পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে সোচ্চার হোন

নারীর প্রতি পারিবারিক নির্যাতন আগের চেয়ে বেড়েছে। পারিবারিক সহিংসতা বা গৃহ নির্যাতন রূপ নিয়েছে ভয়ঙ্কর সহিংসতায়। নারী যদি নিজ গৃহের মধ্যে পরিবারেরই কারো দ্বারা শারীরিক বা মানসিকভাবে নিপীড়নের শিকার হয় তবে আর তার নিরাপদ কোনো জায়গা থাকে না। পারিবারিক সহিংসতার নানান ধরণ রয়েছে। যেমন মানসিক সহিংসতা, স্বামী কর্তৃক সহিংসতা, শারিরীক নির্যাতন, যৌন নির্য‍াতন ইত্যাদি। সব ধরণের সহিংসতাই বন্ধ হওয়া উচিৎ।

মানসিক সহিংসতার মধ্যে রয়েছে- বন্ধুদের সাহচর্য থেকে দুরে থাকতে বাধ্য করা; তার মায়ের বাড়ীতে যেতে না দেয়া; সবসময় একই স্থানে থাকতে বাধ্য করা; অন্য কোনো লোকের সংগে কথা বলতে বিরত রাখা বা বিরক্ত বোধ করা; অবিশ্বাসী বলে মনে করা; স্বাস্থ্য পরীক্ষা সংক্রান্ত কাজে বাইরে যেতে হলে অনুমতি নেয়া; অযৌক্তিকভাবে কোনো রীতি নীতি মানতে বাধ্য করা; চাকরি বা পড়াশুনা করার ক্ষেত্রে বাধা প্রদান করা; কোনো স্থানে বেড়াতে যেতে না দেয়া; বাবা মা বা অন্য কোনো গুরুজনকে জড়িয়ে গালমন্দ করা; জন্মনিয়ন্ত্রন সামগ্রী ব্যবহার করতে বাধ্য করা বা না করা; মেয়ে শিশু জন্মের কারনে খারাপ আচরণ করা; কথার উত্তরে কথা বললে রাগান্বিত হওয়া ইত্যাদি।

স্বামী কর্তৃক সহিংসতার মধ্যে রয়েছে- কারণে বা অকারণে অন্য কোনো মেয়েকে বিবাহ করবে বলে ধমক দেয়া; ডির্ভোস দেয়ার হুমকি দেয়া, আত্মীয়স্বজন বা অন্য প্রতিবেশীর সামনে ধমক বা নির্যাতন করা, অন্য কারো সামনে কটুক্তি করা ইত্যাদি। শারীরিক নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে- গরম পানি বা অন্য কোনো বস্ত্ত দ্বারা সেঁকা দেয়া; এসিড বা গরম পানি নিক্ষেপ করা; বন্দুক, ছুরি কিংবা অন্য কোনো ধারলো অস্ত্রের ভয় দেখানো; কোন বস্ত্ত নিক্ষেপ করে আঘাত করা বা আহত করা ইত্যাদি।যৌন নির্য‍াতনের মধ্যে রয়েছে- স্ত্রীর অমতে বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা; কোনো প্রকার ভয়ভীতি প্রদর্শন করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করা ইত্যাদি। অর্থনৈতিক নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে- স্বামীর পর্যাপ্ত অর্থ/টাকা থাকা স্বত্ত্বেও সংসার পরিচালনার জন্য স্ত্রীকে পর্যাপ্ত টাকা না দেয়া; প্রতিনিয়ত পকেট মানি প্রদানে অস্বীকৃতি প্রদান করা; স্ত্রীর বাবার বাড়ি হতে টাকা পয়সা যৌতুক হিসেবে আনয়নের জন্য চাপ প্রয়োগ করা ইত্যাদি। গৃহ নির্যাতনের প্রধান ধরণগুলোর মধ্যে রয়েছে- অপ্রীতিকর ফোনকল ও শারীরিকভাবে হামলার হুমকি।

গৃহ নির্যাতনের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে: দারিদ্র্য, আর্থিক সমস্যা, মানসিকতার পরিবর্তন, যুদ্ধের প্রভাব ইত্যাদি। পারিবারিক সহিংসতার বহুবিধ প্রভাব পড়ছে। নারীরা নির্যাতনের ফলে কর্মস্থল ত্যাগ করছে, ফলে উত্পাদনশীলতা ব্যহত হচ্ছে; নির্যাতিত মহিলারা প্রায়ই দেরী করে কর্মস্থলে আসেন বা ছুটির পূর্বেই কর্মস্থল ত্যাগ করেন, ফলে অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে; নির্যাতিত মহিলাদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে; নির্যাতিতারা নিজেদের কাজে উৎসাহ-উদ্দীপনার অভাব ও আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগে; নির্যাতনের ফলে নির্যাতিতার মনে সর্বদা এক ধরনের ভীতি কাজ করে; নির্যাতনের শিকার নারীরা পরবর্তিতে গৃহ ত্যাগের ফলে পাচারের শিকার হচ্ছে।

নারীর প্রতি সকল প্রকার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে পুরুষদের চিন্তা-ভাবনা-মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। নারীদের সহযোগি ভাবতে হবে, বন্ধু ভাবতে হবে। নারীর প্রতি পুরুষের আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। ধর্মীয় গোঁড়ামী ও ভূল ধারণা দূর করতে হবে। নারী বিষয়ক আইন ও সনদের প্রচার এবং বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নারী নির্যাতনকারীকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে নারী বিষয়ক রচনার অন্তর্ভূক্তি বাড়াতে হবে। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে। প্রতিবন্ধী নারীদের সমান সুযোগ দিতে হবে। নারী নির্যাতন বিরোধী আইনের যথাযথ প্রয়োগে সহযোগিতা করতে হবে, সরকারি লোকজনের আন্তরিক হতে হবে। শিক্ষা, ক্রীড়া ও সুস্থ সংস্কৃতিতে নারীদের অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়নের নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। নারীদের প্রতিদ্বন্দী না ভেবে সহযোগী ভাবতে হবে, তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ প্রদর্শন করতে হবে। জাতিসংঘ কর্তৃক প্রণিত নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরা) আইন ২০১০, ভ্রাম্যমান আদালত আইন ২০০৯ এর ন্যায় আইনগুলোর প্রয়োগ সুনিশ্চিত করার মাধ্যমে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করে যেতে হবে। নির্যাতনকারীদের বিচার হতে হবে।

স্বামীর শাসন ও শোষণে অধৈর্য্য হয়ে অনেক নারী আক্রোশবশত একাধিক শিশু সন্তান নিয়ে আত্মহত্য করছে। পারিবারিক সহিংসতার জন্য যে সব সময় পুরুষই দায়ী হবে এমনটা নয়। ঢাকার আদাবরে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে নিজ সন্তান শিশু সামিউলকে হত্যায় সহায়তা করছে মা। সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা এবং অশ্লীল চলচ্চিত্র, ম্যাগাজিন ও বই পুস্তক পড়া থেকে দূরে রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শালীন পোশাক পর‍া, কারো সাথে অনৈতিক সম্পর্ক না রাখা যেমন নারীর দায়িত্ব তেমনি
পুরুষদেরও কোমল আচরণ করা এবং কঠোর আচরণ করা থেকে বিরত থাকা দরকার। কেউ বিবাহের জন্য অস্থির হলে যতদ্রুত সম্ভব তার বিবাহের ব্যবস্থা করা উত্তম। নিজের সমমর্যাদার পরিবারের সাথেই ছেলেমেয়েদের বিবাহ দেওয়া ভালো। না হলে পারস্পরিক সম্মান ও অন্যায় করলে কৈফিয়ত দেওয়ার মানসিকতা থাকে না।

পারিবারিক সহিংসতা যাতে না ঘটে সেজন্য মাথা ঠান্ডা রাখা, হুমকি-দমকি ও শক্তি প্রয়োগের পথে না গিয়ে সহজ সমাধানের পথে আসা বেশি ফলপ্রসূ হয়। রাগ ও শক্তি প্রয়োগে লাভের চেয়ে ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি, যা তাৎক্ষণিক টের পাওয়া না গেলেও পরবর্তীতে বুঝা যায় এবং আক্ষেপ করতে হয়। আসুন পারিবারিক সহিংসতা বন্ধে সচেতনতা বাড়াই, সব ধরণের সহিংসতা প্রতিরোধ করি। পারিবারিক সহিংসতা অপরাধ তাই যারা সহিংসতা ছড়ায় তাদের ঘৃণা করি ও প্রতিবাদ জানাই।

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *