প্রশিক্ষণ প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থী

প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রশিক্ষণের পরিকল্পিত কার্যক্রম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অধিকতর প্রতিযোগিতামূলক এই বিশ্বে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত-দক্ষরা প্রশিক্ষণহীন-অদক্ষদের তুলনায় নানান দিক থেকে এগিয়ে থাকে। স্বেচ্ছায় ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ পাওয়ার লক্ষ্যেই প্রশিক্ষণের যত আয়োজন।

নিয়মসম্মত প্রশিক্ষণ প্রশিক্ষণার্থীর জ্ঞান বাড়ায়। সুষ্ঠু ভাবে দায়দায়িত্ব পালনে আগ্রহী করে। কর্ম সম্পাদনের কলাকৌশল জানায়। প্রশিক্ষণ গ্রহণের ফলে দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন সাধন করে। কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে যোগ্যতার উন্নতি ও সমৃদ্ধি সাধন করে।

প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন শক্তিশালী বা দুর্বল হওয়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত-দক্ষ জনবলের উপর নির্ভরশীল। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ সফলতা অর্জনকে সহজসাধ্য করে। প্রশিক্ষণের জন্য অর্থ ও সময় ব্যয় দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ। প্রশিক্ষণকে কোনোভাবেই হেয় প্রতিপন্ন বা ছোট করে দেখার সুযোগ বা অবকাশ নাই। যেখানে প্রশিক্ষণ নেই, সেখানে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাও নেই। প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, উদ্দেশ্য ও কর্মধারা না জানলে কর্মপরিসর বিস্তৃত করা যায় না।

প্রশিক্ষক বা প্রশিক্ষণ দানকারী সংগঠন-প্রতিষ্ঠানকে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উপযোগিতা ও কার্যকারিতার মান বজায় রাখার প্রতি অত্যন্ত মনোযোগী হতে হয়। চাহিদা ও লক্ষ্য অনুযায়ী স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের মান নিয়মিতভাবে উন্নীত করতে হয়। প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে তাত্ত্বিক জ্ঞান প্রদানের চেয়ে ব্যবহারিক জ্ঞান প্রদানের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করতে হয়।

প্রশিক্ষণের বিভিন্ন পদ্ধতি বা কৌশল রয়েছে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সময়ের দাবি অনুযায়ী প্রশিক্ষণ পদ্ধতির পরিবর্তন হচ্ছে। কাজের মাধ্যমে প্রশিক্ষণে (On-the-Job Training) কাজ করতে করতে নির্দিষ্ট কাজে দক্ষতা অর্জন হয়। পরিচিতিমূলক প্রশিক্ষণ (Induction training) কর্ম আগ্রহ, উৎসাহ ও উদ্দীপনা বাড়ে। শিক্ষানবিশ প্রশিক্ষণে (Apprentice training) তত্ত্বাবধায়কদের তদারকি ও তাত্ত্বিক-ব্যাবহারিক প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দেয়া হয়।

প্রবেশনা পদ্ধতিতে (Internship method) পেশাগত বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষাদান করা হয়। কোচিং পদ্ধতিতে (Coaching method) নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে রেখে প্রশিক্ষণ দেয়ায় অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে। বিজ্ঞ পরামর্শ বা মেনটর বা পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে (Mentoring method) সিনিয়র ও অভিজ্ঞ কর্মীরা (Mentor) জুনিয়র ও নতুন কর্মীদের (Mentee) দিকনির্দেশনা-পরামর্শ দেন ও সহযোগিতা করেন। স্থলাভিষিক্ত পদ্ধতিতে (Understudy method) সামগ্রিক কাজ সম্পর্কে ধারণা দিয়ে ধীরে ধীরে অভিজ্ঞ করে তোলা হয়।

প্রদর্শন পদ্ধতিতে (Demonstration) প্রশিক্ষার্থীকে সুনির্দিষ্ট কাজটি কীভাবে করবে, তা ব্যাখা-বিশ্লেষণ-উদাহরণের সাহায্যে বাস্তব ধারণা দিয়ে শিক্ষাদান করা হয়। পদ পরিবর্তন (Job rotation) পদ্ধতিতে এক পদ হতে অন্য পদে স্থানান্তর করে সব বিভাগের কমর্কাণ্ড, কাজের প্রকৃতি ও সমস্যা সম্পর্কে জ্ঞান দেয়া হয়। জুনিয়র বোর্ড (Junior board) পদ্ধতিতে উপদেষ্টারা বিদ্যমান সমস্যাসমূহ জানে বা চিহ্নিত করে, বিশ্লেষণ-পর্যালোচনা করে এবং পরামর্শদান করে। প্রকল্প পদ্ধতিতে (Project method) বিশেষ প্রকল্প সম্বন্ধে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

কাজের বাইরে প্রশিক্ষণে (Off-the-Job Training) প্রথমে কোনো বিষয়ে শিক্ষালাভ করে তা নিজ নিজ কাজের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন বা প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়। এক্ষেত্রে বক্তৃতা পদ্ধতিতে (Lecture) বক্তৃতাদানের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। সেমিনার পদ্ধতিতে (Seminar method) বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি নির্দিষ্ট লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন ও আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষাদান করেন। অধিবেশন পদ্ধতিতে (Conference method) সভায় অংশগ্রহণকারীরা দলগত আলোচনা করে মতামত দিয়ে সমস্যা সমাধান করেন।

উপ-প্রকোষ্ঠ প্রশিক্ষণে (Vestibule training) বিশেষ বাস্তবধর্মী শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। ঘটনা পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি (Case study method) বা ঘটনা সমীক্ষা পদ্ধতিতে সমস্যা সংবলিত কতগুলো ঘটনা উপস্থাপন করে সমস্যার চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ করা হয় এবং পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে বের করা হয়।

ভূমিকা অভিনয় পদ্ধতি (Role playing method) অভিনয় পরিচালনা করে প্রতিপাদ্য বিষয় উত্তমরূপে ফুটিয়ে তোলা হয়। ব্যবস্থাপনা ক্রীড়ায় (Management games) ছোট দলে ভাগ করে কোনো ব্যাপারে এক বা একাধিক সিদ্ধান্ত নেয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের বাস্তবধর্মী অবস্থা নিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

সংবেদনশীলতা প্রশিক্ষণে (Sensitivity training) ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে আলোচনা ও পারস্পরিক ভাবের আদান-প্রদান করতে উৎসাহিত করা হয়। ব্রেনস্টর্মিংয়ে (Brain storming) কোনো বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণার্থীদের অভিমত-পরামর্শ-মন্তব্য সমন্বয়-লিপিবদ্ধ করে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন মতামত পাওয়া যায়।

বাজ্ সেশনে (Bazz session) ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত করে প্রত্যেক দলকে আলোচ্য বিষয়ের একেকটা বিষয়বস্তু দেয়া হয়; প্রতিটি গ্রুপ নিজ নিজ প্রতিবেদন তৈরি করে। ছদ্মবেশধারণ প্রশিক্ষণ (Simulation Training) পদ্ধতিতে প্রকৃত অবস্থার অনুজ্ঞা বিকল্প অবস্থা তৈরি করা হয়।

আপনার কী নেই এই জিজ্ঞাসার চেয়ে কী আছে এই জিজ্ঞাসা মোটেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনার যা আছে তার যথার্থ ব্যবহার আপনি করতে পারছেন কি-না। একজন ঋণ নেয়ার পর অদক্ষতার কারণে, জ্ঞানের অভাবে বা প্রশিক্ষণের ঘাটতি থাকায় যদি উপযুক্ত ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে না পারে তাহলে সে আরো বেশি বিপদগ্রস্ত হবে। তাই আগে ঋণ না দিয়ে প্রশিক্ষণ দিন, প্রয়োজনীয় জ্ঞান সরবরাহ করুন।

প্রশিক্ষণ কর্মসচেতন করে, কর্মস্পৃহা জাগ্রত করে। শ্রম, সময় ও সম্পদের অপচয় হ্রাস করে। ঝুঁকি কমায়। আনুগত্য বৃদ্ধি করে, আত্মবিশ্বাস ও মনোবল বৃদ্ধি করে। সর্বশেষ তত্ত্ব ও তথ্য অবগত করায়। নবতর চিন্তা-চেতনার উন্নয়ন ঘটায়।

প্রশিক্ষণ নির্দেশনার বাস্তবায়নকে সহজতর করে। কর্মদক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কাজে গুণগত ও মানগত পরিবর্তন সাধন করে। পারস্পরিক মানসিক সম্পর্ক উন্নত হয়। সমঝোতা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। কাজের মধ্যে সমন্বয় সহজ করে।

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *