্র, সাহিত্য পাঠচক্র, একাডেমিক পাঠচক্র, দর্শন পাঠচক্র ও রাজনৈতিক পাঠচক্র ইত্যাদি। পাঠচক্র চেতনা ও উপলব্ধির জায়গাকে সমৃদ্ধ করার বলিষ্ঠ জায়গা। কিছু আকর্ষণীয় ও প্রয়োজনীয় বিষয়ে পাঠচক্র মননশীলতাকে সমৃদ্ধ করে; যা সংশ্লিষ্টদের আরো শাণিত করে। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও জ্ঞানভিত্তিক সংগঠন প্রতিষ্ঠায় পাঠ, আলোচনা ও চর্চার কোনো বিকল্প নেই। মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানে অর্থহীন ও অপ্রয়োজনীয় প্রয়াস বন্ধ করে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমন্ডলে নিদারুণ উদাসীনতা দূর করা।

পাঠচক্র কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ বইয়ের ওপর বিশেষ দখল থাকা একজনকে বা লেখককে মুখ্য আলোচক করেও হতে পারে, বইটি সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়াও হতে পারে। এতে একটি সুস্থ-সুন্দর পাঠক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। পাঠচক্রের জন্য বই নির্ধারণ-বাছাই করা হলে সদস্যদের প্রথম কাজ হবে বইটি সংগ্রহ করা। তারপর একটি নির্দিষ্ট তারিখে সব সদস্য বইটি পাঠ শেষ করবেন এবং আরেকটি নির্দিষ্ট দিনে বইটি নিয়ে আলোচনায় বসবেন।

একটি বই পড়ে একজন মানুষের পক্ষে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন সম্ভব হয় না। পাঠচক্রের সুবিধা হচ্ছে প্রত্যেকের শিক্ষণীয় জ্ঞান ও ভাবনার বিষয় সকলের সাথে সহজেই আদান-প্রদান করা যায়। এছাড়া পঠিত বিষয়ের ওপর ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করার ক্ষমতা তৈরি হয় পাঠচক্রের ফলে।

আসলে স্টাডি সার্কেলের লক্ষ্য একটাই—পড়ার অভ্যাস তৈরি করা। জানার জগৎ বিস্তৃত করা। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পাঠচক্রে জটিল-কৌতূহলী বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে পারায় তরুণ সদস্যরাও আলোচক হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পাবে। যৌথভাবে পড়াশুনার মাধ্যমে বৃদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও সৃজনশীল মানসিকতার বিকাশ ঘটে।

স্টাডি সার্কেলে সব বয়সের মানুষ একসঙ্গে বসে নানাবিধ জ্ঞানচর্চা করবে। যুক্তিতর্ক হবে, জ্ঞানের আদান–প্রদান হবে। উপস্থিত প্রত্যেকেই নিজের মতামত দিতে পারবে। প্রতিটি অধিবেশন-আসর-সেশনে নতুন নতুন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচিত হবে। নানা মতের, নানা ভাবনার মানুষের সম্মিলন ঘটায়ে সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিষয়েও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। অনেক অভিজ্ঞ মানুষের আলোচনার ফলে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো দেখার সুযোগ পাওয়া যায়।

পাঠচক্রের সদস্যরা নিজেদের জ্ঞানগত ভিত্তিকে মজবুত করার পর বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন করে তরুণদের দীক্ষা দিতে পারেন জীবনমুখী বিভিন্ন বিষয়ে। সবাই মিলেই পাঠচক্রের গ্রন্থাগার করে বইয়ে ও সাময়িকীতে সমৃদ্ধ করতে পারেন। সবাই মনোযোগী হলে পাঠচক্রকে বড় পরিসরে একাডেমিক একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েও নিয়ে যাওয়া যায়।

১৯৭৮ সালের শেষের দিকে মাত্র ১৫ জন সদস্য নিয়ে জ্ঞানের বিকাশে একটি ক্ষুদ্র পাঠচক্রের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের পথ চলা। সেই পাঠচক্রে সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে প্রত্যেকে একটি করে নির্ধারিত বই বাড়িতে নিয়ে পড়তেন। পরের সপ্তাহের নির্ধারিত দিনে সেখানে এসে ওই বই নিয়ে আলোচনা হতো। এমনিভাবে পাঁচ বছর পর এই পাঠচক্রের সাফল্য দেখে এটি স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার কথা ভাবতে শুরু করেছিলেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

About আনিসুর রহমান এরশাদ

শিকড় সন্ধানী লেখক। কৃতজ্ঞচিত্ত। কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী। ভেতরের তাগিদ থেকে লেখেন। রক্ত গরম করতে নয়, মাথা ঠাণ্ডা ও হৃদয় নরম করতে লেখেন। লেখালেখি ও সম্পাদনার আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সময়ে পাক্ষিক-মাসিক-ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন, সাময়িকী, সংকলন, আঞ্চলিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ ও জাতীয় দৈনিকের সাথে সম্পর্ক। একযুগেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা, লেখালেখি ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। পড়েছেন মিডিয়া ও জার্নালিজমেও। জন্ম টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর থানার হাতীবান্ধা গ্রামে।

View all posts by আনিসুর রহমান এরশাদ →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *