সূফীবাদ ও সূফী দরবেশদের অবদান

মাহমুদুল হাসান খান 

’বাংলাদেশে শুধু বড় বড় শহরের কথা বলি কেন, এমন কোন গ্রাম কিংবা শহর নেই, যেখানে পুণ্য সুফীবৃন্দ গমন করেন নাই ও বসতি স্থাপন করেন নাই’।

-মীর সৈয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী

বিভিন্ন সময়ে শত শত সূফী দরবেশগণ ও তাদের অনুগামী শিষ্যগণ ভারত উপমহাদেশে আগমন করেন। এবং বিভিন্ন শহর ও গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন ইসলাম প্রচারের জন্য। মুসলমানদের মানসিক ও নৈতিক উন্নতি উৎকর্ষ বিধানে সুফিদের কৃতিত্ব ছিল মুসলিম সেনাপতি বিজেতা ও শাসকবর্গ অপেক্ষা অনেক বেশি স্থায়ী ও কার্যকর। তাদের ধর্মীয় অনুরাগ ধর্ম প্রচারের আগ্রহ মানব হিতৈষীমূলক কার্যাবলী ছাড়াও জনমানসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেন এবং ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেন।

ইসলামের প্রথম যুগে আরব মুসলমানদের মধ্যে সুফিদের উৎপত্তি ঘটলেও পারস্যেই এর মূল প্রসার ঘটেছিল। এরপর ধীরে ধীরে সুফিরা বিভিন্ন সময়ে ভারত বর্ষে এসে বিভিন্ন তরিকার মাধ্যমে তাঁদের মরমী কার্যাবলী প্রচার করেন।

সুফিবাদ পরিচিতি

পরম সত্তাকে জানার জন্য অনন্তকাল ধরে মানুষের মধ্যে রয়েছে এক অদম্য আকাঙ্খা। তাই মানুষ যুগে যুগে আধ্যাত্মিক অভিযান চালিয়েছে। এ পরম সত্তাকে আবিষ্কার করে তাঁর সাথে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করতে, পরম সত্তাকে জানার এ প্রয়াসকে ইসলামে বলা হয় সুফিবাদ। সুফিবাদ হচ্ছে ইসলামী এমন একটি পথ যে পথে কঠোর ধ্যান ও প্রার্থনার মাধ্যমে স্রষ্টার ভালবাসা পাওয়া যায় এবং সাথে সাথে নিজের আত্মার উন্নয়ন। স্রষ্টার প্রতি তীব্র ভালবাসার মাধ্যমে মানুষের আত্মোন্নয়নই হচ্ছে সুফিবাদের মূল কথা। ঈশ্বর সত্তার সঙ্গে নিজেকে লীন করে দেয়ার মধ্যেই সুফিবাদের পরম পাওয়া।

অধ্যাপক ম্যাসিগনোঁ বলেন, সুফিবাদ বা মরমীবাদী আন্দোলন এসেছে আদিম মুসলমানদের অতিরিক্ত কঠোর সংযমের প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকার সুত্র থেকে। আবার আদিম আরবী এবং পার্সিয়ান উৎস হতে জানা যায় যে, সুফিবাদ হল জীবনের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য যা নবী মুহাম্মদ (সা:) এর পরপরেই এটি প্রসারিত বা বিস্তৃত না হয়ে খুবই ধীরে ধীরে বিস্তৃতি লাভ করে। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা:) এর খেলাফতের অবসানের পরে সুফিবাদ প্রকাশিত হয়। এ সময় শাসকদের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ থাকায় কিছু উলেমা, নবী ও খলিফাদের আদর্শ নিয়ে এই পথ চলে আসে।

সুফি শব্দের উৎস

‘সুফি’ নামটি সাধারণত ইসলামের মরমীবাদী ও সাধু পুরুষদের নামের সঙ্গে জড়িত। সুফি শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ সম্পর্কে প্রধানত ৫টি মত রয়েছে।

১. ‘সুফি’ শব্দটি আরবী সফ শব্দ থেকে এসেছে। সফ অর্থ কাতার বা সারি। এ মতের অনুসারীরা বলে থাকেন যে, সুফিগণ মুসলিম বিশ্বের প্রথম সফ বা সারির লোক বিধায় তাদেরকে সুফি নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাছাড়া কিয়ামতের দিনে মানুষ তাদের বিশ্বাস ও কার্যানুযায়ী বিভিন্ন কাতার বন্দী বা অগ্রবর্তীদের দলভূক্ত হবেন। সুফি পদটি তাঁদের এরূপ মর্যাদার নির্দেশক।

২. কারো কারো মতে ‘সুফি’ শব্দটি ‘আহলে সুফফা’ থেকে এসেছে। মহানবী (সা:) এর সময়ে মদীনায় আহলে সুফফার প্রায় ৫০০ সাহাবী ছিলেন যাদের কোন পার্থিব আকর্ষণ বা উৎসাহ ছিল না। তাদের জীবন যাপনের সাথে সুফিদের জীবনের যথেষ্ট মিল রয়েছে।

৩. কারো কারো মতে, সুফিরা ‘সুফ’ নামে এক প্রকার রঙ্গীন পোশাক বা পশমের পোশাক পরিধান করতেন বলে এটি তাদের পরিচয় সূচক নাম।

৪. কোন কোন পন্ডিতের মতে আরবী ‘সাফা’ অর্থ পবিত্রীকরণ তাঁদের মতে, সুফিরা ছিলেন পবিত্র চরিত্রের অধিকারী এবং তারা পবিত্র এর উপর জোর দিতেন বেশি।

৫. অধ্যাপক নিকলসন সহ কিছু সংখ্যক পাশ্চাত্য পন্ডিত মনে করেন- ‘সুফি’ শব্দটি গ্রীক সার্ফোস শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ ছিলেন।
যাহোক আধুনিক পন্ডিতদের গ্রহণযোগ্য মত এই যে, ‘সুফ’ শব্দই সুফি বা তাসাউফের মুল।

প্রথম সুফি নামধারী

সুফি শব্দটি খ্রীষ্টীয় অষ্টম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কুফার জারির বিন হাইয়ান নামক একজন রাসায়নিক পেশাধারী সাধক এবং আবু হাশিম নামক একজন সাধকের নামে সর্বপ্রথম ব্যবহৃত হয়।

প্রাথমিক যুগের সুফি

যদিও প্রাথমিক যুগে সুফিবাদ ভালোভাবে সংগঠিত হতে পারেনি, কিন্তু তাদের কিছু অবদান লক্ষ্য করা যায়। প্রাথমিক যুগের কয়েকজন সুফিরা হলেন- বসরার হাসান প্রাথমিক যুগের সুফি বলে পরিচিত। তার মন ধ্যান ধারণায় আল্লাহর ভয় ছিল এবং জীবনে কখনো পাপ কাজ করার উদ্রেক দেখা যায়নি।

কুফার সুফি আবু হাশেমকে ধরা হয় তিনিই প্রথম মরমী এবং ঐ সময় থেকে সুফি নাম ব্যবহার করা হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন সুফিদের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ গুণ হচ্ছে আত্মশুদ্ধি।

ইব্রাহিম বিন আদহম ছিলেন বলখ এর রাজা, যিনি তার অধিকারভূক্ত সিংহাসন ছেড়ে সন্ন্যাস জীবন গ্রহণ করেন।

বসরার রাবিয়া ছিলেন প্রথম মহিলা সুফি সাধক, যিনি ধার্মিক জীবন পালন করতেন এবং দাসের মত খুবই পরিশ্রমী ছিলেন। তিনি বলতেন আলাহর প্রেম আমাকে এত বেশি নিমগ্ন করেছে যে, আর কারো কোন প্রেম বা ঘৃণাই আমার অন্তরে নেই।

বায়েজিদ বোস্তামি তার “Pure love by denying one’s own self.” ধারণার জন্য বিখ্যাত। প্রাথমিক পর্যায়ের সুফিবাদ আলাহর ভীতি ও শেষ বিচারের দিনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু কালক্রমে এই ধারণার পরিবর্তন আসে এবং প্রেমের মধ্য দিয়ে প্রিয়তম আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ভিত্তিরূপে পরিগণিত হয়। দশম শতক থেকে সুফিবাদ মূলস্থান থেকে সরে আসতে থাকে সর্বেশ্বরবাদের দিকে।

ভারতবর্ষে বিভিন্ন সুফি তরিকা

সুফি সাধনার অনুসৃত পথ বা পদ্ধতিকেই তরিকা বলা হয়। প্রতিটি তরিকাই এক বা একাধিক বিশিষ্ট সুফি নির্দেশিত সাধন পদ্ধতি ধারণ করে আছে। খ্রীষ্ট দশম শতাব্দীতে সুফিদের সাধন পদ্ধতি অর্থাৎ আধ্যাত্মিক অনুশীলনকে নিয়ন্ত্রিত করার জন্যে বিভিন্ন তরিকার উদ্ভব ঘটে। এই সব তরিকার প্রতিষ্ঠাতা কোন সুফি সাধকগণ হলেও মূলত সব তরিকাই শেষ পর্যন্ত কোন তাবেয়ী বা সাহাবীর মাধ্যমে মহানবী (সা.) এর সাথে যুক্ত হয়েছে। সুফি সাধনার জগতে অসংখ্য তরিকা রয়েছে। পুরাতন-নতুন মিলে বর্তমানে সাধনার জগতে প্রায় ২০০ এর অধিক তরিকা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে নিম্নোক্ত তরিকাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

চিশতিয়া তরিকা

ভারতে দীক্ষিত সংঘের মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন হল চিশতিয়া তরিকা। এর প্রতিষ্ঠাতা নিয়ে মতবিরোধ আছে। কারো মতে, হযরত আলীর নবম অধ:স্তন পুরুষ আবু ইসহাক এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা। আবার কারো মতে, খাজা আবদাল চিশতি এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা।

খাজা মুঈন-উদ্দিন চিশতী চিশতিয়া তরিকাকে ভারত উপমহাদেশে আনয়ন করেন। তিনি পাক-ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফিরূপে প্রসিদ্ধি লাভ করেন এবং আফতাব-ই-মূলক হিন্দ অর্থাৎ হিন্দুস্তানের সূর্য উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি ১১৪২ খ্রী. সিসতানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিখ্যাত সুফিদের সান্নিধ্য লাভ করেন। ১১৯২ সালে মু. ঘুরী দিল্লি অধিকার করলে ১১৯৩তে খাজা মুঈন-উদ্দিন ভারতে আসেন এবং আজমীরে গিয়ে খানকাহ স্থাপন করে ইসলাম প্রচারে ব্রতী হন। বাকী জীবন এখানে কাটিয়েছেন। তার মৃত্যুর পর আজমীরে তার দরগাহ তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয় ।

বাংলা-পাক-ভারতে চিশতিয়া তরীকা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠে। তাঁর প্রধান খলিফা ছিলেন খাজা কুতব উদ্দিন বখতিয়ার কাকী; যিনি দিল্লিতে বসবাস করতেন এবং ইলতুৎমিশ তাকে খুব শ্রদ্ধা করতেন কুতব মিনারের কাছে তাকে সমাহিত করা হয় এবং এটি তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয়। দিল্লির পরবর্তী বিখ্যাত চিশতি সুফি হলেন শেখ নিজাম উদ্দিন আউলিয়া, তাঁর খানকাও তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয়। তাঁর প্রধান শিষ্য ছিলেন শেখ আঁখি সিরাজ যিনি বাংলাদেশে চিশতিয়া তরিকা জনপ্রিয় করে তোলেন।

চিশতিয়া তরিকার প্রকৃতি

চিশতিয়া তরিকায় ‘ইল্লাল্লাহ’ শব্দ জপ করার উপর বিশেষ জোর দিতেন। তাঁরা উপাসনার সময় সমবেত হতেন এবং রঙ্গিন বস্ত্র পরিধান করতেন, কেউ মুরীদ হতে গেলে তাকে প্রথমে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়তে হয় এবং বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ দেওয়া হয়। অতঃপর মুরীদকে কতগুলো আল্লাহর নাম শিখানো হয় এবং কোন দরগায় গিয়ে ৪০ দিন সিয়াম পালনের আদেশ দেওয়া হয়। অবশেষে তাকে তরিকার পরিচয় দেওয়া হয়। আফিং, ভাঙ্গঁ, তামাক, মাদকদ্রব্য ইত্যাদি চিশতিয়া সুফিদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মোঘল যুগে এই তরিকার দরবেশদের মধ্যে অন্য্যতম ছিলেন শেখ সেলিম, এরপর চিশতিয়া তরিকা কয়েকটি উপভাগে ভাগ হয়।

সোহরাওয়ার্দী তরীকা

শেখ নজিব উদ্দিন আব্দুল কাদির এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি নিজামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন এবং হাদিস শাস্ত্রে বিশেষভাবে বুৎপন্ন ছিলেন। তাঁর পরে তার ভ্রাতুষ্পুত্র শাহাব উদ্দিন উমর বিন আব্দুল্লাহকে এই তরিকার প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। সোহরাওয়ার্দী তরিকা ভারতে বিস্তার লাভ করে শেখ বাহাউদ্দিন জাকারিয়ার হাত ধরে ১২৬৭ সালে। তিনি পিতার মৃত্যুর পর খোরাসনে শিক্ষাগ্রহণের পর পন্ডিত হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। এরপর তিনি মক্কায় মুহাম্মদ (সা:) এর কবরের সেবক হিসেবে ৫৩ বছর অবস্থান করেন। পরে তিনি শাহাব উদ্দিনের কাছ থেকে দীক্ষা লাভ করেন।

শায়খ শিহাব উদ্দিন ভারতে সুফি তরিকা প্রচারের জন্য দায়িত্ব অর্পন করেন শায়খ বাহাউদ্দিনের উপর। তিনি এ দায়িত্ব শুধু মুলতানে প্রচার করেন নি বরং পাশ্ববর্তী বেলূচিস্তানসহ অন্যত্র পৌছিয়েছেন। ইলতুৎমিশ তাঁকে শেখ উল-ইসলাম উপাধিতে ভূষিত করেন। শেখ শাহাব উদ্দিনের আরেকজন শিষ্য শেখ জালাল উদ্দীন তাবরেজী মুলতান ও দিল্লির মধ্য দিয়ে বাংলায় এসে এই তরিকার প্রচার কার্য চালিয়ে যান।

শাত তারিয়া তরিকা

ভারতে এই তরিকা প্রচার করেন সৌদি সুলতানদের আমলে শেখ সিরাজ উদ্দিন আব্দুল্লাহ শাত্তারী। শাত্তার শব্দের অর্থ ভ্রমন করা। আর সুফি মতের ভাষায় ইলম শাত্তারিয়া অর্থ আত্মার সঞ্চালন ও উচ্চাকাঙ্খা বুঝায়। মোঘল সম্রাট হুমায়ুন শাত্তারিয়া তরিকা গ্রহণ করেন সৈয়দ মুহাম্মদ গাউছের কাছ থেকে। আবুল ফজলের “আইন-ই-আকবরী” গ্রন্থে এই তরিকার উল্লেখ আছে।

জৌনপুর ও বিহারে এই তরিকার সুফিদের বেশ প্রভাব ছিল। সিরাজ উদ্দিন আব্দুল্লাহর প্রধান শিষ্য ছিলেন শায়খ ওয়াজী উদ্দিন গুজরাটি। তাঁর সমাধি আহমেদাবাদে অবস্থিত যেখানে নুরজাহান কর্তৃক শাহ পীরের মাজার নির্মিত হয়েছে। এই তরিকার সুফিরা তাওহীদের উপর বিশেষরূপে জোর দিতেন এই জন্য তাঁরা ‘ফনা’ বা ফনা ফিল ফনা বিশ্বাস করতেন না, কেননা ফনা তাওহীদের বিপরীত।

কাদেরীয়া তরিকা

হযরত মুহীউদ্দিন আব্দুল কাদের জিলানী এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১০৭৭-৭৮ সালে জিলান জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১১৬৬ সালে বাগদাদে পরলোকগমন করেন। এই তরিকা ভারতে ব্যাপক জনপ্রিয় ও প্রভাবিত হয়ে উঠে। কাদেরিয়া তরিকা হযরত আব্দুল কাদেরের জীবদ্দশাতেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে এবং তার মৃত্যুর পর তাঁর শিষ্যরা এই তরিকা সারা মুসলিম জাহানে বিস্তার করে। বিভিন্ন স্থানে এই তরিকার সুফিরা বিভিন্ন জিনিসকে তাঁদের তরীকার প্রতীকরূপে ব্যবহার করেন। যেমন-তুরস্কের মুসলমানরা সবুজ গোলাপ ফুলকে প্রতীকরূপে গ্রহণ করেন এবং পাক-বাংলা-ভারতে তাঁর জন্মদিনে উৎসব পালন করা হয়।

কাদেরীয়া তরিকার প্রকৃতি

হযরত আব্দুল কাদের রচিত “ফুয়ুদত-আল-রব্বানীয়া” গ্রন্থে দেখা যায় যে, কোন লোক কাদেরীয়া তরিকা গ্রহণ করতে চাইলে তাঁকে দিনে সিয়াম পালনে এবং রাত্রে আল্লাহর উপাসনায় মশগুল থাকতে আদেশ দেওয়া আছে। এই অবস্থায় তাকে ৪০ দিন থাকতে হয়। পরবর্তীতে এই তরিকা বানাগাজী মু. গাউস প্রচার করেন। এই তরিকার প্রমাণ বহন করে “শাখিনতে উল আউলিয়া মায়ানমির” এর সমাধি কমপ্লেক্স। এই তরিকা কোরআন ও হাদিস অনুযায়ী পারিবারিক জীবন পরিচালনা করতে উৎসাহী করে তোলে।

নকশবন্দীয়া তরিকা

এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা হলেন তুর্কিস্তানের মু. বিন মুহাম্মদ বাহাউদ্দিন আল বোখারী (১৩১৭ – ১৩৮৯ খ্রী.পু.)। নকশবন্দ শব্দের অর্থ চিত্রকর। এই তরিকার সুফীরা আল্লাহর মহিমার চিত্র হৃদয়ে ধারণ করতেন বলে তাদেরকে নকশবন্দীয়া বলা হত। ভারতে এর প্রচারক হলেন খাওয়াজ মু. বাকী বিল্লাহ যার সমাধি দিল্লিতে অবস্থিত। এরপর এই তরিকার প্রচারক ছিলেন শায়খ আহমেদ ফারুকী শরহিন্দ। সম্রাট জাহাঙ্গীরও তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এই তরিকা অনেক পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হলেও ভারতে অনেক পরে প্রবেশ করে। এছাড়াও ভারত উপমহাদেশের প্রধান প্রধান তরিকাগুলোকে কেন্দ্র করে কিছু সংখ্যক উপতরিকা পাওয়া যায়।

বাংলায় সুফিবাদ ও সুফি আগমনের প্রেক্ষাপট

ইসলাম অধ্যুষিত পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া এবং উত্তর-ভারত থেকে বিভিন্ন সময়ে শত শত সুফি দরবেশ বাংলাদেশে আগমন করেন। তারা নানা তরীকার বিশেষ করে চিশতিয়া ও সোহরাওয়ার্দীয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। বর্হিদেশ থেকে আমদানীকৃত হলেও, বাংলাদেশ সুফিবাদ বিস্তারের উপযুক্ত ক্ষেত্র হিসেবে প্রমাণিত হয়। সুফিবাদ সমগ্র বাংলাদেশ এমনকি সূদুর গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, ফলে খানকাহ ও দরগাহ দেশের আনাচে কানাচে পর্যন্ত গড়ে উঠেছিল। বাংলার মাটিতে সুফিবাদ এত বেশি প্রসার লাভ করে যে, কয়েকজন বিখ্যাত বাঙ্গালী সুফির শিক্ষার ভিত্তিতে এখানে কয়েকটি নতুন মরমী সম্প্রদায়ের বিকাশ হয়।

বাংলায় সুফি আগমনকে ঐতিহাসিকরা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। যেমন-
১. মুসলিম রাজশক্তি প্রতিষ্ঠার পূর্বে (৭ম -৮ম শতকে) বণিকদের মাধ্যমে।
২. মিশনারী ভূমিকায় সুফি আগমন (এগারো শতক থেকে)।
৩. মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে (তের শতক থেকে)।

বাংলায় সুফি আগমন এবং তাঁদের কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে বাংলার মানুষের নিকট তাঁরা খুব সহজে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন যার পিছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পেক্ষাপট রয়েছে।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় মধ্যযুগ হল বাংলার মুসলিম শাসনের ইতিহাস, বাংলায় ইসলামের আবির্ভাব, প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিন টিকে থাকার কারণে ধীরে ধীরে বাংলার সমাজ সংস্কৃতি ও সভ্যতায় এক বিরাট পরিবর্তন আসে। মুসলমান সুফি, সাধক ও শাসক শ্রেণীর ঔদার্যে এদেশের সনাতন সাংস্কৃতিক চেতনায় মুসিলম ধ্যান-ধারণা জায়গা করে নেয়। ইসলাম ধর্মের প্রচারক হিসেবে সুফি দরবেশগণ তাদের উদার মানসিকতার কারণে এদেশের মানুষের মনে বিশেষ স্থান লাভ করেন।

প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় আর্থ-সামাজিক ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক বিচারে চতুবর্ণের (ব্রাক্ষণ, কায়স্থ, বৈশ্য, শুদ্র) বিকাশ ঘটে, যার চূড়ান্ত ও নির্মম পরিণতি পরিলক্ষিত হয় সেন শাসনামলে, কর্ণাটক থেকে আগত সেন রাজরা ছিল বিদেশী ব্রাক্ষ্মণ, তারা বাংলায় নিজেদের প্রভাব বলয় সৃষ্টির জন্য বাংলার অন্তঃজ শ্রেণীর হিন্দুদের সর্বদাই অস্পৃশ্য করে রেখেছিল।

বল্লাল সেন কৌলিন্য প্রথা প্রবর্তন করায় সাধারণ হিন্দুদের ধর্মাচরনের অধিকার ছিল না। সমাজে স্বীকৃতি ছিল না নিম্ন শ্রেণীর মানুষদের। সেই সাথে সামন্তবাদের প্রভাবে অর্থনৈতিক অবস্থাও হীন থেকে হীনতর হয়ে উঠে। সাধারণ মানুষের চোখে প্রশাসন ছিল ভীতি এবং সামাজিক বৈষম্য ছিল অমানবিক অত্যাচারের মত। শুধুমাত্র সামাজিক বিধান আরোপের মাধ্যমে নয় বরং প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে জনসাধারণের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।

ব্রাক্ষ্মনদের এই বৈষম্যমূলক সমাজ বিধান ও হিংসাত্মক আচরণ অবহেলিত শ্রেণীকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল এবং লক্ষণ সেনের স্বৈরাচারী মনোভাব এর কারণে রাজসভার আমত্যরাও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। এই জ্ঞাতি বিদ্বেষ এবং সামাজিক বৈষম্য ও বিশৃঙ্খলা ইসলাম প্রচারের জন্য একটি উপযোগী ও অনুকূল পটভূমি প্রস্তুত করে।

ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারের পদ্ধতি

ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারের দুটো পদ্ধতি ছিল। (১) তুর্কিয়ানা তরীকা (২) সুফিয়ানা তরিকা।

বাংলায় ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সুফিয়ানা তরিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কেননা সুফিদের মানবিকতার আবেদন, ব্যক্তিত্ব ও অলৌকিক ক্ষমতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে শ্রদ্ধা ও অনুরক্তির জন্ম হয়েছে। তাদের জীবন যাত্রার সরলতা ও সাম্যের বাণী তৎকালীন সাধারণ মানুষের বিশেষ করে ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকারচ্যুত বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের প্রাণে বিপূল উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। ইসলামের সাম্যবাণী বয়ে আনা সুফিবাদ কঠোর বর্ণবাদী হিন্দু ধর্মের উপর সফল আঘাত হানে।

সুফি দরবেশদের অবদান

ইসলাম বিস্তারেঃ ভারত উপমহাদেশের প্রত্যেকটি অঞ্চল সুফী দরবেশদের আবাসস্থল ও তাদের আধ্যাত্মিক কার্যাবলীর দৃশ্যস্থান ছিল। সর্বত্র তারা তাদের চরিত্র ও কাজের প্রভাব রেখে গেছেন। বিপূল সংখ্যক সাধু দরবেশের উপস্থিতিতে একদা বাংলাদেশ ধন্য হয় এবং অন্য যে কোন স্থান অপেক্ষা এ অঞ্চলে তাদের প্রভাব অনেক বেশি গভীর ও স্থায়ী হয়। বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও বাঙ্গালী অধিবাসীদের মরমী-প্রকৃতি এর উজ্জ্বল প্রমাণ বহন করছে। বাঙ্গালী সিদ্ধ পুরুষগণ নানাভাবে ইসলাম ও সমাজের সেবা করেন এবং মুসলমান সমাজের উন্নতিকল্পে তারা এমনকি মুসলমান বিজেতা, সেনাপতি ও শাসনকর্তাদের অপেক্ষা অধিক স্থায়ী অবদান রেখে যান।

বিভিন্ন সময়ে শত শত সুফি দরবেশ ও তাদের অনুগামী শিষ্যরা বাংলায় আগমন করেন এবং বিভিন্ন শহর ও গ্রামাঞ্চলে এমনকি প্রদেশের নিভৃততম কোণেও ছড়িয়ে পড়েন। তারা ধর্মের শ্রীবৃদ্ধি সাধন করেন এবং অতীন্দ্রিয়বাদ ও স্বর্গীয় প্রেমের প্রসার সাধন করেন। তাদের আদর্শ চরিত্র, অসামান্য নৈতিক বল এবং দুঃস্থ মানবতার জন্যে তাদের গভীর সহানুভূতি ও সেবা অমুসলমান জনসাধারণকেও তাদের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ইসলামের উদারতা ও সাংস্কৃতিক প্রাধান্য যা সুফি পুরুষগণ তৎকালীন আদর্শ অনুসন্ধানকারী ও সমাজের নির্যাতিত ও অধঃপতিত মানুষের নিকট তুলে ধরেছিলেন। সুতরাং এই সকল আদর্শবান পুরুষদের প্রচারকার্য অমুসলমান, বৌদ্ধ ও সমভাবে সকল শ্রেণীর হিন্দুদেরকে ইসলামের স্নিগ্ধ ছত্রছায়াতলে আকৃষ্ট করেছিল।

শেখ জালাল উদ্দিন তাবরিজী ও তার অনুগামী শিষ্যদের প্রচেষ্টার ফলে উত্তরবঙ্গের মালদহ ও দিনাজপুর জেলার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। এই সুফি সম্বন্ধে একটি সমসাময়িক বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তাঁর পান্ডুয়ায় আগমনের পর বিপুল সংখ্যক লোক তার নিকট ভিড় জমায় এবং তাঁরই হাতে ইসলাম কবুল করে। আখী সিরাজ, আলাউল হক, নূর কুতব আলমপ্রমূখ খ্যাতনামা চিশতিয়া সুফি পুরুষদের নিকট উত্তর বাংলার বহু লোক ইসলামে দীক্ষা লাভ করে।

ইবনে বতুতার মতে সিলেটের অধিবাসীরা শেখ জালালের (শাহ্ জালাল) ধর্মীয় প্রচারকার্যে আকৃষ্ট হয়ে ইসলামে দীক্ষিত হয়। স্থানীয় সাহিত্যে দূরদেশীয় এই পরিব্রাজকের মতের সমর্থন পাওয়া যায়। একটি লোকসঙ্গীতে উল্লেখ আছে, “সিলেটে লক্ষ লক্ষ হিন্দু ছিল, কিন্তু কোন মুসলমান ছিল না। শাহ জালালই সর্ব প্রথম সে স্থানে আজান দেন অর্থাৎ ইসলাম প্রচার করেন।”

খুলনা যশোরে মুজাহিদ-দরবেশ খান জাহান আলীর প্রচেষ্টায় ইসলাম বিস্তার লাভ করে। চট্টগ্রাম নোয়াখালী অঞ্চল কেবল চতুর্দশ শতকের মধ্যভাগে মুসলমানদের দ্বারা বিজিত হয়। তথাপি এ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিদ্যমান। বাংলা সাহিত্যে প্রকাশ পায় যে, ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগে পূর্ববঙ্গে মুসলমানদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। কবি কৃত্তিবাসের মতে, মুসলিম প্রভাব এত বেশি বৃদ্ধি পায় যে, সংমিশ্রণের ভয়ে পূর্ববঙ্গের ব্রাক্ষ্মণগণ তাদের পৈত্রিক ঘরবাড়ি পরিত্যাগ করেন।

ত্রয়োদশ শতকের সপ্তদশকে, শেখ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা সোনারগাঁয়ে ‘খানকাহ’ ও ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এই এলাকায় মুসলমানদের শিক্ষার জন্য একটি ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হওয়ায় এই ধারণা দৃঢ় হয় যে, শেখ আবু তাওয়ামার সোনারগাঁয়ে পৌছাবার পুর্বেই সেখানে মুসলমান অধিবাসী ছিল। মুসলমানদের দ্বারা বিজিত হওয়ার পূর্বে সোনারগাঁয়ে মুসলিম জনসংখ্যার অস্তিত্ব সুফি-দরবেশদের প্রচারমূলক কার্যাবলীরই ফলশ্রুতি।

মুসলিম রাষ্ট্রের বিস্তার ও সংহতি

ইসলামের প্রসার ছাড়াও, বাংলাদেশে মুসলমানদের রাজ্য বিস্তৃতি ও মুসলিম রাষ্ট্রের সংহতি বিধানে মুসলমান সুফি-দরবেশদের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কখনও নিজেরা, কখনও মুসলমান সেনাপতিদের সঙ্গে সহযোগিতায় তারা প্রদেশের শেষ সীমা পর্যন্ত মুসলিম অধিকার কায়েম করেন। স্থানীয় কিংবদন্তীতে, ধর্মের জন্যে হিন্দু রাজাদের বিরূদ্ধে কয়েকজন সুফি পুরুষের জেহাদ করার বিষয় উল্লেখিত হয়, যেমন বাবা আদম শহীদ, শাহ সুলতান মাহী-সাওয়ার, মখদুম শাহ দৌলা ও অন্যান্য।

দরবেশদের কেউ কেউ বঙ্গদেশে ধর্মের শাসন-সীমা বিস্তৃত করতে এবং ছোট ছোট হিন্দুরাজা ও জমিদারদের এলাকায় বসবাসকারী মুসলমান প্রজাদের দুঃখ দূর্দশা মোচন করতে মুসলমান শাসনকর্তা ও সেনাপতিদের সঙ্গে যোগদান করেন। মুসলমান সৈন্যদল সুফি দরবেশদের উপস্থিতির ফলে সৈন্যদের মধ্যে বিপুল নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বলের সঞ্চার হয়। এভাবে, নৈতিক বলে বলীয়ান হয়ে মুসলমান সৈন্যরা অমুসলমান সেনাদের উপর বিজয়ী হয়।

মুজাহিদ-দরবেশ জাফরখান গাজী ও শাহ সফিউদ্দিন সাতগাঁয়ের হিন্দু রাজার বিরূদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং ঐ অঞ্চল বাংলাদেশের মুসলমান রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করেন। শাহ জালাল ও তাঁর শিষ্যরা সিলেটের হিন্দুরাজার বিরূদ্ধে যুদ্ধে সিকান্দার গাজীর মুসলমান সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করেন এবং সেখানে মুসলমান আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। জনপ্রবাদভিত্তিক হলেও এটা সত্য যে, সুফি-মুজাহিদ খানজাহান আলী খুলনা যশোরের দুর্গম অঞ্চলে নিয়মিত অভিযান করে উহা মুসলমানদের শাসনাধীনে আনয়ন করেন। সুলতান বারবক শাহের রাজ্য-সম্প্রসারণে ইসমাঈল গাজীর অবদান সপিরিজ্ঞাত। তিনি সফলতার সঙ্গে উড়িষ্যার হিন্দু রাজার বিরূদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং মান্দারন এলাকা জয় করেন।

সুফি-দরবেশগণ বাংলাদেশে মুসলিম রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থায় ইসলামী নীতির সমর্থক ছিলেন। সাধারণতঃ তাঁরা রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করতেন না। কিন্তু মুসলিম রাষ্ট্র ও সমাজের বিপদের দিনে তারা কখন নির্বিকার থাকেন নি। বাংলার ইলিয়াস শাহী সুলতানগণ রাজকার্যে অধিক সংখ্যায় হিন্দুদের নিয়োগ করার নীতি গ্রহণ করেন এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বপূর্ণ পদও তাদের উপর ন্যস্ত করেন। এ ধরনের জাতীয় নীতি অনুসরণ করে তাঁরা উত্তর ভারতের সাম্রাজ্যবাদীদের বিরূদ্ধে তাঁদের শক্তি বৃদ্ধি করতে এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে চেয়েছিলেন।

সুলতানগণ তাদের সালতানাত রক্ষার্থে সংখ্যা-গরিষ্ঠ হিন্দুদের সহযোগিতা লাভের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন এবং বাঙ্গালী অধিবাসীদের স্বদেশ প্রেমের উপর তাদের শক্তির উৎস গড়ে তুলতে ইচ্ছা করেছিলেন। কিন্তু ঐ সময়ের দরবেশ ও উলেমা রাজ্যের দায়িত্বপূর্ণ পদে হিন্দুদের নিয়োগ অসমীচীন মনে করেন। শেখ আলাউল হক বুঝতে পেরেছিলেন যে, এ ধরনের নীতি অনুসরনের মধ্যে বাঙ্গালী মুসলমানদের জন্যে বিপদের সম্ভাবনা নিহিত আছে। সেজন্য, শেখ আলাউল হক সুলতান সিকান্দার শাহের নিকট এ সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। কিন্তু সুলতান তার কথায় কোনরূপ কর্ণপাতও করেন নাই; উপরন্তু, পান্ডুয়ার অধিবাসীদের উপর শেখের বিরাট প্রভাবে শঙ্কিত হয়ে তিনি তাঁকে সোনারগাঁয়ে নির্বাসিত করেন।

পরবর্তীকালে সংঘটিত ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় যে, শেখ আলাউল হক রাষ্ট্রীয় নীতির পর্যালোচনায় সম্পূর্ণ অভ্রান্ত ছিলেন। যদি সুলতান সিকান্দার শাহ শেখেরর পরামর্শ গ্রহণ করতেন, তাহলে রাজা কংসের মাধ্যমে হিন্দু প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দরুণ মুসলনমানদেরকে যে দুর্ভোগ ভোগ করতে হয় এবং সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের উত্তরাধিকারীর রাজত্বকালে মুসলিম রাষ্ট্র ও সমাজ যে বিপদের সম্মুখীন হয়, তা শুরুতেই এড়ান যেত।

এমনকি, হযরত মাওলানা মুহাম্মদ মুজাফফর শামস্ বলখীও বাংলাদেশে মুসলিম রাষ্ট্রের দায়িত্বপূর্ণ উচ্চপদে বিপূল সংখ্যক হিন্দুদের নিয়োগ করা যে অসমীচীন হয়েছে সে সম্পর্কে সিকান্দার শাহের পুত্র ও উত্তরাধিকারী গিয়াসউদ্দিন আজম শাহকে অবহিত করেন। বাঙ্গালী সুলতানের নিকট শেখ তাঁর পত্রে অবিশ্বাসীদের সঙ্গে যে অন্তরঙ্গতা নিষিদ্ধ সে সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের বাণী উদ্ধৃত করেন, “তোমরা যারা বিশ্বাস কর, তোমাদের অন্তরঙ্গতা দিওনা তাদেরকে, যারা বাইরের সারিতে আছে।”

তিনি মুসলমান ধর্মীয় নেতাদের বাণীও উদ্ধৃত করেন; তারা বলেছেন যে, মুমিনের কখনও উচিত নয় যে, অমুসলিম ও অপরিচিত ব্যক্তিদেরকে তারা বিশ্বস্ত, অন্তরঙ্গ ও মন্ত্রদাতারূপে গ্রহণ করে। শেখ যুক্তি দেখান যে, হিন্দুদেরকে বন্ধু ও অনুগ্রহভাজন করার যৌক্তিকতার কারণ গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি কোরআনের বাণীর উদ্ধৃতি দিয়ে দেখান যে, এ রকম নীতি মুসলিম রাষ্ট্রে দুঃখ-কষ্ট ও রাজদ্রোহ আনয়ন করবে। অবিশ্বাসীরা মুসলমান শাসকদেরকে বিনষ্ট করতে কখনও পশ্চাদপদ হবে না এবং তাদেরকে ভূল পথে পরিচালিত করবে। একজন অবিশ্বাসী বিধর্মীকে হয়তো কোন কাজ দেয়া যেতে পারে কিন্তু তাই বলে তাকে শাসনকর্তা কিংবা ব্যবস্থাপক পদে নিয়োগ করা উচিত হবে না; মোট কথা, তাকে মুসলমানদের উপরে কর্তৃত্ব করার দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে না।

আল্লাহ বলেন, “মুমিনগণা অবিশ্বাসীদের থেকে বন্ধু ও সাহায্য করবে না এবং আল্লাহকে অবহেলা করবে না। যদি কেউ তা করে কোন কিছুতেই তারা আল্লাহর সাহায্য পাবে না; তোমাদেরকে কেবলমাত্র সতর্ক করে দেওয়া হবে যাতে তোমরা নিজেদের উপর নির্ভর করে তাদের (অবিশ্বাসীদের) থেকে তোমাদেরকে রক্ষা করতে পার।” শেখ আরও বলেন যে, ‘যারা বিশ্বাসীদের উপর অবিশ্বাসীদেরকে কর্তৃত্ব প্রদান করেছে, তাদের বিরূদ্ধে কোরান, হাদিস ও ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলীতে সতর্কবাণী রয়েছে।

শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অবদান

সুফি দরবেশদের অধিকাংশই আলেম ছিলেন। মাওলানা শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা, মখদুম শরফ উদ্দিন এহিয়া মানেরী, হযরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়া, শেখ আলাউল হক, হযরত নুর কুতুব আলম ও অন্যান্য সুফিদের জীবন এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বাস্তবিকই বাংলায় ও এ উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের প্রথম যুগের সুফি-দরবেশদের জন্য ধর্মীয় জ্ঞানে ব্যুৎপত্তি অত্যাবশ্যক ছিল। আখী সিরাজ উদ্দিন উসমানকে শিষ্যত্বে গ্রহণ সম্পর্কে নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার উক্তি এই মত সমর্থন করে।

আমরা দেখতে পাই, সুফি-দরবেশদের মধ্যে অনেকে ঐ যুগের বড় আলেম ছিলেন এবং তাঁদের প্রতিষ্ঠিত খানকাগুলো ছিল শিক্ষা ও জ্ঞানের কেন্দ্র। এসব শিক্ষাকেন্দ্র চতুর্দিক থেকে শিক্ষার্থীদেরকে আকৃষ্ট করেছে। আমরা কিছু সংখ্যক ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্রের নামোল্লেখ করতে পারি, যেগুলি সুফি-দরবেশদের খানকায় গড়ে উঠেছিল এবং এগুলোর বিচ্ছুরিত জ্ঞানালোকে বাংলা ও উত্তর-ভারত আলোকিত হয়েছিল।

শেখ শরফ উদ্দিন আবু তাওয়ামা ছিলেন তের শতকের দ্বিতীয়ার্ধের খ্যাতনামা পন্ডিতদের অন্যতম। ইসলামী শিক্ষা ও অন্যান্য জ্ঞান-বিজ্ঞানে তার ব্যুৎপত্তি ছিল। তিনি সোনারগাঁয়ে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে, এমনকি, উত্তর-ভারত থেকেও শিক্ষার্থীরা এখানে সমবেত হন। সোনারগাঁও একাডেমীতে মখদুম শরফউদ্দিন এহিয়া মানেরী ছিলেন তার সবচেয়ে খ্যাতনামা ছাত্র। শেখ শরফউদ্দিন আবু তাওয়ামা ‘মাকামাত’ নামে ‘তাসাউফ’ বা ইসলামী মরমীবাদের উপর একখানা মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। সমগ্র উপমহাদেশব্যাপী শিক্ষিত মহলে ‘মাকামাতের’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। এই গ্রন্থের চাহিদা লাহোরের মত সূদুর অঞ্চলে ছিল – তার প্রমাণ রয়েছে।  ফারসী কবিতার আকারে লিখিত ‘ফিকাহ্’ এর উপর অন্য একখানা গ্রন্থ শেখ আবু তাওয়ামার লেখনী-প্রসূত বলে তাঁকে কৃতিত্ব প্রদান করা হয়। যদি এ গ্রন্থ তাঁর দ্বারা লিখিত নাও হয়ে থাকে, তাহলেও তদীয় শিষ্যদের মধ্যে কেউ তাঁর শিক্ষার উপর ভিত্তি করে ইহা সংকলন করেছেন।

শেখ আখী সিরাজ, শেখ আলাউল হক এবং হযরত নূর কুতুব আলম এরা সকলেই তাঁদের বিদ্যাবত্তার জন্যে বিখ্যাত ছিলেন। তাঁরা শুধু আধ্যাত্মিক জ্ঞান বিস্তারেই নয়, সাধারণ শিক্ষা বিস্তারেও সমান আগ্রহী ছিলেন। নুর কুতুব আলম একটি মাদ্রাসা স্থাপন করেন এবং পরবর্তী সময়ে সুলতান হোসেন শাহ এই প্রতিষ্ঠানের জন্য মুক্ত হস্তে দান করেন। এই খ্যাতনামা সুফি পুরুষ ও পণ্ডিতদের খ্যাতি উত্তরÑভারত ও বাংলার সর্বত্র থেকে শিষ্য ও শিক্ষার্থীদেরকে আকৃষ্ট করে।

রাজশাহীর বাঘায় ‘হাওদা’ মিয়া নামে অধিকতর পরিচিত হযরত হামিদ দানিশমন্দের খানকাহ শিক্ষার মহা-বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়েছিল। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলের একজন মুঘল পরিব্রাজক আবদুল লতিফ ইহা লক্ষ্য করেছিলেন। মোট কথা বাঙ্গালী সুফি দরবেশদের খানকাহ ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের মহাকেন্দ্রস্বরূপ ছিল। এ কেন্দ্রগুলো কেবল বাংলার জন্যেই নয়,বরং সমগ্র ভারতের জন্য সাধু দরবেশ ও পন্ডিত ব্যক্তিদের জন্ম দেয়।

জনহিতকর কার্য

সুফি-দরবেশদের খানকাগুলো বিরাট জনহিতৈষণামূলক প্রতিষ্ঠান হিসাবেও পরিগণিত হয়। এখানেই স্রষ্টা-সন্ধানী মানুষেরা তাদের মনের শান্তি খুঁজে পেত এবং তাদের আধ্যাত্মিক জীবনের প্রবল আকাঙ্খা পরিতৃপ্ত হ’ত। খানকাহ্গুলো ছিল একাধারে চিকিৎসালয় এবং আশ্রয়স্থান; যেখানে দুঃস্থ, বৃদ্ধ, উদ্মাদ এবং রুগ্ন ব্যক্তিরা সরাসরি আশ্রয় লাভ করত। তারা শেখ ও তদীয় শিষ্যদের নিকট লাভ করতো সেবা, চিকিৎসা ও আন্তরিক যত্ন। প্রতিটি খানকাহর  সঙ্গে একটি করে লঙ্গরখানা বা বিনা খরচে খাবার ব্যবস্থা থাকত; যেখানে থেকে গরীব ও অভূক্ত লোকদের খাবার দেয়া হতো। লঙ্গরখানার রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে বিষয়-সম্পত্তিও দান করা হতো।

শেখ জালালউদ্দিন তাবরেজী ও পান্ডুয়ার বিখ্যাত সুফি দরবেশদের প্রতিষ্ঠিতা খানকাহসমূহের বিরাট আয়ের লাখেরাজ জমি ছিল। এভাবে সাধু-দরবেশদের খানকাহ্ ও লঙ্গরখানাগুলো দুঃস্থ বিপন্ন মানুষের নিকট এক মহামুক্তির দ্বার উম্মুক্ত করে দেয়। বিনা খরচে খাবার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে সাধু দরবেশগণ দেশের দীনদুঃখী ও সাধারণ মানুষের সংস্পর্শে আসতে এবং তাদের অনুভূতি ও আশা-আকাঙ্খা বুঝতে সক্ষম হন।

মুসলিম আমলে বাংলাদেশে ছিল শত শত সুফি দরবেশগণের কার্যাবলীর দৃশ্যস্থল। ফলে বাঙ্গালী মুসলমানগণ তাদের ঘনিষ্ঠতম সান্নিধ্য ও প্রত্যক্ষ প্রভাবের আওতায় আসে। সিদ্ধ পুরুষগণ তাঁদের জীবনে ও ধারণার আধ্যাত্মবাদ ও উদারতাকে আদর্শস্বরূপ তুলে ধরেন। তাঁরা সঠিকভাবে আধ্যাত্মিকতার পরিমন্ডলে নিজেদেরকে উৎসর্গ করেন এবং পার্থিব জগতের প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শন করেন। তাঁরা ধর্মের উদার ব্যাখ্যা দান করেন।

বাঙ্গালী মুসলমানগণ এই সকল ধর্মীয় মহান শিক্ষকদের অধ্যাত্মবাদ ও উদারতা গ্রহণ করে। এই অধ্যাত্ববাদ মানুষের মনে এত গভীরভাবে রেখাপাত করে যে, এমনকি আজও বাঙ্গালী মুসলমানের চরিত্রে একদিকে রয়েছে মরমীবাদের অনুপ্রেরণা, অন্যদিকে রয়েছে পার্থিব জগতের প্রতি বৈরাগ্য। বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে স্থানীয় লোক-সঙ্গীতে, তাদের মরমী অনুভূতির সুন্দর প্রকাশ দেখা যায়।

হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল মতের লোকদের মিলনকেন্দ্র ছিল এই খানকাগুলো। এ কেন্দ্রগুলো অবারিত প্রতিষ্ঠান ও খোলাখুলি আলোচনার স্থানে পরিগণিত হয়। এভাবে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সমঝোতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠান একটা উদারনৈতিকতা ও অনুকূল পরিবেশের সৃষ্টি করে। ফলতঃ উভয় শ্রেণীর জনগণ একে অন্যের নিকটতর হয় এবং একে অন্যের মতামত বুঝতে পারে। এই উদার পরিবেশে একটি সাধারণ সাংস্কৃতিক মতবাদ ‘সত্যপীর’ পূজার উদ্ভব হয় এবং বাংলা সাহিত্যের উন্নতি ত্বরান্বিত হয়। সুফি সিদ্ধ পুরুষগণ দেশে যে উদার আবহাওয়ার সৃষ্টি করেন তার ফলে বাংলার হিন্দু সমাজে একটি উদার সংস্কার আন্দোলনের জন্ম সম্ভব হয় এবং এর পূর্ণ বিকাশ ঘটে নব দ্বীপের শ্রীচৈতন্যের বৈষ্ণব ধর্মে।

সাধু দরবেশদের সততা ও ব্যক্তিত্ব, তাঁদের মানবতা ও সেবা, প্রীতি ও উদারতা-  শিক্ষিত অশিক্ষিত সকল শ্রেণীর হিন্দুরাজগণকে তাঁদের প্রতি আকৃষ্ট করে। তাদের অনেকেই দরবেশদের হাতে ইসলাম কবুল করে এবং অন্যান্যরা যদিও নিজেদের ঐতিহ্যগত ধর্মবিশ্বাসকেই রক্ষা করে আসছিল, তথাপি তারা সুফি দরবেশদের একান্ত ভক্ত হয়ে ওঠে এবং তাদের অলৌকিক ক্ষমতাকে স্বীকৃতি জানায়।

তারা পীর পূজা শুরু করে এবং তাদের অন্তরাকাঙ্খা পূর্ণ করার মানসো পীরের আশির্বাদ কামনা করে। এমনকি, বহু শতাব্দীব্যাপী হিন্দুরা ভক্তির সঙ্গে সুফি-পীর দরবেশদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসছে এবং তাঁদের আশির্বাদ লাভের আশায় মাজার শরীফ পরিদর্শন করছে। মুসলমান পীর দরবেশদের প্রতি হিন্দুদের এই শ্রদ্ধা বাংলা সাহিত্যে ও হিন্দু কবিদের বর্ণনায় এসেছে।

এগুলো সেই সকল অসংখ্য দৃষ্টান্তের কয়েকটি মাত্র। বাস্তবিকই মুসলিম পীর দরবেশগণ যথার্থরূপে বাংলার আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক বিজয়ের প্রতীকস্বরূপ ছিলেন।

শেষ কথা

এগারো শতকের দিকে সেন রাজাদের ব্রাক্ষ্মণ্যবাদী নীতি ও বৈরি মনোভাবের বিপরীতে মানবিকতার আবেদন নিয়ে সুফিরা এদেশে আগমন করে মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকা, লঙ্গরখানা প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা করে ইসলাম প্রচার ও দ্বীনের খেদমত করতে থাকেন। ফলে সুফিদের প্রতি সাধারণ মানুষের মধ্যে জন্ম হয়েছে শ্রদ্ধা আর অনুরোক্তি, নিজ ধর্মে অবহেলিত ও উপেক্ষিত সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ইসলামের আহবানে সাড়া দেয়।

কিন্তু কালের বিবর্তনে বর্তমানে কথিত সুফি দরবেশদের সম্পর্কে প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা দেখি যে পূর্বেকার সুফি দরবেশদের খানকা ও মাজারকে নিয়ে বর্তমানে একদল সুফি দরবেশ দ্বীন-ইসলামের খেদমতের পরিবর্তে বিদআতী কর্ম-কান্ড পরিচালনার পাশাপাশি ব্যবসা করতেছেন। যেমন- সন্তান লাভের উদ্দেশ্যে সুফিদের মাজারে ভ্রমণ করে প্রার্থনা, মাজারকে সিজদা করা, মাজারে মোমবাতি জ্বালানো বিনা প্রয়োজনে, মাজারে উরশের (মিলাদ মাহফিল) নামে মদ-গাঁজা, জুয়ার আসর মিলানো প্রভৃতি। তাই আমাদেরকে পূর্বেকার সূফি-সাধকদের জীবনী ও তাঁদের কর্মকান্ডের সঠিক ইতিহাস অধ্যয়নের মাধ্যমে বর্তমান বিদআতী কার্য থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র

১. “A History of Sufism in Bangal”, Anamul Haque.

২. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ড. এম. এ. রহিম

৩. বাংলার সংস্কৃতি বাংলার সভ্যতা, এ কে এম শাহনাওয়াজ

৪. মুসলিম আমলে বাংলার শাসনকর্তা , আসকার ইবনে সাইখ

৫. বাংলা সাহিত্যে সুফী প্রভাব, মনিরউদ্দীন ইউসুফ

৬. বাঙ্গাঁলার ইতিহাস (২য় খন্ড) ,রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

৭. বাংলাদেশে ইসলাম ,আব্দুল মান্নান তালিব

 

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.