মালিক ও শ্রমিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য

আত্মসর্বস্ব ও ব্যক্তিস্বার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত মালিকদেরও অনেকে লোক দেখানো নামাজ পড়েন, টুপি মাথায় দেন, বড় দাঁড়ি রাখেন, পাঞ্জাবি পড়েন অথচ মিথ্যা বলেন, ওয়াদা রাখেন না, আমানতের খেয়ানত করেন। মানুষের সম্মান ও ইজ্জতের তোয়াক্কা করেন না লোভী ও স্বার্থপর হয়ে থাকেন। যেখানে মালিক আর কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে এক রুক্ষ,শুষ্ক ও কৃত্রিম সম্পর্ক বিদ্যমান সেখানে সবাই নিজ নিজ স্বার্থ উদ্ধার নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এই স্বার্থান্ধতার ফলে মালিক ও অধীনস্তরা দুটি মারমুখী প্রতিদ্বন্দ্বী দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

মালিক পক্ষের অপরের প্রতি সম্মানবোধ এবং মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাবে মালিক ও বেতনভুক্ত অধীনস্তদের মধ্যে এক নিরন্তর দর কষাকষি চলে। পারস্পরিক সৌহার্দপূর্ণ ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে না ওঠায় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্তদের সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক ব্যতিরেকে কোনো প্রতিষ্ঠানের উন্নতি-অগ্রগতি একেবারে অসম্ভব।

ইসলামে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নিরূপিত হয় নৈতিকতা, নিষ্ঠা ও তাক্বওয়ার ভিত্তিতে। কাজেই যে কোন পেশার লোক সম্মানের পাত্র। কেননা সমাজ জীবনে তথা দৈনন্দিন জীবনে আমরা বিভিন্ন পেশার লোকের মুখাপেক্ষী হই। এমনকি অধীনস্থ-মজুর, দাস-দাসী, শিক্ষক, জেলে, তাঁতী ও ব্যবসায়ী প্রত্যেকেরই সমাজ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কাজেই প্রত্যেক পেশাজীবির অধিকারের প্রতি আমাদের সমান যত্নবান হওয়া এবং সমান সম্মান প্রদর্শন করা উচিৎ।

প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব দৈহিক, মানসিক ও কৌশলগত শক্তি আছে। এগুলি কাজে বিনিয়োগ করার নাম শ্রম। শ্রমের বিনিময়ে অর্থ উপার্জনকারী ব্যক্তি অধীনস্থ। শ্রমের দ্বারা মানুষ তার ভাগ্যের দ্বার উন্মোচন করতে সক্ষম হয়। পৃথিবীর সব মহৎ কাজের পিছনে অজস্র মানুষের শ্রম জড়িত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘মানুষ যতটুকু চেষ্টা করবে, ততটুকু সে পাবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) শ্রম দিয়ে জীবিকার্জন করার প্রতি গুরুত্ব প্রদান করে বলেন, ‘কারও জন্য নিজ হাতের উপার্জন অপেক্ষা উত্তম আহার্য বা খাদ্য আর নেই। আল্লাহর নবী দাঊদ (আ.) নিজ হাতের কামাই খেতেন’।

এক নজরে দেখে নিন লুকিয়ে রাখুন
মালিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য

মালিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য

একজন মালিক তার অধীনস্থ অধীনস্থদের প্রতি হবেন সহানুভূতিশীল। তাদের দুঃখ কষ্টে থাকবে মালিকের আন্তরিক সহমর্মিতা। তাদের দুঃখে তিনি দুঃখিত হবেন, তাদের সুখ ও আনন্দে তিনি আনন্দিত হবেন। অধীনস্থের প্রতি যেমন সহানুভূতিশীল হবেন তেমনি অধীনস্থের শ্রমের প্রতিও তিনি মর্যাদা প্রদর্শন করবেন। একজন অধীনস্থ যে কাজই করুক না কেন; সে তো কাজ করে হালাল উপায়ে বেতন নিচ্ছে।

সে তো কোন চুরি, রাহাজানি, ছলচাতুরী, অন্যায় বা দুর্নীতি করে অর্থোপার্জন করছে না। সে তো তার শ্রম দিয়ে হালাল উপায়েই মালীকের নিকট হতে অর্থ উপার্জন করছে। তাই, অধীনস্থ যে ধরনের কাজই করুক না কেন তার শ্রমের মূল্যায়ন করা উচিত। অধীনস্থের অন্যায়, অনিয়ম, অনৈতিক ও শৃঙ্খলা বিবর্জিত কাজের জন্য অবশ্যই মালিককে বিধি মোতাবেক তাকে শাসন করবে। তবে শাসন যেন শোষনের পর্যায়ে না পড়ে।মালিকের কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য নিম্নরুপ-

শ্রমের কার্যসময় ঠিক করে দেয়া

নিয়মানুযায়ী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্ধারিত কার্যসময় কঠোরভাবে অনুসরণ হওয়া উচিৎ। অফিস কার্যসময়ের পরে কাউকে কোনো কাজে বাধ্য করা নীতিবর্জিত। ন্যায়সঙ্গতভাবে কাজের সময় নির্ধারণ করে দিতে হবে। অধীনস্থকে শ্রম অনুপাতে বিশ্রাম দিতে হবে। বিশ্রামহীন কাজ করতে বাধ্য করানো যাবে না। নিরবচ্ছিন্ন কয়েকদিন কাজ করলে ছুটি বা অবসর দিতে হবে।

রাসূলে কারীম (সা.) বলেনঃ “তোমরা সহজপন্থা অবলম্বন কর, কঠোরতা অবলম্বন করবে না”।হযরত ওমরের অভ্যাস ছিল যে, “তিনি প্রত্যেক শনিবার মদীনার আশেপাশে তদারকি করতেন এবং কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত কাজে নিয়োজিত দেখলে তার কাজের বোঝা লাঘব করে দিতেন” (মুয়াত্তা মালিক)।

প্রখ্যাত ইসলামী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আল্-মাওয়ারদী এই প্রসঙ্গে সরকারের দায়িত্ব বর্ণনা করেনঃ “সরকারী সুপারভাইজারের উচিত- যদি কোন পুরুষ অথবা নারী অধীনস্থের প্রতি অন্যায় আচরণ করা হয়, তখন তিনি মালিককে এই ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন এবং তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ নিতে নিষেধ করবেন”।

এসব নির্দেশনার পরও হাজিরা খাতায় অফিস সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত লেখা থাকবে, অফিস এন্ট্রি টাইম অবশ্যই নয়টার মধ্যে থাকবে অতচ ডিপারচার টাইম থাকবে না, রাত নয়-দশটা পর্যন্ত কাজ করাবে এটাতো কোনো যুক্তিসংগত আচরণ হতে পারে না। অফিসে আসতে একটু দেরী হলে হলে নানান মৌখিক কৈফিয়ত তলব বা গালাগাল করা হয়। অপমান থেকে পার্সোনাল ফাইলে লাল দাগ পর্যন্ত লাগে। ইনক্রিমেন্ট বন্ধ ও বেতন কর্তন হয়। শেষে চাকুরিচ্যুতির চিঠিও ধরিয়ে দেয়া হয়। পর-পর তিন দিন বিলম্ব হলে একদিনের বেতন কর্তন করা হয়।

অফিসে উপস্থিতি সম্পর্কে যেমন কড়াকড়ি আছে তেমন ঘোষিত কার্যসময়ের পরও কোনো কর্মী অফিস ত্যাগ করতে পারেন না। রাত নয়-দশটা পর্যন্ত অফিস চলে। কেউ রাত আটটায় যেতে চাইলে তাকে মালিকের অনুমতি নিতে হয়। অনুমতি নেয়াও এক ঝক্কি। সেখানে নানাবিধ কৈফিয়ত দিতে হয়। সেক্ষেত্রে মৌখিক তিরস্কার সাধারণ মামুলি ব্যাপার। কেউ কোনো কারণে পূর্বানুমতি ব্যতিরীকে অফিসে যেতে না পারলে তিনি তার চাকুরি আছে কি না সে বিষয়ে আশঙ্কায় অস্থির থাকতে বাধ্য হন। কাটাতে হয় দুঃশ্চিন্তার সময়…আসলে চাকুরি আছে কি না? এসব সম্পূর্ণ অমানবিক ও নীতিবর্জিত।

উপযুক্ত মজুরির নিশ্চয়তা বিধান করা

যেকোনো প্রতিষ্ঠানেরই একটি সুসাঞ্জস্যপূর্ণ পদসোপান ও যৌক্তিক বেতনকাঠামো নির্ধারণ হওয়া উচিৎ। পদসোপানের নিচে অবস্থানকারী কর্মীর বেতন-ভাতা অবশ্যই সর্বোচ্চ পদে নিয়োজিত ব্যক্তির বেতন-ভাতার এক তৃতীয়াংশের কম নির্ধারণ করা ন্যায্য নয়। বেকার সমস্যার প্রাবল্য থাকায় বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে উঁচু পদগুলোর ক্ষেত্রে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা একটু ভালো হলেও নিচের পদের লোকদের জন্য তা অনেক অনেক কম।

মালিকরা মেধাসম্পন্ন অধস্থনদের মগজ নিঙড়ে বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞান বের করে নিয়ে নিজেদের কৃতিত্ব বলে চালিয়ে দেন। এসকল অনিয়ম অনেক প্রতিষ্ঠানের কমবেশি একটি সাধারণ কালচার। অধীনস্থদের নানান ওয়ার্কলোড দিয়ে প্রচণ্ডরকম চাপে রাখা হয় যাতে তারা অন্যদিকে মনোযোগ দিতে না পারে। তার কাজ-ধ্যান-জ্ঞান হবে মালিকের প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন করা, যাতে মালিক বড় বড় ‘রসগোল্লা’ খেতে পারেন। এই ওয়ার্কলোড ও কার্যসময়ের অতিরিক্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে কোনোরূপ ওভারটাইম নেই।

একটি কাজ শেষ হতে না হতেই আরও কয়েকটি কাজ কাঁধে ফেলে দেয়া হয়। কোনো জটিল কাজ সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন করা হলেও মালিক কোনো ধন্যবাদ দেন না-কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন না বরং মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়ার জন্য তিরস্কার করা হয়। এর ফলে ওই কর্মী ওভারটাইম দাবি করতে সাহস পান না। কেননা ইউরোপের মতো সকালে চাকুরি ছেড়ে বিকেলে অন্য একটি জোগাড় করা এই সমাজে সম্ভব নয়। শুধুমাত্র বেকারত্ব থেকে মুক্তির জন্য অনেক অনেক তরুণ-তরুণী শত লাঞ্ছনা মুখ বুজে সহ্য করে বদমেজাজী মালিকদের অধীনে কাজ করে চলেছেন। এসব অন্যায় বন্ধ হওয়া দরকার।

উপযুক্ত মজুরির নিশ্চয়তা বিধান করা প্রত্যেক মালিকের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। অধীনস্থকে কেউ বিনা পারিশ্রমিকে খাটাতে পারে না। তাদের শ্রমের পারিতোষিক তাদের দিতেই হবে। তাদের আর্থিক কিংবা দৈহিক ক্ষতিপূরণ করতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে কারো শ্রম প্রতিদানবিহীন বা বিফল-বিনষ্ট হতে পারে না, তা যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:“আমি তোমাদের মধ্যে কোনো কর্মে নিষ্ঠ নর অথবা নারীর কর্মবিফল করি না’। (আল্-ইমরান : ১৯৫)।

সদ্ব্যবহার ও পারফরমেন্সের যথাযথ মূল্যায়ন

মহানবী (সা) আরো বলেছেন, ‘অসদাচরণকারী মালিক বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। অধীনস্থগণ কাজের ক্ষেত্রে কোনোরকম শারীরিক অসুস্থতা, কোনো কারণবশত বিলম্ব ইত্যাদির ব্যাখ্যা বা যুক্তি তুলে ধরতে চাইলে বলা হয় তর্ক-বিতর্ক করছে। কোন কাজ দেয়ার পর তা যত কষ্টেরই হউক এই কাজ আমার দ্বারা হবে না, এমন কথা কেউ বলতে পারেন না। ফলে দেখা যায়, অনেক বেকার বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও ঝাড় দেয়া থেকে শুরু করে মালামাল ওঠানামার কাজ করছে।

প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কোনো পরামর্শ দিলেও যদি তা মালিকের আগে থেকেই নেয়া কোনো একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যায় তবেতো কঠিন পরিস্থিতির তৈরি হয়।মালিকরা অধীনস্থদের মেধা চুরি করে, সব কাজেই তিরস্কার করে, যাতে কোনো কর্মী নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস দেখতে না পায়। ভালো কাজের উপযুক্ত কোনো পুরস্কার দেয়ার ক্ষেত্রে মালিকেরা খুব অনুদার হবার ফলে অধীনস্থরা মানসিকভাবে হীনমন্যতায় ভোগে এবং নতুন কিছু সৃজনের ক্ষেত্রে উৎসাহি থাকে না। তাই দুর্ব্যবহার না করে ও অধীনস্থদের পারফরমেন্সের যথাযথ মূল্যায়ন করাটা মালিকের দায়িত্ব।

চাকরির নিরাপত্তা বিধান করা

যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব ও স্থায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন সেখানে কর্মরতদের চাকুরির নিরাপত্তা নিয়ে কোনোকিছু অতিরিক্ত বলার অপেক্ষা রাখে না। হঠাৎ চাকুরি চলে গেলে যিনি নতুন চাকুরির অন্বেষনে বের হন তার কষ্টটা মারাত্মক। কোনোভাবে ভালো চাকুরির সংস্থান করতে না পেরে একরকম পোড়খাওয়া মানুষ ছোটখাটো প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজের সন্ধানে আসেন। দু-একজন ভিন্নও হতে পারে।

যে সকল ব্যক্তি চাকরি পেলে ভেবে নেন যে, বেঁচে থাকার একটি সংস্থান হলো তাঁরা মূলত মুর্খের স্বর্গে বসবাস করেন। কেননা যতদিন অধীনস্থের দেয়ার আছে কিংবা মালিক যতদিন তার কাছ থেকে কিছু আদায় করে নিতে পারেন তা শুষে নিয়ে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন। একটি ছুতো বের করলেই হলো। অনেক পোড়খাওয়া ব্যক্তি চাকরির দুর্মূল্যের বাজারে কোথাও কাজে যোগ দিয়ে তা টিকিয়ে রাখার জন্য শত অপমান-লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করে মাটি কামড়ে পড়ে থাকেন।

তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মালিক পছন্দ না করলে তাকে অবশ্যই বিদায় হতে হয়। কেননা অনেক পুরোনো কাউকে রেখে তার বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ও বর্ধিত বেতন-ভাতা দেয়ার চেয়ে ওই টাকায় দু-তিনজনকে নিয়োগ দিতে বেশি আগ্রহী থাকেন অনেকে। এতে প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের সংখ্যা বেশি দেখানো যায়। যার কারণে দেখা যায় যে, অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর নতুন নতুন লোকের নিয়োগ এবং পুরোনো লোকের বিদায়। এই প্রবণতা মানবাধিকার নয়, সামাজিকভাবে নানান সমস্যার সৃষ্টি করে চলেছে।

ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে মালিকদের চেহারা ও প্রকৃতি দোকান মালিকের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তবে এ কথাও সত্য যে, সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ঢালাওভাবে শ্রম অধিকার, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যায়ে সম্পৃক্ত নয়। তবে দেশের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাহী পরিষদ আত্মীয় স্বজনে পরিপূর্ণ, কর্মীদের মধ্যে অধিক সংখ্যক তারাই এবং আত্মীয় নন এমন ব্যক্তি তাদের দ্বারা নানাভাবে নিগৃহীত ও শোষণ-বঞ্চনার শিকার। চাকরির নিরাপত্তা বিধান করা ছাড়া ব্যক্তির কাছ থেকে সর্বোচ্চ সাড়া পাওয়া অসম্ভব।

কাজের ধরন সম্পর্কে অবগত করানো

কাজ করে নেয়ার আগে অধীনস্থকে তার কাজের ধরন সম্পর্কে অবগত করাতে হবে। তাকে এক কাজে নিয়োগ করে তার অনুমতি ছাড়া অন্য কাজে লাগানো উচিত নয়। এমনকি তার সম্মতি ব্যতীত যেকোন কাজে নিয়োগ দান সমীচীন নয়। অধীনস্থ দিয়ে এমন ধরনের কাজ করানো আদৌ সঙ্গত হবে না যা তার জন্য অতি কষ্টকর বা সাধ্যাতীত।

সর্বদা মনে রাখতে হবে অধীনস্থ মালিকের হাতের ক্রীড়নক নয়, বরং সে তারই সমমর্যাদার অধিকারী স্বাধীন এক সত্তা। অধীনস্থের পেশা পরিবর্তন বা কর্মস্থল পরিবর্তনে অধিকার থাকবে। এতে কারও হস্তক্ষেপ অর্থই তার স্বাধীন সত্তায় বাধা দানের শামিল। অধীনস্থশ্রেণী উৎপাদনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও মুনাফা লুটে নেয় মালিক শ্রেণী। রাসূলুল্লাহ (সা:) ঘোষণা করেন, ‘অধীনস্থদেরকে তাদের শ্রমার্জিত সম্পদ হতেও অংশ দিও। কারণ আল্লাহর মজুরকে বঞ্চিত করা যায় না’।

স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখা

সমাজের সদস্য হিসাবে অন্যসব মানুষের ন্যায় অধীনস্থেরও মৌলিক অধিকার রয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও বাসস্থানের ক্ষেত্রে। এ অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করা মালিকদের একান্ত কর্তব্য। অধীনস্থের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটবে এমন ধরনের কাজ তাদের নিকট হ’তে গ্রহণ করা অনুচিত। এ সম্পর্কে প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ইবনে হাযম (রহঃ) বলেন, ‘মালিকের জন্য উচিৎ অধীনস্থের নিকট থেকে ততটুকু কাজ নেওয়া, যতটুকু সে সামর্থ্য অনুযায়ী অনায়াসে সুষ্ঠুভাবে করতে পারে। এমন কোন কাজ করতে তাকে বাধ্য করা যাবে না, যার ফলে তার স্বাস্থ্যহানি ঘটে অথবা তার ক্ষতি হয়।

প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা

অধীনস্থদেরকে সুদক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা মালিক পক্ষের কর্তব্য। অনুরূপভাবে সমাজের অন্যান্য লোকের সন্তানের ন্যায় তাদের সন্তানরাও যেন উপযুক্ত শিক্ষা লাভ করে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে সে সুযোগ করে দেওয়াও কর্তব্য।

স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়া

অধীনস্থরা যেন নিদ্রা ও বিশ্রামসহ সুস্থ থেকে মনযোগের সঙ্গে কাজ করতে পারে, সে ব্যবস্থা করার দায়িত্ব মালিকের উপর বর্তায়। মালিকের পক্ষ থেকে এটি এক ধরনের অনুগ্রহ মনে হ’লেও প্রকৃতপক্ষে এটি তাদের প্রাপ্য অধিকার। ওমর (রাঃ) সরকারী কর্মচারীদেরকে নির্দেশ দিতে গিয়ে বলতেন, ‘সবচেয়ে ভাল এবং সৎ সে-ই যার অধীনস্থ মানুষ স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার সাথে থাকে। আর সবচেয়ে খারাপ সেই, যার অধীনস্থরা অভাব ও অশান্তিতে দিন যাপন করে।

ক্ষতিপূরণের নামে শোষণ না করা

শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। যে কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে মুনাফা হবার সাথে সাথে লোকসানের সম্ভাবনা থাকে। অনেক সময় যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল বা মালিকের সম্পদের ক্ষতি সাধিত হতে পারে। এতে অর্থপিপাসু ও আত্মসর্বস্ব মালিকগণ জঘন্য লালসার বশবর্তী হয়ে অধীনস্থগণের কাজ খারাপের অভিযোগ এনে ক্ষতিপূরণের নামে শোষণ করতে তৎপর হয়ে উঠে। এটা যথারীতি অধীনস্থের অধিকার হরণ।

তাদের শ্রমের যতকিঞ্চিত অবমূল্যায়ন করা যেন না হয় সেদিকে মালিকগণের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। ইমাম ইবনে হাযম (রহঃ) বলেন, ‘যাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অধীনস্থ হিসাবে রাখা হয়েছে, তার হাতে যদি ক্ষতি বা কোন কিছু নষ্ট হয়ে যায়, তবে ক্ষতি পূরণের দায়িত্ব অধীনস্থের উপর বর্তায় না। হ্যাঁ, সে যদি ক্ষতি করার ইচ্ছা নিয়ে তা করে তবে অন্য কথা। আর এই ব্যাপারে কোন সাক্ষী না থাকলে মজুরের কথাই গ্রহণযোগ্য হবে কসম সহ’।

পারিশ্রমিক না কমানো

অধীনস্থকে নির্দিষ্ট মজুরীর বিনিময়ে নিয়োগ করার পর, উৎপাদন ঘাটতি হলেও তাদের মতামত ব্যতীত সামান্যতম পারিশ্রমিক কম করা যাবে না। ঘাটতির লোকসান মালিককেই বহন করতে হবে। অধীনস্থের পারিশ্রমিক নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইসলামী অর্থনীতি একটি সুন্দর ও সমাজের কল্যাণকর বিধান নির্ধারণ করেছে। মালিকরা তাদের অধীনস্থের পারিশ্রমিকের হার যতদূর সম্ভব বৃদ্ধি করবে। যাতে করে অধীনস্থরা তাদের জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে কোন সমস্যায় না পড়ে।আর শ্রমের অনুপাতে মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। কেউ অতিরিক্ত বা অতি উত্তম কাজ করলে তার জন্য অতিরিক্ত মজুরি বা পুরস্কার দিতে হবে।

বিপর্যয় সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকা

অধীনস্থগণের চাকরির নিরাপত্তা বিধান করা তাদের অন্যতম অধিকার হিসাবে গণ্য। মালিকগণ ইচ্ছামত অধীনস্থকে চাকরিচ্যুত করবে কিংবা কথায় কথায় চাকরি ছাড়ার নোটিশ দিবে এটা মানবতা বিরোধী। তাই অধীনস্থগণ যাতে নিশ্চিন্ত মনে চাকরি করতে পারে এ ব্যাপারে নিয়োগকারী সংস্থা অভয়বাণী প্রদান করবে।

অপরপক্ষে অধীনস্থগণ অসুবিধার কারণে চাকরি ছাড়তে চাইলে সে সুযোগ তাদের দিতে হবে। এমনিভাবে নিয়োগকারী সংস্থার মারাত্মক অসুবিধা দেখা দিলে সে অধীনস্থের সাথে কৃতচুক্তি বাতিল করতে পারে। এই সকল পরিস্থিতিতে সবকিছু ন্যায়নীতির ভিত্তিতে হচ্ছে কি-না সে দিকে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় সতর্ক দৃষ্টি রাখবে মালিকগণ, যাতে কোন রকমের বিপর্যয় সৃষ্টি না হয়।

দাবী-দাওয়া পেশের সুযোগ দেয়া

অধীনস্থদের অর্থ-উপার্জনের একমাত্র পথ শ্রমের বিনিময় গ্রহণ। মালিকগণ অধীনস্থদের যে অর্থ প্রদান করে থাকে, এতে যদি তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ না হয়, তবে সে স্বীয় প্রয়োজন পূরণার্থে মালিকের নিকট দাবী-দাওয়া পেশ করার অধিকার রাখে। তাদের যথোপযুক্ত দাবী পূরণের কথা উল্লেখ করে মহানবী (ছাঃ) বলেন, ‘অধীনস্থদেরকে যথারীতি খাদ্য ও পোষাক দিতে হবে’।

বৃদ্ধ বা অসুস্থকালীন ভাতা প্রদান

বৃদ্ধ বা অসুস্থকালীন ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা লাভ অধীনস্থগণের সবচেয়ে বড় প্রাণের দাবী। শ্রমই অধীনস্থগণের একমাত্র পুঁজি। অধীনস্থ বৃদ্ধ বা অসুস্থ হয়ে পড়লে তার জীবিকা নির্বাহের কোন পথই থাকে না, যা দিয়ে সে অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থা করবে। সে তখন একেবারে অসহায় দিশেহারা হয়ে পড়ে। খাদ্যের জন্য সে তার যৌবনের উষ্ণ রক্ত ও শক্তি-সামর্থ্য ব্যয় করে আজ সে নিঃস্ব ও রিক্ত অথচ মালিকগণ ভুলেও তার করুণ দৈন্যদশার দিকে ফিরে তাকায় না। তাই বৃদ্ধ, পঙ্গু, অসুস্থ, অসহায় ও দুর্বল লোকদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব মালিকের ওপরও বর্তায়।

অধীনস্থের ভূল ত্রুটি ক্ষমা করা

নবী (সা) এক হাদীসে বলেছেন, ‘মজুর চাকরদের অপরাধ অসংখ্যবার ক্ষমা করা মহত্ত্বের লক্ষণ।’ মালিক পক্ষকে অধীনস্থের মনোভাব, মনের অবস্থা, মনের গতি, তাদের ইচ্ছা-বাসনা ইত্যাদি অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। তাহলেই মালিক অধীনস্থের মাঝে সম্পর্ক ভাল ও সুমধুর হবে। তাদের উভয়ের মাঝে সম্পর্ক যথেষ্ট উন্নত হবে। প্রতিষ্ঠানে কাজ কর্মের জন্য পারস্পরিক ভাল ও সুমধুর পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

মালিককে হতে হবে দয়াবান ও ক্ষমাশীল। অধীনস্থরা ভূল-ভ্রান্তি করতেই পারে। একজন মালিক হিসাবে তা অত্যন্ত ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখে তাকে মার্জনা করবে। মালিক হবে অত্যন্ত সহিঞ্চুশীল। অধীনস্থের প্রতি সহিঞ্চুতাই মালিকের পরম আদর্শ। তিনি হবেন সহনশীল। অধীনস্থদের কাজ-কর্ম, ভূল-ভ্রান্তিতে তিনি হবেন অশেষ সহন ক্ষমতাশালী। ক্ষমাই হবে মালিকের প্রকৃত ও পরম ধর্ম। অধীনস্থের অন্যায় ও অপরাধ তিনি নিজ হাতে ক্ষমা করে দেবেন।

সাহাবীগণ নবীজি (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন কোন খাদেম অপরাধ করলে তার প্রতি কি আচরণ করব; উত্তরে নবীজি (স.) জানালেন, একজন খাদেম দিনে সত্তর বার অপরাধ করলেও তাকে ক্ষমা করে দিও। এ হচেছ অধীনস্থের প্রতি মনিবের মমতাবোধ।

অধীনস্থকে তার সাধ্যানুযায়ী দায়িত্ব অর্পণ

ওভারটাইম পদ্ধতির বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো কর্মীকে অতিরিক্ত কাজের ওয়ার্কলোড দেয়া অমানবিক। মালিক অধীনস্থদের ভরণপোষণের পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করার অজুহাতে কর্মচারীদের উপর স্বকীয় শক্তিবলে অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপিয়ে দিতে পারবে না। আর যদি চাপিয়ে দেয়, তাহলে তাকে সাহায্য করতে হবে। অতিরিক্ত মজুরিও দিতে হবে।

মহানবী (সা) বলেছেন, ‘মজুরদের সাধ্যের অতীত কোন কাজ করতে তাদের বাধ্য করবে না। অগত্যা যদি তা করাতে হয় তবে নিজে সাহায্য কর। ’অধীনস্থের ওপর ততটুকু কাজ বা দায়িত্ব অর্পন করা উচিত যতটুকু সে সম্পন্ন বা বহন করতে পারবে। অধীনস্থ দায়িত্ব বা বোঝা বহন করতে পারবে না এমন কোন দায়িত্ব বা বোঝা তার ওপর অর্পন বা বোঝা চাপিয়ে দেয়া ঠিক হবে না।

অধীনস্থ কাজ করার সময় তার ধারে-কাছে থাকাই ভালো। প্রয়োজনে তার কাজে সাহায্য বা সহযোগীতা করা উচিত। কাজ করতে করতে ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হয়ে গেলে তাকে প্রয়োজনীয় বিশ্রাম করতে দেয়া উচিত। নামাজ বা এবাদতের সময় হলে তাকে তা আদায় করার সুযোগ দেয়া উচিত। রোজার সময়ে রোজাদার অধীনস্থকে হালকা কাজ দেওয়া উচিত; যেন সে রোজা রাখতে পারে।

কাজ শেষেই পারিশ্রমিক প্রদান

মহানবী (সা) বলেছেন, ‘মজুরকে তার গায়ের ঘাম শুকাবার আগেই মজুরি পরিশোধ করে দাও।’ অধীনস্থের মজুরী কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধ করে দেওয়া উচিত। তার শরীরের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তাকে তার পারিশ্রমিক প্রদান করা উচিত। কাজের শেষে বা দিবসের শেষে তাকে মুজুরী প্রদানের মাধ্যমে হাসিমুখে, উত্ফুল্ল চিত্তে অধীনস্থকে বিদায় দেয়া উচিত। যথাসম্ভব ত্বরিৎ মজুরি পরিশোধ করাতে অনেক কল্যাণ নিহিত। মজুরি শোধ করতে অকারণে কিছুমাত্র বিলম্ব করা সঙ্গত নয়। এই ব্যাপারে কোনরূপ ধোঁকা বা প্রতারণার আশ্রয় নেয়া পরিষ্কার জুলুম। অন্য হাদীসে আছে:“ধনীর সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পরের হক আদায় করতে বিলম্ব করা জুলুম ”।

কাজ শুরুর পূর্বে পারিশ্রমিক নির্ধারণ

অধীনস্থের পারিশ্রমিক বা মজুরী তার কাজ শুরু করার পূর্বে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করে নেওয়া উচিত। রাসূলে কারীম বলেন:“যে ব্যক্তি কোনো অধীনস্থকে কাজে নিয়োগ করতে চায়, সে যেন পূর্বেই তার পারিতোষিক নির্ধারণ করে নেয় ”। অর্থাৎ অধীনস্থের বেতন যতক্ষণ পর্যন্ত স্থিরীকৃত না হবে এবং সন্তুষ্ট মনে সে তা গ্রহণ না করবে, ততক্ষণ বলপূর্বক তাকে কাজে নিয়োগ করা যাবে না।

হযরত শোয়াইব (আ.) হযরত মুসা (আ.) কে চাকরির শর্তাবলী শোনানোর পরে একজন মালিক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে এই নিশ্চয়তা প্রদান করেছিলেন: “আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। আল্লাহর মর্জি তুমি আমাকে সদাচারী পাবে” (কাসাসঃ ২৭)। অর্থাৎ যেসব শর্ত স্থিরিকৃত হয়েছে তা আমি যথাযথভাবে অনুসরণ করব। তার চাইতে অধিক শ্রম তোমার কাছে চাইব না এবং যে পারিতোষিক নির্ধারণ করা হয়েছে তার পুরোটাই পরিশোধ করব। এ ব্যাপারে তুমি আমাকে খাঁটি ও সদাচারী পাবে।

কাজের যথাযথ মর্যাদা প্রদান করা

অধীনস্থকে শুধুমাত্র অধীনস্থ মনে না করে তাকে একজন মানুষ হিসাবেও গন্য করা উচিত। আল্লাহর সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব হিসাবে বিবেচনা করা উচিত। অধীনস্থ তার নিজ শ্রম বিনিয়োগ করে কাজ করছে। সেই কাজের প্রতি যথাযথ মর্যাদা প্রদান করা উচিত। হালাল কোনো কাজকেই খাট বা অবজ্ঞতার দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। দেখা যাবে; মালিকের চেয়ে অধীনস্থই তার কাজের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট অধিক নৈকট্য ও সন্তুষ্ট্যি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

হাদিসে আছে, হযরত নো’মান ইবনে বশীর (রা.) কর্তৃক বর্ণিত। তিনি বলেন, নবীজি (স.) বলেছেন, একে অন্যের প্রতি দয়া প্রদর্শনে, প্রেম ভালোবাসায়, মায়া-মমতায় এবং একের সাহায্যে অন্যের ছুটে আসায় সব ঈমানদারকে তুমি একটি দেহের অনুরূপ মনে করবে। দেহের কোন অঙ্গে ব্যথা লাগলে সমস্ত দেহই অনিদ্রা ও জ্বরে তার শরীক হয়ে যায়। সব মানুষের মেধা ও দক্ষতা সমান নয়। এ কারণে সবার উৎপাদন ক্ষমতাও সমান নয়। আবার বিভিন্ন পরিমাণ উৎপাদনের জন্য সমান পারিশ্রমিক প্রদান যুক্তিসঙ্গত নয়। সমান কাজের জন্য সমান পারিশ্রমিক প্রদানের নীতিমালা গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিগ্রাহ্য।

প্রত্যেকের কর্মানুযায়ী তার মর্যাদা নির্ধারিত হয়। কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছেঃ“প্রত্যেকের মর্যাদা তার কর্মানুযায়ী, এটা এ জন্য যে, আল্লাহ প্রত্যেকের কর্মের পূর্ণ প্রতিফল দেবেন এবং তাদের প্রতি অবিচার করা হবে না”- (আহ্ক্বাফঃ১৯)।

অধীনস্থদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা

কর্মক্ষেত্রে অধীনস্থদের অধিকার সম্পর্কে অধিক অজ্ঞতা তাদের প্রতি মালিকদের বৈষম্যের মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দেয়, যা কাম্য নয়। এসবের সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে কর্মসংস্থানের স্বল্পতা, সস্তা শ্রম ও স্বল্প মজুরি। দেশে অধিক বেকারের ফলে মালিকরাও ইচ্ছা করলেই যখন তখন অধীনস্থ ছাঁটাই ও পাইকারি হারে মাত্র তিন থেকে চার হাজার টাকায় অধীনস্থ নিয়োগ করতে পারছেন। অনুরূপভাবে দক্ষ অধীনস্থদের স্বল্পতা ও ঘাটতির কারণেও অধীনস্থরা যখন তখন অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রবণতাও অধিক পরিলক্ষিত হচ্ছে।

মালিক সচেতন থাকলে মজুর নিজেকে খাটো মনে করবে না। মালিকও নিজেকে কোনো দিক দিয়েই শ্রেষ্ঠ মনে করবে না। মূলতঃ পণ্য ও উৎপাদনে মূলধন ও শ্রম দুটোই অপরিহার্য। তাই তারা একে অপরকে সহযোগী মনে করবে। সর্বোপরি একে অপরকে ভাই হিসেবে গ্রহণ করবে। অধীনস্থ-মালিকের মধ্যে চিরদ্বন্দ্ব মিটিয়ে ইসলামের নবী ‘অধীনস্থ-মালিক সম্পর্ককে ভ্রাতৃত্বের বাঁধন পরিয়ে দিয়েছেন। অতএব, তাদের আচরণ হবে ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের সাথে আচরণ।

বাসস্থান ও পোশাক দিয়ে আন্তরিকতা প্রদর্শন

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মজুর-অধীনস্থ ও ভৃত্যদের যথারীতি থাকা ও পোশাক দিতে হবে। অর্থাৎ মজুরির পরিমাণ এরূপ হবে যেন তা কোন দেশ ও যুগের স্বাভাবিক অবস্থা ও চাহিদা অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত হয় এবং উপার্জনকারী তার উপার্জন দ্বারা অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ অন্যান্য চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারে। এক কথায় মালিক তার লালন-পালনের পরিপূর্ণ যিম্মাদার। তিনি আরো বলেছেন, ‘যারা তোমাদের কাজ করছে তারা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন।’-বুখারী।

মহানবী (সা.) অধীনস্থকে আপনজনের সাথে তুলনা করে বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের আপনজন ও আত্মীয়স্বজনদের সাথে যেমন ব্যবহার কর, তাদের সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহার করবে।’

একই কথা মহানবী (সা.) আরেক হাদীসে উল্লেখ করেছেন এভাবে, ‘তোমরা অধীনস্থদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে এবং তাদেরকে কোন রকমের কষ্ট দেবে না। তোমরা কি জান না, তাদেরও তোমাদের মতো একটি হৃদয় আছে। ব্যথা দানে তারা দুঃখিত হয় এবং কষ্টবোধ করে। আরাম ও শান্তি প্রদান করলে সন্তুষ্ট হয়। তোমাদের কী হয়েছে যে, তোমরা তাদের প্রতি আন্তরিকতা প্রদর্শন কর না।’-বুখারী।

অধীনস্থদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার

রাসূল (সাঃ) এর একান্ত খাদেম হযরত আনাস (রা.) বলেন, আমি দশ বছর রাসূল (সা.)-এর খেদমতে ছিলাম। তিনি কখনও উহ্ শব্দ উচ্চারণ করেননি এবং এও বলেননি যে তুমি এটা কেন করলে বা কেন করনি। রাসূল (সা.) তো অধীনস্থের সঙ্গে উত্তম আচরণের নজির দেখিয়ে গেছেনই, তার সাহাবায়ে কেরামও তাদের অধীনস্থদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহারের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।

একদা হযরত ওমর (রা.) আপস চুক্তি সম্পাদনের জন্য যখন বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে রওনা হলেন তখন তিনি এবং তার ভৃত্য পালাক্রমে উটের ওপর সওয়ার হয়ে মদিনা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত দীর্ঘপথ অতিক্রম করেছিলেন। এমনকি বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছার পর সেখানকার লোকেরা বুঝতে পারেনি এ দু’য়ের মধ্যে কে আমীরুল মুমিনীন!

আবু মাসুদ আনসারী বলেন, একদিন আমি আমার কৃতদাসকে মারধর করছিলাম। এমন সময় পেছনের দিক থেকে আওয়াজ এলো হে আবু মাসুদ! জেনে রাখ, আল্লাহ তোমার চেয়ে অধিক শক্তিশালী, আমি মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখি স্বয়ং রাসূল (সা.) আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন। সঙ্গে সঙ্গে নিবেদন করলাম হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমি এ কৃতদাসকে আজাদ (মুক্ত) করে দিলাম। রাসূল (সা.) বললেন, তুমি এরকম না করলে দোজখের আগুন তোমাকে ঝলসে দিত।

অধীনস্থের সম্মান রক্ষা করা

শ্রমগ্রহীতার আরেকটি কর্তব্য হলো, অধীনস্থের সম্মান রক্ষা করা। অতএব তাকে কোনো অবমাননা বা লাঞ্ছনাকর কিংবা দাসসুলভ কাজে খাটানো যাবেনা। ইসলাম এবং ইসলামের মহান ব্যক্তিদের জীবনে এমন অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে যা এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও ব্যক্তিতে সমানাধিকারের মূলনীতিকে সমর্থন করে। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধীনস্থ ও কাজের লোকের সঙ্গে আহার গ্রহণ করতেন। তার কাজের বোঝা লাঘবে সরাসরি সহযোগিতা করতেন। তেমনি অধীনস্থকে প্রহার বা তার ওপর সীমালঙ্ঘনেরও অনুমতি নেই। যদি তাকে প্রহার করে তবে তাকে এ জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

অধীনস্থকে লাভের অংশ দেয়া

রাসূলে কারীম (স.) অধীনস্থকে মজুরিদান করার পরেও তাকে লাভের অংশ দেয়ার জন্যও উপদেশ দিয়েছেন। “কর্মচারীকে তাদের লভ্যাংশ দাও। কেননা, আল্লাহর অধীনস্থদের বঞ্চিত করা যায় না”- (মুসনাদে আহমাদ)।

অন্য একটি হাদীসে রাসূল (স.) বলেনঃ “তোমার ভৃত্য যদি তোমার জন্য রান্না করে এবং তা নিয়ে তোমার কাছে আসে, রান্না করার সময় আগুনের তাপ এবং ধোঁয়া তাকে কষ্ট দিয়েছে, তখন কষ্টকে কিছু লাঘবের জন্য তোমার সঙ্গে বসিয়ে তাকে খাওয়াবে”।যে কষ্ট স্বীকার করে রান্না করে তার যেমন রান্না করা খাদ্যদ্রব্য খাওয়ার অধিকার আছে, তেমনি যে অধীনস্থ টেক্সাইলে কাজ করে, তার শ্রম দিয়ে মালিকের যে মুনাফা হয়, বেতনের বাইরেও তার ওই মুনাফার একটি অংশ ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী তার প্রাপ্য।

ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখা

একজন মালিকের কী ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি থাকা উচিত, সে সম্পর্কে মহান আল্লাহ সূরা : কাসাসে হজরত শোয়াইব ও হজরত মুসা (আ.) এর ঘটনা বর্ণনা করে ব্যাপক অর্থবহ ইঙ্গিত দিয়েছেন। হজরত মুসা (আ.) অনেক দিন পর্যন্ত শোয়াইব (আ.) এর অধীনস্থ হিসেবে কাজ করেছেন। তাকে নিয়োগ করার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আপনার ওপর অহেতুক কষ্টের বোঝা চাপিয়ে দিতে চাই না। আল্লাহর মর্জিতে আপনি আমাকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’

ওই আয়াত থেকে এ কথা সুস্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে, একজন মুসলমান শিল্প মালিকের কাঙ্খিত লক্ষ্য টাকা-পয়সা নয়, বরং তাকে দরদি ও সৎকর্মশীল হতে হবে। তিনি অধীনস্তদেরকে শুধু খাটিয়ে মারবেন না। অথচ যদি কেউ নিজেকে ইসলামপন্থী দাবি করেন আবার ব্যক্তিজীবনে বিলাসী জিন্দেগী যাপন করেন, অপচয় ও অপব্যয় করেন, অঝথা বকা ঝকা করেন, গালিগালাজ করেন, অন্যের প্রাপ্য দিতে গড়িমসি করেন তাকে কি বলা যায়? সে নি:সন্দেহে মুনাফিক ও প্রতারক।

অধীনস্থের প্রতি সহনশীল হওয়া

ইসলাম মালিককে সহনশীল হতে শিক্ষা দেয়। দোষত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে মাফ করে দিতে উৎসাহিত করে। একদিন এক সাহাবি এসে নবী করিম (সা.) কে প্রশ্ন করেন, হুজুর চাকর-খাদিমদের অপরাধ কতবার ক্ষমা করব? নবী করিম (সা.) চুপ করে রইলেন। ওই সাহাবি আবার প্রশ্ন করলে নবী করিম (সা.) ব্যাকুল হয়ে বলে উঠলেন, প্রত্যেক দিন ৭০ বার হলেও ক্ষমা করো।

হজরত আনাস (রা.) বলেন, আমি নবী করিম (সা.) এর সঙ্গে ১০ বছর অতিবাহিত করেছি, তার সেবা করেছি কিন্তু তিনি কোনোদিন আমাকে ভর্ৎসনা করেননি, কোনো দিন বলেননি, এটা এভাবে কেন করেছ? বা ওটা ওইভাবে কেন করনি?

নবী করিম (সা.) আরও বলেন, তোমরা যা পরিধান করবে, যা খাবে তোমাদের চাকরদেরও তা পরিধান করাও এবং তা খাওয়াও। সাহাবায়ে কেরাম যেন এর বিপরীত ভাবতেই পারতেন না। অথচ কেউ যদি নিজেকে ইসলামের ধারক বাহক হিসাবে দাবি করেন, নিজেকে দাঈ ইলাল্লাহ হিসাবে পরিচয় দেন অথচ সর্বত্র বৈষম্য চর্চা করেন, ন্যায্য অধিকার থেকে অপরকে বঞ্চিত করেন, যৌক্তিকতা ও আইন লংঘন করেন-তাকে কি বলা যায়?

একসঙ্গে খেতে ঘৃণা বোধ না করা

হজরত ওমর (রা.) একবার বলেছিলেন, আল্লাহ ওই জাতিকে লানত করুন, যারা নিজেদের চাকরদের নিয়ে একসঙ্গে খেতে ঘৃণা বোধ করে। এ কথা শুনে হজরত সাফওয়ান (রা.) বলে উঠলেন আল্লাহর কসম, আমরা এ ঘৃণাবোধ করি না। অধিকন্তু নিজেদের ওপরও আমরা তাদের প্রাধান্য দিয়ে থাকি। ইসলাম অধীনস্থকে বলে নিজের মালিকের হক আদায়ে সচেষ্ট থাকতে। সে যেন তাতে কোনো প্রকার ফাঁকি না দেয়। অপরদিকে মালিককে সহনশীল, হৃদয়বান এবং সহানুভূতিসম্পন্ন হতে শিক্ষা দেয়।

মালিক নিজের মনের মধ্যে অধীনস্থকে কোনো প্রকার শোষণের অভিপ্রায়ও রাখতে পারবে না। স্বাস্থ্যহানিকর ও তার সাধ্যাতীত কোনো কাজে তাকে নির্দয়ভাবে নিযুক্ত করতে পারবে না বরং সে অধীনস্থের কষ্টকে নিজের কষ্ট বলে মনে করবে। সমব্যথী হয়ে তার কল্যাণ সাধনে সচেষ্ট থাকবে, নিজের আনন্দের ভাগী হবে, তাকে আত্মীয়তার স্নিগ্ধ পরিবেশে রাখবে, যাতে সে কোনো রকমের হৃদ্যতার অভাব অনুভব না করে। সর্বোপরি একজন অধীনস্থকে সে নিজের সহোদরের মর্যাদায় রাখবে, যার চেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আর কিছুই হতে পারে না।

অধীনস্থদের দায়িত্ব ও কর্তব্য

একজন অধীনস্থের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হ’ল- চুক্তি মোতাবেক মালিকের প্রদত্ত কাজ অত্যন্ত নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সাথে সম্পাদন করা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,‘আল্লাহ ঐ অধীনস্থকে ভালবাসেন যে সুন্দরভাবে কার্য সমাধা করে’। অধীনস্থের ব্যাপারে ইসলামের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা হ’ল, ‘কোন ক্ষতি করা চলবে না, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না’।

অধীনস্থ নিজের উপর মালিকের কাজের দায়িত্ব নিয়ে এমন এক নৈতিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয় যে, এ কাজ সে অর্থ উপার্জনের জন্য করে না; বরং এর সাথে পরকালের সফলতা জড়িত বলে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। চুক্তি পূর্ণ করার ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। অধীনস্থের দায়িত্ব চুক্তি মোতাবেক মালিকের প্রদত্ত কাজ অত্যন্ত নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সাথে সম্পাদন করা।

ইরশাদ হচ্ছে, ‘অধীনস্থ হিসাবে সেই ব্যক্তি ভাল, যে শক্তিশালী, বিশ্বস্ত’ । অধীনস্থ দায়িত্ব গ্রহণের পর কাজে অলসতা প্রদর্শন করলে তার মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তাদের জন্য দুর্ভোগ, যারা ওযনে কম দেয়। ওযন নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে এবং দেওয়ার সময় কম করে দেয়। অধীনস্থ তার উপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে আঞ্জাম দিবে এটা তার কর্তব্য। আর এ কর্তব্য সুচারুভাবে পালন করকোন কোন অধীনস্থ মালিকের কাজে ফাঁকি দিয়ে নিয়মিত হাযিরা খাতায় স্বাক্ষর করে বেতন উত্তোলন করে থাকে, যা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এজন্য তাকে ক্বিয়ামতের মাঠে অবশ্যই বিচারের সম্মুখীন হ’তে হবে।

আর যদি অধীনস্থ তার উপর অর্পিত দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করে, তাহ’লে তার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) দ্বিগুণ পুরস্কারের কথা ঘোষণা করে বলেন,‘তিন শ্রেণীর লোকের দ্বিগুণ ছওয়াব প্রদান করা হবে। তাদের মধ্যে এক শ্রেণী হ’ল – ‘ঐ অধীনস্থ যে নিজের মালিকের হক্ব আদায় করে এবং আল্লাহর হক্বও আদায় করে’। রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন, ‘সৎ অধীনস্থের জন্য দু’টি প্রতিদান রয়েছে’। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, ‘যেই সত্তার হাতে আবূ হুরায়রার প্রাণ তার কসম! যদি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ, হজ্জ ও আমার মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহারের ব্যাপারগুলো না থাকত, তাহ’লে আমি অধীনস্থ হিসাবে মৃত্যুবরণ করতে পছন্দ করতাম’।

ধর্মের দৃষ্টিতে মালিক ও অধীনস্থদের আচরণ

ইসলামই সেই ধর্ম প্রথম যে মানবাধিকারের বিধান প্রবর্তন করেছে। যেমন ইসলামের সংবিধান পবিত্র কুরআনে সূরা বানী ইসরাঈলের ৭০ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,‘আর আমি তো আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি এবং আমি তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে দিয়েছি উত্তম রিজিক। আর আমি যা সৃষ্টি করেছি তাদের থেকে অনেকের উপর আমি তাদেরকে অনেক মর্যাদা দিয়েছি।’

এ সুন্দর পৃথিবীর রূপ-লাবণ্যতায় অধীনস্থদের কৃতিত্বই অগ্রগণ্য। কিন্তু সভ্যতার কারিগর এ শ্রেণীটি সর্বদাই উপেক্ষিত, অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত। উদয়াস্ত খেটে যে অধীনস্থ তার মালিকের অর্থযন্ত্রটি সচল রাখে, সেই মালিকেরই অবিচারে অধীনস্থদের অচল জীবনটি আরো দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এটাকে সেই মৌমাছির সাথে তুলনা করা যায়, যারা দীর্ঘ পরিশ্রমের মাধ্যমে মধু সংগ্রহ করে চাকে সঞ্চয় করে, কিন্তু তার ভাগ্যে একফোঁটা মধুও জোটে না।

মালিক কিংবা শ্রমিক সবারই উপার্জনটা হালাল হতে হবে। হালাল জীবিকা উপার্জনের প্রধান উপায় হচ্ছে শ্রম। পার্থিব জীবন যাতে দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত না হয় সেজন্য ইসলাম পরিশ্রম করাকে উৎসাহিত করেছে, একই সাথে এটিকে ইবাদাত হিসেবেও গণ্য করা হয়েছে।

আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আর মানুষের প্রাপ্য শুধু তা, যার জন্য সে চেষ্টা ও শ্রম করেছে। চেষ্টা ও শ্রম অবশ্যই গুরুত্ব পাবে এবং চেষ্টা ও শ্রমকারীকে তার পূর্ণমাত্রার প্রতিফলন অবশ্যই দেয়া হবে।

শ্রমের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানোর তাগিদ দিয়ে আল কুরআনে আরো বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদি আল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা ফরজের পরে ফরজ। (বায়হাকী)

শুধু ইবাদত-বন্দেগী নিয়ে মশগূল না থেকে ছালাত শেষে জীবিকার্জনের জন্য পৃথিবীতে বের হয়ে পড়ার কথা আল্লাহ বলেছেন। তবে ন্যায় নীতির পথে চলতে হবে। নীতিহীন ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা অবশ্যই বন্ধ করা প্রয়োজন। এজন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণসহ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া একান্ত জরুরি। শ্রম আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন হলে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতসসহ সকল ধরনের শোষণ-বঞ্চনা, নিপীড়ন-নির্যাতন, চাকুরিচ্যুতি প্রবণতা বন্ধ হতে বাধ্য।

সাপ্তাহিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ছুটির দিনে অফিসিয়াল কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখার নিয়ম থাকলেও তা অনেক প্রতিষ্ঠান মানেনা। ওই সব দিন কার্যে বাধ্য করা হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও নির্বাহী পরিষদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে অধিক মাত্রায় ড্রপআউট কিংবা চাকুরিচ্যুতির মাত্রা বাড়াটা খুব ভালো লক্ষণ নয়।

নবী করিম (সা.) অধীনস্থ-মালিকের সম্পর্কের ব্যাপারে বলেছেন, যারা তোমাদের কাজ করবে তারা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ এদের তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ, এদের সঙ্গে তোমাদের সম্পর্ক প্রভু-ভৃত্যের নয় বরং এরা আর তোমরা ভাই ভাই। একজন ভাই তার সহোদর থেকে যা কিছু আশা করতে পারে, পেতে পারে তারাও তোমাদের কাছে তাই আশা করতে পারে। তাই তাদের জন্য কষ্টকর হয় এমন কাজের বোঝা তাদের ওপর চাপিয়ে দিও না।

অগত্যা তা যদি করাতেই হয় তবে নিজে তাদের সর্বতোভাবে সাহায্য কর। অথচ ছুটির দিনেও বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করানো, কোন বিনিময় ছাড়া অতিরিক্ত সময় খাটানো এমনকি জরুরী প্রয়োজনেও ছুটি না দেয়ার মত জঘন্য মানসিকতার নীচু প্রকৃতির লোকজন যখন নিজেদেরকে ইসলাম প্রেমিক বলে প্রচার করে তা রীতিমত হাস্যকর হয়ে ওঠে।

ইসলামে মালিক-অধীনস্থ সম্পর্ক হবে পিতা-সন্তানের ন্যায়। নিজের পরম আত্মীয়ের মতোই অধীনস্থের সাথে আন্তরিকতাপূর্ণ আচরণ করা, পরিবারের সদস্যদের মতই তাদের আপ্যায়ন করা, অধীনস্থের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার প্রতিটি মুহূর্তের প্রতি মালিকের খেয়াল রাখা এবং তাদের সুবিধা-অসুবিধার কথা বিবেচনা করা মালিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

ওমর (রাঃ) প্রয়োজন ও দেশের অবস্থার প্রতি দৃষ্টি রেখে বেতন নির্ধারণ করে দিতেন। অনেক সময় অধীনস্থদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মালিকগণ উপযুক্ত মজুরী প্রদান না করে ইচ্ছামত মজুরী দেন এবং অধীনস্থদের প্রবঞ্চিত করেন ও ঠকান। অধীনস্থগণ নীরবে তা সহ্য করে থাকে। এ ধরনের কাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হবে। তার মধ্যে একজন হল যে অধীনস্থের নিকট থেকে পূর্ণ শ্রম গ্রহণ করে, অথচ তার পূর্ণ মজুরী প্রদান করে না। অধীনস্থকে তার প্রাপ্য পূর্ণভাবে যথাসময়ে প্রদান করাও মালিকের একটি প্রধান দায়িত্ব।

উপসংহার

প্রত্যেক নবী-রাসূল পরিশ্রম করে উপার্জন করেছেন। হযরত ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে উল্লেখ আছে, হযরত আদম (আঃ) কৃষিকাজ করতেন, হযরত দাউদ (আঃ) বর্ম তৈরি করতেন, হযরত নূহ (আঃ) কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন, হযরত ইদ্রিস (আঃ) সেলাইয়ের কাজ করতেন এবং হযরত মূসা (আঃ) রাখালের কাজ করতেন।হযরত ইব্রাহীম ও লূত (আ.) কৃষক ছিলেন। হযরত সালিহ (আ.) ছিলেন ব্যবসায়ী এবং হযরত মুসা, শোয়াইব ও মুহাম্মাদ (স.) ছিলেন রাখাল।

মহানবী (সাঃ) নিজে মেষচারণ করেছেন, কাপড় সেলাই করেছেন, ঘর ঝাড়– দিয়েছেন, বালতি দিয়ে কূপ থেকে পানি উঠাতেন, এমকি রান্নার কাজও করতেন। হযরত খাদিজার (রাঃ) সহকারী হিসেবে বাণিজ্য করেছেন। নিজের হাতের উপার্জনকে উত্তম খাদ্যও বলা হয়েছে। রাসূল (সাঃ) বলেছেন- ‘নিজের হাতের শ্রমের উপার্জন দ্বারা খাওয়া হতে উত্তম খাবার আর কেউ কোনদিন খায়নি।’

ইসলাম যেমন শ্রমকে উৎসাহিত করেছে, তেমনি শ্রমের ধারক ও বাহক অধীনস্থকে হেয় প্রতিপন্ন করার অধিকার কাউকে দেয়নি, বরং অধীনস্থদের সম্মানের আসনে সামাসীন করেছে। অধীনস্থের অধিকার ও মর্যাদা নির্ধারণ করে দিয়েছে। রাসূলে কারীম (স.) কে সর্বোত্তম উপার্জন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেনঃ সৎ ব্যবসায়-লব্ধ মুনাফা ও ব্যক্তির নিজ শ্রমের উপার্জন। যে ব্যক্তি নিজের শ্রমের ওপর জীবিকানির্বাহ করে তার চেয়ে উত্তম আহার আর কেউ করে না।

মহানবী (স.) বলেনঃ শ্রমজীবী ও উপার্জনকারী আল্লাহর বন্ধু।ইসলাম এই যে শ্রমনীতি শিক্ষা দিয়েছে তা সার্বজনীন। মালিক-অধীনস্থ উভয়ই যদি ইসলামের শ্রম নীতি মেনে চলেন তাহলে পৃথিবীতে আর বঞ্চিতদের আর্তনাদ শোনা যাবে না, দেখা দেবে না কোন রকম অধীনস্থ অসন্তোষও।

 

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.