মদিনার সনদ ও সমাজ ব্যবস্থা

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শান্তির দলিল মদিনার সনদ। সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ লিখিত আন্তর্জাতিক সন্ধিপত্রটি বিশ্বশান্তির রোলমডেল। শান্তি, শৃঙ্খলা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় যার ভূমিকা অতুলনীয়। সমাজে সদ্ভাব, সম্প্রীতি ও সংহতি আনয়নের মাইলফলক। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, ঐক্য ও সুশাসন কায়েমে ইসলামের জগদ্বিখ্যাত মহাসনদটির প্রভাব অনন্য।

গোষ্ঠী-জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের সমান অধিকার নিশ্চিতে মদিনার সনদটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পৃথিবীর ইতিহাসে মানবাধিকারের সনদের মধ্যে অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ সনদটি ঐতিহাসিক দলিল। আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায়ও সনদটির আবেদন ও প্রাসঙ্গিকতা এতটুকু কমেনি।

মদিনার সনদের সার্থক রূপকার

মদিনার সনদ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন মুহাম্মদ সা. এর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কর্ম । মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকারী বিশ্বশান্তির অগ্রদূতের সম্পাদিত মানবাধিকারের এই সার্বজনীন চুক্তিটি সমস্বার্থের, আবাসভূমির-দেশের সুরক্ষায় একটি প্ল্যাটফর্মে সবাইকে সমবেত করতে পেরেছিল। মদিনা ও পাশের অঞ্চলগুলোর মুসলমান (আনসার ও মুহাজির), ইহুদি, খ্রিষ্টান ও পৌত্তলিকদের মধ্যে এটি স্বাক্ষরিত হয়।

মদিনা সনদের ইতিহাস

মুহাম্মদ সা. ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর ইয়াসরেবে হিজরত করেন। তাঁর নেতৃত্বে মদিনা মুসলমানদের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে পরিণত হয়। তিনি সেখানে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। একটি সনদ তৈরি করে মদিনার অমুসলিমদের কাছে প্রস্তাব করেন। ইসলাম শান্তি চাওয়ার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সংবিধান মদিনা সনদ। এতে সকল পক্ষ স্বাক্ষর করায় এটি রাষ্ট্র পরিচালনা ও নাগরিকদের সব ধরনের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম ছিল।

মদিনা সনদের নামকরণ

মদিনার পূর্ববর্তী নাম ছিল ইয়াসরেব। রাসুল সা. হিজরতের পরই বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সদ্ভাব ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কতকগুলো ধারা সম্বলিত লিখিত চুক্তি স্বাক্ষরের দুরূহ কাজটি সফলভাবে সম্পাদন করেন। সংবিধানটিকে প্রথমে ‘কিতাবুর রাসূল’ বলা হতো। পরে ইয়াসরেবের নাম মদিনাতুন্নবী বা নবীর শহর হওয়ার পর ইয়াসরেববাসীদের এই চুক্তি ‘মিসক আল মদিনা’ ‘The Charter of Medina’ ‘মদিনা সনদ’ ‘Medina charter’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

মদিনা সনদ প্রণয়নকালীন সমাজ ব্যবস্থা

তখন মদিনার সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার মতো কোনো কেন্দ্রীয় সরকার ছিল না। সেখানে বসবাসরত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে গোষ্ঠীগত হিংসা-কলহ-বিদ্বেষপূর্ণ মানসিকতা ছিল। আরবের মানুষদের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক ঐক্য ছিল না।

আরবের রাজনৈতিক-সামাজিক মানচিত্রে বৃত্তের দেশজ ভাবনা ছিল অনুপস্থিত। নগরবাসী ও বেদুইনদের ঐক্যচেতনা গোত্র ও গোষ্ঠীর গণ্ডিতেই আবদ্ধ ছিল। গণতন্ত্রের কোনো ধারণাই মানুষের ছিল না। শাসন পদ্ধতি ছিলো ব্যক্তি কেন্দ্রিক। বিধিবদ্ধ শাসনতন্ত্র ছিলো না।

শাসকদের খেয়াল-খুশীমতো মুখোচ্চারিত বাণীই ছিলো আইন। শাসকের যথেচ্ছারে জনস্বার্থের পরিপন্থী কাজ হতো। রাসূল সা. মদীনায় পৌঁছার পর দেখেন এখানে তিন শ্রেণীর লোকের নিবাস রয়েছে। ১. মদীনার আদিম পৌত্তলিক সম্প্রদায়, ২. বিদেশি ইহুদী সম্প্রদায়, ৩. নব বায়আত প্রাপ্ত মুসলিম সম্প্রদায়। এদের আদর্শগত মিল ছিলো না।

মদিনা সনদের উদ্দেশ্য

পরস্পরবিরোধী চিন্তা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে নৈরাজ্য-সংঘাত-যুদ্ধবিগ্রহের পরিবর্তে পরস্পরের শান্তিপূর্ণ অবস্থানের লক্ষ্যে একত্র করতেই এই সনদ। উদ্দেশ্য ছিলো অত্যাচারিত-নিপীড়িতকে সাহায্য করা এবং চুক্তিভুক্তদের মান-মর্যাদা ও ধর্মবিশ্বাসের অধিকার সংরক্ষণ করা।

সনদটির মাধ্যমে ইয়াসরেবের সবাইকে নিয়ে এমন রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়, যা রাষ্ট্র গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। জীবন রক্ষা, সম্পদ রক্ষা, বংশ রক্ষা, জ্ঞান রক্ষা ও ধর্ম রক্ষা তথা মানবতার সুরক্ষা বা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল। এটি ইয়াসরেবে ও পার্শ্ববর্তী জনপদসমূহকে সুরক্ষা ও সুশাসন এবং মৈত্রীর এক ছাতার নিচে এনেছিল।

সনদটির উদ্দেশ্য ছিলো মক্কা থেকে হিজরতকারী কোরাইশ ও অন্যান্য মুসলিম, মুহাজিরদের আশ্রয়দানকারী ইয়াসরেবের মুসলিম আনসারগণ; ইয়াসরেবের আওফ গোত্র, বনি হারিস গোত্র, বনি সায়েদা গোত্র, বনি জুশাম গোত্র, বনি নাজ্জার গোত্র, বনি আমর ইবনে আওফ গোত্র, বনি নাবিত গোত্র, বনি ছালাবা গোত্র, বনি জুফনা, বনি শাবাতায়; ইহুদিগণ ও খ্রিষ্টানগণসহ অমুসলিম পৌত্তলিক সম্প্রদায় এবং চুক্তি মেনে চলতে রাজি হানাফগণের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণে নীতিমালা প্রণয়ন।

মদিনা সনদের বৈশিষ্ট্য

মানুষে মানুষে বৈরিতা নয়, পারস্পরিক সৌহার্দ মদিনার সনদের মূলমন্ত্র। এতে সব সম্প্রদায়ের শুভেচ্ছা ও সহযোগিতার প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। মদিনায় বসবাসরত সব জাতি ও গোত্র এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল। এতে দাস-দাসী, নারী, দুর্বল ও অসহায় থেকে শুরু করে উচ্চ শ্রেণি পর্যন্ত সবার অধিকারের কথা ছিল। নিজে বাঁচ ও অন্যকে বাঁচতে দাও- এটাই নীতি ছিল।

সনদটির মাধ্যমে গঠিত সাধারণ জাতির সবার নাগরিক অধিকার সমান ছিল। এতে পার্থিব ও ধর্মীয় বিধানের সমন্বয় হয়েছিল। আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করা হয়েছিল। প্রকারান্তরে আল্লাহর বিধানকে কার্যকর করা হয়েছিল। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়েছিল। সনদের ধারাগুলোতে যুদ্ধ ও শান্তিচুক্তি, মুসলিম-অমুসলিমের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং বিচার-আচারে নবীজীর কর্তৃত্বের ব্যাপারগুলো ছিল।

একটি ভৌগলিক সীমায় বসবাসকারীরা মদিনার চুক্তি নামক সাধারণতন্ত্রটির অধীনে এসে একই দেশে বসবাসকারী নাগরিক বলে গণ্য হয় এবং শান্তিচুক্তি ভঙ্গ না করা পর্যন্ত একে অন্য থেকে জানমালের নিরাপত্তা পায়। এতে মদিনার পুনর্গঠন ও যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত আরব জাহানকে একতাবদ্ধ করার মহৎ পরিকল্পনা প্রকাশ পেয়েছিল। মুহাম্মদ সা. একজন শ্রেষ্ঠ রাজনীতিজ্ঞ প্রমাণিত হয়েছিল।পরস্পর বিরোধী চিন্তা-রুচি-ধর্মভাবাপন্নদেরও সহযোগিতা-সমর্থন পেয়েছিল।

মদিনা সনদের গুরুত্ব

মদিনা সনদ গোত্র-গোষ্ঠীগত চুক্তি হয়েও সর্বজনীনতা লাভ করেছে। এটি উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, গোত্রীয় দম্ভ, ধর্মবিদ্বেষ, অঞ্চলপ্রীতির নামে কর্তৃত্বের সব রকম প্রয়াস খতম করে সাফল্যের ন্যায্য অধিকার সংরক্ষণ ও দায়িত্ব কর্তব্যের বিবরণ সংবলিত অনন্য দলিল।

সনদটিতে মুহাম্মদ সা. এর মানবাধিকার ঘোষণার প্রকৃষ্ট পরিচয় প্রতিভাত। কল্যাণকর প্রমাণিত হওয়ায় সবার কাছে অপরিহার্য সনদটি গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। এটি রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যমে ধর্ম সংগঠিত হওয়ার উপায় বাড়িয়েছে এবং ধর্মের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মূলভিত্তি তৈরির রাজনীতিকে গ্রহণীয়ও করেছে। রাষ্ট্র ও ধর্মের সহাবস্থানের ফলে ঐশীতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। যা ছিল বৃহত্তর ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল।

এ সনদের ফলে অনর্থক দ্বন্দ্ব-সংঘাত এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে সবার মানবিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকার নিশ্চিত করে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়। যা গোত্রগুলোকে বিলুপ্ত না করে প্রত্যেকের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ণ রেখে উদারতার ভিত্তিতে একটি বৃহত্তর জাতি গঠনের পথ উন্মুক্ত করে। মদিনার বুকে শান্তির ঝরনাধারা প্রবাহিত হয়।

আবু ওবাইদা কিতাব আল আমওয়াল গ্রন্থে বলেন, মদিনা সনদের প্রধান ধারাগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কেন্দ্রীয় প্রশাসন, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রভৃতি এবং বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ ক্ষমতা মহানবী (স)-এর ওপর ন্যস্ত করা হয়। এ সনদ বলে মহানবী ছিলেন মদিনা ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বাধিনায়ক।

প্রথম লিখিত সংবিধান মদিনা সনদ খুবই স্থিতিশীল শাসনতন্ত্র। সনদটির মাধ্যমে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসেবেও স্বীকৃতি লাভ করেন। মদিনায় ইসলামের ধর্মীয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। বিশ্বব্যাপী ইসলাম প্রচার ও ইসলামী সাম্রাজ্য স্থাপনের ভিত রচিত হয়। মদিনা নতুন রাষ্ট্র রক্ষার গ্যারান্টি নিশ্চিত হয়। শাসক ও শাসিতের মধ্যে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ জাগ্রত হয়। আইনের দৃষ্টিতে রাজা-প্রজা সকলেরই জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করা হয়। পূর্ণ প্রতিষ্ঠা লাভ করে- ইসলামের আন্তর্জাতিকতাবাদ, ইসলামী গণতন্ত্র ও ধর্মীয় উদারতা।

কী ছিল মদিনা সনদে?

মদিনার সনদে ৪৭টি ধারা রয়েছে। ২৩টি ধারা মুসলমানদের মধ্যে, আনসার ও মুহাজিরিনের মধ্যে সম্পর্ককে নির্ধারণ করে। ২৪টি ধারা অমুসলিম, ইহুদি এবং অন্যান্যদের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ককে নির্ধারণ করে। স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়সমূহ ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে একটি সাধারণ জাতি (উম্মাহ) গঠন করে। মদিনার মুসলমান, পৌত্তলিক, ইহুদি, খ্রিস্টান সকলেই সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করে। কোনো সম্প্রদায় অপর সম্প্রদায় অপেক্ষা বেশি নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারে না।

নবগঠিত প্রজাতন্ত্রে হযরত মুহাম্মদ সা. এর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়। তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান হন। পদাধিকারবলে হন সর্বোচ্চ বিচারালয়ের সর্বোচ্চ বিচারক বা সর্বময় কর্তা। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তির অধিকার থাকে রাষ্ট্রপ্রধানের।

অভ্যন্তরীণ গোপনীয়তা রক্ষা হয়। মক্কার কুরাইশদের সাধারণভাবে মদিনা রাষ্ট্রের শত্রু বলে ঘোষণা করা হয়। কোনো সম্প্রদায় গোপনে কুরাইশদের সাথে কোনো প্রকার গোপন সন্ধি করতে পারবে না। মদীনা বা মদীনাবাসীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে কুরাইশদের তথ্য সরবরাহ করা, তাদের সাহায্যকারীদেরকে এড়িয়ে চলা ও তাদের কোনো প্রকার সাহায্য-সহায়তা করায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়।

মুসলিম, খ্রীস্টান, ইহুদী, পৌত্তলিক ও অন্যান্য সম্প্রদায় নির্বিঘ্নে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে তথা ধর্মীয় ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবে। কেউ কারো ধর্মীয় কাজে কোনো রকম হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

মদিনার উপর যে কোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণকে প্রতিরোধ করার জন্য সকল সম্প্রদায়কে এক জোট হয়ে অগ্রসর হতে হবে। কোনো সম্প্রদায় বাইরের শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে মিলিত শক্তি দিয়ে সে আক্রমণকে প্রতিহত করবে। বহিঃশত্রু আক্রমণ করলে স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়গুলো নিজ নিজ যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করবে।

রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। অসহায় ও দূর্বলকে সহায়তা প্রদান করতে হবে। সর্বাবস্থায় সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতার হস্ত প্রসার এবং সকলের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

মদীনাকে পবিত্র নগরী বলে ঘোষণা করা হয়। মদিনায় সকল প্রকার রক্তক্ষয়, হত্যা, বলাৎকার ও অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যকলাপ চিরতরে নিষিদ্ধ করা হয়।

সুবিচার নিশ্চিত করা হয়। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তা ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবেই বিচার করা হবে। অপরাধীর সম্প্রদায়কে দায়ী করা যাবে না। সর্বপ্রকার পাপী ও অপরাধীকে ঘৃণার চোখে দেখতে হবে। ঘৃণিত পাপী ও অপরাধী ব্যক্তিকে অবশ্যই উপযুক্ত শাস্তি ভোগ করতে হবে।

নতুন যুদ্ধনীতি হয়। মুহাম্মদ সা. এর অনুমতি ব্যতীত মদীনাবাসীগণ কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে বা সামরিক অভিযানে যেতে পারবে না।

মুসলমানদের কেউ যদি অন্যায় কিংবা বিশ্বাসঘাতকতা করে তবে সবাই মিলে তার বিরুদ্ধে যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। নিজ সন্তান বা আত্নীয় হলেও এ ব্যাপারে তাকে ক্ষমা করা যাবে না। সনদে স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো মতানৈক্য ও বিরোধ দেখা দিলে তা বিচার-মীমাংসার জন্য আল্লাহর রাসূলের সা. কাছে পেশ করতে হবে।

প্রত্যেক গোত্র সম্মিলিতভাবে মহানবী সা. এর ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব মেনে চলবে। স্ব-স্ব গোত্রীয় দলপতিদের গোত্রীয় প্রাধান্য অক্ষুন্ন থাকবে। প্রত্যেকটি গোত্র তাদের পূর্ববর্তী চুক্তিসমূহ এবং দেয় মুক্তিপণ ও মুক্তিপণসমূহ এককভাবে প্রদান করবে। সেখানে মদিনা রাষ্ট্র কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি করবে না।

সমাজ ব্যবস্থায় মদিনা সনদের প্রভাব

‘মদিনা সনদ’ ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও নাগরিক জীবনে বিরাট পরিবর্তন সাধন করে। রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপনে সাহায্য করে, শান্তিপূর্ণ প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা হিংসাদ্বেষ-কলহ-গৃহযুদ্ধ বন্ধ করে। যুদ্ধবাজদের অনৈক্যের স্থলে নিয়ত যুদ্ধরত গোত্রগুলোর মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে, গড়ে তোলে সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার বন্ধন; বিপদে সবাই এক- এ নীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে।

মদিনার সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন হয়। ইসলামের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। মদিনায় কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। হজরতের ওপর মদিনার শাসনতান্ত্রিক কর্তৃত্ব অর্পিত হয়। কুরাইশদের বিরুদ্ধে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে এটি তার ক্ষমতা ও মর্যাদাকে যথেষ্ট বৃদ্ধি করে। ইসলাম প্রচারের ও ইসলামী রাষ্ট্রের পথ প্রশস্ত হয়। এর পথ ধরেই সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা কায়েম হয়, মদিনায় ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রের পথ সুগম হয়।

মদিনা সনদের ফলাফল রাজনৈতিক ঐক্য-শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং সমঅধিকার ও সম্প্রীতি স্থাপন। এ সনদ মদিনার প্রত্যেক মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করেন। সব নাগরিককে সমানাধিকার দান করে। মুসলমান ও অমুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে তোলে। মুহাজিরদের মদিনায় বসবাসের জীবিকা উপার্জনের ব্যবস্থা করে। মদিনা সনদের মূল ভিত্তি ছিল ‘নিজে বাঁচো এবং অপরকেও বাঁচতে দাও’ নীতি। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর দেশটিতে সব ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা নিশ্চিত হয়।

সুসংহত-ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের মাধ্যমে মদিনা সনদই সর্বপ্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে বা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বীজ বপন করে বা বৃহত্তর ইসলামী সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হয়। ইয়াসরেবের ঐতিহাসিক চুক্তির পরই ইয়াসরেব ও পার্শ্ববর্তী এলাকার সব সম্প্রদায়ের লোকের সহযোগিতা ও সমর্থনেই দৃঢ়-মজবুত ভিত্তির ওপর ইসলামী রাষ্ট্রের বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠা হয়। সনদের শর্ত ভঙ্গ করার অপরাধে নবী সা. ইহুদিদের মদিনা থেকে বহিষ্কৃত করেন।

মদিনা সনদ বিশাল সাম্রাজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রয়োজন মেটাতে সমর্থ হয়। এতে সত্যিকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়। সমাজের সব নাগরিক পরস্পরের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে অবগতি লাভ করে। এ সনদের মাধ্যমে মহানবী সা. যুগান্তকারী চূড়ান্ত নীতি-নির্ধারণ ও বিপ্লবী নেতার স্বীকৃতি লাভ করেন।

মদিনা সনদের শিক্ষা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

ঐতিহাসিক মদিনা সনদের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে আদর্শ-কল্যাণ রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের উজ্জ্বল একটি নজির রেখে গেছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শান্তিকামি মহামানব; যা আধুনিক বিশ্বেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সামাজিক ভারসাম্য ও আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে সেসব নীতিমালার কোনো বিকল্প নেই।

 মদিনা সনদের শিক্ষা হচ্ছে সত্যিকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ-আদর্শ প্রতিষ্ঠা, সমাজের সবার পরস্পরের অধিকার ও কর্তব্য পালন নতুন সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম করে। ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য সীমারেখা ছিন্ন করলে উন্নত সমাজ ব্যবস্থা প্রবর্তনের পথ সুগম হয়।

মদিনা সনদের ধারাবাহিকতা ধরেই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় পরবর্তী যুগে যথাক্রমে ১২১৫ সালের ম্যাগনাকার্টা, ১৬২৮ সালের পিটিশন অব রাইট, ১৬৭৯ সালের হেবিয়াস কার্পাস অ্যাক্ট, ১৬৮৯ সালের বিল অব রাইটস এবং ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘ কর্তৃক ঘোষিত ‘সর্বজনীন মানবাধিকার’ ঘোষিত হয়।

উপসংহার

মদিনা সনদ হচ্ছে বিশ্ব মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় শ্রেষ্ঠ দলিল ও মানবতার সংবিধান। মদিনা সনদের প্রতিটি ধারা সর্বকালে সব দেশের রাষ্ট্রীয় সংবিধানের জন্য একটি আদর্শ। মদিনার এ সংবিধানের আলোকে যেকোনো দেশের সংবিধান রচিত হলে তা সব নাগরিকের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।

সমস্যাসংকুল বিশ্বে, গভীর সংকটে আবর্তিত সমাজ-রাষ্ট্রের উত্তরণ ঘটতে পারে মদিনা সনদের আলোকেই। ঐতিহাসিক ৪৭টি ধারা অনুসরণ করলে যেকোনো দেশের রাজনীতি, রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যাপকভাবে উপকৃত হতে পারে। মদিনার সনদের পরতে পরতে শান্তি, সম্প্রীতি, সহাবস্থান, মানবাধিকার ও ধর্মীয় গোঁড়ামি পরিহারের যে বার্তা রয়েছে তা অনুসরণ করলে লাভ করা সম্ভব ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও বহুল কাঙ্ক্ষিত কল্যাণ রাষ্ট্র।

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.