সিঙ্গেল মাদার, সিঙ্গেল ফাদার ও কঠিন বাস্তবতা

ছেলেমেয়েদের উজ্জল ভবিষ্যতের জন্য পিতামাতা উভয়ের যত্ন-পরিচর্যা-সহযোগিতা প্রয়োজন। অথচ দিন দিন পরিবার ভাঙ্গনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক স্বাধীনচেতা প্রাপ্তবয়ষ্ক নারী  ‘সিঙ্গেল মাদার’ হচ্ছে। পিতৃ পরিচয় ছাড়াও সন্তানকে লালন পালন করছে। এমন সিঙ্গেল মাদার বা একক মায়েদের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও নেহায়েত কম না। ফলে জানা-অজানা অনেক পরিবারে সন্তানেরা বেড়ে উঠে মাতৃছায়ায়। সমাজের তীর্যক দৃষ্টি, আর্থিক অস্বচ্ছলতা সহ্য করেও সিঙ্গেল মায়েরা সন্তানদের পাশে থাকেন। সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে তাদের এগিয়ে নেন। সিঙ্গেল মাদার বা সিঙ্গেল প্যারেন্টস সমাজ বা পরিবার কারো জন্যই সুখকর নয়। বাবাহীন সন্তান মানুষ করা চাট্টিখানি কথা তো আর নয়! তবে তারা বলেন, মা তো ‘মা-ই।’ মা যে শুধুই মা, অতুলনীয়া।

এক নজরে দেখে নিন লুকিয়ে রাখুন

মায়ের আঁচল ছায়ায় সফল সন্তান

এমন অনেক মা আছেন, যারা সিঙ্গেল মাদার হিসেবে সন্তানকে পালন করেন। তারা কেউ বিধবা, কেউ বা ডিভোর্সি। তবু সন্তানকে বড় করার জন্য তাদের একাই হয়ে উঠতে হয় সন্তানের বাবা-মা দুই-ই। বাবার মতো কঠিন হয়ে শাসন করতে হয়, মায়ের মতো স্নেহ দিয়ে আবার সে দুঃখ ভুলিয়ে দিতে হয়। বাবার মতো বাইরের দুনিয়া থেকে সন্তানকে আড়াল করতে হয়। আবার মায়ের মতো পরিবারের ভেতরের প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিতে হয়, যাতে সন্তানের পরিবার চালনার এবং পরিবারের একজন হয়ে ওঠার দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। সন্তান জন্মাতে কোনো নির্দিষ্ট পুরুষ না থাকা, নারী কোনো নির্দিষ্ট পুরুষকে সন্তানের পিতা হিসেবে নির্ধারণ না করা,বহুপুরুষ বা অবৈধ পুরুষ দ্বারা সন্তান গ্রহন, তথা অবিবাহিত মা পশ্চিমা বিশ্বে স্বীকৃত। স্পার্ম ব্যাংক হতে পছন্দের ব্যক্তির শুক্রানু নিয়ে কৃত্রিমভাবেও তা ধারণ করছে। তবে অনেক দেশেই এসব দেখা যাাচ্ছে।

বারাক ওবামা

কেনিয়ানিবাসী বারাক হুসেইন ওবামা (সিনিয়র) এবং মার্কিন অ্যান ডানহ্যামের পরিচয় হাওয়াই মানোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাকালে। মুসলিম কৃষ্ণাঙ্গ পিতা ও খ্রিস্টান শ্বেতাঙ্গী মায়ের সংসারে একমাত্র পুত্র বারাক ওবামা (জুনিয়র) এর জন্ম। ওবামার যখন মাত্র ২ বছর বয়স তখন ওবামা (সিনিয়র) মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের উদ্দেশ্যে স্ত্রী অ্যান ও পুত্রকে রেখে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি চলে যান। যাওয়ার আগে সংসারিক মনোমালিন্য ও ডিগ্রি অর্জনে তাদের ছেড়ে যাওয়ার মতবিরোধের কারণে ডিভোর্স নেন ওবামা ও অ্যান ডানহ্যাম দম্পতি।

পরবর্তীতে পুনরায় ইন্দোনেশীয় লোলো সুতোরোকে বিবাহ করেন অ্যান ডানহ্যাম এবং কন্যা সন্তানের জন্ম দেন তিনি। ১০ বছর বয়স থেকেই ওবামা তার নানা-নানীর সহচার্যে বেড়ে উঠেছেন। জ্ঞানত ওবামা তার বাবাকে মাত্র একবার দেখেছেন। ওবামা ও তার বোন মায়াকে সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে অ্যান একাকী তাদের মনোবল ও সাহস দিয়ে গেছেন আমৃত্যু। তার সহযোগিতা ও অনুপ্ররণায় পুত্র ওবামা আজ পৃথিবী জুড়ে সকল সংগ্রামী মানুষের কাছে দৃষ্টান্তস্বরূপ। মায়ের স্মৃতিচারণে তিনি ‘Dreams from My Father‘ বইয়ে বলেন- ‘আমার মধ্যে আজ যা কিছু ভালো, সবই তাঁকে দেখে শেখা, তাঁর কাছ থেকে পাওয়া। আমি তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ, চিরঋণী।’

অ্যাঞ্জেলিনা জোলি

লুইস জুন ও রোল্যান্ড এফ. বার্ট্রান্ড কন্যা মার্শেলিন বার্ট্রান্ড ছিলেন একজন মার্কিন অভিনেত্রী। ১৯৭১ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন অভিনেতা জন ভটের সাথে। কন্যা অ্যাঞ্জেলিনা জোলি ভট ও পুত্র জেমস হ্যাভেনের জন্মের পর ১৯৮০ সালে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে তাদের। ফলে কন্যা ও পুত্রকে নিয়ে নিউ ইয়র্কের প্যালিসেডে চলে আসেন তিনি।

বিবাহ বিচ্ছেদের প্রতিকূলতা কাটাতে অভিনয় ছেড়ে দিতে হয় তাকে। পিতার কারণে বরাবরই অভিনয়ে অনিচ্ছুক জোলী শুধুমাত্র মায়ের স্বপ্ন পূরণে গ্ল্যামার জগতে পা রাখেন। ২০০২ সালে আইনগতভাবে পিতৃবংশীয় পদবী ‘ভট’ ত্যাগ করে হয়ে ওঠেন ‘অ্যাঞ্জেলিনা জোলি’। শুধুমাত্র মায়ের আঁচলে বেড়ে ওঠা জোলী তার নিজের জীবনের অনুপ্রেরণা হিসেবে মায়ের পথ অনুসরণ করে চলেন।

লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও

১৯৯৮ সালে বিখ্যাত পরিচালক জেমস ক্যামেরনের সিনেমা ‘টাইটানিক’-এ দুর্দান্ত অভিনয় দিয়ে সকলের মন জয় করেন অভিনেতা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও। ১৯৯০ সালে প্রথম পা রাখেন মিডিয়া জগতে। ২০১৬ সালে ‘দ্য রেভেন্যান্ট’ ছবিতে অভিযাত্রী হিউ গ্লাসের চরিত্রে অভিনয় করে অর্জন করেন কাঙ্ক্ষিত অস্কার। সমস্ত জয়ের পেছনে তাকে উৎসাহ দিয়ে গেছেন তার মা ইরমেলিন।

কমিক শিল্পী ও বই পরিবেশক জর্জ ডিক্যাপ্রিও এবং আইন সচিব ইরমেলিনের একমাত্র সন্তান লিওনার্দো। লিওনার্দোর শৈশবে দাম্পত্য জীবন থেকে বিচ্ছেদের পর মা ইরমেলিনের সাহচর্যেই বেড়ে ওঠেন তিনি। মাতৃস্নেহে বড় হলেও পিতার সান্নিধ্যেও ছিলেন তিনি। সৃষ্টিশীল মা তাকে তার ইচ্ছাপূরণে দারুণভাবে সহায়তা করে গেছেন সবসময়।

শাহরুখ খান

রুপে-গুণে তেজস্বিনী ফাতিমা খান ছিলেন প্রথম শ্রেণীর একজন ম্যাজিস্ট্রেট। ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ১৯৫৫ সালে ভারতীয় একজন স্বনামধন্য স্বাধীনতা কর্মী তাজ মোহাম্মদ খানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের সংসারে কন্যা শেহনাহ লালারুখ খান ও পুত্র শাহরুখ খানের জন্ম হয়। শাহরুখ খানের যখন মাত্র ১৫ বছর বয়স, তখন তার বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। তিনি প্রায় আট মাসের অধিক শয্যাশায়ী ছিলেন। তার অসুস্থতায় দেখাশোনা আর পরিবারের দায়িত্ব ফাতেমার উপর বর্তায়।

স্বামীর চিকিৎসায় মাত্র ১০ দিনে পাঁচ হাজার রূপি মূল্যের ২৩টি ইঞ্জেকশনের ব্যয়ভার চালানো বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায় ফাতেমার জন্য। দিন-রাত কাজ করে গেছেন সংসারের দায়িত্ব পালনে। স্বামীর মৃত্যুর পর তার ব্যবসাকে আবার নতুন করে দাঁড় করান ফাতেমা। তার উৎসাহে শাহরুখ প্রথম অভিনয়ে যোগ দেন এবং বলিউডে আজ সাফল্যের শীর্ষে অবস্থান করছেন। ১৯৯০ সালে মায়ের মৃত্যুর পর তিনি ভীষণভাবে ভেঙে পড়েন। একজন সফল ভারতীয় অভিনেতা, প্রযোজক, টেলিভিশন উপস্থাপক এবং মানবপ্রেমিক হিসেবে শাহরুখ বিশ্বাস করেন, তার জীবনাদর্শ মায়ের থেকেই পাওয়া। মায়ের সংগ্রাম ও পরিশ্রম সবসময়ই তাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

অপরাহ উইনফ্রে

বিংশ শতাব্দীতে আফ্রিকান-আমেরিকান সবচেয়ে ধনী ও ‘কুইন অব অল মিডিয়া‘ হিসেবে পরিচিত অপরাহ উইনফ্রের ছেলেবেলা ছিল আর দশটা শিশুর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। মিসিসিপির নিভৃত পল্লী মিলওয়াকিতে এক অবিবাহিত মায়ের সন্তান হয়ে জন্ম গ্রহণ করেন অপরাহ। ফলে অপবাদ, নিন্দা আর অবহেলায় মাকে নিয়ে ছোট্ট অভাবের সংসার ছিল তার। সাথে কৃষ্ণবর্ণের এই মেয়েটিকে চেহারার  জন্য সবসময় নিগ্রহ সহ্য করতে হয়েছে।

জন্মের ১ বছর পরই নানীর কাছে চলে যান এবং সেখানেই বড় হতে থাকেন। ৬ বছর বয়সে পুনরায় মায়ের কাছে চলে আসেন। মা ভিনিতা লি গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন এবং পিতা ভারনন উইনফ্রে ছিলেন পেশায় নরসুন্দর। পরবর্তীতে জীবনের নানা উত্থান-পতন কাটিয়ে পিতার সহায়তায় প্রথমে স্থানীয় এক রেডিওতে সংবাদ পাঠিকার কাজ পান। এরপর তাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি; একাধারে হয়ে উঠেছেন লেখক, অভিনেত্রী, পরিচালক আর গণমাধ্যমের সম্রাজ্ঞী।

সেলেনা গোমেজ

দারিদ্রের সাথে সংগ্রাম করে শূন্য থেকে অসীমে পৌঁছানোর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সেলেনা গোমেজ। রিকার্ডো জোয়েল গোমেজ এবং অ্যামান্ডা ডন ম্যান্ডি কর্নেটের সংসারে তিন কন্যার অন্যতম তিনি। সেলেনার বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে। হঠাৎ করে সুখী পরিবার ভেঙে যাওয়ায় সেলেনা হতাশায় ভুগতেন। তাদের এমনও দিন গেছে, যখন তিনবেলা খাবার জোগাড়েই তার মা কর্নেটকে রীতিমত যুদ্ধ করতে হয়েছে। সংসারের খরচ চালাতে তিনটি চাকরি করতেন তিনি।

মেয়ের মন ভাল রাখতে তাকে বিভিন্ন কনসার্টে নিয়ে যেতেন। সেখান থেকেই অনুপ্রাণিত হতেন সেলেনা । গানবাজনা আর অভিনয়ে ঝোঁক থেকেই তার কর্মজীবন শুরু। মায়ের সহযোগিতা আর সংগ্রামী জীবন থেকে তিনি সর্বদা অনুপ্রেরণা পেতেন। তার প্রকাশিত প্রথম ও দ্বিতীয় সঙ্গীতের অ্যালবাম বিলবোর্ডে শীর্ষ ১০ ও ৫ এ স্থান লাভ করে। অভিনয় ও সঙ্গীত দুইদিকেই সেলেনার সমান দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।

কয়েকজন একক মা

সুস্মিতা সেন

সাবেক মিস ইউনিভার্স সুস্মিতা সেনকে বলিউডের সবচেয়ে সুন্দরী ও ফ্যাশন সচেতন তারকা হিসেবে ধরা হয়। মাত্র ২৫ বয়সে প্রথম কন্যাসন্তান দত্তক নেন এই তারকা। প্রায় ১০ বছর পর তিন মাস বয়সী আরেকটি কন্যাশিশু দত্তক নেন। দত্তক নেয়া দুই সন্তানকেই নিজ সন্তানের পরিচয়ে বড় করছেন এ তারকা। যার কারণে ব্যক্তিগত জীবনে বিয়ে করেননি। মাতৃপরিচয়েই সন্তানদের দেখাশোনা করে যাচ্ছেন তিনি।

রাভিনা ট্যান্ডন

নব্বই দশকে বলিউডের পর্দা কাঁপানো অভিনেত্রী রাভিনা ট্যান্ডন। বিয়ে করেছিলেন ভারতের নামকরা ব্যবসায়ী অনিল থাডনিকে। বিয়ের আগেই দত্তক নিয়েছিলেন দুইটি সন্তান। বিবাহিত জীবনে নিজে জন্ম দিয়েছিলেন আরো দুই সন্তানের। ২০০৬ সালে অনিলের সাথে ছাড়াছাড়ির পর চার সন্তানকে একাই সামলাচ্ছেন রাভিনা। এরইমধ্যে বড় মেয়ে পূজার বিয়েও দিয়েছেন রাভিনা।

ববিতা কাপুর

এই বলিউড সুন্দরী বিয়ে করেছিলেন আরেক বলিউড অভিনেতা রনধীর কাপুরকে। দাম্পত্য জীবনে দুই কন্যা সন্তানের জন্ম দেন ববিতা। আর সে দু’জন হচ্ছেন কারিশমা কাপুর ও নবাবপত্নী কারিনা কাপুর। সন্তানরা জন্ম নেয়ার পর থেকে স্বামী রনধীর এক পর্যায়ে প্রচুর মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে ববিতা ডিভোর্স দেন তার স্বামীকে। তারপর থেকে দুই মেয়েকে নিয়ে নিজের জীবনের গল্পটা একাই এগিয়ে নেন এই তারকা অভিনেত্রী।

নীনা গুপ্তা

‘বোল্ড লেডি’ খ্যাত বলিউড তারকা নীনা গুপ্তার প্রেম গড়ে ওঠেছিলো ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ক্রিকেটার ভিভ রিচার্ডসের সঙ্গে। একসঙ্গে বসবাসও করেছিলেন তারা। রিচার্ডের সন্তানও গর্ভে আসে নীনার। বিয়ে ছাড়াই জন্ম নেয় কন্যা। তারপর বাকী জীবনে আর বিয়ে করেননি। একাই সন্তানকে লালন-পালন করেছেন। মানুষ করেছেন। সেই সন্তানই এখন ভারতের ফ্যাশন ডিজাইনিং ইন্ডাস্ট্রিতে বেশ পরিচিত নাম- মাসাবা গুপ্তা।

পূজা বেদী

বলিউড অভিনেত্রী পূজা বেদী ৯০’র দশকে বিয়ে করেন ভারতের নামকরা ব্যবসায়ী ফারহান ইব্রাহিমকে। তারপর এ দম্পতির ঘর আলোকিত করে আসে পুত্র ওমর ও কন্যা আলিয়া। পরবর্তীতে সম্পর্কের উত্থান পতনে বিয়েটা আর টেকেনি পূজা বেদীর। এ অভিনেত্রী একাই মানুষ করেছেন দুই সন্তানকে। ওমর ও আলিয়া এখন মায়ের পরিচয়েই তৃপ্ত।

মাহিরা খান

পাকিস্তানি অভিনেত্রী মাহিরা খান একজন সিঙ্গেল মাদার। ২০০৭ সালে আলি আসকারির সঙ্গে গাঁটছড়া বেধেছিলেন। ৮ বছর একসঙ্গে সংসার করার পর ২০১৫ সালে বিচ্ছেদ ঘটে। এর ভেতর তাদের ঘরে আসে একটি ছেলে সন্তান। সেই ছেলে সন্তানের নাম আজিলান। বিচ্ছেদের পর একমাত্র ছেলে আজলানের সব দায়িত্ব নেন মাহিরার৷ মাহিরা জানান, তার প্রথম কাজ এখন তার ছেলেকে মানুষ করা।

অপু বিশ্বাস

২০০৮ সালের ১৮ এপ্রিল গোপনেই বিয়ে করেন অভিনেতা শাকিব খান ও অভিনেত্রী অপু বিশ্বাস। বিয়েতে দেনমোহর ধার্য করা হয় ৬০ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কলকাতার একটি হাসপাতালে ছেলে আব্রাম খান জয়ের জন্ম হয়। ১০ বছর একসঙ্গে কাটানোর পর হয়ে যায় ডিভোর্স।

অ্যাঞ্জেলিনা জোলি

‘ব্র্যাঞ্জেলিনা’ দম্পতির ৬ সন্তান লালনপালন করছেন হলিউড তারকা অ্যাঞ্জেলিনা জোলি নিজেই। ব্র্যাডপিট সন্তানদের গালিগালাজ ও মারধর করতো। অ্যাঞ্জেলিনার বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তের পেছনে ছেলেমেয়েদের মঙ্গল চিন্তা ছিল অন্যতম কারণ। জোলি চাননি তাদের ছেলেমেয়েরা মা-বাবার হরদম ঝগড়া করা দেখে বেড়ে উঠুক। দীর্ঘ ১০ বছর একসঙ্গে থাকার পর ২০১৪ সালে আগস্টে বিয়ে করেছিলেন পিট-জোলি।

শ্রীদেবী

১৯৯৬ সালে বনি কাপুরের সঙ্গে যখন শ্রীদেবীর বিয়ে হয় তখন বলিউডের জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। যখন বনির সন্তানের গর্ভধারণ করেন শ্রীদেবী তখনো বনি তার প্রথম স্ত্রীকে ডিভোর্স দেননি। বনি কাপুরের সাথে বিয়ের কয়েকমাসের মধ্যেই শ্রীদেবীর কোলজুড়ে আসে প্রথম সন্তান জানভি কাপুর।

সারিকা

অভিনেত্রী সারিকার সাথে অভিনেতা কমল হাসানের ভালোবাসার সম্পর্ক যখন শুরু হয় তখনো কমলের সাথে তার প্রথম স্ত্রীর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়নি। তবুও সারিকা ও কমল হাসান বিয়ের আগে একসঙ্গে থাকা শুরু করেন। অতঃপর সারিকা জন্ম দেন বর্তমানের নামকরা অভিনেত্রী শ্রুতি হাসানকে। সারিকা ও কমল পরে বিয়ে করেন। তবে সেই বিয়ে বেশিদিন টেকেনি। তাদের সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর শ্রুতি হাসানকে লালনপালন করেছেন সারিকা নিজেই।

শাকিরা

২০১০ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের থিম সং ‘ওয়াকা ওয়াকা’র মাধ্যমে পুরোবিশ্ব এক নামে চিনেন শাকিরাকে। তার গাওয়া এই গানটি ছিল ইউটিউবে সর্বাধিক শোনা গান। ২০১৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে শাকিরা ‘লা লা’ গান দিয়ে মাতান পুরোবিশ্বকে। শাকিরার প্রথম প্রেমিক আর্জেন্টিনার সাবেক প্রেসিডেন্ট ফার্নান্দো ডে লা রুয়ার ছেলে অ্যান্টোনিওর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর স্প্যানিশ ফুটবল তারকা জেরার্ড পিকেকে নতুন সঙ্গী হিসেবে বেছে নেন।  এ পপ তারকা প্রেমিক ফুটবল তারকা পিকের সঙ্গে লিভ টুগেদার করেন। এমন অবস্থায় বিয়ের আগেই ছেলে সন্তান নেন।

অমৃতা

বিয়ের আগেই অভিনেত্রী অমৃতা অরোরা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। বিয়ের কয়েকমাস পরেই সন্তানের জন্ম দেন তিনি। অমৃতা হয়তো বিয়ের আগে থেকেই গর্ভবতী ছিলেন।

সেলিনা জেটলি

বলিউড অভিনেত্রী সেলিনা জেটলি দুবাইয়ের হোটেল ব্যবসায়ী পিটার হাগের সঙ্গে বেশ কয়েকবছর প্রেম করেছিলেন। সেলিনার সঙ্গে পিটার হাগের বিয়ে হয় ২০১১ সালের জুলাইয়ে। একই বছরের মার্চে যমজ সন্তানের মা হন অমৃতা। বিয়ের আগেই গর্ভবতী ছিলেন তিনি।

শ্রেয়া

সিঙ্গেল মাদার হয়েছেন অভিনেত্রী শ্রেয়া পান্ডে। ২০১৭ এর ডিসেম্বর মাসে অবিবাহিত শ্রেয়া সারোগেসির মাধ্যমে মা হওয়ার ইচ্ছের কথা প্রথম শেয়ার করেন বাবা সাধন পাণ্ডের সঙ্গে। বাবা মেয়ের সিদ্ধান্তে পূর্ণ সম্মতি দেন। সেই সিদ্ধান্তের ফল হল শ্রেয়ার মেয়ে ‘আদর’। সারোগেসির মাধ্যমে মা হয়েছেন শ্রেয়া।নাতনিকে দেখার পর শ্রেয়ার বাবা-মা দু’জনেই খুব খুশি হয়েছিলেন।

মাহি গিল

বলিউড অভিনেত্রী মাহি গিল লিভ-ইন সম্পর্কে রয়েছেন । তার আড়াই বছরের কন্যা সন্তান ভেরোনিকা। তাঁর বয়ফ্রেন্ড আছে। তিনি মেয়েকে নিয়ে মুম্বাইয়ে থাকেন। আর তার প্রেমিক থাকেন গোয়াতে। মাঝেমধ্যে মেয়েকে নিয়ে গোয়াতে যান তিনি। বিয়ে না করেও পরিবার-সন্তান সবই পাওয়া যায়। তাই আলাদা করে বিয়ের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে করেন না তিনি।

সন্তান নিয়ে থাকা মায়েরা

ববিতা

চলচ্চিত্রের এক সময়ের জনপ্রিয় নায়িকা ববিতা। তার ছেলে অনিক ইসলামের বয়স যখন মাত্র তিন বছর (ঘটনা ১৯৯৩ সালের ১০ জানুয়ারি) তখনই তার স্বামী ইফতেখারুল আলম মারা যান। এরপর থেকে ববিতা তার একমাত্র ছেলে অনিককে নিয়েই আছেন।স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে অনিককে মানুষ করাই ছিল তার একমাত্র কাজ। একদিকে অভিনয়, অন্যদিকে সংসার-সন্তান সামলানো এসব তিনি করেছেন।

জাকিয়া বারী মম

জনপ্রিয় নাট্য নির্মাতা এজাজ মুন্নার সঙ্গে ছিল তার প্রথম সংসার। সে ঘরে এসেছে মম’র ছেলে উদ্ভাস। স্বামীকে ছেড়ে আলাদা হয়ে গেলেও মম আজো আগলে রেখেছেন সন্তানকে। মম বলেন, আমার বাচ্চাটা আহ্লাদের কৌটা হয়েছে। খুব বুঝদার। আমি শুটিংয়ে থাকলেও ওর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করি। আর ছুটির দিন হলে তো কথাই নেই। ছেলেকে নিয়েই থাকি সারাক্ষণ। ওর ভবিষ্যতের জন্যই এখন আমিই যথেষ্ট। আমি ছাড়া’তো ওর দেখভালের আর কেউ নেই। ওকে আমি মানুষের মতো মানুষ করতে চাই।

আজমেরী হক বাঁধন

২০১০ সালে বিয়ে করেছিলেন এই লাক্স সুন্দরী। বিয়ের চার বছরের মাথায় স্বামীর ঘর ছেড়ে বাবার বাসায় ওঠেন। এখন তার মেয়ে মিশেল আমানী সায়রাকে নিয়েই তার পৃথিবী। মেয়েকে নিয়ে বাঁধন বলেন, আমিই ওর বাবা আর আমিই ওর মা। আমার পরিচয়েই ও বড় হবে। ও যখন ছোট ছিলো তখন আমি অভিনয়ই ছেড়ে দিয়েছিলাম। সারাক্ষণ বাসায় মেয়েকে সময় দিতাম। এখন ও অনেকটা বড় হয়েছে। ওকে একটু কম সময় দিলেও হয়। ও এখন আমার গার্জিয়ান বলা চলে। আমার মন খারাপ হলে গলা ধরে এসে আমাকে বুঝায়।

সোহানা সাবা

নির্মাত মুরাদ পারভেজের সঙ্গে জনপ্রিয় এই অভিনেত্রীর প্রেম এবং বিয়ে। ছেলে স্বরবর্ণের জন্মের ১৭ মাস পরেই তারা আলাদা হয়ে যান। এখন ছেলে মায়ের সঙ্গেই থাকেন। সাবার সন্তান পালনের ক্ষেত্রে তার মায়ের অবদানই বেশ। যখন শুটিং কাজে ব্যস্ত থাকেন তখন নানীর সঙ্গে সময় পার করে স্বরবর্ণ।

সারিকা

২০১৬ এর নভেম্বরেই স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয় জনপ্রিয় মডেল সারিকার। ২০১৪ সালের আগস্টে ব্যবসায়ী মাহিম করিমের সঙ্গে বিয়ে সেরেছিলেন সারিকা। বিয়ের এক বছরের মাথায় সারিকার কোলে আসে এক কন্যাসন্তান। মেয়ের নাম রেখেছেন শাহরিশ আন্নাহ। ডিভোর্সের পর সন্তানকে নিয়েই তার পৃথিবী সাজিয়েছেন সারিকা। অভিনয়ে নিয়মিত না হলেও সন্তানকে যথেষ্ট সময় দেন সারিকা।

সালমা

সাত বছরের সংসারের ইতি টানেন ক্লোজ আপ তারকা সালমা। মেয়ে স্নেহাকে নিয়ে নিজের পরিবারের সঙ্গে মোহাম্মদপুরে আছেন। এভাবেই বাকি জীবনটা কাটতে চান। তিনি বলেন, আমি আমার মেয়েকে একাও মানুষ করতে পারবো। কারণ ডিভোর্সের পর আমি আরো গোছালো হয়েছি। এখন প্রতিটা কাজ বুঝে শুনে করি। আর এখন গান করতে আমার সমস্যা হয় না। তেমনি সন্তান লালন-পালন করতেও বেগ পেতে হয় না। পাশাপাশি এখন মেয়ের পড়াশুনাও চালিয়ে যাচ্ছি।

শ্রাবস্তী দত্ত তিন্নি

এই মডেল-অভিনেত্রী ২০০৬ সালে প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন অভিনেতা হিল্লোলকে। দীর্ঘ পাঁচ বছর সংসার করার পর ২০১১ সালে তাদের সংসার ভেঙ্গে যায়। ওই সময় তাদের ঘর আলোকিত করে এসেছিলো মেয়ে ওয়ারিশা। তাকে নিয়েই জীবন শুরু করেন তিন্নি। তিনি এখন মেয়েকে নিয়ে প্রবাসী জীবন বেছে নিয়েছেন। কানাডার মন্ট্রিলে অবস্থান করছেন।

ইপসিতা শবনম শ্রাবন্তী

শ্রাবন্তী অসংখ্য বিজ্ঞাপন ও নাটকে অভিনয় করেছেন। বড় মেয়ে রাবিয়াহ আলম ও ছোট মেয়ে আরিশা আলমকে নিয়ে এখন বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রে। ২০১৮ সালের ৭ মে তাকে তালাকের নোটিস পাঠান তার স্বামী মোহাম্মদ খোরশেদ আলম। শ্রাবন্তী দীর্ঘদিন যাবৎ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। সেখানে থাকতেই স্বামীর পাঠানো তালাকের নোটিসের খবর পান।

নোভা ফিরোজ

২০০৫ সালে ‘প্রাণ ডালে’র একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের মাধ্যমে মিডিয়ায় অভিষেক ঘটে নোভার। ভালোবেসে নাট্যনির্মাতা রায়হান খানকে ১১-১১-১১-তে বিয়ে করেন নোভা। ২০১৩ সালের ২৮ জুলাই পুত্র সন্তান রাফাজ রায়হানের মা হন। কিছুদিন সংসার করার পর বিবাহবিচ্ছেদ হয় নোভা-রায়হানের। পারস্পরিক সম্মতিতে নোভা ও রায়হানের বিয়ে বিচ্ছেদ হয়।

সিঙ্গেল ফাদার

অভিষেক

দত্তক নেওয়া বা সারোগেসি এগুলো কোনো কিছুই আর গল্পের মধ্যে আটকে নেই। এখন সিঙ্গেল ফাদার (Single Father of Kolkata) হয়ে কলকাতাতে, ৪২ বছরের অভিষেক পাল সেই নজির রাখলেন। ভাইট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF) এর সাহায্য নিলেন পিতৃত্বের স্বাদ। প্রথম বার সফল হননি। দ্বিতীয় বার ৩২ সপ্তাহে তিনি জানতে পারলেন যমজ সন্তানের বাবা হতে চলেছেন । তার মতে, ধর্ম, বয়স, লিঙ্গ এর কোনোকিছুই সন্তান লাভের জন্য বাধা হতে পারে না।’

আদিত্য তিওয়ারি

২০১৬ সালের ১লা জানুয়ারিতে একটি পুত্রসন্তানকে দত্তক নেন পেশায় ইঞ্জিনিয়ার আদিত্য তিওয়ারি। পুত্র সন্তানটি ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত ছিলো। তবুও থেমে থাকেনি আদিত্য। প্রায় দেড় বছর ধরে আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৬ সালে নিজের বুকে টেনে নেন ছেলেকে। নাম রাখেন অবনীশ।

করণ জোহর

যমজ সন্তানের বাবা বা ‘সিঙ্গেল ফাদার’ হয়েছিলেন বলিউডের পরিচালক ও প্রযোজক করণ জোহর। বিয়ে না করেই সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান সুখ লাভ করেছেন তিনি। দুই সন্তানের মধ্যে একজন ছেলে ও অন্যটি মেয়ে সন্তান। ইয়াশ ও রুহির জন্ম ২০১৭ সালে।

 তুষার কাপুর

বিয়ে না করেই জিতেন্দ্র পুত্র তুষার কাপুর ২০১৬ সালে সারোগেসির মাধ্যমে বাবা হন। শুরু থেকেই এই সিদ্ধান্তে পরিবারকে পাশে পেয়েছেন অভিনেতা। তার পুত্রের নাম লক্ষ্য।

সংকটটা  আসলে কী ও কেন?

একা এগিয়ে চলা বেশ কঠিন

কখনো কখনো সামান্য ভুল বোঝাবুঝির কালো মেঘ এসে ভেঙে দেয় সাজানো সংসার। আবার অনেক সময় দুর্ঘটনায় ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায় একটি পরিবার। যে কারণেই হোক, মানুষকে দুঃসময় কাটিয়ে নতুন করে শুরু করতে হয় পৃথিবীতে বেঁচে থাকার লড়াই। সংসার ভাঙ্গনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্তানের গুরুদায়িত্ব বহন করতে হয় তার মাকে।  একইসাথে সামাজিক ও পারিবারিক চাপ কাটিয়ে একা এগিয়ে চলা বেশ কঠিন। একা বাচ্চার স্কুল , চাকরি , বাজার সবকিছু নিয়ে হিমশিম খেতে হয় প্রতিটি মুহুর্তে।

অনিরাপত্তা ও অসম্মান

সিঙ্গেল মাদারদের আর্থিকভাবে গুরুত্ব দিলেও সামাজিকভাবে তেমন একটি গুরুত্ব দেয় না পাশ্চাত্য সমাজ ব্যবস্থাও। সামাজিকভাবে সহযোগিতা করে না বিধায় একা মা-ই পরিবারের সমস্ত দায়-দায়িত্ব পালন করে থাকে। সমাজের কটুক্তি শুনতে হয়। কোনো পুরুষ মানুষের সাথে কথা বলতে দেখলেই বাজে কমেন্ট করে। সিঙ্গেল মাদারকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া ৮০% পুরুষ সাহায্যের নামে তাদের নোংরা মনমাসিকতার পরিচয় দিয়ে থাকে। একাকীত্বের কারণে, বিভিন্ন মানসিক চাপ এবং কাজের চাপের কারণে স্বস্তি মিলে না। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অনেক জটিলতার সমুখ্খীন হতে হয় বলে বিষন্নতায় ভুগেন।

বাচ্চাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব

সিঙ্গেল মাদারের বাচ্চারা  নানা ধরনের মানসিক সমস্যায় ভূগেন। অন্য পরিবারের মত বাবা মা কে এক সাথে পায় না বলে এবং মায়ের সব দিক সব সময় সামাল দিতে গিয়ে বাচ্চাদের ঠিকমত সময় দিতে না পারায় ভীষণভাবে বিষণতায় ভূগে বাচ্চারা।  শারীরিক অনেক সমস্যায়ও ভূগতে দেখা যায় তাদেরকে। এই বিষন্নতা থেকে এক সময় বাচ্চারা বিভিন্ন খারাপ নেশায় আশক্ত হয়ে পড়ে।

সিঙ্গেল মাদারদের চ্যালেঞ্জ

সমাজ একক মায়ের জন্য সহজ নয়। সামাজিক প্রেক্ষাপটে সিঙ্গেল মাদার বা একক মায়েদের সন্তানকে বড় করে তোলার ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। তারপরও অনেক মা নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এককভাবে তাদের সন্তানকে বড় করে তুলছেন। একক মা একটি পরিচয় সংকট তৈরি করে সন্তানের। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টা একদমই কম। পরিবারের ভেতরেও সিঙ্গেল মা হিসেবে থাকার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়নি। একা মা হিসেবে সামনে এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে সহযোগিতার জায়গাটা সামাজিকভাবে বা পারিবারিকভাবে নেই।

একজন নারী বাবা বা ভাইয়ের অধীনে থাকবে বা তার স্বামীর সাথে থাকবে এটাই নিয়ম বলে স্বীকৃত। সিঙ্গল মাদার মানেই ওয়ার্কিং ওম্যান, এটা মোটামুটি ধরে নেওয়াই যায়। সিঙ্গল মাদারদের লোকে একটু বেশি সাহসী মনে করেন। সিঙ্গল মাদার মানেই যেন স্বাভাবিক ভাবেই সুপারওম্যান। বিধবাদের জন্য যদি বা কিছুটা সহানুভূতি থাকে, ‘সিঙ্গল মাদার’ শুনলেই শুরু হয়ে যায় গুজব। ‘সত্যি একা তো? না কি বাইরে কোনও বিশেষ বন্ধু-টন্ধু আছে।’

কী করেন সফল সিঙ্গেল মায়েরা

ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে একাকিত্ব, সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগ বুঝতে দেয়ায় সে ধীরে ধীরে সহমর্মী হয়ে উঠে। মা আর সন্তানের সম্পর্কে অকারণ কুয়াশা বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয় না। সন্তানকে শুধু শাসন বা শুধুই প্রশ্রয় দেন না। আচরণে একটা ভারসাম্য রাখেন। প্রথম থেকেই চেষ্টা করেন সন্তানের সাথে বন্ধুত্ব তৈরি করার। সন্তানকে স্নেহমমতায় ঘিরে নিরাপদে রাখেন, তবে নির্ভরশীল বা মুখাপেক্ষী করে রাখেন না; ফলে স্বাধীন চিন্তা, মতামত ও সত্সাহস গড়ে ওঠে। পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে সে যেন ভয় না পায়। মায়ের প্রতিটি আচরণের যুক্তি ও উদ্দেশ্য সন্তান বুঝতে পারে এবং সেটাকে সম্মান করে।

ডিভোর্স

সন্তান বৈধ উপায়ে হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রী ভিন্ন হলে তাকে তালাক বা Divorce বলে। এসব সন্তানদের ব্যাপারে সবাইকে উত্তম ব্যাবহার এবং সহযোগীতার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা ধর্মেও রয়েছে।  এসব সন্তানদের জারজ সন্তান বলা হয় না। স্বামীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় আলাদা থাকছেন। সবাই চরিত্রহীনা বা পতিতা না। ডিভোর্সের পর ন্যায্য পাওনা দিতে গড়িমসি করতে দেখা যায় অধিকাংশের ক্ষেত্রে ।

একটা মেয়ে বাচ্চাসহ যখন তার স্বামীকে রেখে যান , সেই স্ত্রী পরিত্যক্তা স্বামী ২/৪ মাস না যেতেই নতুন বৌ নিয়ে আসেন, উপভোগ করতে থাকেন নতুন জীবন আর বাচ্চার ভাগ্যে শুরু হয় দুঃখ দুর্দশা । তবে স্বামী পরিত্যক্তা বা যেই কারণে স্বামী থেকে আলাদা থাকুক না কেন বাচ্চাদের কষ্টের কথা চিন্তা করে একাই জীবন কাটিয়ে দেয়ার কথা চিন্তা করে অনেক ক্ষেত্রে অনেক মেয়েরাই। ডিভোর্সের পরে একাকিত্ত্বের যে ভয়াবহ শূন্যতা, সন্তান সেই শূন্যতা পূরণ করে।

একলা মা ও সমাজ

বাবার নাম ছাড়া শুধু মায়ের নাম দিয়েও পাসপোর্ট হয়, ভাতার কার্ড হয়, ভোটার কার্ড হয়। তবে একক মাতৃত্বের এমন সম্মান আইনের চোখে থাকলেও সমাজ ভালো চোখে দেখে না একলা মাকে। পরিবার থেকে ডিভোর্সি মেয়েটিকে শেখানো হয়, এখুনি আত্মীয়-স্বজনকে ডিভোর্সের কথা না জানাতে। সম্পর্ক চুকে গেলেও তার পরিচয়ে বাঁচতে হয়।একটু জোর গলায় কথা বললে সবাই চুপ করিয়ে দেয়। পাছে পাশের বাড়ির লোক শুনে ফেলে। কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে ডিভোর্সি মেয়েকে না নিয়ে যাওয়াই শ্রেয় মনে করেন অনেকে। সেজেগুজে বাড়ির থেকে বেরোলে পাড়ার মানুষ মন্দ বলবে। বাড়ি থেকে অত সাজগোজ করে বেরোনোর প্রয়োজন নেই বলে থেকে থেকেই মনে করিয়ে দেন বাড়ির লোকজনই।

স্পার্ম ব্যাঙ্ক থেকে স্পার্ম ক্রয়

চলচ্চিত্র পরিচালক অনিন্দিতা সর্বাধিকারী স্পার্ম ব্যাঙ্ক থেকে স্পার্ম কিনে কৃত্রিম উপায়ে তা নিজের গর্ভে স্থাপন করেছেন৷ যথাসময়ে এসেছে আরুষ৷

সারোগেসি বা বিকল্প মাতৃত্ব

সারোগেসি হলো সন্তান জন্মদানের জন্য কোনো নারীর গর্ভ ভাড়া নেওয়া৷ এই প্রক্রিয়ায় কোনো সন্তানহীন দম্পতি অথবা কোনো একক মা বা বাবা সন্তানলাভের জন্য কোনো নারীর গর্ভ ভাড়া নিতে পারেন৷ এক্ষেত্রে ‘সারোগেট মা’ বা যিনি সেই সন্তান ধারণ করছেন, এতে তার সম্মতি থাকতে হবে৷ সন্তানটি প্রসবের পর অবশ্য সারোগেট মা সদ্যজাত সন্তানকে ঐ দম্পতিকে দিতে বাধ্য থাকবেন৷

সারোগেসির মাধ্যমে দ্বিতীয়বার মাতৃত্বের স্বাদ পেয়েছেন শিল্পা শেট্টি। শাহরুখ খান, আমির খানের মতো ‘হ্যাপিলি ম্যারেড’ এবং সন্তানের বাবারা তো রয়েছেন পাশাপাশি করণ জোহর, তুষার কাপুর, একতা কাপুরের মতো ‘হ্যাপিলি সিঙ্গল’ সেলেব সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান সুখ লাভ করেছেন। সারোগেসির মাধ্যমে মা হন সানি লিওন। তার দুই যমজ সন্তান অ্যাশের ও নোয়ার জন্ম নয় ২০১৮-র মার্চ মাসে। শিল্পা শেঠী সারোগেসির সাহায্যে মা হয়েছেন।

সালমান খানের ভাই সোহেল খান ও তার পত্নী সীমা খান দ্বিতীয়বার সন্তানের জন্ম দেন সারোগেসির মাধ্যমে। ২০১১ জন্ম নেয় ইয়োহান খান। কমেডিয়ান-অভিনেতা কৃষ্ণা অভিষেক ও তাঁর পত্নী কাশ্মিরা শাহ যমজ সন্তানের বাবা-মা হন সারোগেসির মাধ্যমে। বিয়ের প্রায় ১৪ বছর পর সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান সুখ লাভ করেন অভিনেতা শ্রেয়াস তালপেড়ে ও তাঁর পত্নী দীপ্তি তালপেড়ে। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে তাঁদের কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। সারোগেসির মাধ্যমে ৪৬ বছর বয়সে যমজ সন্তানের মা হয়েছেন লিসা রায়।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, wikimedia.org

তাহমিনা জামান, শিশু বর্ধন ও পারিবারিক সম্পর্ক, ২০০৯

 

পরিবার.নেট

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *