উপলব্ধি

ইসরাত জাহান

পৃথিবীর জটিল সব সমীকরণ কেন জানি মাথায় আসে না রাজিয়া বেগমের। মেয়ের  কথায় কেমন যেন খেই হারিয়ে ফেলেন তিনি। যে কথা বলছে সে তো তারই আত্মজা। যে ভাষায় কথা বলছে মনে হচ্ছে এ অন্য কেউ। বড্ড অচেনা মনে হচ্ছে নিজের মেয়েকে। অনেক কথা ভিড়ে একটা শব্দই তার কানে বাজছে , ‘আমি তোমার মেয়ে হতে পারি কিন্তু তোমার মত বোকা না।’ তাহলে তিনি কি খুব বোকা? কি জানি হবে হয়ত!

মা তুমি কি ভাবছ? আমি এখন কি করব বললে না তো। মেয়ে রায়হানার ডাকে চমকে ওঠেন রাজিয়া বেগম। বললেন মাত্রইতো এলে হাতমুখ ধুয়ে কিছু   খাও, বিশ্রাম নাও পরে দেখা যাবে।

রাজিয়া বেগম অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক। যৌথ পরিবারের বড় বউ। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ীতে এসে তিনি যেন অথৈ সাগরে পড়ে গেছিলেন। এইচএসসি পাশ করার সাথে সাথে প্রাইমারী স্কুলে চাকরিটা হয়ে গেছিল তার। নিম্নবিত্ত পরিবারে এমন একটা সরকারি চাকরি রাজিয়ার বাবা-মা যেন সাত রাজার ধন পেয়েছিল। বাবা যদিও মেয়ের কাছ থেকে কোনো টাকা নিতে চাইতেন না।  তবে রাজিয়া বুদ্ধিমতি মেয়ে পাছে বাবার সম্মানে আঘাত লাগে এমন কাজ এড়িয়ে গেছে, তার পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে উদ্যাোগ নিয়েছে।

বাবাকে সরাসরি কোনো টাকা দেয়নি তবে বাড়ির পাশে একটু জমি কিনে বাবাকে বলেছিল এখানে আমরা শাক-সবজির চাষ,  মুরগীর খামার করতে পারি তাই না। ছোট ভাই দুটো বেশি লেখাপড়া করতে চায় না। তাই তাদেরকে রাজিয়া বলল, অন্যের কাছে চাকরি না করে চলো আমরা ব্যাবসা শুরু করি। দুই ভাইতো আকাশ থেকে পড়ল। বুবু তাহলে তুমি মাস্টারী ছেড়ে ব্যবসা করবা। আরে না তোমরা আছ না আমি পুঁজি দেব তোমরা শ্রম দেবে। দুইভাই খুশি হয়ে ওঠে তাহলেতো খুব ভালো।

দুই ভাই তাদের বুবুর মুখ রক্ষা করেছে৷ সেই ছোট ব্যবসাই সময়ের পরিক্রমায় লাভজনক হয়ে উঠেছে। রাজিয়ার বাবা মেয়ের সব চালাকি বুঝতে পারতো। গোপনে মেয়ের জন্য খুব দোয়া করতো আর ভালো ঘর-বর খুঁজত। আল্লাহ হয়ত পিতার আকুল এ ডাকে সাড়া দিলেন। ঘটক এক পাত্রের সন্ধান দিলো খুব ভালো পরিবার ,বনেদি ব্যাবসায়ীর বড় ছেলে। ছেলের পিতা রাজিয়া বেগমকে কোনো অনুষ্ঠানে দেখে পছন্দ করেছে। এখন যদি মেয়ের বাবা রাজি থাকেন তাহলে ওনারা  বিয়ের দিনক্ষণ পাকা করতে চান।

আপত্তির কিছু নাই! এত ভালো ঘর! রাজিয়ার পরিবারেও এখন আর অভাব অনটন নাই। তাই সেও খুশিমনেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল। সবই ঠিক ছিল, শুধু গোল বাধল বউয়ের চাকরি নিয়ে। বাড়ির বড় বউ যার উপর সকল দায়িত্ব তিনি যদি স্কুলে গিয়ে বসে থাকেন তাহলে সংসার যে উচ্ছন্নে যাবে! শ্বাশুড়ি, চাচী শ্বাশুড়ি, দাদী শ্বাশুড়ি সকলে একযোগে বলেছিল। রাজিয়া স্বামীর কাছে পরামর্শ চাইলেন তিনি স্পষ্টকরে কিছু না বলে বাড়ির সকলের মতামতই তার মতামত বলে দিলেন। দেখতে দেখতে তার স্কুল থেকে বিয়ে উপলক্ষে নেয়া ছুটি শেষ হয়ে এলো।

রাজিয়া বেগম এরই মধ্যে শ্বাশুড়িদের সাথে কাজে হাত লাগিয়ে অনেকটা মন জয়ও করে নিয়েছিলেন। কিন্তু তারা আাকারে ইঙ্গিতে চাকরি করার বিপক্ষে সেটা বুঝিয়ে দিত। সুযোগ বুঝে রাজিয়া শ্বশুরের কাছে গিয়ে হাজির হন এবং চাকরিটা করার অনুমতি চান । অনেক কষ্টে শ্বশুরকে তিনি রাজী করান। সেই থেকে তার লড়াই শুরু হয়েছিল ঘরে-বাইরে। যৌথ পরিবারে কাজের অন্ত নাই। ভোর ৪টা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত বিরামহীনভাবে কাজ করতে হয়েছে তাকে। তার উপর পান থেকে চুন খসলে তার চাকরির উপর রাগ ঝাড়ত সবাই।

দিনে দিনে সংসারে লোক বাড়তে থাকে কিন্তু বাড়িতে জায়গাতো আর বাড়ে না তাই রাজিয়ার শ্বশুর আালাদা বাড়ি করে চলে আসেন। লোকসংখ্যা কমলেও কাজ কমে না তার। ততদিনে তিনি ৩ সন্তানের জননী। দাদী শ্বাশুড়ি খুব অসুস্থ ; তাকে ছাড়া কাউকে সহ্য করতে পারেন না। তাই সেবার ভার তার ওপর। এর পর শ্বশুর স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে যায়। ২জন রোগীর সেবা, সংসার, স্কুল;, সব কিছু সামলাতে তাকে হিমসিম খেতে হয়েছে। স্বামীর সহানুভুতি ছিল তাই বলত রায়হানার মা তুমি এবার চাকরিটা ছেড়ে দাও অনেকতো  হল। তোমার এত কাজের চাপ!

রাজিয়া অভিমানে চুপ করে থাকত আবার কখনো বলত তুমি একটু সাহায্য করলেই তো আমার জন্য সহজ হয়ে যায়। আমি ? পুরুষ মানুষ সংসারের কাজে হাত লাগালে সেটা শোভন দেখায় না। রাজিয়া বেগম জানত লড়াইটা তার একার, তাই একাই লড়তে হবে। রায়হানার ফুপু চাচাদের বিয়ে হয়ে গেল। সংসারে আবারও লোক বাড়ল। এবার রাজিয়া বেগম ভেবেছিলেন তার বুঝি ছুটি হলো। কিন্তু বাড়ির অন্য বউরা কেউ যৌথ পরিবারে থাকতে চাইল না তাই আলাদা হয়ে চলে গেল। রাজিয়া বেগমের শ্বশুর-শশুড়ি ওনার সাথেই থাকতে চাইলেন। তিনিও তাদেরকে সম্মানের সাথে রাখলেন।

অন্য জায়েরা তাকে আড়ালে বোকা বলত, কেউ বলত সম্পত্তির লোভে সেবা করে সময় হলে ঠিক বুঝতে পারবে। এসব শুনেও কিছু বলত না নিজের মনে কাজ করে যেত সে। কেউ কেউ সহানুভুতি দেখাতে আসতো তুমি এত করো তবু সবাই তোমার নিন্দা করে কিছু বলো না কেন? তিনি তাদের হাসিমুখে বলতেন, কই আমায়তো কেউ কিছু বলে না। রাজিয়ার ২মেয়ে ৩ছেলে। সব সন্তানকেই তিনি স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলেছেন। ছেলে মেয়েদের তিনি ঘরের সব কাজ  করতে শিখিয়েছেন। এ নিয়ে স্বামী আর শাশুড়ির কম কটু কথা শোনেন নি!

নির্লজ্জ মেয়েমানুষ নিজে গায়ে বাতাস লাগায়ে চাকরি করে আর ছেলেদের দিয়া হাড়িপাতিল ধোয়ায়, ঘরমোছায়, রান্না করায় । আল্লাহ এসব সহ্য করবে না। আল্লাহ সহ্য করেছে কি করেনি তা তো আর মানুষ জানতে পারে না তবে রায়হানার দাদা-দাদীর সেবায় এতটুকু ত্রুটি হয়নি ঘরের ছেলে মেয়েগুলো সব মাকে সাহায্য করত বলে।রায়হানার বিয়ের কিছুদিন পর দাদা-দাদি মারা যায়। শ্বশুর-শাশুড়ি মুখে না বললেও তারা যে তার জন্য অনেক দোয়া করতেন তা তাদের আচরণে বুঝতে পারতেন।

একে একে সব ছেলেদের বিয়ে দিয়ে আলাদা আলাদা সংসার পেতে দিলেন মেয়েরাও স্বামী সংসার নিয়ে সুখে আছে । আত্মীয় পরিজন হৈ হৈ করে উঠল। কেমন মা তুমি মনে এতটুকু মায়া দায়া নাই। নতুন বউদের কেউ একা ছেড়ে দেয়। হেসে বলতো- একা ছেড়ে দিব কেন?  আমিতো আছি ওদের সাথে সব সময়। সবাই বলল ঢং।

চাকরি থেকে অবসর হলেও ছুটি হয়নি তার সংসার থেকে। যদিও বুড়া-বুড়ির সংসার। ছেলে বউরা নিয়ম করে খোঁজ নেয়। খাবার পাঠায়। মাঝে মাঝে তিনিও নাতি-নাতনীদের নিয়ে নিজের বাড়িতে পিকনিক করেন। তখন অবশ্য তার তিন ছেলে আর নাতিরাই আর এসিস্ট্যান্ট হিসাবে থাকে। নাতনীরা গাল ফোলায়, দাদী আমরা বুঝি রান্না করতে পারি না । তিনি হাসেন, বলেন পারবি না কেন এটাতো সহজ কাজ সবাই পারে।

বিকেলে বারান্দার ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে এত সব স্মৃতির সাগরে সাঁতরে বেড়াচ্ছিলেন বকুলপুর গ্রামের  রাজিয়া আপা। শতশত ছাত্র ছাত্রীর বুকে যিনি আদর্শের  আলো জ্বেলেছেন শিখিয়েছেন বড়দের শ্রদ্ধা আর ছোটদের ভালোবাসতে, শিখিয়েছেন কাজ কাজই, কাজের কোনো কাজ ছোট-বড় নেই, কাজের কোনো লিঙ্গ পরিচয় নেই। আর আজ তার মেয়েই কিনা বলছে শাশুড়ি একটা বোঝা, সারাক্ষণ কুটনামী করে,,,, উঠতে বসতে কথা শোনায়, তাছাড়া ওনার সেবা করতে ইসলাম আমাকে বাধ্য করেনি। আর  শোন মা আমি তোমার মতো বোকা না যে গাধার মতো খাটব।

নিচের ঘরে কোলাহল বেড়েছে গ্রামের মেয়ে বউরা  একত্রিত হয়েছে। রাজিয়া বেগম উঠে দাঁড়ালেন আর বসে থাকা চলে না। তার মেয়ে আজ চেখো আঙ্গুল দিয়ে শিক্ষার যে ক্ষত দেখিয়ে দিল তা যে সারিয়ে তুলতে হবে। ভালোর উপর মন্দ কত বেশী প্রভাব বিস্তার করে তা তিনি মেয়েদের দিকে তাকালেই দেখতে পাচ্ছেন। হাত পেতে নিলেই যে সব পাওয়া হয়ে যায় না, জীবন খাতায় কিছু পাওয়া বাকী রাখা যায়। রাজিয়া আপা কোলাহলমুখর ঘরের দিকে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যেতে থাকেন।

 

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *