মুই কী হনু রে!

আজকাল চাটুকার আর ঠকবাজদের দৌরাত্ম্য বেশি! মিথ্যুক বা মিথ্যাবাদীরা সবই পারে, তারাই সবকিছুতে সেরা, এই সমাজের সবচেয়ে যোগ্য মানুষ! এরা কথায় এমন অতি পটু যে কাজের বদলে কথা দিয়েই কার্যসিদ্ধি করতে পারে! মুখে পটপটানি, কাজের প্রয়োজনে কাছে টানা, স্বার্থ ফুরালে কর্মঠ-যোগ্যদেরও হেয় করায় পৈশাচিক আনন্দ পায়!

মুই কি হনুরে ভাবের মানুষের কাছে নিরবে নিবৃত্তে থাকা মানুষের কোনো ঠাঁই নেই। এরা নিজের যোগ্যতায় আত্মপ্রসাদে ভুগতে থাকে। এরা একটু সাফল্যের নাগাল পেলে আর কাউকে সম্মানের চোখে দেখে না। ধরাকে সরা জ্ঞান করে। তাদের কথা কাজে মুই কি হনুরে ভাব কাছের মানুষকেও দূরে ঠেলে।

সৎ পথে কামাই করে লবণ ভাত খাওয়ার চেয়ে অসৎ পথে বিরানি খাওয়ার মধ্যেই এদের সুখ। ক্ষমতার কারণে অপকর্মকেও সুকর্ম বলে চালিয়ে দেন, চারিত্রিক স্খলন বলতে কিছু আছে বলে তারা বিশ্বাসই করেন না। স্বার্থপর মানুষ দেশ-জাতি-সমাজের কল্যাণে কাজ করা মানুষের মাঝে মহত্তর কোনো উদ্দেশ্যও খুঁজে পান না। বিনয়ী গুণটা এদের স্বভাবে অনুপস্থিত। কিছু নব্য ধনীরা বিলাসিতা করেন, নিয়ম ভাঙেন, দাপট দেখান!

কাজ না শিখে, কথা শিখেই অনেকে মুই কি হনুরে ভাব ধরে! বাকপটুরা টাকার ফুটানি দেখান, কিন্তু টাকা কিভাবে বানিয়েছেন তা ভাবেন না! এই ধরণের অহংকার-অহমিকার মানসিকতা সমাজেরই অসুস্থতা! ভালো-মন্দ, সত্যাসত্য, ন্যায়-অন্যায় বাছ-বিচার নেই! দেখবেন প্রবাসী বাংলাদেশীরা কষ্ট করছেন; অথচ স্বজনদের বড্ড দেমাগ, দু হাতে টাকা উড়াচ্ছেন!

মুই কী হনু রে ভাব যে শুধু বড়লোকের রোগ, এমন নয়! চলতে-ফিরতে, চায়ের আড্ডায়, হাটে-বাজারে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষেরই ঔদ্ধত্য দেখবেন! অন্যকে ঝাড়ি না দিরে এদের পেটের ভাত হজম হয় না। কটুকথা-কটুমন্তব্য করতে এদের জুড়ি মেলা ভার! অন্যের ব্যাপারে আপত্তিকর ও অশ্লীল কটূক্তি করেন!

এরা ফুর্তি করার ফুরসত পেলেও অন্যদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ বাড়ান! তাদের কণ্ঠনিঃসৃত বাক্যবাণে অনেকের চোখে অশ্রু ঝরে! অন্যদের রক্ত-ঘাম-অশ্রু এদের জন্য স্বস্তির! তাদের অসম্মানসূচক কথাবার্তা বলা, কদর্য ভাষা, অবিবেচনাপ্রসূত শ্লীলতাবর্জিত বক্তব্য ও অবিমৃশ্যকারিতা অন্যদের চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে!

এদের কাছে সম্পর্ক মানে স্বার্থ! ফলে চারপাশে সবকিছুতেই তারা সুযোগসন্ধানীদের ধান্দাবাজি খুঁজে! নিজের সামান্য ক্ষতি সহ্য না করলেও অন্যদের তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে ফেলে দিতে তারা দারুণ পারদর্শী! তাদের রাখঢাকহীন রূঢ় কথা ও আচরণে অন্যদের মাথা লজ্জায় হেঁট হয়, অথচ অনর্গল অশ্রাব্য বাক্যবাণ বর্ষণ করেও তাদের কিছুই হয় না।

মুই কী হনু রে ভাবওয়ালাদের ক্ষমতা অন্যকে নির্ভরশীল থেকে আরো নির্ভরশীল করায়, তাদের শক্তি অন্যকে শোষিত-বঞ্চিত-অপমানিত-লাঞ্ছিত করায়, তাদের পৌরুষ টিটকারি মারায় আর টিকাটিপ্পনি কাটায়! এই ভাব এসে গেলে আর ভালো-মন্দ হিতাহিত জ্ঞান থাকে না অহংবোধের কারণে। যাকে যা বলার না তাই বলে, যা করার না তাই করে, ক্ষমতার দর্পে ধরাকে করে সরা জ্ঞান।

এরা ক্ষমতা ও অর্থকে স্থায়ী মনে করে। যিল্লতি বা দুর্দশায় নিপতিত হবার আশংকাও করে না। টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত, মান-সম্মান সবই যেন স্থায়ী! আজ যে বাদশাহ কাল সকালে ফকির- একথা তারা যৌক্তিকই মনে করে না। ফলে কুদৃষ্টান্ত স্থাপন করতে করতে তারা বিপথে বেপরোয়া হয়ে পড়ে।

মুই কী হনু রে ভাবধারীরা বেফাঁস কথা বলেন, ভাবমূর্তি সংকটে পড়লেও বিব্রতবোধ করেন না। যার সামান্য যোগ্যতা নেই সে বড় দায়িত্ব পেলে কী অবস্থা দাঁড়ায়! তাঁর ভাবসাব পাল্টে যায়। তিনি ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। কারো কাছে ধরনা দেন না। একে মারেন, ওকে ধরেন।

তারা যাকে খুশি তাকে গালমন্দ করেন। আর নানা অজুহাতে অন্যদের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করেন। অধীনস্তদের ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন। প্রতিদ্বন্দ্বীদের চরিত্র হনন করেন। তাঁর পা আর মাটিতে থাকে না। মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করেন না। মতের অমিল হলে চড় মারেন, একটু এদিক-সেদিক হলে লাথি মারেন।\

কেউ একটু সামলে চলতে বললে ভীষণ বিরক্ত হন, মানুষ খারাপ দৃষ্টিতে দেখবে বলে বুঝালে তাকেই উল্টো বিপদে ফেলেন, গালমন্দ করেন। তিনি কোনো কাজ করেন না, তিনি বোঝেন না, তিনি বকাবাজি করেন- বলে ছলে-বলে-কৌশলে উল্টো ফাঁসান। গরম-তিরিক্ষি মেজাজের এদের সাথে চলার জন্য আত্মসম্মান ও ব্যক্তিত্ববোধ বিসর্জন দিতে হয়!

বুক ফুলিয়ে, বুক চেতিয়ে বড়াই করে কি হনু রে বলে- মেধার লড়াইয়ে জিতলে, ভালো রেজাল্ট করলে, ভালো চাকরি পেলে, ভালো পদ পেলে। এরা নিজস্বতা তৈরির প্রয়োজন মনে করেন না, মুই কী হনু রে ভাব ধরে মাটির দিকে তাকান না। স্ট্রাগলের চেয়ে চালাকি করেই স্টার হয়ে যান। এদের দখল করে থাকায় আগ্রহ যত বেশি, মূল্যায়ণ করায় আগ্রহ ততই কম।

বড় বংশের বলে, গায়ের রঙ ফর্সা বলে, ধনী পরিবারের সন্তান বলে, শ্বশুরবাড়ির ওরা খানদানি ফ্যামিলি বলে- মুই কী হনু রে ভাব দেখালেই মনের কালিমা দূর হয়ে যায় না, আচরণ থেকে ছোটলোকি যায় না! আবার অনেকে এমন ভাব যেন- নবাবদের ওঠাবসা ছিলো! কম জানলেও পান্ডিত্য দেখাতে গড়গড় করে বলা শুরু করলে আর থামতেই চান না!

কেউ কেউ তো অধীনস্তদের চাকরের মতোই ভাবেন! পান থেকে চুন খসলেই সামনাসামনি না বললেও পেছনে সর্বনাশ করেন! হাজারো কাজের মধ্যে কোনো একটি কাজ অপছন্দ হলেই তার এক হাত দেখে নেন, উপরে উঠে যেতে চাইলেও নিচে নামায়ে আনতে চেষ্টা করেন! সবার উপরে আমি কিংবা আমার নিচে আছে দশজন- এই ভাবনাটা তাদের মানসিক প্রশান্তি দেয়!

মুই কী হনু রে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যিনি চলেন- তিনি ভাবেন তিনি এমন কিছু হয়ে গেছেন, যাকে দশজন মূল্যায়ন করে কিন্তু তাকে কাউকে মূল্যায়ন করতে হয় না! তার মূল্য এতই বেশি যে তার কাছাকাছি মানে কেউ নাই! সে যে ব্যাপারে কিছুই বুঝে না সে ব্যাপারে বিশেষজ্ঞের কাজ নিয়াও অযাচিত মন্তব্য করে! শুধু ধুরন্ধর, সুযোগসন্ধানীরাই এদের কাছাকাছি যেতে ও থাকতে পারে!

মুই কি হনু রে মানসিকতার লোকদের হজম শক্তির বড়ই অভাব। হঠাৎ ভালো কিছু পেয়ে গেলে নীরবে তা হজম করতে পারেন না। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে হলেও মানুষকে জানান- আমি পেয়েছি, আমি করেছি, আমি বড়, আমি ভালো কর্মী, আমি যোগ্য নেতা, আমি অর্জনে অগ্রসর, আমি তো এই, আমি তো সেই। কখনো অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা, কখনো অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো ভাবখানা!

বড় পদক পেলেই বড় মানুষ হন না, ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়লেই শ্রদ্ধার আসন শক্তিশালী হয় না। হম্বিতম্বি করে, ভয়ভীতি দেখায়ে, শো অফ করে, খেয়ে ফেলব ভাব নিয়ে, অন্যকে সাইজ করে, নিজস্ব বলয় ও বাহিনী তৈরি করে, অন্যের জীবন নষ্ট করে, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে, যার সাথে লাগার দরকার নেই তার সাথেও লেগে, মুখ গম্ভীর করে থেকে- মুই কি হনুরে ভাব নিয়ে থাকাটা ঠিক না।

এতো অহংকার! এতো এতো ইগো! পক্ষের কারো অন্যায় হলেও ন্যায়-অন্যায় বাছবিচার ছাড়া অপরাধীর পক্ষে ঝাপিয়ে পড়ে। অন্য পেশাকে, অন্য দলকে ছোট করাতেই এদের আনন্দ। অন্যদের গুরুদায়িত্ব পালন, অবদানকে খাঁটো করে দেখেন। অন্যের কাজকে নিকৃষ্ট কাজ মনে করা, অন্যকে অসম্মান করা, সম মর্যাদার মনে না হলেই খারাপ ব্যবহার করা অহংকারের আলামত! অহমিকা ঝেড়ে ফেলেই মানুষ হয়ে উঠতে হয়।

মুই কি হনু রে ভাবের মানুষদের দুরভিসন্ধি আর কূটচালে ভালোবাসার মূল্য হারিয়ে যায়। বছরের পর বছর চেনাজানা থাকার পরও আসল চেহারা চিনতে কাছাকাছি যেতে হয়, সময় দিতে হয়। অনেকে বতর্মান পজিশনকে এতটা গর্বের বিষয় হিসেবে ভাবেন যে বন্ধুত্ব স্বীকার করেন না, আত্মীয়-স্বজন হলেও কথাই বলেন না!

এরা অন্যকে প্রকাশ্যে হুমকি দিতে পারেন, দাম্ভিকতা দেখিয়ে অপমান করে পৈশাচিক আনন্দ পান! অযৌক্তিক ভাবে বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে যারা দাম্ভিক হয়; তাদের অপকর্মের দায় অন্যরাও। ক্ষমতার অপব্যবহারকারীর মূল্যায়ন বেশি দিলে সমাজে মানবিক মূল্যবোধ ধ্বংস হয়ে যাবে। অবশ্য তাদের নিতান্তই বালখিল্যতাপূর্ণ ও অসৌজন্যমূলক ব্যাখ্যারও কিছু প্রশংসাকারী জুটে! দুর্বৃত্তের ছলনার অভাব হয় না। কান যাদের দুটোই কাটা, তাদের হিতোপদেশ দিয়ে বা ভদ্রতা সভ্যতার কথা শোনিয়ে কোনো লাভ নেই।

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.