ব্যবসা-বাণিজ্যে সফল যারা কেমন তারা

ড. আহসান হাবীব ইমরোজ :  আচ্ছা ফারাবী বলোতো, ‘তোমার আম্মু সপ্তাহে ২-৩ বার টোকিও যায় বাজার-সওদা করতে কিন্তু কিভাবে?’ মাল্টিপুলের ঢঙ্গে সাথে সাথে অপশনও বলে দিলাম ১. উড়োজাহাজে চেপে? ২. জাহাজে করে, নাকি ৩. হেঁটে। সামনে প্রাইমারি সমাপনী পরীক্ষা তাই জরুরি পড়ার মধ্যে মাথা ডুবিয়ে রাখা আমাদের ছেলেটি ধাক্কা খেয়ে ঘুম ভাঙ্গার মতো, চমকে উঠলো। মুহূর্তেই আবার নিজেকে সামলে প্রশ্নের প্যাঁচ বোঝার চেষ্টায় ছাদের দিকে চোখ দুটি স্থির করলো। হঠাৎ সবজান্তার মতো ফিক করে একটি হাসি দিয়ে বললো, হেঁটে।

হ্যাঁ, আমাদের বাসা থেকে হাঁটা দূরত্বেই ছোট্ট একটি শপিংমল নাম তার টোকিও। পরিবহনের সুবিধার্থে মাঝে মাঝে রিকশাও নিতে হয়। আর ঝটপট টাকা তোলার জন্য লাগোয়াই আছে এটিএম বুথ। এই যে বাসা থেকে নেমেই শ গজের ভেতর পণ্য কেনা, পরিবহন, ব্যাংকিংসহ নানাবিধ কার্যক্রম হচ্ছে এরই পোশাকি নাম দিয়েছে মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্য। অবশ্য এটি বাসায় বসেও প্রযুক্তির কল্যাণে আজ মোবাইল, ইন্টারনেটে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তেই সম্পন্ন করা যাচ্ছে। আর ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে ফুলের মালার মতোই জড়িয়ে আছে নানাবিধ অনুষঙ্গ যেমন; অর্থ, শ্রম, উৎপাদন, বিপণন বাজার, আমদানি-রফতানি, রাজস্ব, কোম্পানি, ব্যাংক, বিনিয়োগ, হিসাব, লাভ-ক্ষতি শত শত বিষয়।

পাঠক, মাফ করবেন কাঠখোট্টা একাডেমিক আলোচনা আমার উদ্দেশ্য নয়, সে আপনারা ঢের জানেন। বলতে পারেন এটি মূল খাবারের আগে এক চিমটি তেতো লবণ। মিল্লাতে ইব্রাহিম বা আব্রাহাম রিলিজিওনের প্রধান তিনটি ধারা মুসলিম, খিৃষ্টান আর ইহুদিদের অনুসারীর সংখ্যা পৃথিবীতে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৫%। ১৪% নাস্তিক বা নন-রিলিজিয়ন বাদ দিলে বাকি সব ধর্মের অনুসারী হচ্ছে মাত্র ৩১%। এই মিল্লাতে ইব্রাহিমের সকলের এক কমন বিশ্বাস আদম-হাওয়া বা এডাম-ইভের মাধ্যমেই পৃথিবীতে মানব সভ্যতার সূচনা।

আদম-হাওয়ার জান্নাতে বিচরণ, ফল খাওয়া, দুনিয়ায় আগমন এমনকি তাদের কয়েক জেনারেশন পর্যন্ত পারস্পরিক দান-প্রদান হলেও ব্যবসা-বাণিজ্য যে হয়নি তা অনুমান করা যায়। মোটামুটি ইতিহাস ঘেটে জানা যায় ১০থেকে ১১ হাজার বছর আগে বিনিময় প্রথা চালু হয়। গৃহপালিত পশুরা প্রাথমিক বিনিময়ের মাধ্যম বা মুদ্রা ছিল। এর অনেক পরে ঝিনুক বা কড়ি হয় মাধ্যম। সর্বশেষ আদি মৃদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন হয় আজ থেকে প্রায় ২৫০০ বছর আগে। আর এটাই স্বাভাবিক, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনেই এই মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন। আজকের বিশ্বের আকাশচুম্বি এই ব্যবসা-বাণিজ্যের বৈভবের টাওয়ার সমূহ এবং তাদের আলোকচ্ছটা দাঁড়িয়ে আছে সেই প্রায় ১০ হাজার বছরের মেধা, মনন আর সাধনার ভিত্তিভূমির ওপর।

তবে শুধুমাত্র ধারণা ও কল্পনার মাধ্যমে সেই মেধা, মনন কিংবা সাধনার বিজয় গাথা অনুমান করা সম্ভব নয়। বলা হয় “When you assume you make an “ass” out of “u” and “me” এর পাশাপাশি আরেকটি বক্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ যা হাজার বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত “ Chinese proverb One picture is worth ten thousand word” । অর্থাৎ একটি ছবি বা উপমা অনেক লম্বা বক্তব্য হতেও গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং আসুন ব্যবসা জগতের লক্ষত্রসম কিছু মানুষের জীবনালেখ্য জানার চেষ্টা করি।

বিশ্বের প্রথম বিলিয়নিয়ার

বিশ্বের সবচেয়ে ধনীব্যক্তিদের বিলিয়নিয়ার অর্থাৎ কমপক্ষে ১০০ কোটি ডলার বা বাংলাদেশী টাকায় ৮,১৭৯ কোটি টাকার (10 sep. 2012= 81.7907 BDT) মালিক বলা হয়।সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী বর্তমান সময়ে বিশ্বে বিলিয়নিয়ার সংখ্যা ১,২২৬ জন। অথচ আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে বিশ্বের প্রথম বিলিয়নিয়ার হিসেবে নিজকে প্রতিষ্ঠিত করে জোহান ডি রকফেলার (১৮৩৯-১৯৩৭)। কে এই রকফেলার? আমেরিকার এই বিখ্যাত ব্যক্তির উত্থানের অবিশ্বাস্য কাহিনী খুব মজাদার। তিনি আলুক্ষেতের শ্রমিক থেকে আমেরিকার সবচেয়ে ধনীর আসনটি দখল করেছিলো। না না বরং বিশ্বের সর্বকালের সবচেয়ে ধনীর আসনটি, তিনি হলেন জন ডি. রকফেলার।

প্রথম জীবনেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন ১) একজন ভালো মানুষ হবে। ২) ১,০০,০০০ ডলারের মালিক হবেন। আর ৩) ১০০ বছর বাঁচবেন। কিন্তু তার শুরুটা খুবই কঠিন। হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান হিসেবে রকফেলার ঘন্টায় মাত্র চার সেন্ট অর্থাৎ মাসে প্রায় ৯০০ টাকার বিনিময়ে কাঠফাটা রোদের নিচে আলুক্ষেতে লোহার কোদাল নিয়ে কাজ করেছেন। তার অপরীসিম পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের ফলে তিনি প্রায় ২৭,৮০,৮৬০,০০,০০,০০০ অর্থাৎ সাতাশ লক্ষ আশি হাজার আটশত ষাট কোটি টাকা মূল্যে সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন। আর তার ৯৮ তম জন্মদিন পালনের মাত্র ৪৬ দিন আগে তিনি মারা যান।

রকফেলার তার মাকে হাঁস-মুরগি পালনে সাহায্য করে তার জীবনের প্রথম ডলারটি উপার্জন করেছিলেন। তিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তার সুবিশাল আট হাজার একর ভূ-সম্পত্তিতে চমৎকার একপাল মুরগি পুষতেন যেগুলো দেখে তিনি তার শৈশব স্মৃতি রোন্থন করতেন। তার মা মুরগি পোষার জন্য তাকে যে অর্থ দিত তা তিনি খরচ না করে একটা ফাটা অব্যবহৃত চায়ের পোয়ালায় জমাতেন। এছাড়াও দিনে ৩৭ সেন্টের বিনিময়ে এক কৃষিখামারে কাজ করতেন। প্রথম অবস্থায় ৫০ ডলার না হওয়া পর্যন্ত তিনি পুরো পারিশ্রমিকটাকেই জমা করলেন। এরপর ঐ ৫০ টি ডলার শতকরা ৭ ডলার লাভে তা নিয়োগকর্তাকেই ধার দিলেন। তিনি বলছেন, ‘আমি নিজে টাকার দাস না হয়ে টাকাকেই আমার দাস বানাবো।’ তার ভাবী-শাশুড়ি আম্মা তাকে বলেছিলেন, ‘রকফেলারের মতো একজন স্বল্প আয় সম্পন্ন মানুষ যার উন্নতির আশা অত্যন্ত ক্ষীণ, তার হাতে সঁপে দিয়ে আমার মেয়েকে জলে ভাসিয়ে দিতে পারি না।’

রকফেলার কখনো কলেজে যাননি। স্কুলজীবনে শেষ করে কয়েক মাসের জন্য একটি বাণিজ্যিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করেছেন। ষোল বছর বয়সেই তার বিদ্যায়নতনে শিক্ষাগ্রহণ শেষ হয়ে যায়। অথচ তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা দান করেছিলেন। যখন তিনি স্টান্ডার্ড ওয়েল কোম্পানির প্রধান ছিলেন, তার অফিসে প্রতিদিন পুপুর বেলা একটি নির্ধারিত কাউচে অর্ধঘন্টা ঘুমাতেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিদিন একটু একটু করে পাঁচবার ঘুমানোর অভ্যেস ছিল তার। পঞ্চান্ন বৎসর বয়সে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর ফলে গঠিত হয়েছে ‘রকফেলার ফাউন্ডেশন, যা সারা দুনিয়াজুড়ে মানব স্বাস্থ্যের উন্নয়নকল্পে প্রতি মাসে প্রায় ৬ কোটি টাকা দান মূলত এন্ড্রু কার্নেগীর দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ব্যাপকভাবে সমাজ- উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ করেন।

বর্তমান বিশ্বে অনেক চ্যারিটেবল ফাউন্ডেশন থাকলেও প্রায় ১০০ বছর আগে মে ১৪, ১৯১৩ সালে তিনি রকফেলার ফাউন্ডশন প্রতিষ্ঠা করেন। দানের ক্ষেত্রে তিনি বিশ্বরেকর্ড করেন যার পরিমান প্রায় ১১৫০০০০০০০০০০ টাকা। তার ফাউন্ডেশনের শ্লোগান হচ্ছে to promote the well being of mankind throughout the world. এমনকি তরুণ আইনস্টাইনও তার বৃত্তির সহযোগিতা চেয়ে পত্র দিয়েছিলেন আর তিনি আইনস্টাইনের মহো এরকম প্রায় ১৩০০০ ফেলোকে তিনি বৃত্তি দিয়েছিলেন। আজ থেকে ৭৫ বছর আগে ১৯৩৭ সালে তিনি দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন কিন্তু বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্যে রেখে গেছেন এক শক্তিশালী ক্ষমতার থাবা যার ফলে ২০১২ সালে ফোর্বসের বিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের সর্ববৃহৎ বা ১ নাম্বার বৃহৎ পাবলিক কোম্পানি হচ্ছে Exxon Mobil.

ব্যক্তি হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন ? তার জীবনালেখ্য থেকে পাওয়া যায় ধর্মের ব্যাপারে তিনি গভীর উৎসাহী ছিলেন। কখনো নাচতেন না, থিয়েটারে যেতেন না এবং ধুমপান বা মদ্যপান করতেন না।প্রতিবার খাদ্য গ্রহণের আগে তিনি প্রার্থনা করতেন এবং প্রতিদিন ধর্মীয় পুস্তক পাঠ শুনতেন। এতদভিন্ন তিনি উন্নত জীবনের বাণী এবং কবিতা পাঠ শুনতেন। কঠিন দারিদ্র্যতা, অশিক্ষা এবং পারিবারিক হীন অবস্থা থাকার পরও তিনি অনেক অনেক বড় হতে পেরেছিলেন শুধুমাত্র অক্লান্ত পরিশ্রম আর অধ্যাবসায়ের শুণে। আমরাও চেষ্টা করলে এই দু’টি গুণ অর্জন করতে পারি এবং নিজকে অনেক বড় হিসেবে তৈরি করতে পারি।

দ্যা স্টিল কিং

এন্ড্রু কার্নেগী (১৮৩৫-১৯১৯) জন্মগ্রহণ করেন এক দরিদ্র তাঁতী পরিবারে।স্কটল্যান্ডের ডানফার্মালিনে যে ছোট্ট বাড়িটি এন্ড্রুরা প্রথম সাব করতেন তাতে মাত্র দুটি ঘর ছিল। নিচের তলায় বাবা তাঁতের কাজ করতেন আর ওপরের ঘরটিতে রান্নাবাড়া, খাওয়া থাকা সবই করতে হতো । কার্নেগী পরিবার যখন আমেরিকায় এলো, বাবা টেবিলক্লথ বুনে বাড়ি বাড়ি ফেরি করে বিক্রি করতেন আর মা এক জুতো প্রস্তুতকারকের অধীনে কাজ করতেন। এন্ড্রুর পরার জামা ছিল মাত্র একটি। প্রতি রাতে মা সেটা ধুয়ে ইস্ত্রি করে দিতেন। ১৮৪৮ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে পিটার্সব্র“ক তাঁত ফ্যাক্টরির ববিন শ্রমিক হিসেবে প্রতিদিন ১২ ঘন্টা করে সপ্তাহে ৬ দিন কঠোর পরিশ্রম করে সপ্তাহিক বেতন পেতেন মাত্র ১.২০ ডলার (বর্তমান বাংলাদেশী টাকায় মাত্র ৯৮ টাকা)। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার সম্পদের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় ২৯৮ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ২৪,৩৭,৩৪২,০০,০০,০০ কোটি টাকা মাত্র)।

তার বক্তব্য অনুসারে তার সমস্ত বুদ্ধি তিনি মার কাছ থেকেই পেয়েছেন। অবশ্য মার প্রতি তার অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তার জীবনের অন্যতম প্রেরণা। বয়স যখন বাইশ হলো, এন্ড্রু তার মার কাছে প্রতিজ্ঞা করলেন যে, মা যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন বিয়ে করবেন না। তিনি যখন বিয়ে করলেন তখন তার বয়স হয়েছিল বায়ান্ন আর প্রথম সন্তান যখন জন্ম নিল তখন তার বয়স বাষট্টি। তার মা মার যাওয়াতে এত গভীরভাবে দুঃখীত হয়েছিলেন যে, পনের যাবত মার নামোল্লেকও সহ্য করতে পারতেন না। এন্ড্রু কার্নেগী ‘স্টিল কিং’ নামে পরিচিল ছিলেন। কিন্তু স্টিল নির্মানের ব্যাপারে তার হাজার হাজার কর্মাচারী তার চেয়ে বেশি জানতো। তিনি শুধু জানতেন কিভাবে মানুষকে পরিচালনা করতে হয় আর এটাই ধনী হতে সাহায্য করেছিলো। ছোটবেলাতেই তিনি ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্ব দেবার কৌশল আয়ত্ত করেছিলে ।

তার মা খরগোশ ধরেছিলেন। কিন্তু তিনি দরিদ্রতার কারণে খরগোশটার খাবার জোগাড় করতে না পারায় একটা চমৎকার মতলব আঁটলেন। পাড়ার ছেলেদের বলেন, তারা যদি খরগোশের খাবার এনে দিতে পারে তাহলে তাদের সম্মানার্থে খরগোশের বাচ্চাদের নামকরণ করবেন। তিনি পিটসবার্গে একটা বৃহদাকার স্টিলের কারখানা তৈরি করে তৎকালীন পেনসিলভানিয়া রেলরোডের প্রেসিডেন্ট জে. এডগার টমসনের নামে এই স্টিল মিলের নামকরণ করবেন। স্বভাবতই মি. টমসন খুশি হয়ে প্রয়োজনীয় ইস্পাতের তৈরি রেলের অর্ডার দিলেন। এন্ড্রু কার্নেগী পিটসবার্গে টেলিগ্রাফ বার্তাবাহকের একটা চাকুরী পেলেন। তার মাইনে ছিল দৈনিক পাঁচ সেন্ট। এটা তার কাছে এক পরম সৌভাগ্য বলে মনে হলো।

অল্পদিনেই তিনি এ শহরের প্রতিটি বাণিজ্যিক এলাকার কারখানার নাম ঠিকানা আয়ত্ত করে ফেললেন। একদিন সকালে বিরাট সব খবরে টেলিগ্রাফের তার গরম হয়ে উঠে। ফিলাডেলফিয়া থেকে ভয়ানক উত্তেজিত পরিস্থতি পিটসাবার্গের সাহায্য কামনা করছিল। তখন কোন অপারেটর কর্তব্যরত ছিল না। এন্ড্রু কার্নেগী তৎক্ষণাৎ দৌড়ে গিয়ে সংবাদটা গ্রহন করলেন এবং টেলিগ্রাফের মাধ্যমে যথাস্থানে পৌঁছে দিলেন। এ কাজটির জন্য তাকে অপারেটর করে বেতন দ্বিগুণ করা হলো। ডিভিশনাল সুপার তাকে তার প্রাইভেট সেক্রেটারি পদে পদোন্নতি দিলেন। এরপর একদিন রেল গাড়িতে হঠাৎ করে এক আবিস্কারকের সঙ্গে সাক্ষাৎ তার সৌভাগ্যের দরজা খুলে দিল। আবিস্কারক নিজের আবিস্কৃত একটি স্লিপিং কারের মডেল তাকে দেখালেন। কার্নেগী অনুধাবন করতে পারলেন আবিষ্কারটি সম্ভাবনাময়। তিনি টাকা ধার করে ঐ কারবারে কিছু শেয়ার ক্রয় করলেন। এতে কোম্পানি তাকে ভালো লভ্যাংশ দিল এবং এভাবেই তার বিনিয়োগ থেকে বছরে পাঁচ হাজার ডলার আয় হল।

একবার রেলপথে একটা কাঠের পুল পুড়ে গিয়েছিল। এন্ড্রু কার্নেগী একটা কোম্পানি গঠন করে লোহার ব্রিজ তৈরি শুরু করে দিলেন। এতে তার এত প্রচুর অর্থলাভ হতে থাকলো যে তা তাকে অভিভূত করে দিল। তারা কয়েক বন্ধু মিলে পশ্চিম পেনসিলভানিয়ায় চল্লিশ হাজার ডলার দিয়ে একটি তৈলখনি কারখানা কিনলেন এবং এক বছরের মধ্যে দশ লক্ষ ডলার উপার্জন করলেন। কার্নেগীর সাতাশ বছর বয়সে তার সপ্তাহিক আয় এসে দাঁড়িয়েছিল এক হাজার ডলার। এসব ধনরাশি উপার্জনের বেলায় তাকে বেশি কঠোর পরিশ্রম অবশ্য করতে হয়নি। তিনি নিজেকে এমন সব সহকারী দ্বারা পরিবেষ্টিত রাখতেন যারা তার চাইতে বেশি জানতেন। কার্নেগী তার অংশীদারদের লাভেল অংশ পুরোপুরি দিতেন। তিনি যত কোটিপতি তৈরি করেছিলেন যা এ যাবত আর কেউ তা পারেননি।

জীবনে মাত্র চার বছর স্কুলে গিয়েছিলেন কার্নেগী। তা সত্ত্বেও বেশ কটি ভ্রমণ কাহিনী, রচনা ও জীবনি এবং অর্থনীতির বই লিখেছিন। অর্থনীতি, ব্যবসা ও দান সম্পর্কিত তার লেখা চমৎকার বই দ্যা গসপেল অব ওয়েলথ। তিনি ৩৬৫ মিলিয়ন ডলার দান করেছিলেন (৩৬৫ কেন? হয়তো বছরের প্রতিদিনের জন্য ১ মিলিয়ন-বাংলাদেশী টাকায় সর্বমোট –প্রায় ৩০,০০০,০০,০০,০০০ টাকা) তার কার্নেগী কর্পোরেশন অফ নিউইয়র্কই গত ২০১০ সালে দান করেছে প্রায় ৮,০০০,০০,০০,০০০ টাকা। তার অর্থরাশি দান করার সর্বোত্তম উপয় তাকে কে বলে দিতে পারে তাই নিয়ে খবরের কাগজে প্রতিযোগিতা চলতো এবং পুরস্কার ঘোষণা করা হতো। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, ইনস্টটিউটসহ সারা বিশ্বে প্রায় ২৮০০ টি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। তার দান বিশ্বে কতটা প্রভাব সৃষ্টি করেছে শুধু একটি দুষ্টান্ত থেকেই বুঝা যায় এন্ড্রু কার্নেগী বলেছিলেন যে, ধনী হয়ে মরাটা চরম অপমান ও লজ্জাজনক।

কম্পিউটার সম্রাট বিল গেটস

ছোটবেলায় বিল গেটস (জন্ম অক্টোবর ২৮, ১৯৫৫) ছিলেন খুবই অদ্ভুত ধরনের। তিনি সব সময় নীরবতা পছন্দ করতেন। অনেক দার্শনিক তাকে অদ্ভুত ঠান্ডা মাথার লোক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি ছিলেন কিছুটা খামখেয়ালি প্রকৃতির, অর্থাৎ নিজের ইচ্ছামতো সবকিছু করতেন, এমনকি মা-বাবার শাসন পর্যন্ত মানতেন না। তার পিতা বলেছেন, শিশুকালে সে প্রতিদিন বিকেলে পাহাড়ে বেড়াতে যেত। বিল গেটসের মায়ের নাম মেরী। তিনি ছিলেন একজন সমাজসেবিকা। তিনি ১৯৯৪ সালে মারা যান। ছোটবেলায় বিলগেটস বয়সের তুলনায় আকৃতিতে ছোট ও খুব পাতলা ছিলেন। কাজেই এসব কারণে তাকে সরকারি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন।

স্কুলে থাকাকালে বিল গেটসের অভিনয়ের প্রতি ঝোঁক দেখা দেয় এবং তিনি স্কুলে নাটকেও অভিনয় করতে থাকেন। এরই মধ্যে তিনি স্থানীয় একটি কম্পিউটারের ক্লাবে ভর্তি হন। সেখানে তিনি কম্পিউটারের বেসিক ল্যাঙ্গুয়েজ শিখতে থাকেন। ক্লাবে বসেই ট্রে (বিল গেটসের ডাকনাম ছিল ট্রে) দু’টি পোগ্রাম তৈরি করে ফেলেন। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে করতে অন্য কিছু তাদের মাথায় থাকতো না। গেটস অংকসহ কিছু সাবজেক্টে মনোডোগী ছিলেন না। তিনি লেকসাইড প্রাইভেট স্কুলের ছাত্র পেয়েছিলেন, অনেক বন্ধুর মাঝে পল এলেনকে ক্লাসমেট হিসেবে পেয়েছিলেন। পল এলেন সেই কঠিন ও সংগ্রামী দিন গুলোর কথা তার স্মৃতিময় লেখায় উল্লেখ করেছেন। তার স্কুলের কথা, শিক্ষকের , পাঠদান পদ্ধতির কথা, বিল গেটস এবং তাদের সংগ্রামের কথা সেই প্রয়োজনীয় কথাগুলি সরাসরি তার কাছ থেকেই জেনে নেওয়া যেতে পারে।

কম্পিউটার নিয়ে দু বন্ধূ প্রচুর সময় ব্যয় করায় তারা হাভার্ড থেকে ড্রপআউট হন। এ সম্পর্কে তার পিতা-মাতা রাগান্বিত না হয়ে বরং তাদের কাজে উৎসাহ দেন, এর ফলে তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। এভাবেই কম্পিউটারে কাজ করতে করতেই একদিন তিনি ও তার বন্ধু পেল এলেন এক নতুন দিগন্ত আবিস্কার করেন। বিল গেটস বললেন, আমরা বিশ্ব জয় করতে যাচ্ছি। এবং এখান থেকেই বিশ্বখ্যাত মাইক্রোসফট কোম্পানির জন্ম। আর এ কোম্পানির মাধ্যমেই বিল গেটস বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ধনীদের একজন। ১৯৯৫ সাল থেকে সেই গত ২০০৭ পর্যন্ত টানা ১৩ বৎসর যাবৎ বিল গেটস বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। বর্তমানে তার অবস্থান আমেরিকায় প্রথম হলেও বিশ্বে দ্বিতীয়।

সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী তার মোট সম্পদের পরিমাণ হচ্ছে বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৫,০০,০০০,০০,০০,০০০/- গেটস ১৯৯৪ সালে মিলিন্ডাকে বিবাহ করেন। তাদের তিনটি সন্তান আছে। গেটস রকফেলার ও এন্ড্রু কার্নেগীর জীবনি অধ্যয়ন করে ২০০০ সালে Bill & Melinda Gates Foundation প্রতিষ্ঠিত করেন। অপরদিকে তার দানের পরিমাণ কিন্তু কম নয়, তার সঞ্চিত সম্পদের প্রায় ৪০% প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার র্অথাৎ বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ২,০০,০০০,০০,০০,০০০/- টাকা। বিল গেটস দুটি বিখ্যাত বই লিখেন, The Road Ahead and Business, The speed of thought.

ইনোভেটর

স্টিভ জবস (১৯৫৫-২০১১) অ্যাপেলের চিফ হিসেবে বাৎসরিক বেতন নিতেন মাত্র ১ ডলার। কিন্তু অ্যাপেল, ডিজনীতে তার লক্ষ লক্ষ শেয়ারের বিনিময়ে আর অর্জিত সম্পদের পরিমান বাংলাদেশী টাকায় ৬৮,০০০,০০,০০,০০০/- । গত বছর তার মৃত্যুতে সারা দুনিয়া কেঁপে উঠে ও বারাক ওবামা বলেন, ‘বিশ্বকে বদলে দিতে পারবেন, তার এমন ভাবার সাহস ছিল আর ছিল তার করে দেখানোর প্রতিভা’। একই বছর জন্ম নেওয়া এবং অন্যতম প্রতিদ্বদ্ধী বিল গেটস বলেছেন “প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্টিভের প্রভাব অনুভব করবে। এমন মানুষ পৃথিবীতে খুব কমই আসে।” ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা তরুণ জুকারবার্গ বলেছেনম “তুমি যা করেছো, তা বিশ্বকে বদলে দিতে পারে এটা দেখানোর জন্য ধন্যবাদ স্টিভ”। সবচেয়ে বাস্তব কথাটি বলেছেন স্টিফেন স্পিলবার্গ, “টমান এডিসনের পর সব থেকে সেরা আবিষ্কার্তা”।

প্রথমতঃ আমরা জোহান ডি. রকফেলার (১৮৩৯-১৯৩৭) ও এন্ড্রু কার্নেগী (১৮৩৫-১৯১৯) কে নিয়ে আলোচনা করেছি যাদের জন্ম প্রায় ১৭৫ বছর আগে এবং তার মৃত্যুবরণ করেছেন ৭৫ বছর আগে। এরপর আলোচনা করেছি বিল গেটস (১৯৫৫), স্টিভ জবস (১৯৫৫-২০১১) কে নিয়ে যাদের জন্ম একই বছর ১৯৫৫ সাল অর্থাৎ ৫৭ বছর আগে। স্টিবস জবস ইন্তেকাল করলেও বিল গেটস এখনও জীবিত। আর এ চারজনের মাধ্যমে গত দেড়শত বছরের ব্যবসার কিছুটা গতিপ্রকৃতি বিশেষ করে আকাশচুম্বি সাফল্যের পিছনে তাদের দুঃসাহসী ভিশন, অক্লান্ত পরিশ্রম, সহযোগীদের কাজে লাগানো, নব নব উদ্ভাবন সর্বোপরি মানবতার জন্য তাদের অবদান এবং প্রভুর প্রতি তাদের পরম বিশ্বাস স্ব স্ব সময়ে এমনকি অনাদিকালের জন্য তারা ব্যবসা ও মানবতার উৎকর্ষতার আকাশে ভাস্কর হয়ে থাকবেন।

এইচপি এর জন্ম যেখানে: বিশ্বের সেরা সেরা কোম্পানিসমূহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একেবারে নিম্ন পর্যায় থেকে যেমন, মাইক্রোসফট, অ্যাপেল, ডেল, আমাজান, ডিজনী, গুগল, এইচপি এমনকি ফেসবুকের মত প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছে নিজ নিজ বাসার একেবারে গ্যারেজ থেকে। পৈত্রিকসূত্র,প্রতিভা, সময় এবং পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে ইয়ংগেস্ট বিলিওনিয়ার হয়েছেন অনেকেই তাদের কয়েক জনের বিবরণ দেওয়া হলো।

মানুষের জীবন নিয়ে এত আলোচনার কী দরকার? তার উত্তরটি দিচ্ছি আরেক জনপ্রিয় ব্যক্তির ভাষায়। “মানুষকে না জেনে আপনি মানুষের মতো মানুষ হতে পারবেন না। আপনি যা হতে চান, সে জন্য পথ বা পন্থা চাই। আর সেটা পাবেন কোত্থেকে? মানুষের জীবন থেকে হ্যাঁ, মানুষের জীবনই জীবন-সাফল্যের বিরাট এক সফল অভিধান”। মাত্র ৪০ শব্দের ৪টি বাক্যের সে কথাটি একজন সফল হতে ইচ্ছুক মানুষ সোনার হরফে নিজের ডেস্ক এর সামনে টাঙ্গিয়ে রাখতে পারেন। কে বলেছেন কথাটি? কেন, এটি নিয়ে এত নাটকীয়তা? ঘাল-জামানায় মোটিভেশনাল লেখক কিংবা বক্তাদের তালিকা অনেক লম্বা। কিন্তু তাদের সবার গ্রান্ড ফাদার বা গ্রান্ড মাস্টার হিসেবে বিবেচনা করা হয় ডেল কার্নেগীকে, এটি তারই কথা।

তিনি ১৯৫৫ সাল অর্থাৎ মৃত্যুর বছর পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন তার বক্তব্য এবং লেখনীর মাধ্যমে। সেখানে শত শত মানুষের সফলতার চমৎকার সব উদাহরণ এসেছে কিন্তু তাকে নিয়ে লেখা হয়েছে খুবই কম। ১৯৮৮ সালে আমেরিকার মৌসরীরতে এক ফার্মে কৃষক পিতার ঘরে চরম দারিদ্রতার দোলনায় তার জন্ম। তিনি ছিলেন পিতামাতার ২য় সন্তান। সেই শৈশবেই তিনি প্রতিদিন ভোর ৪টায় উঠতেন তার পিতা-মাতার সহযোগিতায় গরুর দুধ দোহানোর জন্য। শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের ছাত্র থাকাবস্থায় একটি ইঁদুর ভর্তি কক্ষে প্রতিদিন থাকা খাওয়ার খরচ ১ ডলার সংগ্রহ করতে তিনি গলদর্ঘম হতেন। কিছূটা পরিচিতি লাভের আশায় তিনি কলেজে অ্যাথলেট এবং পাবলিক স্পিকিং কোর্সে ভর্তি হতে চাইলেন কিন্তু নিদারুণভাবে ব্যর্থ হলেন চরম হীনমন্যতার কারণে।

১৯০৮ সালে গ্রাজুয়েশন করার পর নানা কাজে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে ১৯১২ সালে দায়িত্ব নিলেন YMCA এর শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালার। রূপোর চামচ মূখে নিয়ে জন্ম না হলেও তার জিহ্বাটি ছিল যেন রূপার তৈরি।যার সাহয্যে পরবর্তীতে লাখো মানুষকে তিনি অনুপ্রানিত করেছেন ঐশ্বর্যশালী, প্রতিপত্তিবান, সুখি এবং সফল হওয়ার জন্য অত্যন্ত সিরিয়াসলি হাজার হাজার মানুষকে নিয়ে কাজ করার সেই অনবদ্য কাহিনী ও অভিজ্ঞতা নিয়ে ২৪ বছর পর ১৯৩৬ সালে তিনি রচনা করেন তার অনবদ্য বই How to Win Friends and Influence People. ১৯৫৫ সালে তার মৃত্যুর দিন পর্যন্ত প্রকাশকদের ভাষ্যমতে ২০ বছরে তার সেই বইটির বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪৮,৪৪,৯৩৮টি। তখন পর্যন্ত যার ৭১টি প্রিন্ট এমনকি ২৯টি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে।

মনে রাখতে হবে সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ১৬ কোটি আর পৃথিবীর জনসংখ্যা ২৮০ কোটি মাত্র। মৃত্যুর পূর্বেই গত ৪০ বছরে তার প্রণিত Mr. Carnegie’s courses গ্রহণ করেছে বিশ্বের ৭৫০টি শহরের ৪,৫০,০০০ মানুষ। তার উল্লেখযোগ্য বইসমূহ হচ্ছে; Lincoln the Unknown (1032), Little Known Facts About Well Known People (1934), Five Minute Biographies (1937), Biographical Roundup (1945) and How to Stop Worrying and Start Living(1948)

ধারণা করা হয় পৃথিবীতে এ পর্যন্ত জন্মগ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০,৭৬০ কোটি। গবেষক খ্রিষ্ট জন্মের প্রায় ৫০,০০০ বছর আগে আদম ও হাওয়া বা এডাম ও ইভের জন্ম ধরে এই ধারণাপত্র তৈরি করেছেন । এই ১০,৭৬০ কোটি মানুষের ভেতর সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি কে ? নিশ্চয়ই এটি পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন সমূহের অন্যতম। মাইকেল এইচ হার্ট প্রায় অসম্ভব এ কাজটি সম্পন্ন করার জন্য ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায় এমন প্রায় ১০,০০০ মানুষের জীবন অধ্যয়ন করার ব্যবস্থা করেন। আর এর ভিত্তিতে ১৯৭৮ সালে রচনা করেন তার জগৎ বখ্যিাত বই The 100: A ranking of the most influential persons in history’. বিরাট সাধনা করে লেখা এই বইটি কয়েকদিনের মধ্যেই ৫ লক্ষ কপি বিক্রি হয়ে যায়, প্রায় ৭৫টি ভাষায় এর অনুবাদ হয় তবু ষড়যন্ত্র করে ১৫ বছর (১৯৯২) পর্যন্ত এর নতুন কোনো এডিশন আটকে রাখা হয়।

মাইকেল এইচ হার্ট সবাইকে চমকে দিয়ে সেই বইতে সর্বকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যাক্তি হিসেবে তুলে ধরেন নবী মুহাম্মদ (সা.) কে । মুহাম্মদ (সা.) এর অনেক গুরুত্বপূর্ণ গুণাবলী ও সফলতার কথা সেই বইতে বর্ণিত হয়েছে। এর ভিতর আছে তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী। এ পর্যায়ে আমরা গত দেড়শত বছরের বিশ্বের সেরা সেরা ব্যবসায়ীদের আলোচনার পর প্রায় ১৫ শত বছর আগে যিনি এসেছিলেন এবং আদি থেকে অনাুদ সকল কালের জন্য শ্রেষ্ঠ মডেল সেই রাসুল (সা.) এর প্রসঙ্গে আসবো। ইতিহাস অধ্যয়ন করে আমরা পাই রাসুল (সা.) ১২ থেকে ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত মোট ১৪ বছর ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। চাচা আবু তালিবের সাথে তৎকালীন শাম অর্থাৎ বর্তমানের লেবানন, জর্দান, সিরিয়া ও প্যালেস্টাইন এবং চাচা যুবায়ের সাথে ইয়েমেন এলাকায় ব্যবসায়িক সফরে যান। ইতোমধ্যেই তিনি সেই চরম জাহেলী আরব সমাজ থেকেই তার সত্যবাদিতার জন্য আস্সাদিক এবং আমানতদারিতার জন্য আল্ আমিন উপাধি পান।

সেই সমাজের এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন খাদিজা বিনতে খুওয়ালিদ। ধনাঢ্যতার কারণেই যার অন্যতম উপাধি ছিল খাদিজাতুল কুবরা বা গ্রেট খাদিজা। দেশ হতে দেশান্তরে যার ব্যবসা বহরগুলি এতই বিশাল হতো যে তখন প্রচলিত ধারণা ছিল সবার বহর একত্র করলে যা হবে একা খাদিজার বহর ততটুকুন। তিনি লোক মারফত মুহাম্মদ (সা.) এর কাছে প্রস্তাব দিলেন তার ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব নিতে। যদি তিনি সেটি গ্রহণ করেন তবে তাকে আরবের প্রচলিত পরিমাণের দ্বিগুণ কমিশন দেওয়া হবে। মুহাম্মদ সা. চাচা আবু তালিবের সাথে পরামর্শ করে সে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর এতে খাদিজাতুল কুবরার অভাবনীয় লাভ হয়। এই ব্যবসায়িক বুদ্ধিমত্ত্বা ও সততার জন্যই মূলত খাদিজা (রা.) মুহাম্মদ (স.) এর প্রতি আকৃষ্ট হওয়া ও পরবর্তীতে প্রস্তাব দিয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ।

মানবতার উৎকর্ষের গুণাবলী

মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনের ২৫ থেকে ৪০ বছরের বিবাহিত সময়কালে খাদিজা (রা.) তার চেয়ে ১৫ বছরের ছোট স্বামীর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন। নবী হওয়ার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত এই শ্রদ্ধাপ্রদর্শনের কারণকী? তার মহৎ ও পূত-পবিত্র যা প্রকাশ পেয়েছে তার পারিবারিক, সামাজিক এবং ব্যবসায়িক কর্মক্ষেত্রে। মোহাম্মদ আব্দুল করিম খান সংকলিত “বাংলায় বোখারী শরীফ হাদিসসমূহ” বইটির ঈমান অধ্যায়ে ২য় হাদিসটি যেটি বর্ণিত হয়েছে আয়েশা (রা.) থেকে তাতে বলা হয়েছে, প্রথম ওহি নাজিলের পর হযরত বুঝতে পারলেন তার উপর বড় কোন দায়িত্ব আসছে; তাই তিনি বিচলিত হয়ে বলিলেন, “আমার ভয় হইতেছে আমার জীবনে কুলাইবে কিনা, আমার শরীরে সহ্য হইবে কিনা?”

তীক্ষ্ণ  বুদ্ধিসম্পন্না বিবি খাদিজা (রা.) তাকে সান্তনা দিয়ে বলিলেন, “খোদার কসম, কিছুতেই নয়, আল্লাহ আপনাকে কিছুতেই অপদস্ত করিবেন না নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করিবেন-আপনাকে জয়যুক্ত করিবেন। কেননা, মানবতার উৎকর্ষের মূল সাতটি গুনাবলীই ১. আত্মীয় স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করিয়া আত্মীয়তার হক আদায় করা। ২. সত্যবাদিতা। ৩. সকল ক্ষেত্রে বিশ্বাসী আমানতদার হওয়া। ৪. এতিম, বিধবা, অন্ধ, খঞ্জ তথা অক্ষমদের খাওয়া, পরা ও থাকার বন্দোবস্ত করিয়া দেওয়া। ৫. বেকার সমস্যার সমাধান করিয়া দেওয়া। ৬. অতিথিপরায়ণতা। ৭. প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্ষেত্রে দুস্থ জনগনের সাহায্যে জীবন উৎসর্গে প্রস্তুত থাকা, আপনার মধ্যে রহিয়াছে”।

মুহাম্মদ (স.) ব্যবসায়িক জীবনে নিজে যে আদর্শ অনুসরণ করতেন এবং অন্যদের করার জন্য বলতেন তার কিঞ্চিৎ বিবরণ কোরআন-হাদিস থেকে দেওয়া হলো যা হবে আমাদের চলার পথের আলোকবর্তিকা।

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.