বিপ্লবী আনোয়ার ইব্রাহিম : কারাবন্দি থেকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী

আনোয়ার ইব্রাহিম। একজন বিপ্লবী। একজন তারকা রাজনীতিবীদ। মালয়েশিয়ার ১০ম প্রধানমন্ত্রী। এশিয়ার ভবিষ্যত। মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক অঙ্গনের  উজ্জ্বল তারকা। দীর্ঘ সময়ের বিরোধীদলীয় নেতা। বিরোধী জোট পাকাতান হারাপান (পিএইচ) এর চেয়ারম্যান। কয়েকদশক ধরেই মালয়েশিয়ার রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র ও রাজনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক।

তিনি দশকের পর দশক ধরে মালয়েশিয়ার ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা উত্থান-পতনের সম্মুখীন হয়েছেন। মালয়েশিয়ার প্রবীণ  এই বিরোধী নেতাই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা সরকারী দলকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে পেরেছেন।  এই রাজনীতিবিদের সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবন বিরোধীদের আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করেছে, জুগিয়েছে এগিয়ে চলার খোরাক। মালয়েশিয়ার কয়েক দশকের শাসনকারী দলকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের প্রতিটি পর্যায়ের নায়ক তিনি।

এক নজরে দেখে নিন লুকিয়ে রাখুন

দশম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ

নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অনেক নাটকীয়তা শেষে আনোয়ার ইব্রাহিমই মালয়েশিয়ার দশম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন। ২৪ নভেম্বর বৃহস্পতিবার বিকালে দেশটির প্রধান রাজা ও পেনাংয়ের সুলতান আবদুল্লাহ রিয়াতউদ্দিন আল মোস্তাফার উপস্থিতিতে তিনি শপথ নেন।  কুয়ালালামপুরে সুলতান আবদুল্লাহর প্রশাসনিক ভবন আস্তানা নেগারা রাজপ্রাসাদে ইয়াং ডি-পার্টুয়ান আগাং-এর সামনে শপথ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। রাজা আল সুলতান আব্দুল্লাহর  শপথ বাক্য পাঠ করান।

২৬ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান

২৬ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা আর সংগ্রামের পর ৭৫ বছর বয়সী পাকাতান হারাপান জোটের নেতা আনোয়ার ইব্রাহিম প্রধানমন্ত্রী হলেন। সরকারের উচ্চপর্যায়ের পদ থেকে নির্বাসিত বিরোধী নেতায় পরিণত হয়েছেন। আদালতের মুখোমুখি হয়েছেন। কারাবরণ করেছেন। তার সাথে বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। ক্ষমতার খুব কাছে থেকে বারবার ফিরে আসতে হয়েছে তাকে। বারবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার হাতছানি পেলেও শেষ পর্যন্ত তা অধরা থেকেছে।

সময় এখন বিপ্লবী আনোয়ার ইব্রাহিমের

সময় এখন বিপ্লবী আনোয়ার ইব্রাহিমের। গল্প এখন কারাবন্দি থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার। সুদীর্ঘ লড়াইয়ের পর তিন দশক ধরে দেখে আসা স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। পাড়ি দিতে হয়েছে কণ্টাকীর্ণ বন্ধুর পথ। কখনো কখনো ছিটকে পড়েছেন রাজনীতি থেকে।
জননন্দিত এক হতভাগ্য নেতা আনোয়ার ইব্রাহিম একটি চ্যালেঞ্জিং সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে মালয়েশিয়ার অর্থনীতি মন্থর হয়ে পড়ছে। দেশটি বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় আনোয়ার ইব্রাহিম চান দুর্নীতি বিরোধী কাজে জোর দিতে এবং দেশকে বর্ণবাদ ও ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করতে।

নয় বছর কারাগারে ছিলেন আনোয়ার ইব্রাহিম

ক্ষমতার রাজনীতির ভেতরের চক্রান্তের কারণে রাজনৈতিক জীবনে তাকে দু’বার কারাবরণ করতে হয়েছে। সমকামিতার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি মোট ন’বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। আনোয়ার অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর, সম্পদের পাহাড় গড়া কিছু পরিবারের বিরুদ্ধে কঠোর। তাই কখনোই শাসকগোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয় না হলেও জনগণ তাকে সবসময় ভালোবেসেছে ও তার ওপর আস্থা রেখেছে।

এশিয়ার ভবিষ্যত আনোয়ার ইব্রাহিম

মালয়েশিয়ার প্রবীণ নেতা আনোয়ার ইব্রাহিম। এশিয়ার একসময়কার দ্রুত-উদীয়মান রাজনৈতিক তারকা ছিলেন। ১৯৯৭ সালে টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে যাকে ‘এশিয়ার ভবিষ্যৎ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল।

আনোয়ার ইব্রাহিমের জন্ম ও শিক্ষাজীবন

আনোয়ার বিন ইব্রাহীম ১৯৪৭ সালের ১০ আগস্ট  মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় পেনাং রাজ্যের চিরোক তক্কুন গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ইব্রাহীম আব্দুল রহমান একজন হাসপাতালের কর্মচারী ছিলেন এবং পরবর্তীকালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তার মা চে ইয়েন হুসেন একজন গৃহিণী ছিলেন।

আনোয়ার ইব্রাহীম তার শিক্ষাজীবন তার নিজ গ্রামে শুরু করেন। তিনি মালয় কলেজ কুয়ালা কানজার থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন। ইউনিভার্সিটি অফ মালয় থেকে মালয় স্টাডিজ এ অনার্স এবং ১৯৭৪-৭৫ সালে জেলে থাকা অবস্থায় মাস্টার্স সমাপ্ত করেন। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ মালয়েশিয়ার প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন।

আনোয়ার ইব্রাহিমের রাজনৈতিক জীবন

মালয়েশিয়ার ৭ম উপ-প্রধানমন্ত্রী। প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা উত্থান-পতনের সম্মুখীন হয়েছেন। আনোয়ারের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় কুয়ালালামপুরের মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬০ সালে। ছাত্রজীবনে ১৯৬৮-১৯৭১ সাল পর্যন্ত ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মালয়েশিয়ান মুসলিম স্টুডেন্টস এর সভাপতি ছিলেন। একই সময়ে ইউনিভার্সিটি অব মালয়া মালয় ল্যাংগুয়েজ সোসাইটির সভাপতি ছিলেন।

১৯৭১ সালে মুসলিম ইয়ুথ মুভমেন্ট অব মালয়েশিয়া (এবিআইএম) সংগঠিত হলে এর সহযোগী প্রতিষ্ঠাতা ও প্রো কমিটির সদস্য ছিলেন। একই বছর মালয়েশিয়ান ইয়ুথ কাউন্সিল এর ২য় সভাপতি নির্বাচিত হন ইসলামপন্থী এই তরুণ ছাত্র নেতা। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এবিআইএম’র প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সেসময় তিনি সুদক্ষ বাগ্মিতায় গ্রামীণ জীবনের সমস্যার কথা তুলে ধরেছিলেন।

ঘটনাচক্রে প্রধানমন্ত্রী মাহাথিরের পক্ষ থেকে ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ইউএমএনও- তে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পান তিনি। ১৯৮২ সালে সেই আমন্ত্রণ স্বীকার করে মাহাথির মোহাম্মদের উদারপন্থী দলে যোগ দেন। এরপরই তার উত্থান ঘটে। তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন।  তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দ্রুত পরিবর্তন করতে থাকে। ১৯৮৩ সালে যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী, ১৯৮৪ সালে কৃষি মন্ত্রী এবং ১৯৮৬ সালে শিক্ষামন্ত্রী হন। ১৯৯১-১৯৯৮ সাল পর্যন্ত অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১ ডিসেম্বর  ১৯৯৩- ২ সেপ্টেম্বর ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯৭ সালে তাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ন্যস্ত করে মাহাথির দুই মাসের ছুটি কাটান।

১৯৯৮ সালে তিনি ‘এশিয়ান অফ দ্য ইয়ার’-এর শিরোপাও পান। তবে মাহাথিরের সাথে মতপার্থক্যের জেরে ১৯৯৮ সালে উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেন মাহাথির। পরে তার বিরুদ্ধে আনা হয় সমকামিতা ও দুর্নীতির অভিযোগ। নেয়া হয় কারাগারে। তাকে রাজনীতিতেও নিষিদ্ধ করেন আদালত। পরে উচ্চ আদালতে আপিল করে ২০০৮ সালে নির্দোষ হিসেবে মুক্তিলাভ করেন আনোয়ার; রাজনীতি করার অধিকারও ফিরে পান তিনি। আপিলে প্রমাণিত হয়— তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ছিল মিথ্যা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

আনোয়ারের সমর্থকরা ‘সংস্কার আন্দোলন রিফর্মাসী মুভমেন্ট’ শুরু করে। এ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা বারিসন ন্যাশনাল সরকারের নীতি বহির্ভূত কর্মকাণ্ড বিলোপ করা। ১৯৯৮ সালে কুয়ালালামপুরে অ্যাপেক সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ ও অন্যান্য এ্যাপেক প্রতিনিধিদের সামনে আনোয়ার ও তার সংস্কার আন্দোলনের সমর্থনে ভাষণ দেন।

সংস্কার আন্দোলনের নেতা কর্মীদের নিয়ে ১৯৯৯ সালে আনোয়ার ন্যাশনাল জাস্টিস পার্টি গঠন করেন এবং ৯৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্যে ‘বারিসন অল্টারনেটিভ’ নামে বিরোধী জোট গঠন করেন। ২০০৩ সালের আগস্টে ন্যাশনাল জাস্টিস পার্টি ও মালয়েশিয়ান পিপলস্ পার্টি একীভূত করে পিপলস্ জাস্টিস পার্টি গঠন করে।

২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে পিকেআর, পিএএস এবং ডিএপি মিলে পাকাতান রাকাত নামে জোট গঠন করেন। তিনিই ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট থেকে ২০১৫ সালের ১৬ জুন পর্যন্ত এর  জেনারেল চীফ ছিলেন। জোটটি ২০০৮ সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং ৩১টি আসন জয়লাভ করে বিরোধী দলে পরিণত হয়। আনোয়ার ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট থেকে ২০১৫ পর্যন্ত সালের ১৬ মাচ বিরোধী নেতা ছিলেন। সংসদীয় এলাকা পারমাতাং পাও থেকে নির্বাচিত হয়ে মালয়েশিয় সংসদ সদস্য ছিলেন ২৮ আগস্ট ২০০৮  থেকে ১৬ মার্চ ২০১৫ এবং ২৯ মার্চ ১৯৮২ থেকে ১৪ এপ্রিল ১৯৯৯ পর্যন্ত।

২০১৪ সালের ভোটে যখন তার জয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল, ঠিক তখনই ধাক্কা খান তিনি। সমকামিতার পুরনো অভিযোগে দ্বিতীয়বারের মতো আদালতের নির্দেশে আবারো জেলে যেতে হয় তাকে। পরে ২০১৮ সালের ৯ মে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আনোয়ারের দল ও মাহাথিরের নেতৃত্বাধীন জোট পাকাতান হারাপান এগিয়ে থাকে। ২২২ আসনের পার্লামেন্টে ১১২ আসনে বিজয়ী হয়। এর মধ্যে আনোয়ারের পিপলস জাস্টিস পার্টি-পিকেআর পায় ৪৮ আসন। আনোয়ারের আশীর্বাদ ও তার দলের সমর্থিত প্রার্থী হিসেবেই মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। আনোয়ার ২০১৮ সালের ১৬ মে জেল থেকে মুক্তি পান।  কথা ছিল, দুই বছর পর আনোয়ারের কাছে ক্ষমতা দিয়ে অবসরে চলে যাবেন মাহাথির। কিন্তু কথা রাখেননি মাহাথির।

২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে তিনি পিকেআর এর প্রেসিডেন্ট। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পাকাতান হারাপান এর চেয়ারম্যান। আনোয়ারের পাকাতান হারাপান পার্টি ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো ইতিহাস তৈরি করে তৎকালীন বারিসান ন্যাশনালের রাজত্বের অবসান ঘটায়। কিন্তু দুই বছর পরই এটি ক্ষমতা হারায়। মূলত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ পদত্যাগ করলে শাসক জোট ভেঙে পড়ে এবং মালয়েশিয়া রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে নিমজ্জিত হয়।

মাহাথির ও আনোয়ার ইব্রাহিমের সম্পর্ক

মাহাথিরকে কখনও দেখা গেছে আনোয়ার ইব্রাহিমের গুরু হিসেবে, কখনো বন্ধু হিসেবে, কখনও বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে, কখনও আবার সহযোগী হিসেবে।  মতপার্থক্যের জেরে ঘনিষ্ঠ মিত্র থেকে শত্রুতে পরিণত হয়েছেন, কারাবন্দী হয়েছেন। পরে নাজিব রাজাককে হটাতে মিত্রে পরিণত হয়েছেন।

আনোয়ার ইব্রাহিম ছিলেন মাহাথিরের সম্ভাব্য উত্তরসূরি। আনোয়ার ইব্রাহিমকে রাজনৈতিকভাবে হুমকি বলেও মনে করতেন মাহাথির। ১৯৯৭ সালে এশিয়ায় অর্থনৈতিক সংকট শুরু হলে একসময় রাজনৈতিক মতপার্থক্যও তীব্র হয়ে উঠেছিল উভয়ের মধ্যে। আনোয়ার সরকারের অব্যবস্থাপনা, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির সমালোচনা করতে থাকেন।

প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের সঙ্গে বিরোধের ফলশ্রুতিতে গুরু-শিষ্যের বিচ্ছেদ হয়। এই বিচ্ছেদ থেকে শুরু হয় তার দুর্ভাগ্যের সময়। আনোয়ারের একক সংগ্রামী জীবন চলতে থাকে। মাহাথির দুই দশকের বেশি সময় দেশ শাসন করে অবসর নিলে নতুন একাধিক প্রধানমন্ত্রীও আনোয়ারের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখেন।

২০১৮ সালের ৯ মে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মাহাথিরের নেতৃত্বাধীন পাকাতান হারাপান জোট ২২২ আসনের পার্লামেন্টে ১১৩ আসনে বিজয়ী হয়। মাহাথিরের নতুন দল ছিল ছোট, তারা আসন কম পায়, মাত্র ১৩টি। আনোয়ারের দল পিকেআর পায় বেশি আসন, ৪৮টি। তবু তিনি মাহাথিরকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ দেন। শর্ত থাকে, দুই বছর পর আনোয়ার প্রধানমন্ত্রী হবেন।

২০২০ সালে মাহাথির পূর্ব সমঝোতা অনুসারে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে গড়িমসি করতে থাকেন। ক্ষমতাসীন জোটে ভাঙন দেখা যাওয়ার জেরে মাহাথির পদত্যাগ করেন।  মাহাথির স্থিরচিত্ত ছিলেন যাতে আনোয়ার ইব্রাহিম দেশের প্রধানমন্ত্রী না হন। পরে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার জন্য মাহাথির মোহাম্মদকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিহিতও করেন আনোয়ার ইব্রাহিম।

ক্যারিশম্যাটিক নেতা আনোয়ার ইব্রাহিম

হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো কথার জাদুতে মানুষকে আকৃষ্ট করার অদ্ভুত ক্ষমতা ছাত্র বয়স থেকেই ছিল আনোয়ার ইবরাহিমের। তিনি ক্যারিশম্যাটিক নেতা হয়ে উঠেছিলেন। শুধু মালয়েশিয়ানদেরই নয়, দেশে দেশে অনেক মুসলমানেরই প্রিয় নেতা আনোয়ার ইবরাহিম। শুধু মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয় বরং পুরো মুসলিম বিশ্বের অভিভাবক হিসেবেও তাকে দেখতে চান অনেকে।

যেভাবে ক্ষমতায় আনোয়ার ইব্রাহিম

১৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছিল মালয়েশিয়ার ১৫তম সাধারণ নির্বাচন। তবে পার্লামেন্টের ২২২ আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য ১১২টি আসন পায়নি কোনো জোটই। ফলে এবারও আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ মসৃণ ছিল না। কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় অনিশ্চয়তার দোলাচলে ঘুরপাক খাচ্ছিল মালয়েশিয়ার রাজনীতি।

সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে  আনোয়ার ইব্রাহিমের দল পাকাতান হারাপান (পিএইচ) জোট ৮২টি আসনে জয় পায়। অন্যদিকে মুহিউদ্দিন ইয়াসিনের দল পেরিকাতান ন্যাসিওনাল (পিএন) পায় ৭৩ আসন। কোনো দলই ২২২ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় সমর্থন দেখাতে পারেনি। দেশটিতে সরকার গঠনে ১১২ আসন নিশ্চিত করতে হয়।

তাদের পেছনে রয়েছে মুহিউদ্দিন ইয়াসিনের পারিকাতান ন্যাশনাল পার্টি। তারা পেয়েছে ৭৩টি আসন। প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল সাবরি ইয়াকুবের ক্ষমতাসীন বারিসান ন্যাশনাল (বিএন) জোটের ভরাডুবি হয়েছে। তারা পেয়েছে মাত্র ৩০টি আসন। স্বাধীনতার পর ছয় দশক ধরে মালয়েশিয়া শাসন করা বারিসানের এমন ভরাডুবি মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের বদলেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তাছাড়া বর্ণেও মালয়েশিয়ার সারোয়াক রাজ্যের জিপিএস পেয়েছেন ২২টি আসন ও জিপিআরএস পেয়েছেন ৬টি আসন এবং সাবাহ রাজ্যের ওয়ারিশান পেয়েছেন ৩টি আসন ও অন্যরা পেয়েছেন ৩টি আসন। যা এককভাবে সরকার গঠনে কোনো দলের সামর্থ্য ছিলোনা।

সাধারণ নির্বাচনের পর রাজার হস্তক্ষেপে টানা পাঁচ দিনের অচলাবস্থার কেটেছে। এ অবস্থায় রাজার হস্তক্ষেপে আনোয়ার ইব্রাহিম প্রধানমন্ত্রী হলেন।

মাহাথিরের পরাজয়ে আনোয়ারের বিজয়

দুই দশকেরও বেশি সময় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা মাহাথির মোহাম্মদ ৫৩ বছরে প্রথমবার নিজের পার্লামেন্টারি আসন খুইয়েছেন। শুধু যে হেরেছেন তা-ই নয়, ৯৭ বছর বয়সি এই রাজনীতিক তার জামানতও হারিয়েছেন। মাহাথিরের এমন হারকে ‘বিস্ময়কর’ বলা হচ্ছে।  নির্বাচনে নিজের আসনে পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে চতুর্থ হন মাহাথির। এতে তার দলেরও ভরাডুবি হয়েছে। তার দল একটিও আসন পায়নি।

দ্বিতীয়বারের এই পরাজয়কে তার সাত দশকের রাজনৈতিক জীবনের ইতি হিসাবে দেখা হচ্ছে। জামানত ধরে রাখতে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেতে হতো মাহাথিরের; অথচ তিনি পেয়েছেন ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, সাকুল্যে মাত্র ৪ হাজার ৫৬৬ ভোট। লংকাউয়ির ওই আসন জিতেছেন আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুহিউদ্দিনের পারিকাতান অ্যালায়েন্সের প্রার্থী মোহাম্মদ সুহাইমি আবদুল্লাহ। তিনি পেয়েছেন ২৫ হাজার ৪৬৩ ভোট, দ্বিতীয় হওয়া বারিসান ন্যাশনালের আরমিশাহ সিরাজ পেয়েছেন ১১ হাজার ৯৪৫ ভোট। ২০১৮ সালে এই আসনে মাহাথির পেয়েছিলেন ৩৪ হাজার ৫২৭ ভোট, মোট ভোটের ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ। সেবার তার বিরুদ্ধে বারিসান ন্যাশনালের প্রার্থী পেয়েছিল ২৯ দশমিক ১ শতাংশ ভোট।

মাহাথির ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালে ৯২ বছর বয়সে তিনি পুনরায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী হন। এই দফায় অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে তার সরকারের পতন ঘটে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির শেষদিকে তিনি পদত্যাগ করেন। ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক প্রধানমন্ত্রী হিসাবে গিনেস ওয়ার্ল্ড বুকে নাম লিখিয়েছিলেন তিনি।

আনোয়ার ইব্রাহিমের অবদান

শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর আনোয়ার ‘ন্যাশনাল স্কুল কারিকুলাম’ প্রনয়ণ করেন। মালয়েশিয়ার জাতীয় ভাষার নাম ‘বাহাসা মালয়েশিয়া’ থেকে বাহাসা মেলায়ু এ পরিবর্তন করেন।

১৯৭৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি ওয়ার্ল্ড অ্যাসেম্বিলি অফ মুসলিম ইয়ুথ (ওয়ামি) এর এশিয়া প্যাসিফিকের প্রতিনিধি ছিলেন। ১৯৮১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ইসলামিক থট (আইআইআইটি) এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা তিনি। তিনি আইআইআইটির পরিচালক, ট্রাস্টি ও বোর্ড মেম্বার। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি কুয়ালালামপুরের চ্যান্সেলরের দায়িত্বও পালন করেছেন।

১৯৮৮ সালে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান এবং ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তাতে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৮৯ সালে ইউনেস্কো সাধারণ অধিবেশন এর ২৫তম সভাপতি নির্বাচিত হন। বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন মার্চ ১৯৯৮ থেকে সেপ্টেম্বর ১৯৯৮ পর্যন্ত।   ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত ইউনেসকো জেনারেল কনফারেন্স এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

আনোয়ার ইব্রাহিমের পরিবার

আনোয়ার ইব্রাহিমের স্ত্রীর নাম  ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইলি।  ওয়ান আজিজাহ দেশটির সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী।  ১৯৮০ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তাদের বিয়ে হয়। তার ৫ মেয়ে ও এক ছেলে সন্তান রয়েছে। সন্তান ছয়জন হচ্ছেন- নুরুল ইজ্জাহ আনোয়ার, নুরুল নুহা আনোয়ার, মুহাম্মাদ এহসান আনোয়ার, নুরুল ইলহাম আনোয়ার, নুরুল ইমান আনোয়ার  ও নুরুল হানা আনোয়ার। নুরুল ইজ্জাহ আনোয়ার  পারাতাং পাউহ থেকে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছেন।

আনোয়ার ইব্রাহিমের চিন্তাধারা

কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছিলেন, ‘বন্দি থাকার সময় বোঝা যায় স্বাধীনতার গুরুত্ব কোথায়। কারও ক্ষেত্রে যেন এমনটা না হয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে মানুষকে কারারুদ্ধ করা আমাদের বন্ধ করতে হবে।

আমি কখনও লড়াই ছাড়িনি। আমি রাজনীতিতেই ছিলাম। শারীরিকভাবে না হলেও ছিলাম। আমাকে এটা প্রচার করতে হবে যে, যুক্তি ও সহিষ্ণুতাই ইসলামের পথ। এর মাধ্যমে দেশের নাগরিকদের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারও নিশ্চিত করা যাবে। আমার লক্ষ্য দেশের মঙ্গল। আমাদের কঠিন সময় গিয়েছে, অব্যাহত ভাবে আমার চরিত্রের ওপর কালিমা লেপন করা হয়েছে। বিরোধীদলকে ভয় দেখানো বা হয়রানি-নিপীড়নের জন্য আদালতকে ব্যবহার করা যায় না। ধর্ম বা বর্ণের ভিত্তি নয়, মালয়েশিয়া চলবে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে। মালয়েশিয়ার জনগণ পরিবর্তন চায়।

আমি সব সময় গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, উদার চিন্তার কথা বলেছি। কিন্তু আপনি যখন এর আস্বাদ নিতে যাবেন, একটা পার্থক্য চোখে পড়বে। স্বাধীনতা অস্বীকার করা হলে এটা আপনার কাছে অত্যাচার এবং এটা বেঁচে থাকারও কারণ। আমি একনিষ্টভাবে সোচ্চার থেকে গণতন্ত্রের জন্য, সংস্কারের জন্য এমনকি স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার জন্য কাজ করে যাবো। আমি মুক্ত থাকতে চাই, দলে কাজ করতে চাই এবং নেতৃত্ব দিতে চাই।’

সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন আনোয়ার ইব্রাহিম

শপথ গ্রহণের পর মালয়েশিয়ার ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আমি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করব। আমি মালয়েশিয়ার প্রতি আমার সত্যিকারের আনুগত্য প্রকাশ করব।

দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, বিদ্বেষপূর্ণ সমাজ নিরাময়, দুর্নীতি দমন এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কাজ করবে মালয়েশিয়ার সরকার। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে নতুন সরকার। তা ছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং জনগণের উন্নত জীবন নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে আভাস দেন, আরও দুই শরিকের সহযোগিতায় জোট সরকার গঠনে সক্ষম হবে তার রাজনৈতিক দল।

তিনি আরও বলেন, বহু বিচার আর বছরের পর বছর কারাবন্দি থাকার পর আজ আমি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী। এর জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। রাজার প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা নেই। যখন রাজনীতিকরা আমাকে সমর্থন দেননি, তিনি দেশ সামলানোর যোগ্য ভেবেছেন।

পুরস্কার হিসেবে কাউকে মন্ত্রী নিয়োগ দিবে  না আনোয়ার ইব্রাহিম

আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, আমি চাই তারা আমার নীতি, সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রতি অঙ্গীকার এবং অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে আমাকে সমর্থন করুক। অবশ্যই আমরা একটি বা দুটি ক্ষেত্রে বিবেচনা করতে পারি, যেখানে এটি একেবারে প্রয়োজনীয়। তবে এটিকে রাজনৈতিক সমর্থনের পুরস্কার হিসেবে দেখা উচিত নয়। পুরস্কার হিসেবে আর কাউকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে না। এ ধরনের অযৌক্তিক পদ্ধতি থেকে তার সরকার সরে আসবে।

পাবলিক ফান্ডের অপচয়ের বিরুদ্ধে আনোয়ার ইব্রাহিম

মালয়েশিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য কেনা মার্সিডিজ বেঞ্জ এস৬০০ লিমুজিন গাড়ি ব্যবহার করতে অস্বীকার করেছেন আনোয়ার ইব্রাহিম। এর পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে থাকা যেকোনো একটি গাড়ি  ব্যবহার করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

সেলাঙ্গোর একটি মসজিদে নামাজের পর মালয়েশিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি চাই না আমার ওপর নতুন কোনো খরচ হোক। আমার ব্যবহারের জন্য কোনো নতুন সরকারি গাড়ি কেনা হবে না এবং তার অফিস কোনো নতুন অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র কিনবে না। পাবলিক ফান্ডের অপচয়ের বিরুদ্ধে এটি একটি নতুন সংস্কৃতির অংশ; যা সবার অনুশীলন করা উচিত। শর্ত হলো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নতুন কোনো কেনাকাটা করা যাবে না। আমি বেতন না নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু করেছিলাম। আরও যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো আমাদের যে তহবিল আছে তা নষ্ট না করা।

সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, ১০০, ১০০০ বা ১০,০০০ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত- আপনি কতটুকু সংরক্ষণ করতে পারেন তা নিয়ে ভাবুন।সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এটি সব বিভাগের কর্মকর্তাদের মনে রাখার বার্তা যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের একটি নতুন সংস্কৃতি শুরু করা উচিত। নিজেদের সুবিধার জন্য সরকারি টাকা ব্যবহার করবেন না।

মালয়েশিয়া-তুরস্কের সম্পর্ক এগিয়ে নিবেন আনোয়ার ইব্রাহিম

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পরই আনোয়ার ইব্রাহিমকে ফোন করে অভিনন্দন জানান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান। তিনি বলেন, পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে। এ ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

ফোনালাপে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, কঠিন সময়ে ভাই হিসেবে আপনি আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমি মালয়েশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।

বেতন বা প্রধানমন্ত্রী ভাতা নেবেন না আনোয়ার ইব্রাহিম

আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন,  আমিও  প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেতন নেব না। আমার মূল অগ্রাধিকার হচ্ছে, মানুষের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় কমানো।জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে সরকারি সংস্থাগুলোকে অনতিবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছি।

তিনি বলেন, ইতিবাচক কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যেমন এ মুহূর্তে রিংগিত (মালয়েশীয় মুদ্রা) ও পুঁজিবাজার শক্তিশালী হচ্ছে। এটি সরকারের প্রতি আস্থার প্রকাশ। কিন্তু এখন জীবনযাত্রার ব্যয় ও জনগণের বোঝা বাড়িয়ে দেওয়া দ্রব্যমূল্যের ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বগতির বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।  আমাদের প্রধান কাজ, জনগণের ওপর চাপ কমানো, তা প্রশাসন জানে।

আনোয়ার ইব্রাহিমের মন্ত্রিসভা ছোট 

আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন,  মন্ত্রীদের আগের চেয়ে কম বেতন দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। নিশ্চিতভাবে মন্ত্রিসভার আকার হবে ছোট। নতুন মন্ত্রীদের কম বেতন নেওয়ার বিষয়ে আমার সঙ্গে একমত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছি। বিষয়টি এখনো আলোচনা ও প্রস্তুতির প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

নিম্ন আয়ের মানুষদের ভর্তুকি দিবেন আনোয়ার ইব্রাহীম

ভর্তুকি কমিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষদের সরাসরি অর্থ প্রদানের চিন্তা ভাবনা করছেন আনোয়ার ইব্রাহীম।  তার মতে ভর্তুকি শুধু নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্যই হওয়া উচিত। ভর্তুকি কাদের দেয়া হবে সে ক্ষেত্র অবশ্যই নির্দিষ্ট করে দেয়া উচিত। যদি সেটি না থাকে তবে নিম্ন আয়ের মানুষরাই শুধু নয়, ধনীরাও ভর্তুকি পায়। কিন্তু ধনীদের ক্ষেত্রে ভর্তুকি পাওয়া উচিত নয়।

আনোয়ার ইব্রাহিমের একটি হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য

ইনটারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থটের (আইআইআইটি) ৪০তম বর্ষ পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, মুসলিম মানস-আজ বিভিন্নভাবে বিক্ষিপ্ত। ঐতিহ্যগতভাবে এক রজ্জুবন্ধনে জড়িত মুসলিমরা আমাদের সময়কার বড় বড় চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করার সাথে সাথে আধুনিকতা আর উত্তর-আধুনিকতার বিপরীতে নির্ভরযোগ্য প্রতিক্রিয়ার তালাশ করছে।

আমরা ভাগ্যবান যে, চারটি দশকের মাথায় এসে আমাদের ভবিষ্যতের সাফল্যের ভিত্তিপ্রস্তর সঠিক স্থানেই গাঁথা হয়েছে। আমরা বিশ্বব্যাপী আস্থাযোগ্য, বহুমাত্রিক মুসলিম পণ্ডিতদের একটি মজবুত নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছি এবং একাডেমিক, ব্যবসা, পাবলিক সার্ভিস ও সিভিল সোসাইটির এক নতুন প্রজন্মের পণ্ডিত ও নেতৃবৃন্দকে প্রশিক্ষণ দিতে সহায়তা দিয়েছি। আমাদের দুনিয়াজোড়া স্বল্পসংখ্যক ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠানের অন্যতম মনে করা হয় যারা বহুমাত্রিক মতামতের জন্য খোলা মন ও মতামত গ্রহণকারী এবং যুক্তিপূর্ণ সংলাপের জন্য সুযোগদানে প্রস্তুত হিসেবে বিবেচিত।

কিন্তু এখন আত্মতুষ্টির সময় নয়। ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানানো প্রকৃতপক্ষে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ধারাবাহিকতার অবিভাজ্য অংশ। কিন্তু এটিকে অন্ধ অনুকরণের সাথে মিলিয়ে দেখা যায় না, যাতে করে সেটি আমাদেরকে মুসলিম সমাজ এবং গোটা দুনিয়া বর্তমানে যেসব সমস্যা নিয়ে চিন্তিত, সেদিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সেগুলোর সমাধানের পথ খুঁজতে নিরুৎসাহিত করে।

আজ আমরা এক বংশানুক্রমিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, যাতে রয়েছে প্রশাসনের ভেঙে পড়া দশা, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার অভাব এবং পরিবেশগত সঙ্কট, যা আমরা জানি এই গ্রহের উপরের জীবনকে পরিবর্তনের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব দশকের পর দশক ধরে অর্থনৈতিক স্থবিরত্ব, রাজনৈতিক দমনপীড়ন এবং বৈদেশিক হস্তক্ষেপের শিকার হয়ে আসছে।

মুসলিম সমাজগুলো দারিদ্র্য, শিক্ষার ক্ষেত্রে দৈন্যে জর্জরিত, তারা ধর্মীয় বাড়াবাড়ি ও বিপথগামী মতবাদের বিস্তারে সহায়ক হয়ে পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে কার্যকর মুসলিম সমাজ, প্রতিষ্ঠান, যোগ্য নেতৃত্ব এবং সঙ্কটকালীন পাণ্ডিত্যের অবর্তমানে সৃষ্টিকর্তায় সন্দেহ ও অবিশ্বাস এবং ধর্মত্যাগ উম্মাহর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।

সংক্ষেপে বলা যায়, আইআইআইটির শুরুর দিকে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে, তা আগের মতোই রয়ে গেছে মনে হবে। কিন্তু দুনিয়ায় বড় রকমের পরিবর্তন ঘটে গেছে। আমাদের এখন এমন এক অস্বাভাবিক দুনিয়াকে নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে যা অতিমাত্রায় আরো জটিল, গোলমেলে এবং এমনকি পরস্পরবিরোধী।

সামনের দিকে চলতে গিয়ে আমাদের চিন্তা এবং পদক্ষেপে সৃজনশীল এবং সাহসী হতে হবে। প্রয়োগধর্মিতা ও প্রভাবকে সম্প্রসারণ করতে হলে আইআইআইটিকে নিজের অবস্থানকে পুনঃস্থাপন করতে হবে, শুধু ঐতিহ্যের নীরব বাহক হিসেবে নয়, বরং উম্মাহ এবং মানবজাতির এসব চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করার উপযোগী উদীয়মান এবং উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন পণ্ডিত ও চিন্তাশীলদের একটি নেটওয়ার্ক হিসেবে জেগে উঠতে হবে।

প্রত্যাশা করি না যে, আমরা এই কাজ কিভাবে করতে হবে, তা জেনে নিয়েছি। আমরা চাই যে, আপনারা আগামী বছরে শিক্ষা ও পরিবর্তনের একটি পর্যায়ে প্রবেশ করবেন, যাতে আমরা আরো শক্তিশালী এবং আমাদের মিশন বাস্তবায়নে যোগ্যতর হয়ে উঠে দাঁড়াব।

আমরা আমাদের কর্মকৌশলের কেন্দ্র হিসেবে জ্ঞানকে সুসংহতকরণের ওপর জোর দিয়েছি যাতে তার শাখা-প্রশাখাকে এক কেন্দ্রে নিয়ে আসা যায় এবং আইআইআইটিকে জ্ঞান ও উদ্ভাবনী চিন্তার উৎস হিসেবে মানবতার কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। এ ব্যাপারে সাফল্যের জন্য আমার সহকর্মীদেরকে সাধাসিধা, রুটিন মাফিক কার্য সম্পাদনের গণ্ডি ভেদ করার, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্ভাবনী যোগ্যতা, বলিষ্ঠতা আর আমাদের মিশনের প্রতি আবেগপূর্ণ উৎসাহ সহকারে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ প্রদান করছি।

চার দশক ধরে আইআইআইটি জ্ঞান ও সত্যের সন্ধানে নিবেদিত এবং সব ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নিয়োজিত ছিল। আমি জানি, এত বছর আগে আইআইআইটির প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে এর মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রতিষ্ঠাতাদের যে দৃষ্টিভঙ্গী ছিল তারই প্রতিধ্বনি করেছি; আর তা-ই আজও যথাযথ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রয়ে গেছে। তাদের লক্ষ্যের বাস্তবায়নে এবং পৃথিবীটাকে আরো ন্যায় ও মানবতাপূর্ণ করে তোলার জন্য আপনাদের সমর্থন, উৎসাহ উদ্দীপনা এবং অবদানকে স্বাগত জানাই।
ধন্যবাদ।

আপনাদেরই একান্ত,
আনোয়ার ইব্রাহিম

 

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.