মানবিক গুণাবলির বিকাশে পরিবার

আনিসুর রহমান এরশাদ

মানুষের জীবনের সততা, মহানুভবতা, উদারতা, ন্যায়পরায়ণতা, সভ্যতা, সাধুতা, অখণ্ডতা, একত্রতা, পূর্ণতা সর্বোপরি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, চরিত্র, মহত্তর ও আদর্শিক গুণাবলির সংমিশ্রিত আত্মশুদ্ধির ফসল হচ্ছে নৈতিকতা। দুর্নীতি প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও প্রধান অবলম্বন নৈতিকতা অর্জন। নৈতিকতা অর্জন ব্যতিরেকে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও নির্মূল করা কখনো সম্ভব নয়। নৈতিকতা সমস্ত অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্মমতার আঘাত থেকে রক্ষা করার জন্য এক সাহসী ও প্রতিবাদী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।

মানবিক গুণাবলি বিকশিত হওয়ার একমাত্র পথ নৈতিকতা। নৈতিকতা হলো আত্মশুদ্ধি বা আত্মার মুক্তি ও শান্তি, মানুষের জীবন গড়ার মাধ্যম। জাতির সর্বক্ষেত্রে অবক্ষয় রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে নৈতিকতা। সততা ও নৈতিকতার দুর্ভিক্ষ চলছে। মানুষের নীতি-নৈতিকতা, মানবিকতা, দয়া, মায়ার মতো মানবীয় গুণাবলি হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হয়ে আসছে। নৈতিক সংকটের আবর্তে ক্লিষ্ট ভাগ্যাহত মানুষের পৃথিবীও প্রকৃত সুখ-শান্তিময় আবাস হয়ে উঠতে পারে মানবিক গুণাবলি বিকাশের মাধ্যমেই।

মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হোন

দেশপ্রেম, মানবপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হোন; স্বকীয়তা বজায় রাখুন। নিজেকে মূল্যায়ন করা শিখলে আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি হয় ও ব্যক্তিস্বতন্ত্রতাকে গুরুত্ব  দিয়ে স্বকীয়তার বিনির্মাণ করা সম্ভব হয়। যে নিজে নিজের ব্যাপারে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে না সে অন্যের কাছে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবেই চিহ্নিত হয়। অপরের গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে আগে নিজের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হবে।

নিজেকে নিজে যোগ্য ভাবতে না পারলে, যৌক্তিক চেতনাবোধে উজ্জীবিত সচেতন-বিবেকবান-বুদ্ধিমান-কাঙ্ক্ষিত বোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে নিজেকে নিজেই বিশ্বাস করতে না পারলে অন্যের কাছে নিজের ব্যাপারে এরূপ উঁচু ধারণা আশা করা বোকামি হবে। আর নিজের প্রতি নিজের আস্থা, বিশ্বাস, দ্বিধা-সংশয় মুক্ত পরিচ্ছন্ন ধারণা তখনই তৈরি হবে যখন কর্ম ও চিন্তায় মানবীয় মূল্যবোধের চর্চা ও লালন থাকবে। যে নিজেকে ছোট-তুচ্ছ-নগণ্য ভাবে, সে নিজেকে অপমানিত হতে দেয়। যে নিজেকে মর্যাদাহীন মানুষ হিসেবে চিহ্নিত হতে দেয় সে বঞ্চনা-লাঞ্ছনা-অপমান পাবারই উপযুক্ত। মানুষের অন্যান্য প্রাণীর মতো খেয়ে প্রাণে বাঁচলেই হয় না; আত্মসম্মান-আত্মমর্যাদা-স্বাধীনতা নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়।

মৌল মানবিক চাহিদা পূরণেই শেষ নয়; সত্যিকারের মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা অনেক বড় কিছু। প্রাণ থাকলেই প্রাণী, জীবন থাকলেই জীব হয় কিন্তু মানুষের ঘরে জন্ম নিলে, মানুষের মতো চোখ-কান-মুখ-দুই পা-দুই হাতের দৈহিক গঠন থাকলেই মানুষ হয় না। দেখতে মানুষের মতো রূপ, শারীরিক গঠন, আকার আকৃতি থাকার পরও রুচিবোধ হতে পারে পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট, হিংস্রতা থাকতে পারে বাঘ-সিংহের চেয়ে বেশি, কামুকতা থাকতে পারে কুকুরের মতো। তাই রূপের মানুষ নয় গুণের মানুষ হতে হবে।

আদর্শ চরিত্রবান করে গড়ে তুলুন

নীতি ও নৈতিকতার ক্ষেত্রটাই আজ সবচেয়ে বেশি রোগাক্রান্ত। শিক্ষকরাও আজ বিধ্বংসী চিন্তা অঙ্কুুরিত করে কতিপয় শিক্ষার্থীর বিশুদ্ধ মগজে, আলোকিত মানুষ গড়ার চেয়ে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকে। লোভী ডাক্তাররা অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করায়, অপ্রয়োজনীয় ‘অপারেশন’ করে। অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে জীবন বিনাশ করার কাজে লিপ্ত থাকেন। প্রতারণাকারীরা নিজেদেরকে প্রতারিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত করে। যে সমাজ তার নৈতিক চরিত্র হারিয়েছে, সে সমাজ ধ্বংসের পথে চলেছে। ইতিহাসের সব পতনই হচ্ছে নৈতিক পতন। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রত্যেক পিতা-মাতার উচিত তাদের সন্তানদেরকে আদর্শ চরিত্রবান করে গড়ে তোলা।

চরিত্র হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ। চারিত্রিক গুণাবলি ধ্বংস হলে মানুষ নীতি-নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলে আর পশুত্ববোধ এবং বিবেকহীনতা তার মধ্যে স্থান লাভ করে। তখন অপকর্মই হয়ে ওঠে চরিত্রহীন মানুষের  প্রধান কাজ। চারিত্রিক অধঃপতনের কারণে আজ আমরা হারিয়ে ফেলেছি নৈতিকতা, বিবেকবোধ, চারিত্রিক দৃঢ়তা, সততা, মানবিকতা, ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ।

কাজের মাধ্যমে সম্পর্কের উন্নতি ঘটান

ত্যাগের উপযুক্ত প্রতিদান প্রকৃত সম্মান। নেতিবাচক চিন্তা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মানুষ ধীরস্থির নয়। লোভ-লালসার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবার পরিণাম ধিক্কার। অজুহাত খুঁজলে সংশোধন মিলে না। কাজের মাধ্যমে সম্পর্কের উন্নতি ঘটে, পরিবর্তন টেকসই হয়। প্রকৃত বন্ধু কখনো পিছন থেকে আঘাত করে না। নিকটজনেরা যার কাছে অনিরাপদ, তাকে উপেক্ষা করুন।  ভালো মানুষের ভান করার চেয়ে ভালো মানুষ হওয়া অনেক কঠিন। অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করুন, নিজের বিশ্বাসের মূল্যায়ন পাবেন। অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে মূল্যবান মাথা খাঁটালে আপনি পেছাবেন। উপযুক্ত মানুষের সাথে উঠাবাসায় আপনার যোগ্যতা বাড়বে।

অন্যের প্রতি সহানুভূতি বাড়ান

অন্যের প্রতি সহানুভূতি বাড়লে নিজেতে মোহাচ্ছন্ন থাকা কমে যায়। ভয়ে ভীত না হয়ে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে রাখুন। দুর্বলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে সবল দিক বাড়িয়ে তুলুন। বিপদের বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা সযত্নে লালন করুন। সত্যকে দেখতে ও উত্তমকে মানতে শিখুন। ঘৃণার বদলে ভালোবাসা ছড়িয়ে দেয়ার সংগ্রাম করুন। সংগ্রামীকে ভুলের কারণে তাচ্ছিল্য করাও কাপুরুষতা। অন্যের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দানকারীই প্রকৃত বিজেতা। সমৃদ্ধ জীবন মানেই ভালোর প্রসার ঘটাতে নিবেদিত জীবন। অন্যের সমালোচনায় অন্যের অপমান, সমালোচকের নিচে পতন। যার দম্ভ বেশি সে অভদ্র, সৌজন্য বজায় রাখে বিনয়ীরাই।

 

পরিবার.নেট

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *