পরিবেশ বিপর্যয় রোধে বাণিজ্যিক বনায়ন

“এই পুষ্প, এই বৃক্ষ, তরুলতা, এই বিহঙ্গ আমার
জীবন এমন কানায় কানায় ভরিয়ে তুলেছে,
আমার মধ্যে কোনো একাকীত্ব কোনো বিচ্ছিন্নতা
আমি অনুভব করতে পারিনে…”
– বরেণ্য কথা সাহিত্যিক আহমদ ছফা

গাছের প্রাণ মানে দেশের প্রাণ। গাছের অস্তিত্ব মানে প্রাণের অস্তিত্ব, প্রাণীর অস্তিত্ব। যে অঞ্চলে যত গাছপালা, সেই অঞ্চল তত বেশি প্রাণবন্ত। গাছ ধৈর্যের প্রতীক, ধীরস্থির সাধনার প্রতীক, জীবনের সার্থকতার প্রতীক, সভ্যতার অন্যতম বাহন , জীবন বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দু । পৃথিবীর অস্তিত্ব রক্ষায় বৃক্ষ ও প্রাণী একে অপরের সম্পূরক । শান্তি, সহিষ্ণুতা আর প্রশান্তির যে নিরব অভিব্যক্তি তা মানুষের জন্য শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত করে। অঙ্গার বাতাসে মিশে থাকে, গাছ তা নিগূঢ় শক্তি বলে শোষণ করে নিজের করে নেয়।

পরিবেশ উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, পুষ্টি সরবরাহ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে গাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবনকে স্বস্তি এবং শান্তিপূর্ণ করতে প্রয়োজন হয় গাছপালার। দোলনা থেকে কবর কিংবা চিতা সব জায়গায় গাছপালার অবাধ ব্যবহার। গাছপালা প্রাণিকুলের জীবন ধারণের প্রধান সহায়। তাইতো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন-

‘কত যুগ যুগান্তরে কান পেতে ছিল স্তব্দ
মানুষের পদশব্দ তবে নিবিড় গহন তলে
যবে এল মানব অতিথি দিল তারে ফুল ফল
বিস্তারিয়া দিল ছায়াবীথি।’

সময়ের প্রয়োজনে গাছলাগানো এখন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। পরিবেশ বিপর্যয় রোধে বাণিজ্যিক বনায়নের দ্বারা সকলের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমেই দেশকে বদলে দেয়া সম্ভব। মানুষের কল্যাণে অপূর্ব সৃষ্টি গাছ । গাছ ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক। যার ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রাণিকুল আজীবন সর্বাংশে নির্ভরশীল।

বৃক্ষের অভাবে মৃত্তিকা হয়ে উঠে শুষ্ক, রুক্ষ, অনুর্বর। শুরু হয় মরু প্রক্রিয়া। আর বৃক্ষ সূর্যের উত্তাপ শোষণ করে পরিবেশকে শীতল রাখে। সৌরতাপের বর্ষণ থেকে মৃত্তিকাকে রক্ষা করে । খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বেশি ঠাণ্ডা, বেশি গরম, ঝড়-ঝঞ্ঝা, বন্যা, বায়ু দূষণ ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমরা বন্ধ করতে পারি না। কিন্তু অধিক সংখ্যক গাছ-গাছালিই এগুলোর তান্ডবলীলা, ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে পারে। তাই গাছ লাগানোকে আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। কবির আহ্বান-

‘মানুষ তুমি গাছের পক্ষে দাঁড়াও
মানুষ তুমি বৃক্ষমুখী হও
গভীর নিঃসর্গ তোমাকে অভিবাদন জানাবে।

পরিবেশ বিপর্যয়রোধে বাণিজ্যিক বনায়নের গুরুত্ব

পরিবেশ বিপর্যয়রোধে বাণিজ্যিক বনায়ন বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। তাই জীবনের প্রয়োজনে পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিক বনায়ন সময়ের অপরিহার্য দাবি । বৃক্ষ গুল্মের পুষ্প পল¬বের সৌন্দর্য নিয়ে এত যে উপমা তাতেও বৃক্ষরাজির অবদান অনস্বীকার্য । যে কোন পর্যটন স্পটকে দৃষ্টি নন্দন করণে গাছপালার বিকল্প নেই । কবি বলেছেন-

‘ও অরণ্য! জ্যোৎস্না স্নাত রাত্রির প্রতীমা
রাশি রাশি পাতার মখমলে আমাকে আবৃত কর।
পোড়া পিঠে মেখে দাও মমতার সবুজ ভেষজ
ধুয়ে যাক দীর্ঘশ্বাস গুলো।’

বাণিজ্যিক বনায়নের মাধ্যমেই সম্ভব পরিবেশ বিপর্যয়রোধ । ফলদ, বনজ, ভেষজ প্রতিটি বৃক্ষেরই সামগ্রিক পরিবেশের ওপর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, একটি বয়স্ক বৃক্ষ তার জীবদ্দশায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ও জীবজগতে যে অবদান রাখে তাহলো-মাটির ক্ষয়রোধ ও উর্বরতা বৃদ্ধি করে ৫ লাখ টাকার, বায়ু দূষণমুক্ত করে প্রায় ১০ লাখ টাকার,জীব ও জন্তুর খাদ্যের জোগান দেয় ৪০ লাখ টাকার, বাতাসের আর্দ্রতা বাড়িয়ে বৃষ্টিপাতের অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি করে প্রায় ৫ লাখ টাকার, গাছপালা নির্ভর প্রাণীর আবাসন সংস্থান করে প্রায় ৫ লাখ টাকার,জীব নির্ভর জীবনরক্ষাকারী অক্সিজেন সরবরাহ করে প্রায় ৫ লাখ টাকার।

আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় জীবনে গাছের অবদান অতি গুরুত্বপূর্ণ। শান্তি ও সেবাধর্মের আদর্শ দীক্ষাগুরু হলো এই মূক ও মৌন গাছ। গাছ গ্রামীণ জনগণের দুঃসময়ের বন্ধু। সাধারণত অর্থনীতিবিদদের কাছে এটি গৌণ হলেও গ্রামীণ মানুষটির কাছে তা অত্যন্ত মূল্যবান, মুখ্য ও দুঃসময়ের বন্ধু। গাছপালা থেকে আমরা দু’ধরনের উপকার পেয়ে থাকি। ১) Tangible benefit ২) Intangible benefit .

দেশকে সুশীতল ও বাসযোগ্য করে রাখার ক্ষেত্রে গাছের অবদান অনস্বীকার্য। গাছ-খাদ্য দেয়, অক্সিজেন দেয়, জ্বালানি দেয়, আসবাবপত্র ও গৃহনির্মাণের সামগ্রী দেয়। আবহাওয়া ও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে। জীবন রক্ষার নানা ওষুধ দেয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাসগৃহ রক্ষা করে। তাই বৃক্ষ ছাড়া জীবন কল্পনাও করা যায় না। কবি বলেছেন-

‘বৃক্ষ নেই প্রাণের অস্তিত্ব নেই,
বৃক্ষহীন পৃথিবী যেন প্রাণহীন মহাশশ্মান।’

পৃথিবীতে ক্রমান্বয়ে গাছ-গাছালির সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় হ্রাস পাবার ফলে এই গ্যাস পুরোপুরি শোষিত না হওয়ায় তা ক্রমশ: বায়ুমণ্ডল এবং ভূ-পৃষ্ঠে জমা হয়ে মানব সভ্যতা এবং প্রাণী জগতের জন্য এক বিরাট হুমকীর সৃষ্টি করেছে। ১৯৫০ সনের পর জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জ্বালানী কাঠ সংগ্রহ ও কৃষি জমির সম্প্রসারণের জন্য বন উজাড় বৃদ্ধি পেয়েছে।

ভারতের একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের মতে, “Though there is no accurate estimates, sources say that closed to Rs.2000 million worth of wood is cut each year under the guide of catering to the industry which the state sells at a heavy subsidy-Rs.9 per wooden crate as against actual cast of Rs.30 per crate, thereby providing an incentive of Rs.21 per box to the states deforestation.” আর এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো বাণিজ্যিক বনায়ন ।

পরিবেশ বিপর্যয়রোধেপরিকল্পিতহারে বাণিজ্যিক বনায়ন হলে অনেক সুফল পাওয়া সম্ভব । যেমন-

দুযোর্গ প্রতিরোধ বৃক্ষ

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে,“উপকুলীয় এলাকায় ব্যাপক বৃক্ষ রোপণ করে একটা বেষ্টনী তৈরি করতে পারলে ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য দুর্যোগ হতে আত্মরক্ষার একটা স্থায়ী ব্যবস্থা হবে।৮

বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা হ্রাসে বৃক্ষ

বিজ্ঞানীদের ধারণা আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে ১.৫০-৩০ সে:। খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিবে।আর এর থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ।

ভূমিক্ষয় রোধে বৃক্ষ

ভূমিক্ষয়ের প্রধান কারণ হলো বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাত। গাছপালা এ দুটির গতিকে কমিয়ে দিয়ে ভূমিক্ষয় রোধ করে।

শব্দদূষণ রোধে বৃক্ষ

বৃক্ষ শব্দ শোষক হিসেবে কাজ করে। বৃক্ষের সারি শব্দের চলার পথে বিঘ্ন সৃষ্টি করে এবং শব্দদূষণ রোধ করে। যে কোনো প্রকারের শব্দ সৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথে তার ৮৫% গাছপালা শোষণ করে শব্দ দূষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করে।

ওয়ার্ল্ড রিসার্স ইনস্টিটিউটের মতে, বিশ্বের বনভূমি উজার হতে হতে অর্ধেকে এসে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে বিশ্ব পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। ১৯৯২ সালের ৩ জুন থেকে ১৪ জুন ব্রাজিলের রাজধানী শহর রিও-ডি- জেনেরিওতে অনুষ্ঠিত হয় পরিবেশ বিষয়ক বিশ্ব শীর্ষ সম্মেলন। বিশ্বে প্রতি মিনিটে প্রায় ৫০ একর বনভূমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ায় মোট স্থলভাগের ৬৭.০৫% জাপানের ৬৬.৫৮% বনভূমি রয়েছে। আর বাংলাদেশে মোট বনভূমির পরিমাণ হ্রাস ২৫ লাখ হেক্টর।

বাংলাদেশের বনভূমি থেকে আসে ৫ শতাংশ। মহাদেশভিত্তিক বনভূমির একটি ছক নিম্নে দেয়া হল-

         মহাদেশভিত্তিক বনভূমি

মহাদেশ মোট বনভূমি (কোটি হেক্টর) বিশ্বের মোট বনভূমির অংশ (%)
দক্ষিণ আমেরিকা  ১০৪.৫৩ ২৫.৬৯
এশিয়া ৮৩.২১  ২০.৪৫
উত্তর আমেরিকা ৭০.২২ ১৭.২৬
ইউরোপ  ৬৬.৮৭ ১৬.৪৪
আফ্রিকা ৬৬.৪৬ ১৬.৩৪
ওশেনিয়া ১৫.৫৬ ৩.৮২
পৃথিবী ৪০৬.৮৫ ১০০.০০%

এ ছকই স্পষ্ট করছে, মানব বসবাসের উপযোগী একটি পৃথিবীর জন্য প্রয়োজনীয় বনভূমি নেই। বিশ্ব পরিবেশ এবং জীবজগতের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য এ’উপাদানটির চাহিদা পূরণ করতে বাণিজ্যিক বনায়নের গুরুত্ব অনেক বেশী।

বাংলাদেশে বাণিজ্যিক বনায়নের প্রয়োজনীয়তা

একটি দেশের পরিবেশ রক্ষায় ও আর্থ সামাজিক উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত রাখতে শতকরা ২৫ ভাগ বৃক্ষাচ্ছিত রাখা অপরিহার্য। আমাদের দেশের আয়তনের শতকরা ১৭.৮% বনভূমি থাকলেও গাছপালায় আচ্ছাদিত ভূমির পরিমাণ মোট আয়তনের শতকরা মাত্র ৭.৭০ ভাগ। একটি হিসাব মতে ২ মিলিয়ন হেক্টর বনাঞ্চল আছে যা স্থলভাগের ১৫% মাত্র, কিন্তু উৎপাদনশীল গাছ আছে এর অর্ধেক পরিসরে।

ওয়ার্ল্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে মাত্র ৫ শতাংশ। দেশের উত্তর ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের বনভূমির পরিমাণ মাত্র ৩.৫ শতাংশ। তাই ইতোমধ্যেই বাংলাদশে প্রাকৃতিক নানা বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় সে এদেশের মানুষের জীবনে বৃক্ষের প্রয়োজন বর্তমান জীবনাচরণের ধারায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের আবাসস্থলটি চিরচেনা রূপটি হারিয়ে ফেলছে। অরণ্যে গাছ নেই, মাঠের সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে, এক সময়ের খরস্রোতা নদীগুলো বালুকাময়-প্রকৃতি হচ্ছে রুগ্নতর। চোখ বুঁজে কান চেপে বাস্তবতাকে পাশ কাটাবার সময়টি আমরা পেছনে ফেলে এসেছি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বনায়নের প্রয়োজনীয়তা যে অত্যন্ত বেড়ে গেছে এ ব্যাপারে সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ নেই। পরিবেশ সংরক্ষণে বাণিজ্যিক বনায়নের কোন বিকল্প নেই । কেননা-

প্রতিদিন বাতাসে সঞ্চিত হওয়া ক্ষতিকর গ্যাস ও বিষাক্ত পদার্থ শোষণ করে বায়ু দূষণমুক্ত রাখে।
কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাসকে অক্সিজেনে পরিণত করে; গ্রিনহাউসের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।
নদ-নদীর উৎসগুলোর পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায়, ভূমিক্ষয়- রোধ করে এবং বন্যার প্রকোপ থেকে আমারদের রক্ষা করে।

কৃষি জমির গুণাগুণ রক্ষা করে, জমির উর্বরতা সংরক্ষণ করে।
তাপ ও প্রবল বাতাস থেকে ফসল, প্রাণী ও জনগণকে রক্ষা করে এবং আশ্রয়দান করে।
প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সহায়তা করে।
মাটির তলদেশের পানির স্তর উপরে টেনে সেচযন্ত্রের নাগালে রাখতে সহায়তা করে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়ায়।

বাণিজ্যিক বনায়ন মানেই পরিকল্পিত বনায়ন। প্রকৃতিতে অনেক গাছপালার রয়েছে যাদের মধ্যে ক্ষতিকারক পোকা দমনের বিষের গুণাগুণ রয়েছে। যে সকল গাছের পাতা ও বীজের রস অথবা গুঁড়া দিয়ে ফসল ও খাদ্যশস্যের পোকার আক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়। যেমন-তামাক ও নিমগাছ। কৃষকেরা এটি ব্যবহার করতে পারে। বাংলাদেশ অধিক চাহিদার কারণে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অধিক ফল উৎপাদনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বেসরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন কোনো প্রতিষ্ঠান এ কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা বাড়ছে এবং বাড়বে। বাড়তি জনগণের খাদ্যের যোগান দিতে আমাদের অধিক খাদ্য ফলাতে হবে। কিন্তু অধিক খাদ্য ফলাতে গিয়ে ভূমির উর্বরতা হারিয়ে ফেললে ভবিষ্যতে এ জমি থেকে ভালো ফল আশা করা যাবে না। তাছাড়া আমাদের খাদ্য অভ্যাসও পরিবর্তন করতে হবে। কেবল ভাত বা রুটিকে খাদ্য হিসেবে না দেখে এর সাথে ফলমূল ও নানা শাক সবজির কথা ও ভাবতে হবে।এক্ষেত্রে প্রয়োজন বাণিজ্যিক বনায়ন।

অধিক হারে গাছ লাগানোর গুরুত্বকে ৪ ভাগে ভাগ করা যায়। তাহলো,অর্থনৈতিক গুরুত,¡পরিবেশগত গুরুত্ব,জীববৈচিত্র্য,চিত্তবিনোদন। এ গুরুত্বকে বিবেচনায় রেখে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপনকে বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশে বাণিজ্যিক বনায়নের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। পুষ্টি, পশুখাদ্য, জ্বালানী ও পরিবেশ সংক্রান্ত ভাবনা এই প্রয়োজনীয়তাকে আরো গুরুত্ববাহী করেছে। এছাড়া গ্রামীণ শিল্পের প্রসারকে সহায়তা দানের জন্যও বনায়ন অপরিহার্য। কোনো গাছই অপ্রয়োজনীয় নয়। বাণিজ্যিক বনায়নের মাধ্যমে ব্যাপক গাছ রোপণ গোটা গ্রামীণ নিঃস্বর্গ বদলে দিতে পারে। আর সবাই সেটিই প্রত্যাশা করে।

সরকারিভাবে ঢাকঢোল পিটিয়ে বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ পালন করলেই দেশ সবুজ হয়ে যাবে না। এটি প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় । একে সফল করতে হলে দেশব্যাপি বাণিজ্যিক বনায়নের ব্যাপক কর্মসূচি নিতে হবে।

বনবিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পসমূহের আওতায় সারাদেশে ৫ বছরের বনায়নের হিসেব নিম্নে তুলে ধরা হল:

কার্যক্রম ১৯৯৪-৯৫  ১৯৯৫-৯৬  ১৯৯৬-৯৭  ১৯৯৭-৯৮  ১৯৯৮-৯৯
(ক) বনায়ন (হেক্টর) ১৮৫৬৪.৬৩ ৮৫৭৪.৪ ৭৫৩৫ ৮৯৬৪   ১০৫৯৩
(খ) স্টাপ বাগান (কি.মি.) ৪০৩৮.৫৮ ১৬৬৫.৯১ ৩৬৯০  ১৭১৯  ১৪০০
(গ) চারা বিতরণ (লক্ষ) ৫৩৬.২৯ ৪৬০.৯০ ৩৮৪.৮০ ২৪৬.২১   ১৫৯.৬০৩

সরকারের সহযোগিতার পাশাপাশি সকলের প্রচেষ্টায় আমাদের দেশকেও বৃক্ষে সমৃদ্ধশালী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিরসনে উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে প্রস্তুত করতে বাণিজ্যিক বনায় কে গুরুত্ব দিতে হবে ।

গাছপালা কমে গেলে প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যায়। ফলে খরার কারণে ফসলাদি ভাল হয় না। দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সামুদ্রিক অঞ্চলে যতবেশি গাছপালা বৃদ্ধি করা যাবে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকুলবাসীরা ততবেশি হেফাযতে থাকতে পারবে।

একটি আমগাছ ৫০ বছর জীবিত থাকলে যে অবদান রাখে তার আর্থিক মূল্য ১৫ লাখ ৭০ হাজার ভারতীয় রূপী বলে ভারতীয় বন গবেষণা থেকে জানা যায়। ফলে পরিবেশ বিপর্যয়রোধের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাণিজ্যিক বনায়ন নি:সন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

বাণিজ্যিক বনায়নে  আমাদের করণীয়

বর্তমান পরিবেশ বিপর্যয় মানব সভ্যতার জন্যে বিরাট হুমকি স্বরূপ। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী Peter Walliston বলেছেন- Environmental pollution is a great threat to the existence of living beings on the earth.

বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয়। বাণিজ্যিক বনায়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশে ২৫ ভাগ বন সৃষ্টি করা সম্ভব। যে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বাণিজ্যিক বনায়ন ও অংশীদারিত্বমূলক বনায়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয় তাহচ্ছে,বনায়নের মাধ্যমে গ্রামীণ দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বনজ সম্পদ বৃদ্ধি ও পরিবেশের উন্নয়ন।

বাংলাদেশের কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে বাণিজ্যিক বনায়নকে কৃষকদের দোরগোড়ায় সহজসাধ্য ও সময়মত পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন করা প্রয়োজন। বিজ্ঞানসম্মত বন ব্যবস্থায় অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে উন্নতমান সম্পন্ন উপযুক্ত গাছের চারা অপরিহার্য। তাই বন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য আদর্শ নার্সারির গুরুত্ব অপরিসীম।

বাণিজ্যিক বনায়ন সম্প্রসারনে করণীয় হচ্ছে- জনসচেতনতা সৃষ্টি, গাছের চারার সহজলভ্যতা সৃষ্টি , চারার গুণগত মান উন্নয়ন, বন বিষয়ক প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, বন বিষয়ক জ্ঞান সম্পদ ব্যবস্থাপনা , বন বিষয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন কাজের জন্য দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টিতে অবদান, প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদার , বন পণ্যের বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন, ওষুধি উদ্ভিদের চাষ সম্প্রসারণ’।

পরিবেশের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্তির জন্য যে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাসমূহ গ্রহণ করতে হবে তাহলো,অবাধে গাছপালা নিধন ও বনভূমি উজাড় করা বন্ধ করা। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যতে নিমজ্জিত হওয়া থেকে ভূমিকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ করে সেখানে বৃক্ষরোপণ। প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে গণসচেতনতা বৃদ্ধি ।

গাছের বিনাশ মানে পরিবেশের ভারসাম্যের সর্বনাশ, মেঘ পালাবে, বৃষ্টি হবে না; বৃষ্টির অভাবে নতুন করে গাছ ফলবেনা, ফসল গুমরে মরবে, জলাশয়গুলো যাবে শুকিয়ে, ফলে মাছ জলজ কীটপতঙ্গ ধ্বংস হবে, পাখিরা চলে যাবে অন্য কোনো দেশে। তাই বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে বনায়নের ক্ষেত্রে সম্মিলিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।

বাণিজ্যিক বনায়ন কার্যক্রমকে জোরদার করার লক্ষ্যে গণসচেতনতার জন্যে রেডিও-টিভিতে ব্যাপক প্রচার করতে হবে। ‘নিজে বৃক্ষরোপণ করুন; অপরকে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করুন’- এ আহ্বান সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে । পোস্টার, ব্যানার, স্লোগান দিয়ে জনগণকে জাগিয়ে তুলতে হবে এবং বনায়নের প্রতি উৎসাহিত করতে হবে।

গাছ লাগানোর জন্যে জনমনে চেতনা সঞ্চার করতে মিনিপর্দা, মাইকে প্রচার, সভাসমিতি ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে পারে। উপকুলীয় বনায়নের মাধ্যমে ঝড়ের তীব্রতা কমানোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও প্রভৃতি দাতাসংস্থা সহায়তা দিয়েছে।

সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। পাশাপাশি প্রাইভেট সেক্টরকেও বাণিজ্যিক বনায়নের ক্ষেত্রে বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে হবে । তবেই ক্ষতিকর নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হ্রাস পাবে, মানুষ ও সম্পদ রক্ষা পাবে এবং বাংলাদেশ সোনার ফসলে ভরে ওঠবে।

বানিজ্যিক বনায়নের মাধ্যমে দেশকে সবুজে-শ্যামলে, ফুলে-ফলে ভরিয়ে তুলতে চাই।দেশ ও জাতির স্বার্থে বনায়নকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। গাছের প্রতি মমত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। বৃক্ষ ও মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করার মাধ্যমে আমাদের দেশকে বদলে দিতে হবে।

বৃক্ষ নিধন নয়, বরং বৃক্ষরোপণই আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব। আর প্রচুর পরিমাণে বৃক্ষ রোপণকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশ হয়ে ওঠবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে নয়নাভিরাম এক অকৃপণ ঔদার্য। ফিরে আসবে সেই হারানো রুপ। যে রুপে মুগ্ধ হয়ে জীবনানন্দদাশ লিখেছিলেন-

‘এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে-সবচেয়ে সুন্দর করুণ;
যেখানে সবুজ ডাঙ্গা ভম্বরে আছে মধুকুপী ঘাসে অবিরল;
যেখানে গাছের নাম; কাঠাল, অশ্বথ, বট, জারুল, হিজল;
সেখানে ভোরের মেঘে নাটার রঙ্গের মতো জাগিছে তরুণ;

আসুন! যার যেখানে সুযোগ আছে গাছের চারা লাগাই, অন্যকে গাছ লাগাতে উৎসাহিত করি, পরামর্শ দেই গাছ লাগানোর। সুজলা, সুফলা হয়ে উঠুক পৃথিবীর মানচিত্রে ক্ষুব্ধ আমার এই জন্মভূমিটি! সুবজ শ্যামলিমায় ভরে উঠুক কানায় কানায়, কমে যাক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মানুষের মনে আসুক চিরসুন্দর, অকৃত্রিম, অনাবিল হাসি।

প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীব বৈচিত্র্য সুরক্ষায় এবং অথনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বৃক্ষের অবদান অপরিসীম। মানুষের জীবনধারণের জন্য খাদ্যসহ যে সব মৌলিক চাহিদা রয়েছে বৃক্ষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় সবগুলো পূরণ করে থাকে। মোটকথা বৃক্ষ আমাদের জীবন ও জীবিকার আধার। জীবনের প্রশ্নেই বৃক্ষরোপণ কর্মকাণ্ডে মানুষকে সাড়া দেয়া উচিত। তাই আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই-

‘গাছ লাগিয়ে ভরবো দেশ
বদলে দেব বাংলাদেশ।’

বৃক্ষ মানব জীবন বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দু। বাতাসের বিষ শুষে নিয়ে গাছ মানুষস সমস্ত প্রাণিকুলকে দান করে নির্মূল বায়ু-যা তার বেঁচে থাকার পূর্বশর্ত। গাছকে কেন্দ্র করেই প্রাণের অস্তিত্ব। মানব জীবনের সাথে বৃক্ষের সম্পর্ক সুগভীর। তাই বৃক্ষকে মানব জীবনের ছায়াস্বরূপ বলা হয়।

বৃক্ষ আমাদের নীরব বন্ধু, নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ। পরিকল্পিত বনায়নের মাধ্যমে আমরা বৃক্ষ সম্পদ বাড়াতে পারি। সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবেশ বিপর্যয়রোধে বাণিজ্যিক বনায়নের বিকল্প নেই।

পৃথিবী একটি। কিন্তু বৃক্ষ নিধনের কারণে সেই পৃথিবীটি যদি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে তাহলে পৃথিবীর মানুষ দাঁড়াবে কোথায়? তাই একটি সুখী ও সুন্দর জীবনের জন্যে সকলকে এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হওয়া উচিৎ যে,

“লাগাব বৃক্ষ, তাড়াব দুঃখ
চলো সবাই গাছ লাগাই না হয় জীবন রক্ষা নাই।”

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.