সম্মানজনক জীবন গড়ায় পরিকল্পিত প্রচেষ্টা

জোনাকীর মত টিকে থাকার চেয়ে সূর্যের মত শক্তিশালী হওয়ার প্রচেষ্টা চালানোতেই সার্থকতা। সিংহের গর্জন দিতে গিয়ে বীরের বেশে যদি মরণকে হাসিমুখে বরণ করতে হয় তাতেও কল্যাণ। কিন্তু মহিষের মত টিকে থাকাতেও মানসিকভাবে তৃপ্ত থাকাটা অযৌক্তিক। কোনোরকম মূল্যহীনভাবে গ্লানি মেখে টিকে থাকার চেয়ে সম্মানের সাথে জীবনাবসান ঘটলে তাও মেনে নেয়া যায়।

মিটিমিটি জ্বলার চাইতে সমূলে বিনষ্ট হওয়াকেই গ্রহণযোগ্য বলছি না তবে সৃষ্টিতেই আনন্দ। আঁধমরা হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াটাও অনেকের কাছে ভীষণ সুখের। যাদের বিশ্বাস অতি দুর্বল, খুব সহজেই অন্য কোনো ব্যক্তি বা ভিন্নরকম ঘটনার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েন তাদের মৌলিকত্ব নেই। নিজস্ব কিছু না থাকলে পরনির্ভরশীল হয়ে মুক্তবুদ্ধির অধিকারী চিন্তাশীল হয়ে গড়ে উঠা যায় না।

স্বকীয়তার বিনির্মাণ না হলে মূল্যায়ন থাকে না। বড় যারা হয় তাদের সিদ্ধান্ত বেশ ভারী হয়। তাই কারা সাহসী , আত্মবিশ্বাসী ও বাঁধা বিপত্তিতেও টিকে থাকার মত সংগ্রামী তা যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন পরিবেশ ও পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে হয়। তার মানে অনাকাক্সিক্ষত কোনো প্রক্রিয়ায় পরিবেশ ঘোলাটে করা নয় বরং পরিবর্তণশীল পরিবেশের সাথে খাঁপ খাইয়ে চলার শক্তি সামর্থ্য বিবেচনা করা দরকার।

চিন্তার মূল্য যেই বুঝে যে চিন্তাশীল। চিন্তার মূল্য খাঁটি স্বর্ণের মূল্য বুঝার মত সবাই বুঝবে ব্যাপারটি এমন নয়। তবে হ্যাঁ মূল্য বুঝলেই যে সবাই মূল্যায়ন করবে এটা আশা করা যায় না । কেননা এটা নির্ভর করবে সম্পূর্ণ মানসিকতার উপর। যার মন-মানসিকতা, রুচিবোধ ও জ্ঞানের গভীরতা যেমন সে অনুযায়ীই সে সবকিছুকে বিচার করে। তাই সম্মানজনক জীবন গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে পরিকল্পিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই এটা সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়। সেক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে,

সদা যৌক্তিকবোধের সরব অস্তিত্ব কাম্য

বিশাল প্রাসাদ নির্মিত হয় যদি দুর্বল খুঁটির উপর তবে তার পরিণতি সহজেই অনুমেয়। সুতরাং প্রাসাদ নির্মাণের পূর্বে খুঁটির ধারণ ক্ষমতা যাচাইয়ের প্রশ্ন আসে, এর খাটিত্ব প্রমাণের প্রসঙ্গ আসে। তেমনি কোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, উদ্যোক্তা, প্রধান নির্বাহী এসব শীর্ষস্থানে অবস্থানকারীদেরকে লক্ষ উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্যে প্রয়োজনীয় যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে।

ধরুন, যদি ঘোষণা হয় যে, স্বর্ণের এ বিশাল মজুত থেকে যে যতটুকু একসাথে বহন করে ২ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে নিয়ে যেতে পারবে ততটুকু তার। এখন কেউ যদি ২০ কেজি ওজনের মালামাল বহন করার ক্ষমতা রাখে সে ৫০কেজি নিতে চাওয়াটাও যুক্তিসঙ্গত হবে না। যার যার শক্তি সামর্থ্য ও ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ীই দায়িত্ব নিতে হবে। ব্যক্তিভেদে, পরিবেশ পরিস্থিতি ও অবস্থাভেদে যৌক্তিকতার ধরণও বিভিন্ন রকমের হতে পারে।

সাময়িক প্রাপ্তির আনন্দ নয়

অদৃশ্য কোনো শক্তি মানুষের, মানব সমাজের কিংবা প্রকৃতির যে ক্ষতি করেছে তার চেয়ে মানুষ নিজেই নিজের অকল্যাণ বয়ে এনেছে প্রচুর। যা কিছু স্বাভাবিক, সাধারণ ছিল তাকে প্রভাবিত করতে গিয়ে, নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অনেক সরলতাকে জটিলতায় রূপান্তরিত করা হয়েছে। বিজয়ের স্বাদ যেন পরাজয়ের তিক্ততাকে ত্বরান্বিত করেছে। যা সাধারণ বাস্তবতা ছিল তা অস্বাভাবিক বাস্তবতাকে হাজির করেছে।

স্বাভাবিক অনেক কিছুই অস্বাভাবিকরূপে বিদ্যমান থাকছে। সরল-সহজভাবে জগৎটাকে আর চেনা যাচ্ছে না। জগতের প্রকৃতরূপের সন্ধান পাওয়া, সত্যিকারের চেহারাটা বুঝাটা দুঃসাধ্য যেন। সাধারণ স্তরের বিদ্যা-বুদ্ধি, জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের পক্ষে জটিল জগৎটাকে বুঝাটা অসম্ভব হয়ে ওঠেছে। নব নব চিন্তা, নতুন নতুন জ্ঞান, উৎকৃষ্ট কাজের ব্যবহারে উৎকৃষ্ট সৃজন চিন্তন প্রক্রিয়ায় জটিলতা বাড়াচ্ছে, বিদ্যমান বাস্তবতাকে পরিবর্তিত রূপ দিচ্ছে সমাজকে পেঁচিয়ে দুর্বোধ্য করে ফেলছে।

ভবিষ্যতকে ভেবে সিদ্ধান্ত নিন

অনেক কিছুই মুখোশে ঢাকা। সাদাচোখে দৃশ্যমান অনেক কিছুই আসল রূপ প্রকাশ করে না। ফলে নানা অবিশ্বাস, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, সংশয়-সন্দেহ জন্ম নেয়। সরলতার মানেই প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া হৃদয়গুলো আজ কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ। মানুষ তার সীমাবদ্ধতাকে ভাবনায় আনেনি দুর্বলতা প্রকাশ পাবে বলে। নব সৃষ্টির আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছে এর প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল কী হবে তা ভাবেনি।

অনেক সৃষ্টির আনন্দ আজ বেদনার মহাসাগর খনন করছে। মেধা, শ্রমের সমন্বয়ে তৈরি হওয়া বাস্তবতা মানবতাকে ধ্বংসের ‘দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে। মানুষ সহজ-সরল পথেই দুঃসহ এক অনাকাক্সিক্ষত বাস্তবতা থেকে মুক্তি পেতে পারে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভবিষ্যত ভাবনা অত্যন্ত জরুরি।

জটিলতা নয় সরলতার মধ্যেই প্রকৃত সুেখর সন্ধান

মানুষ বহুপূর্বেই প্রকৃতিকেই শুধু নিয়ন্ত্রণের সংকীর্ণ চিন্তার গণ্ডি থেকে বের হয়ে এসেছে। এখন স্বল্প কিছু মানুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে মানব সমাজে বৃহত্তর অংশের চিন্তা-ভাবনা, আবেগ-অনুভূতি, আচার-আচরণ-অভ্যাস তথা যাবতীয় কার্যক্রম, মনে হতে পারে/স্বাধীনতা বেড়েছে কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে প্রতিটি ব্যক্তিসত্তাই তার নিজস্ব স্বকীয়তা, স্বতন্ত্রতা নিয়ে বেড়ে উঠতে অক্ষম হয়ে পড়েছে।

অন্যের চিন্তায় চিন্তা করা, অন্যের ভাবনায় ভাবা, অনুকরণ-অনুসরণপ্রিয় মানসিকতা তৈরির জন্য গোটা সুক্ষ্ম পারিবারিক বাস্তবতাকে, বিদ্যমান চারপাশের জন্তুকে এমনভাবে কৌশলে সাজানো হয়েছে যে নিজে যে নিজের মাঝে নেই সেটি অনুধাবণের শক্তিও মৃত্যু ঘটেছে। আমি যে আমিতেই আছি এটা বলতে পারাটা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠেছে। বলাটা যে ঝুঁকিপূর্ণ তাও অস্বীকার করা যায় না।

মানুষ নিজের প্রয়োজনেই পথ বদলায়েছে, পদ্ধতি-প্রক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। মানব সমাজের কর্তৃত্বশীল, আধিপত্যশীল, ক্ষমতাবান মানুষেরা উঁচু থেকে নীচু সকল স্তরের মানুষের কল্যাণ, মঙ্গলের কথা বিবেচনায় না আনার ফলে সেই পন্থা, উদ্ভাবনী কৌশলই তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে এসেছে যে গোটা মানবতা দুশ্চিন্তায় হতাশায় আচ্ছন্ন।

উপযোগী স্তর থেকে অন্য নানা স্তর পার হয়ে সর্বোচ্চ যে স্তরে এসে থেমেছে সেখান থেকে সরে যাবার প্রত্যাশা বিশ্ব মানবতার চোখে মুখে। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত এ পথিকটি যেন নিজেকেই অচেনা মনে করে দূর অজানা আশাঙ্কায় শঙ্কিত ভাবে সময় কাটাচ্ছে। তার বর্তমান অবস্থান তাকে যথেষ্ট শান্তি দিতে ব্যর্থ, জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় দারুণভাবে উদ্বিগ্ন। ফিরে আসতে চায় এক মধ্যম স্তরে।

অত নীচু আর অত উঁচু স্তরের কোনোটাই যে তার জন্য প্রযোজ্য মনে হচ্ছে না, উত্তম ভাবতে পারছে না। বারবার ফিরে তাকাচ্ছে, পেছনে নানাকষ্টের স্তরে। যেখান থেকে অনেক পথ পাড়ি এসেছে। আরো সামনে এগুতে নাকি অতীতের ভুল-ত্র“টি থেকে শিক্ষা নিয়ে পেছনের অপূর্ণাঙ্গতা, অস্বয়ংসম্পূর্ণতা। অসামঞ্জস্যতা দূরীকরণে সচেষ্ট হবে। এগুতে যায়, হোচট খায়, পেছনে ফিরে দেখে, সোনালী অতীত হাতছানি দেয়। এগুবে না পিছুবে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে।

ভাবে যদি এগুতেই হয় পাল্টাব গতি, নয়তো সাড়া দেব পেছনের হাতছানিতে। যেহেতু চলমান গতিপথ কণ্টকাকীর্ণ, বিভ্রান্তিকর। সেহেতু বিশ্বমানবতা শান্তি-পিপাসু, সকল নৃশংসতা-বর্বরতার চিন্তা পাল্টে নতুন গতিতে হাটবে নাকী পেছনে ফিরে যাবে সেটাই ভাবনার জগতকে আচ্ছাদিত করে আছে। আর বাস্তব জগৎ তো চিন্তা-ভাবনার জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাই ভবিষ্যৎ দেখার অপেক্ষায় অপেক্ষমান বিশ্বমানবতা।

অসহায় বঞ্চিতদের পাশে দাড়ানো

কেউ আকাশছোঁয়া অট্টালিকায় বিলাস বহুল জীবন যাপনে আসক্ত, আর কারো পুরো আকাশটাই ছাদ আর জমিনটাই বিশ্রামের জায়গা। সেই নিরাপদ আশ্রয় আর একেবারে নিজের মনের মতো করে সাজানোর মত কিছু। সম্পদ বলতে নিজের দেহটাই, তারপরও দেহটাকে ইচ্ছা-স্বাধীনমতো ব্যবহারের সুযোগ নেই। দুমুঠো খাদ্যের সন্ধানে [থাকে] সেটা কী করুণ আকুতি। নিরস কঠিন সে জীবন। স্বপ্ন-আশা-কল্পনার জগৎটা নেহায়েত অসহায়। নির্মম বাস্তবতার নির্দয়তায় তার অস্তিত্ব যতটুকু বিদ্যমান তাও অন্য কোনো শক্তির প্রভাবে প্রভাবিত।

স্বকীয়তা আর ব্যক্তিসত্তার তীব্র নিরবতা সেখানে পরিলক্ষিত। বিশাল জগতের সংকীর্ণ পরিসরে টিকে থাকা তার অস্তিত্ব। যাদের বেঁচে থাকাটাই নিরন্তন সংগ্রামে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত, নিঃশ্বাসটা যাতে বন্ধ না হয় সে জন্যেই সর্বশক্তি নিয়োগ, সবমিলিয়ে অসহনীয় অস্বাভাবিক জীবযাপন। নশ্বর দেহটাতে প্রাণটাকে কোনোমতে ধরে রাখাটা যে কী কষ্টকর হতে পারে বিকলঙ্গ, অসুস্থ, পঙ্গু অবস্থায় মানুষদের আর্তনাদ আর সাহায্য চাওয়ায় উপস্থাপিত কষ্টতেই তার উজ্জ্বল প্রমাণ।

বেঁচে থাকতে চাওয়াটাই যেন অপরাধ। জীবনে নয় মৃত্যুই হাতছানি দেয়, তা উপেক্ষা করে চলতে হয়। জীবনটা যেন আশীর্বাদ নয় অভিশাপ, উপহার নয় শাস্তি। স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারে না, কষ্ট অনুভূত হয়, সুখ-শান্তি আনন্দ বলতে যে কী বুঝায় তা অপরিচিতই থেকে যাচ্ছে তার থেকে। প্রতিবন্ধী হয়েই জন্ম নেয়া শিশুটির অস্বাভাবিক দেহটা কিসের শাস্তি? জন্মের পর বুঝ শক্তি আমার পরই না ভাল-মন্দ পার্থক্যের যোগ্যতা আসে। সামর্থবান হয়, পাপ পুণ্যের বিচার বিবেচনা শুরু হয়। কিন্তু যৌক্তিক বোধের সব অস্তিত্বের সম্ভাবনা উকি দেয়ার আগেই এক ভয়াবহ শাস্তি পাবার জন্যই যে নতুন প্রাণের আবির্ভাব- সেটার অর্থ কী?

ভোগে নয় ত্যাগেই সুখ

ধরে নিলাম, সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষগুলো দেখে নিজের শক্তি, সামর্থ্য, যোগ্যতার কারনে অহংকারী হবে না। যে অদৃশ্যশক্তি তাকে সুন্দর জীবন দিলেন তার প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ করবে। এদের শিক্ষার জন্যই হয় তো অন্যদের সৃষ্টি তাহলো কারো শিক্ষার জন্য, জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার জন্য অন্য কাউকে যন্ত্রণায় দগ্ধ করার যৌক্তিকতা আছে কীভাবে?

মা-বাবার বিভিন্ন ভুলের কারনে অসর্তকতা অসচেতনতার কারনে জন্মাতে পারে। শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক নানা অস্বাভাবিকতায় ভারা নতুন প্রাণ। মানলাম একের দোষেও যে অন্যকে শাস্তি পেতে হবে এটাও প্রকৃতির নিয়ম। অন্যকে দোষারোপ করে তো আর সংশ্লিষ্ট মানুষটির কল্যাণ হাসিল হবে না। তাই অস্বাভাবিক, প্রতিবন্ধী পঙ্গু মানুষদের পাশে দাঁড়াতে হবে সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষগুলোতেই। এটা তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য, মানবিকতা, মনুষ্যত্বকে কারনে প্রকৃতিগতভাবেই শারীরিক সমস্যায় নিপতিত মানুষগুলোর পাশে সাহায্য-সহযোগিতার উদার মানসিকতা নিয়ে সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষেরা দাঁড়াবে এটাই প্রত্যাশা।

প্রশ্ন আর যুক্তি তোলে অদৃশ্য কোনো শক্তিকে দোষারোপ করে বিশাল-বিশাল যুক্তি আর কঠিন-কঠিন তর্কের উৎপত্তি না ঘটায়ে সমস্যার সমাধানে বাস্তবিক পদক্ষেপেই কল্যাণ হাসিল সম্ভবপর। যে তত্ত্বীয় জ্ঞান মানব সমাজের, সৃষ্টি জগতের কোনো কাজে লাগে না, কল্যাণ হাসিল হয় না, তার চর্চা-গবেষণা নিরর্থক। ফলাফল শূন্য অন্ত:সারহীন ভারি ভারি জ্ঞানভাণ্ডার মাথায় জমিয়ে মাথা ভারি করে কোনো লাভ নেই।

দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমে উজ্জ্বীবিত হোন

২/৪/’০৯ এম এস হলে যে নৃশংসতা ও লুটপাট সংগঠিত হয়েছে ছাত্ররাজনীতির জন্য এটা কলঙ্ক তিলক। সাধারণ নিরীহ ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে থেকে মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে। এর চেয়ে লজ্জাকর, অবমাননাকর, আর কী হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় কী ধরনের মানুষ তৈরি করতে চায়, আর কী ধরনের রুচিবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন মানুষ তৈরি হচ্ছে-ভবিষ্যতের জন্যে যা চরম উদ্বেগের, উৎকণ্ঠার।

মানুষের জন্য, দেশের মাটির কল্যাণে, জাতির উন্নয়নের জন্যেই তো রাজনীতি, মানবসেবর মহৎ নেশায় নিঃস্বার্থভাবে পরের কল্যাণে বিলিয়ে দেয়াইতো ব্রত হওয়ার করা দেশের সেবক রাজনীতিবিদদের। বাড়ী করব, গাড়ী করব, বড়লোক হব, সুন্দরী নরী পাব এসব স্বপ্নপূরণের ক্ষেত্রে রাজনীতি যখন সবচেয়ে কার্যকর, ফলপ্রসূ প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত হয়ে তখন দুঃখের সীমা না হওয়াটাই স্বাভাবিক।

ছাত্ররাজনীতি কী জন্য? কোন্ স্বার্থে? কার স্বার্থে? কেন এটি বন্ধ করা হচ্ছে না?এর পেছনে কারণ কী? আমি যুক্তি খোঁজে পাইনা অস্ত্রনির্ভর, লেজুড়বৃত্তিক, বৃহত্তর রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে ছাত্র সমাজ তথা দেশের সম্ভাবনাময় সোনালী ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ব্যবহারের ইতিবাচক কোন্ দিকের পক্ষে। মনে করি ইতিবাচক কিছু নেই নেতিবাচক সব। ইতিবাচক কিছু তারাই উপস্থাপনা করেন যারা তা থেকে কোনো স্বার্থ হাসিলের ধান্ধায় থাকেন।

ক্যান্টিনে-ডাইনিংয়ে খাওয়া, ক্যাম্পাসের আশেপাশে বাজারের চাঁদা তোলা, বহিরাগতদের হলে রাখা, আর বৈধ ছাত্রদের হলের বাইরে থাকতে বাধ্য করা, টেণ্ডারবাজি, অবৈধ ভর্তি করিয়ে, নানানভাবে অবৈধ অর্থ উপার্জন, এসবই যদি হয় ছাত্ররাজনীতিবিদদের কাজকর্ম তবে আমরা এটি চাই না। মেধানির্ভর ছাত্ররাজনীতি হলে সেটা ভেবে দেখা যেত।

দেশের আপামর মানুষের ট্যাক্সের পয়সায় চলা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া একজন ছাত্র আরেকজন ছাত্রকে সহজেই খুন করতে পারে, হলের একজনকে চড় থাপ্পর মারতে পারে, একই বিভাগের, একই ব্যাচের একজন বন্ধুকে রক্তাক্ত করে উল¬াস করতে পারে কোন্ মানসিকতার সৃষ্টির ফলে। নিজের রুমমেট, হলমেট, ক্লাসমেট অথচ মায়া-মমতা, স্নেহ-শ্রদ্ধা, প্রীতি-ভালবাসা নেই। পারস্পরিক সম্পর্কের নেই সুদূর সেতুবন্ধন। কোন্ লোভে, কোন্ প্রয়োজনে, কার ইশারায়, কার ছত্রছায়ায়-পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রামের সহজ সরল ছেলেটি স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দুর্ধর্ষ ক্যাডার, সকলের আতঙ্ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

চাই মানবিক মূল্যবোধ

বিশ্ববিদ্যালয়ে হিংসা-বিদ্বেষ, পারস্পরিক অবিশ্বাস, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-শঙ্কা, ক্ষোভ-প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ধ্বংসাত্মক নারকীয় তাণ্ডব আমরা চাই না। বিশ্ববিদ্যালয়ে,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হউক, ছাত্ররা পেশীশক্তির জোরে, অস্ত্রের জোরে কেউ মোড়ল সেজে বসে অন্যদেরকে ব্যবহার করুক স্বার্থের প্রয়োজনে এটা আমরা চাই না। প্রচলিত ছাত্ররাজনীতির কোনো দরকার নেই, প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের ভোটে ছাত্রপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারে। যারা ছাত্রদের প্রয়োজনে প্রশাসন কর্তৃপক্ষের সাথে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনা সংগ্রাম করতে পারে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে।

বিভিন্ন সংস্কৃতির সংগঠন সেবামূলক সংগঠন সৃজনশীলতা, মেধা-মননশীলতা-রুচিশীলতা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন ক্লাব থাকতে পারে। যার মাধ্যমে সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটবে। মেধা বুদ্ধিমত্তা বিশে¬ষণী শক্তি বৃদ্ধি পাবে। সুস্থ নেতৃত্ব গড়ে উঠবে, বুদ্ধিবৃত্তিক সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। এসব সৃষ্টিশীল, যৌক্তিক বোধের কল্যাণকর চেতনার প্রসারে ভূমিকা রাখতে সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা চলতে পারে।

সন্দেহবশত: প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত কাউকে মারা, আহত-নিহত করা অর্থনৈতিক স্বার্থ বা নারী লোলুপতা কামুকতার মধ্যে তৃপ্তি খোঁজা-এসব বিভ্রান্তিকর, মঙ্গলজনক, অনাকাক্সিক্ষত প্রত্যাশা পূরণের নানামুখী প্রয়াসের অব্যাহত যাত্রাপথে ইচ্ছাকৃত বা বাধ্য হয়ে কেউ ব্যবহৃত হউক আমরা তা চাই না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই একই পরিবারের মতো মিশে মিশে বসবাসকরুক, জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি চর্চা, সৃজনশীল ঠিকানা ঘটুক, গবেষণা হউক বৃহত্তর প্রয়োজনে। মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত, দেশপ্রেমিক, যোগ্য-দক্ষ-জ্ঞানী মানুষ সৃষ্টির কারখানা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় ভূমিকা রাখবে এটাই প্রত্যাশা করে।

নামে নয় গুণে মানুষ হোন; স্বকীয়তা বজায় রাখুন

একজন সচেতন, বুদ্ধিমান শত্র“র চাইতে অচেতন, বোকা বন্ধুকে বেশি ভয় করি। গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষের অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ কথা, কাজ ও সাধারণ মানুষের চোখে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। আর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠার জন্য গুরুত্বহীন কর্মতৎপরতার সঙ্গ এড়াতে হয়। গুরুত্বহীন কাজকর্মে সময়দান গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যক্তিত্ব গঠনের সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তাই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে গঠনের জন্য নিজেকে মূল্যায়ন করা শিখতে হয়। নিজের আত্মমর্যাদাবোধ ও ব্যক্তিস্বতন্ত্রতাকে গুরুত্ব দিতে হয়। স্বকীয়তার বিনির্মাণ ছাড়া বড় মানুষ হওয়া যায় না। অনুকরণ, অনুসরণের মাধ্যমে স্বকীয় চিন্তা, ব্যক্তিসত্তার বিনির্মাণ ঘটে না।

সে নিজে নিজের ব্যাপারে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে না সে অন্যের কাছে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবেই চিহ্নিত হওয়াটাই যৌক্তিক, অপরের গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে আগে নিজের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হবে। নিজেকে নিজে যোগ্যভাবতে না পারলে, যৌক্তিক চেতনাবোধে উজ্জীবিত সচেতন, বিবেকবান, বুদ্ধিমান, কাক্সিক্ষত বোধ সম্পন্ন মানুষ হিসেবে নিজেকে নিজেই বিশ্বাস করতে না পারলে অন্যের কাছে নিজের ব্যাপারে এরূপ উঁচু ধারণা আশা করাটা বিরাট বোকামী হবে।

আর নিজের প্রতি নিজের আস্থা, বিশ্বাস, দ্বিধা সংশয় মুক্ত পরিচ্ছন্ন ধারণা তখনই তৈরি হবে যখন কর্মও চিন্তায় মানবীয় মূল্যবোধের চর্চা ও লালন থাকবে। সে নিজেকে ছোট ভাবে, তুচ্ছ নগন্য ভাবে, সেই নিজেকে অপমানিত হতে দেয়। যে নিজেকে মর্যাদাহীন মানুষ হিসেবে চিহ্নিত হতে দেয় সে সত্যিই বঞ্চনা, লাঞ্ছনা, অপমান পাবারই উপযুক্ত।

মানুষ অন্যান্য প্রাণীর মতো খেয়ে-প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকলেই তাকে জীবন্ত বলা যাবে না, আত্মসম্মান, আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। মৌল মানবিক চাহিদা পূরনেই মানুষের কর্মপরিসরের সংকীর্ণ অস্তিত্বের প্রতিফলন ঘটে, কিন্তু এতটুকুই শেষ নয়। মানুষ হিসেবে, মানুষ হয়ে, মানুষের মত প্রকৃত মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা অনেক বড় কিছু।

খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা আর যৌনচাহিদা মিটলেই হবে না, মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, মূল্যায়ন, স্বীকৃতি থাকতে হবে। প্রাণ থাকলেই প্রাণী, জীবন থাকলেই জীব হয় কিন্তু মানুষের ঘরে জন্ম নিলে, মানুষের মত দেহ হলেই মানুষ হয় না। দেখতে মানুষের মত শারীরিক গঠন, আকার আকৃতি থাকার পরও রুচিবোধ হতে পারে নিকৃষ্ট পশুর চেয়ে, হিংস্রতা থাকতে পার বাঘ-সিংহের চেয়ে বেশি, কামুকতা থাকতে পারে কুকুরের মতো।

শুধু চোখ, কান, মুখ, দু’পা, দু’হাত থাকলেই দৈহিক গঠন মানুষের রূপে থাকলেই তাকে মানুষ বলে না, মানুষ হওয়া, প্রকৃত মানুষ হওয়া ভেতরের কিছু, আরো অনেক বড় কিছু যেগুলো অস্বীকার করা যায় না। তাই মানুষ প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে পরিচয় দেয়া শুধু নয় আদর্শ মানুষ, প্রকৃত মানুষের গুণাবলী অর্জন করতে হবে। রূপের মানুষ নয় গুণের মানুষ চাই। মানব জাতির সদস্য সংখ্যা বাড়ুক শুধু সেটা নয় প্রকৃত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এ প্রত্যাশা করি।

আমার কাছের মানুষজন, বন্ধু, নিকটের আপনজনেরা সবাই হউক, প্রকৃত মানুষ যাতে তাদের সংস্পর্শ ছোঁয়ায়, পরশের আমারও সঠিক উন্নতি ঘটে, উত্তরোত্তর উন্নয়নের পথে প্রত্যয়, আমি পিছিয়ে না পারি, অবনতি না ঘটে, মানে, গুণে, মূল্য বৃদ্ধি পাবে এমন সহায়ক মানুষজনের কাছাকাছি থাকব সদা এটাই প্রত্যাশা আমার।

অর্জিত জ্ঞানকে প্রয়োগ করুন;সদা সক্রিয় থাকুন

মানুষ ভাললাগার পর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে, নানাবিধ তৎপরতায় অংশগ্রহণ করে নাকি কোনো কর্মাদিতে সম্পৃক্ত হয়ে কাজকর্ম করতে করতে একসময় সেই কাজকে ভালবেসে ফেলে? ভাললাগার কারনে কর্মতৎপর হওয়া নাকি কর্মতৎপর থাকতে থাকতে ভাল লেগে যাওয়া। ভাললাগেনা কিন্তু পরিস্থিতির কারনে বাধ্য হয়ে কঠিন পরিশ্রমে অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনা অহরহ। এখানে ব্যক্তির ইচ্ছার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অসমতা লক্ষণীয়। কাউকে চাপিয়ে দেয়া হল এমন কিছু করতে। বাধ্য হয়ে, স্বতস্ফুর্ততা ছাড়াই সেটি নিরুপায় হয়ে করতে হল। এক সময় হয়তো, অপছন্দনীয় কাজ করতে,নিজের কাজ, পেশা, পারিপার্শ্বিক বাস্তবতাকে মেনে নিল, খাপ খাইয়ে নিল। এখানে কোনো সত্তা, কোনো শক্তিকে আধিপত্যশীল ধরা হবে?

অনেক সময় কাজ করতে করতে তাতে বিরক্তি চলে আসে। আগ্রহ থেকে শুরু হলেও পরবর্তীতে আগ্রহে ভাটা পড়ে। স্বক্রিয়তা থেকে নিস্ক্রিয়তা আসে। উদ্যম কমে গতিশীলতা থেমে নিশ্চল হয়ে পড়ে জীবন। এর পেছনের কারণটা কী? ভাললাগাটা কী সচেতন মনের প্রতিক্রিয়া, নাকি অবচেতন মনের? সময়ের ব্যবধানে ভাললাগার কিছুও মন্দ লাগতে শুরু করে; ঘটে উল্টোটাও। তাই সবসময় ভাললাগার বিষয়গুলো একই রকম থাকে না। ব্যক্তিভেদে রয়েছে এক্ষেত্রে ভিন্নতা। কারো কাছে যেটি অসহনীয় কারো কাছে সেটিই সহনীয়। সুতরাং ভাললাগার ব্যাপারটা সার্বজনীন কিন্তু নয়। একই ব্যক্তিরও এরচেয়ে ভাললাগে এমন কাজও সবচেয়ে মন্দলাগার মতো ব্যাপার হতে পারে।

প্রয়োজনের কারণেই কাজকর্ম, আচরণ না-কি সক্রিয়তা থেকেই কাজ-কর্ম সম্পাদন। প্রত্যেকেরই কোনো না কোনোভাবে বাধ্য হওয়াটা অবধারিত কী না? যে ক্ষুধা লাগবে খেতেই হবে, সুতরাং খাদ্য জোগাতেই হবে, সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে হলে শিক্ষিত হতেই হবে, পড়াশুনা করতেই হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতেই হবে-পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার দাবী পূরণ করতে গিয়ে এগুলো আগ্রহ না থাকলেও, ইচ্ছা, স্বতস্ফুর্ততার অনুপস্থিতি সত্ত্বেও করতে হয়। কিছু জৈবিক প্রয়োজনে, কিছু মানবিক প্রয়োজনে, কিছু সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় সৃষ্ট প্রয়োজনে করতে হয়। তাই শুধুমাত্র মানুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার প্রশ্নই নয় পরিবেশ, চারপাশ, পারিপার্শ্বিকতা বাধ্যবাধকতা আসতে পারে। তাহলে নিজমনের বিরুদ্ধে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করাটা প্রকৃতিগত ব্যাপার, স্বভাবগত কী- না?

শরীর ও মন মিলেই তো মানুষ। অনেক সময় মন যা চায় শরীর তা সায় দেয় না। শরীর চায় মনের সম্মতি মিলে না, পরস্পরবিরোধী এই অবস্থান কি প্রমাণ করে? মন চায় আরো পড়তে, শরীর বিছানায় শুয়ে ঘুমাতে চায়। কে বিজয়ী হয়, কে শক্তিশালী? ব্যক্তিভেদে সে ক্ষেত্রে ভিন্নতা আছে। কেউ মন চাইলে তার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে পারে, শারীরিক চাহিদাকেই প্রাধান্য দেয়। অর্থাৎ কারো মন দ্বারা শরীর নিয়ন্ত্রিত হয়, কারো শরীর দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয় মন। যার মন শরীরের চেয়ে শক্তিশালী আমার ধারণা সেই শ্রেষ্ঠ। যাহোক, বাধ্যবাধকতার অনুশীলন ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত দুটোই হতে পারে কী? যেমন চেয়ারম্যানকে অপছন্দ করলেও সাক্ষাতে সালাম দিতে হয়। তিনি শক্তি প্রয়োগ করে সালাম দিতে বাধ্য করেন নি ঠিকই তবু ঘৃণা হয় এমন ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে সম্মান দেখানোর পেছনের কারণটা কী? তাহলে প্রকাশ্য আচরণে মনের সত্যিকার অবস্থান ফুটে নাও উঠতে পারে। আচরণকে শুধু মন-শরীর দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না। আরো কোনো শক্তি রয়েছে, সেই শক্তিটা কী? প্রয়োজন রয়েছে গভীর ভাবনার।

বাধ্যবাধকতার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? কেনইবা প্রয়োজন মনে করা হয়? যৌক্তিক বাধ্যতা, অযৌক্তিক, বাধ্যতা, স্বেচ্ছায় বাধ্যবাধকতা জোরপূর্বক বাধ্যবাধকতা এগুলোকে কীভাবে দেখা হবে? কেউ যখন পরাধীন থাকা, অন্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকার মধ্যেই প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছে, তৃপ্ত থাকতে চেয়েছে তখন তাকে কে মুক্তির স্বাদ দিতে পারবে? ব্যক্তির স্বকীয়তা, নিজস্ব ব্যক্তিসত্তার সক্রিয় চেতনা তাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায় একজন যৌক্তিক মানুষ কারো নিয়ন্ত্রণে না থেকে, অন্যের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে, অন্যকে অনুকরণ-অনুসরণ না করে, কারো বাধ্য না হয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে কী-না? আদৌ এটি সম্ভবপর-নাকি সম্ভবপর নয়? মানুষ যদি সকল শক্তির যে নিয়ন্ত্রণ বলয় তার বাইরে চলে আসতে পারে তাহলে পৃথিবী কী আরো মুক্ত স্বাধীন মানুষের শান্তি-সুখের নিশ্চয়তা বিধান করবে, নামিক অরাজকতা-বিশৃঙ্খলার বাড়বে? আমার মন যে দ্বিতীয়টাই হবে।

‘কাজ’ এর ব্যাপারে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। মোবাইলে সারারাত প্রেমিকার সাথে কথা বলাটাকে প্রেমিক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করতে পারে, কেউবা এটাকে বাজে কাজ, অর্থহীন ও অনর্থক সময় অপচয় বলে মন্তব্য করতে পারে। কোনো কাজটি ভাল কিংবা বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটি বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে বিবেচনা করছে। কেন একটি কাজ একজনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ আরেকজনের কাছে গুরুত্বহীন মনে হচ্ছে। কারণ দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাধারা, রুচিবোধ পার্থক্য। দু’জনের জ্ঞান একই রকম নয়। আবার প্রয়োজনীয়তা কী সবার একই রকমের? মোটেই না। কিন্তু ভিন্নতা কেন? কারো প্রত্যাশা-মান-আশার সীমান বিস্তৃত কাকে সংকীর্ণ-এর পেছনে কী কারণ লুকায়িত? আর ব্যক্তিভেদে বিশ্বাস, চিন্তা, প্রয়োজন ও গুরুত্বের ব্যাপারে ধারণা, দৃষ্টিভঙ্গি, ইচ্ছা-স্বাধীনতার প্রসঙ্গে ভাবনাগুলোর যে ভিন্নতা তা তাদের বাস্তব জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে? আর কীভাবেই বা সেটি ঘটছে?

কী কথা ও কী কাজ-এর দ্বারাই মানুষের মূল্যায়ন হয় নাকি কার কথা ও কার কাজ- সেটি বিবেচনা করে কথাও কাজকে মূল্যায়ন করা হয়? আসলে ব্যীক্তই গুরুত্বপূর্ণ নাকি ও কাজ গুরুত্বপূর্ণ। চেয়ারম্যান সাহেব বলেছেন-অবশ্যই অত্যন্ত দামী কথা, আর অমুক কৃষক বলেছেন , গুরুত্ব নেই। অথচ হতেই পারে ঐ কৃষকের কথা ও কাজটা অত্যন্ত মূল্যবান। তাই ব্যক্তিকে সেটি ভেবে কথা ও কাজকে মূল্যায়ন করার চেয়ে কথা ও কাজ দিয়ে ব্যক্তিকে মূল্যায়নের ব্যাপারে আমার আগ্রহ বেশি। এই যে আমরা প্রতিনিয়ত জানছি এই জানাটাই কী কাজ, নাকি কাজের জন্যই জানা। কেউ জানাটাকেও কাজ মনে করে, আবার কেউ একটি কিছু করবে, সেই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য জ্ঞানাহরণ করে। জ্ঞানের প্রয়োগটাকে কাজ মনে করে। আমি শুধু জেনে পণ্ডিত হয়ে মাথা ভারী করে বসে থাকাটাকে পছন্দ করি না বরং জ্ঞান প্রয়োগের মাধ্যমে, বাস্তবে যাবতজীবন-যাপনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক কিছু-তৎপরতা পরিলক্ষিত হবে এটাই কামনা করি। জয় হোক মানুষের, বিশ্বমানবতার, মানুষের জন্য কল্যাণকর এমন জ্ঞানের।

সুঅভ্যাস ও সুন্দর আচরণ

ব্যক্তির আচরণ জিনের উপর নির্ভর করে। আচরণ অভ্যাস কি পরিবর্তনশীল নাকি অপরিবর্তনীয়? পরিবর্তন হলে কেন হয়, কীভাবে হয় আর না হলে কেন হয় না? একই ব্যক্তির আচরণ জায়গা ভেদে ভিন্ন হয় কী-না? ব্যক্তির আচরণকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে সময়ের প্রসঙ্গ কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে? ‘কাম্য-আচরণ’-কার জন্য, কেন কাম্য? কাম্য আচরণের ধারণা কী পরিবর্তনশীল? এক্ষেত্রে কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নাকি সমাজ? ব্যক্তি ও সমাজের প্রত্যাশায় ভিন্নতার যৌক্তিকতা কতটুকু? ব্যক্তির আচরণ কীভাবে তার নিজস্ব অবস্থানের সাথে সম্পৃক্ত? আচরণের ক্ষেত্রে বয়সের ভূমিকা কী? একই পরিবেশে মানুষ ভিন্ন আচরণ করে কেন? পরিবেশ পরিবর্তনে কে ভূমিকা রাখে? কে শক্তিশালী পরিবেশ নাকি ব্যক্তি মানুষ? একসঙ্গে এতগুলো প্রশ্ন। খুব অনায়াসে এগুলোর উত্তর দেয়া সম্ভবপর নয়। আমরা সহজ-সরলভাবে উত্তর খুঁজার প্রয়াস চালাব।

আমরা দেখি একজন ব্যক্তি প্রেমিকার সাথে অত্যন্ত বিনয়ী, নম্র আচরণ করছে, মোলায়েম স্বরে কথা বলছে, অধিনস্তদের সাথে কঠোরভাষায় উদ্ধতস্বরে কথা বলছে। অর্থাৎ ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভিন্নতা ভিন্ন রকমের আচরণকে যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করছে। স্বাভাবিক কারনে পিতা হিসেবে সন্তানের সাথে আচরণ, মালিক হিসেবে শ্রমিকের সাথে আচরণ, স্বামীর হিসেবে স্ত্রীর সাথে আচরণ, বস হিসেবে সহকর্মীদের সাথে আচরণ একই রকম হয় না। ভাষার ব্যবহার, চোখের ব্যবহার, কণ্ঠস্বরের স্কেল একই রকম থাকে না। তাহলে ব্যক্তির আচরণ কি সম্পর্কের ধরণের উপর নির্ভরশীল।

পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষ, সমতল ভূমিতে বসবাসকারী মানুষ, নদী ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষ, সমুদ্র তীরবর্তী এলাকার মানুষের আচরণে ভিন্নতা থাকে। কেউবা সাহসী, কেউবা সহজ-সরল, কেউবা বুদ্ধিমান। আচরণে পরিবেশের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী এটা কী অস্বীকার করা যাবে না?একজন কোটিপতির পরিবারের সদস্য, আর একজন রিক্সাচালক, দিনমজুরের পরিবারের সদস্যদের আচরণে ভিন্নতা আছে। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবস্থার পার্থক্যটা আচরণে প্রভাব ফেলছে। ধনাঢ্য পরিবার বিলাসিতার জন্য যে অর্থ ব্যয় করছে, দারিদ্র্যের কাছে তা বেহুদা খরচ, অপচয় মনে হচ্ছে।

একজন ডক্টরেটধারী ব্যক্তির কাছ থেকে মানুষ যে ধরনের কথাবার্তা আচার-আচরণ আশা করে মেট্রিক পাশ কারো কাছ থেকে সে আশা করে না। বা চিন্তাগত যোগ্যতার ভিন্নতা, জ্ঞানের জগতে অবস্থানগত পার্থক্য আচরণে নানান ধরনে প্রকাশ করছে। সমাজে গ্রহণযোগ্য সৌন্দর্যের ধারণা অনুযায়ী শারীরিক সৌন্দর্যে অপরূপা সুন্দরী একজন নারী আর কালো রংয়ের নারীর আচরণ এক হয় না। উভয়ের সাজগোজ রূপচর্চায় ভিন্নতা থাকে। উপস্থাপনে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। আবার একজন এমপি ও একজন চকিদারের আচরণ এক হয় না।

সবাই সব আচরণ করতে পারে না, অবস্থান ও যোগ্যতার ভেদে আচরণের যৌক্তিক পরিবেশনা বিভিন্ন হয়। ক্ষমতা, কর্তৃত্বের জায়গায় বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন রকম আচরণ সুস্পষ্ট রূপে ফুটে উঠে।তাহলে ব্যক্তির আচরণ কিসের ওপর নির্ভর করে? সম্পর্কের ধরনের ওপর নাকি পরিবেশের ওপর, নাকি অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর, নাকি শিক্ষাগত যোগ্যতার ওপর, নাকি শারীরিক সৌন্দর্যের ওপর, নাকি চর্চার ক্ষেত্রে অবস্থানগত ভিন্নতার ওপর? নাকি এসবগুলোরই ওপর?সুঅভ্যাস ও সুন্দর আচরণ করে এমন ভাল মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, সমাজ সুন্দর-শান্তিময় হবে, প্রত্যাশা এটাই।

একই ব্যক্তির আচরণ জায়গা ভেদে ভিন্ন ও হয়। ঘরে দেখা গেল স্ত্রীর সাথে মিষ্টিমধুর কথা নেই, মানোমালিন্য চলছে অথচ বাইরে সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো অনুষ্ঠানে মন থেকেই হোক আর নাইবা হোক- লোকদেখানোর জন্য হলেও অন্তরঙ্গ আলাপ, হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দেখা যায়। আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব কলহ দাম্পত্য জীবনে থাকলেও প্রচার মাধ্যমে পরিবেশনের জন্যে উপস্থাপনটা বাস্তবতার বিপরীত ও হতে পারে।

দেখা গেল অফিসে বসে কর্তৃত্ব, গম্ভীর চেহারা, কঠিন চরিত্রের লোক বলে পরিচিত অথচ সমুদ্রের কাছে গিয়ে, পাহাড়-পর্বত, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করতে গিয়ে সফর সঙ্গী সহকর্মীদের সাথে বসের বেশ অন্তরঙ্গ আলাপ, খোলামেলা আলাপচারিতা, এই যে আন্তরিকতার প্রকাশ এতে কী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রভাব ফেলেছে? একই ব্যক্তি একই সম্পর্কের মানুষের সাথে জায়গা ভেদে ভিন্ন আচরণ করছে। সকালে মন একটু ফুরফুরে থাকে, দুপুরে কথায় কথায় একটু বেশি রাগ, উত্তেজনা প্রকাশ পায়। এসব কিসের আলামত, বিকেলে মনের অবস্থা একরকম, রাতে আরেক রকম। একজন ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকমের আচরণ করছেন। তার মানে আবহাওয়া পরিবেশ মানসিক জগতকে প্রভাবিত করছে এবং আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করছে?

ব্যক্তি কী আচরণ করছে সেটি কী ব্যক্তির একেবারেই নিজস্ব নাকি বাইরের কোনো ব্যাপার দ্বারা প্রভাবিত। অন্তর্নিহিত ব্যাপার নাকি বাহ্যিক বিষয়গুলো ও বিবেচনায় আসবে। একজন বৃদ্ধের প্রেম আর তরুণের প্রেম একইভাবে বিবেচনায় আনা হয় না। শিশুর আচরণ পূর্ণ বয়স্ক যুবকের কাছে কাম্য নয়। তাহলে বয়সভেদে, ভিন্ন বয়সের মানুষের কাছে কাম্য আচরণ ভিন্ন। একজন শিক্ষকের ছাত্রীর সাথে প্রেম আর ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যকার প্রেম একই চোখে দেখা হয় না। এখানে অবস্থান, সম্পর্ককে বিবেচনায় আনা হচ্ছে, সকল নারীই নারী, সকল পুরুষই পুরুষ এবং সবার আচরণই একইভাবে দেখা হবে-এটা কেউ আশাও করে না।

বয়সভেদে সম্পর্কভেদে একই আচরণের ব্যাপারেও বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়। শিক্ষককে সালাম দেয়া ও চেয়ারম্যানকে সালাম দেয়ার উদ্দেশ্য, অর্থ একই রকম নাও হতে পারে। একই ধরনের আচরণ অথচ এর পেছনে বিভিন্ন রকমের ব্যাখ্যা, কারণ লুক্বায়িত থেকে যায়। ‘কাম্য আচরণের’ কোনো নির্দিষ্ট রূপ নেই। কারো কাছে যা কাম্য, তাই অন্যের কাছে সবচেয়ে বিরক্তিকর আচরণ শুনতে পারে। তাই এর সার্বজনীন রূপ দেয়া যাবে না। ইহা নির্ভর করে নির্দিষ্ট সম্পর্ক, সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ ব্যক্তিদের বিশেষত্বের ওপর, সম্পর্রে ধরণের ওপর।

একজনের ‘কাম্য আচরণ’ আরেকজনের কাছে ‘অগ্রহণযোগ্য’ ‘অযৌক্তিক’ মনে হতেই পারে। তাই যার কাছে যা প্রত্যাশা করা হবে যে তার পূরণ নাও করতে পারে এই বাস্তবতা মেনে নেয়ার মতো উদার মন পারস্পরিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরী। আর ‘কাম্য আচরণে’ ধারনাও পরিবর্তনশীল। একই সমাজে সময়ের সাথে সাথে এর পরিবর্তন হতে পারে, আবার একই সময়েও বিভিন্ন সংস্কৃতিতেও যৌক্তিক আচরণ’ সংক্রান্ত ধারণায় মিল, অমিলও থাকতে পারে। তবে এটি চূড়ান্ত, চিরস্থায়ী নয়। পরিবর্তিত হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো এই যে, ‘কাম্য আচরণ’ ‘ যৌক্তিক আচরণ’ এগুলো ব্যক্তিবিশেষে বিভিন্ন রকম হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট সমাজ সংস্কৃতিতে তার একটি গ্রহণযোগ্য চচা থাকে যা সাধারণেভাবে অধিকাংশই মেনে চলে তবে ব্যতিক্রমও দেখা যায়। এই যে ধারণা গড়ে ওঠে এটির পেছনে মুখ্য ভূমিকা কার- কোন ব্যীক্তর নাকি সমাজের? ব্যক্তি মিলেই তো সমাজ, অনেক ব্যক্তি যে প্রথা, সমাজ, সংস্কৃতি, চর্চার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন তার বিরুদ্ধেই লড়েছেন, সংস্কার করেছেন, পরিবর্তন এনেছেন। অর্থাৎ ব্যক্তিই সমাজ ও সংস্কৃতিকে নিজের মতো করে গড়েছেন, আমূল পরিবর্তন না হলেও নানান সংস্কার করেছেন। আবার দেখা যায়, বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন এলাকার, বিভিন্ন সমাজের বা সংস্কৃতির মানুষজনের মধ্যে কিছু মিল খুঁজে পাওয়া গেলেও নানান ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়।

এলাকাভেদে, ধর্মভেদে, সমাজভেদে, সংস্কৃতিভেদে মানুষের জীবনাচরণে বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। তাহলে অনেক ব্যক্তি তার পারিপার্শ্বিক বিদ্যমান বাস্তব জগৎ দ্বারাই প্রভাবিত হন, নিজের স্বকীয়তা, বিশেষ সত্তার নিজস্বতার প্রভাবে সমাজ-সংস্কৃতিতে ফেলতে পারেন না। যারা বিরাজমান ছাঁচে নিজেকে গঠন করেন তাদের আচরণ আর যারা বিদ্যমান ছাঁচটাকেই পরিবর্তন করেন তাদের আচরণ-এক হবে না। যদিও দ্বিতীয় ধরনের মানুষের সংখ্যা খুবই কম। সমাজ যা ব্যক্তির কাছে আশা করে ব্যক্তি সেই প্রত্যাশা পূরণ করে না, করতে পারে না, করতে চায় না-এমনও হতে পারে, আর ব্যক্তি সমাজের কাছে যা আশা করে সমাজ তা দিতে সক্ষম নাও হতে পারে।

ফলে এই যে আশা-প্রত্যাশা এটা পূরণ হয়, কখনো পূরন হয় না। ব্যক্তি যেমন ‘অযৌক্তিক আচরণ’ করতে পারে গোটা সমাজটাও তেমনি ‘অযৌক্তিক আচরণ’ করতে পারে। তবে পার্থক্যটা হলো ব্যক্তির সমাজের দৃষ্টিতে সমর্থনযোগ্য নয় এমন আচরণের কারণে যে রকম শাস্তি হয় অনায়াসেই সমাজের তা হয় না। তাইতো গ্যালিলিও কে পুড়ে মরতে হয়। অবশ্য যেমন সমাজ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তির চেয়ে শক্তিশালী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়্, সমাজই মুখ্য আর ব্যক্তি গৌণ হয়ে পড়ে ঠিক তেমনি ব্যীক্তও অনেক সময় সমাজ নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হতে পারে। তবে এ ধরনের ব্যক্তির আবির্ভাব বড় বেশি একটা হয় না।

ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করা

আমরা অনেককেই দেখি যারা দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে জীবন সংগ্রামে অনেক পরিশ্রম, ত্যাগ স্বীকার, করে বড় হয়েছেন আবার অনেকে সুখ, শান্তি, ভোগ, বিলাস, আরাম-আয়েশে জীবন কাটিয়ে দুঃখ ডেকে এনেছেন, কেউ ছোট থেকে বড় হবার দিকে এগিয়েছেন, কেউ বড় থেকে ছোট হওয়ার জন্য পিছিয়েছেন। এই যে ভিন্ন ধরনের মানুষ। তাহলে কী বলব পরিবেশ দ্বারা অনেকে নিয়ন্ত্রিত হয়, কেউ পরিবেশকে প্রতিকুল করে ফেলে, কেউ প্রতিকুল পরিবেশ কে অনুকুলে আনে। কেউ পরিবেশকেই নিয়ন্ত্রণ করেন।

তাহলে কখনো দেখা যায় ব্যক্তিই শক্তিশালী, পরিবেশ দুর্বল, আবার কখনোবা পরিবেশ, পারিপার্শ্বিক কেই শক্তিশালী হয়ে উঠতে দেখি। এটা কেন হয়? তাহলে মানুষের যোগ্যতা সমান নয়। সব মানুষই সমান শক্তিধর নয়। নাকি পরিবেশ, প্রকৃতি, বাস্তবতা সবার সাথে সাম্যের আচরণ করেন না, পক্ষপাতিত্বর করেন। ব্যক্তিকে গুরুত্বের ক্ষেত্রে অসম বিচার-বিবেচনা করেন। পরিবেশকে মানুষ পরিবর্তন করে, প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে নাকি প্রকৃতি, পরিবেশ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে।

যে নিয়ন্ত্রিত হয় আর যে নিয়ন্ত্রক তাদের আচরণ এক হয় না। একই ভূমিকাও থাকে না। কখনো মানুষ অসহায়, কখনো প্রকৃতি অসহায়। তাই কে শক্তিশালী, কারণ আচরণ কাকে প্রভাবিত করে? মনে হয় এক পক্ষ আরেক পক্ষকে নয়। বরং উভয়ের পরস্পরকে প্রভাবিত করে। শ্রেষ্ঠত্ব মানুষেরই তবে তার অনেক অযৌক্তিক আচরণই তাকে নিকৃষ্ট রূপে উপস্থাপন করে-এক্ষেত্রে মানুষ যে দায়ী এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই্ তবে কতটুকু দায়ী তা নিয়ে তক-বিতর্ক থাকতেই পারে।

সম্মানজনক জীবন গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে চাই পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। মানুষ পেট সর্বস্ব জীব নয় যে সে খেয়ে পড়ে বেচেঁ থাকলেই হলো । সমাজ , সংস্কৃতি , নীতি নৈতিকতা মেনে সম্মানজনক জীবন যাপনের মাধ্যমেই অর্থপূর্ণ হয় মানব জীবন । মর্যাদাহীন হয়ে সময় কাটানো নরক যন্ত্রণা যেন ।তাই ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত মানব সমাজের প্রতিটি সদস্যকে অর্থপূর্ণ জীবনের সন্ধান দিতে সক্রিয় হতে হবে । প্রতিটি মানুষের মৌল মানবিক অধিকার পূরণ হবে, সুখ শান্তিময় বসুন্ধরায় সবাই সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বেচেঁ থাকবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা ।

 

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.