জীববৈচিত্রপূর্ণ একটি পৃথিবীই আমাদের স্বপ্ন

‘মানুষের লোকালয় যদি কেবলই একান্ত মানবময় হয়ে ওঠে,
এর ফাঁকে যদি প্রকৃতি কোনো মতে প্রবেশাদিকার না পায়,
তাহলে চিন্তাও কর্ম ক্রমশ কলুষিত ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে
নিজের অতলস্পর্শ আবর্জনার মধ্যে আত্মহত্যা করে।’
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

জীববৈচিত্রপূর্ণ একটি পৃথিবীই আমাদের স্বপ্ন। জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের অর্থ আমাদের মৃত্যু। অনাগত সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য এমন বৈচিত্র্যময় নিঃসর্গ প্রয়োজন যার একটি সমৃদ্ধশালী জীববৈচিত্র্য জীবকুলের অস্তিত্বকে সুনিশ্চিত করবে। প্রাণী ও উদ্ভিদের টিকে থাকা,উৎপাদনশীলতা বজায় রাখার জন্য জীববৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। অথচ বৈরী জলবায়ু ও পরিবেশগত সংকটের ফলে জীববৈচিত্র্যে বিপণ্ন হওয়ার প্রশ্নটি বারবার সামনে চলে আসছে কোটি কোটি মানুষের অস্তিত্ব বিপণ্ন হবার আশঙ্কায়। এ বসুন্ধরাকে মানুষের বাসযোগ্য রাখতে জীবজগতের বৈচিত্র্যের কোনো বিকল্প নেই।

শিরোনাম বিশ্লেষণ; তত্ত্বগত আলোচনা

প্রকৃতির কোনো স্থানের প্রাণ প্রাচুর্যের যে বৈচিত্র্য তাকে ঐ স্থানের জীববৈচিত্র্য বলা হয়। প্রকৃতির যে কোনো স্থানেই বিভিন্ন প্রাণী উদ্ভিদের সমাহার দেখা যায় এই বিভিন্ন প্রাণী উদ্ভিদের সমাহার ঐ স্থানের জীববৈচিত্র্য।

কোনো সুনির্দিষ্ট এলাকার জীববৈচিত্র্য বলতে সংশি¬ষ্ট ভূখণ্ডে বা জলাশয়ে বিরাজমান যাবতীয় প্রাণী-উদ্ভিদ ও বাসস্থানের বিভিন্নতাকে বোঝায়।

জীববৈচিত্র্য তিন পর্যায়ের হতে পারে। যেমন-জীনগত বৈচিত্র্য (Genetc Diversity) প্রজাতি বৈচিত্র্য (Species Diversity) এবং তাদের আবাসের বৈচিত্র্য (Habital Diversity) বা পরিবেশগত বৈচিত্র্য (Ecosystem Diverstiy)। একই প্রজাতির প্রাণী বা উদ্ভিদের মাঝে জীনগত যে পার্থক্য বিদ্যমান তাই জীনগত বৈচিত্র্য। এক প্রজাতি হতে অন্য প্রজাতির প্রাণী বা উদ্ভিদের মাঝে যে পার্থক্য তাকে বলে প্রজাতির বৈচিত্র্য।

বিশাল ও বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদগোষ্ঠীর মধ্যে আঙ্গিক ও চারিত্রিক যে বিভিন্নতা লক্ষ করা যায় তা উদ্ভিদ বৈচিত্র্য। উদ্ভিদজগতের মধ্যকার বিভিন্নতা হলো, Morphological diversity, Ecological diversity, Anatomical diversity, Cytological diversity, Pigmental diversity, Biochemical diversity, Adaptational diversity, Multational diversity, Nutritional diversity, Reproductive diversity, Diversity in size and shape. Diversity in alternation of generation. Diversity in economic importance এবং Diversity in space.

পৃথিবীপৃষ্ঠে; অন্তরীক্ষে এবং স্বাদু পানির ও সামুদ্রিক জলাশয়সমূহে বসবাসকারী সকল প্রকার জীবের মধ্যে বিরাজমান প্রজাতিগত, জীনগত ও পরিবেশতাত্ত্বিক বিভিন্নতাই জীববৈচিত্র্য। জীববৈচিত্র্য নির্ভর করে পরিবেশের বৈচিত্র্যের ওপর। জীববৈচিত্র্য ২ টি পর্যায়ে বিবেচনা করা হয়। ১) গঠনগত (Structural) বা অঙ্গসংস্থানিক বৈচিত্র্য যা প্রজাতি বা শ্রেণী বিন্যাসতাত্ত্বিক (Taxonomic) এবং অভিব্যক্তিয় বৈচিত্র্যের ভিত্তি এবং ২) কার্যগত (Functional) বৈচিত্র্য যা পরিবেশতাত্ত্বিক এবং বংশগতীয় বৈচিত্র্যের ভিত্তি।

উদ্ভিদের মধ্যে যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তার জন্য পৃথিবীর বিচিত্র ভৌগোলিক বা প্রাকৃতিক পরিবেশ ও অনেকটা দায়ী। সারা পৃথিবীতে প্রায় চারলক্ষ, কারো কারো মতে ছয় লক্ষের মতো উদ্ভিদ প্রজাতি সনাক্ত করা হয়েছে। প্রাণীর মধ্যেও রয়েছে বহু ধরণের বৈচিত্র্য।

জীববৈচিত্র্যপূর্ণ পৃথিবীর স্বপ্ন; কেন?

প্রকৃতি এবং জলবায়ু জীবজগতের সাথে যেমন জড়িত তেমনি প্রাণীকুলের জীবন প্রক্রিয়া, তাদের আহার বিহার ও টিকে থাকা না থাকার সাথে সম্পর্কিত। যে কারণেই প্রকৃতিকে লালন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশের প্রতি সুবিচার আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

জীববৈচিত্র্য বিশ্বের সামগ্রিক পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জীবজগতে প্রতিটি প্রজাতি একটি পরিকল্পিত শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এর মাঝে কোনো প্রজাতি ক্ষতিগ্রস্ত বা বিলুপ্ত হলে জীবজগতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে বাধ্য। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফাণ্ড ফর নেচারের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, প্রতিদিন বিশ্ব থেকে ৫টি প্রজাতির উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বখাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, (Tropical rain Forests) থেকে প্রতিদিন ১০০টি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

আর কোনো একটি প্রজাতির বিলুপ্তি অন্য অনেক প্রজাতির অস্তিত্বকে বিপণ্ন করে তুলছে। কেননা প্রতিটি জীবই অন্য অনেক জীবনের জীবনযাপনে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করে। জীবজগতের ভারসাম্য চারপাশের সব উপাদানেরই ভারসাম্য বজায় রাখে। তাইতো আমরা জীববৈচিত্র্যপূর্ণ পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি।

মানুষ বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ ও প্রাণীজ উৎস থেকে খাদ্য, বস্ত্র, ঔষুধ, শিল্পজগত পণ্য, জ্বালানী, বাসস্থান তৈরির সরঞ্জাম সংগ্রহ করে। প্রায় সাত হাজার উদ্ভিদ প্রজাতিকে আমরা খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করি। জীববৈচিত্র্য হারিয়ে গেলে নতুন নানাবিধ সংকট মানব জীবনকে অসহনীয় করে তুলবে। জীববৈচিত্র্যের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক।

জীববৈচিত্র্যের পরিবেশতান্ত্রিক গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবেশতন্ত্রের জীবকুলের অস্তিত্ব হুমকীর সম্মুখীন হলে খাদ্য চক্রে (Food Chain) শক্তি প্রবাহের ব্যাঘাত ঘটে এবং পরিবেশতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এর সুদূরপ্রসারী ফলস্বরূপ মানবজাতির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় এবং মানুষের অস্তিত্বও বিপণ্ন হয়ে পড়ে। মানবজাতির অস্তিত্বকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে জীববৈচিত্র্যের আছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

জীবজগতে কোনো জীবই এককভাবে টিকে থাকতে পারে না। পরস্পর নির্ভরশীল ও জীবনধারার একটি উদ্ভিদ বা প্রাণীর জীবন বিপণ্ন হলে তা অন্য উদ্ভিদ বা প্রাণীর অস্তিত্বকে প্রভাবিত করে। যে প্রতিবেশ ব্যবস্থা যত বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ সে প্রতিবেশ ব্যবস্থা তত বেশি সুস্থিত এবং তত বেশি উৎপাদনশীল। প্রতিবেশ ব্যবস্থায় যেকোনো একটি উপাদানের পরিবর্তন হলে সে প্রতিবেশ ব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে। যার ফল-জীববৈচিত্র্য হ্রাস পাওয়া, উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া।

Bird Species and Climate Change (2006) প্রতিবেদনে উলে¬খ করেছে যে, ২০ সে: তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে পাখিদের বিলুপ্তির হার অনেক বৃদ্ধি পাবে। ওয়াকিং গ্র“প-২ এর রিপোর্ট ২০০৭ থেকে জানা যায় গেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জীববৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে বিনষ্ট হতে পারে। তার ফলে মৎস ও পশু উৎপাদনে সমস্যা প্রকট হবে।

জলবায়ুর পরিবর্তন বিশ্বের জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। সকল প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে বা পরিবর্তন হবে। খাদ্য শৃঙ্খলে পরিবর্তন, তাদের জীবনচক্র অর্থাৎ প্রজনন ও বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটবে। এর ফলে অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অনেকে আবার পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে চিরতরে।

পানিচক্রে পরিবর্তনের ফলে জলাভূমি শুকিয়ে যেতে পারে। এতে প্রজাতি বৈচিত্র্য কমে যাবে। উদ্ভিদ বৈচিত্র্য ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিবে। কোনো কোনো বন ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ায় নির্ভরশীল প্রাণীবৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সামুদ্রিক পাখির আশ্রয় এবং বাসা বাঁধার স্থান হ্রাস পাবে। উপকুলীয় প্রতিবেশ সংকুচিত হওয়ায় হ্রাস পাবে এলাকা নির্ভর প্রাণী উদ্ভিদ।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে কোনো কোনো ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী নির্দিষ্ট সময়ের আগেই শীতনিদ্রা শেষ করছে; তাদের প্রজনন প্রক্রিয়া শুরু করছে অনেক আগে। কোনো কোনো প্রাণীর খাদ্যাভাস পরিবর্তনের ফলে শারীরিক বৃদ্ধি বেশি হচ্ছে। আর্কটিক সাগরে বরফ গলে যাওয়ায় মেরু ভাল্লুকের বংশবৃদ্ধি বেশি হচ্ছে। উচ্চ তাপমাত্রা কীটপতঙ্গের বিচরণক্ষেত্র প্রসারিত করতে সহযোগিতা করছে।

IPCC-2007 অনুযায়ী, ‘ যে সমস্ত প্রজাতি (প্রায় ৯৭%) উপযুক্ত পরিবেশে সরে যেতে পারবে না তাদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যাবে।’ যেমন-তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মাছের বিপাকের হার বৃদ্ধি পাবে। তবে মাত্রারিক্ত বৃদ্ধি মাছের জীবনচক্রের জন্য ক্ষতিকর হবে। মাছের প্রজনন মৌসুমে প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত কিংবা তাপমাত্রা বজায় না থাকলে মাছের প্রজনন ব্যাহত হবে। মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে কমে যাবে, মাছের অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী প্রবাল সম্পদের বিপুল ক্ষতির কারণ হবে। প্রথমত, প্রবাল বিবর্ণ হয়ে যাবে, দ্বিতীয়ত, প্রবাল প্রাচীরে রোগ দেখা দিবে, তৃতীয়ত, সামুদ্রিক পানি অম্লীয় হয়ে যাওয়ার কারণে প্রবাল মারা যাবে। এছাড়া ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে মানুষের জীবন হয়ে উঠতে পারে দুর্বিষহ, ঘনঘন ফসলহানি দেখা দিতে পারে।

২০০৭ সালে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত পরিবেশ বিষয়ক সম্মেলনে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী ২০৮০ সালের মধ্যে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ গাছপালা ও প্রাণী হুমকির মুখে পড়ে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। বিশ্বের তাপমাত্রা ১.৫ থেকে ২.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ গাছপালা ও পশুপাখির জীবনের ওপর ভয়াবহ ঝুঁকির সম্ভাবনা বিদ্যমান। এমতাবস্থায় জীববৈচিত্র্যপূর্ণ পৃথিবীর স্বপ্ন পূরণে একযোগে কাজ করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।

স্বপ্নপূরণের অন্তরায় ও বাস্তবতা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

জীববৈচিত্র্যপূর্ণ একটি পৃথিবীর স্বপ্ন পূরণে পৃথিবীর প্রতিটি দেশকেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয়। বিশ্বকে নিয়ে ভাবলে আগে এদেশকে নিয়ে ভাবতে হবে। উদাহরণ হিসেবে আমরা বাংলাদেশকে , এদেশের জীববৈচিত্র্যে, সমস্যা, সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করব।

বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় আয়তনে ছোট হয়েও এদেশের জীববৈচিত্র্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এদেশে প্রায় ৫০০ প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদ। ৬৭৭ প্রজাতির মলাস্কা, ৬৫৩ প্রজাতির স্বাদু এবং লোনা পানির মাছ, ৩০ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ১৫৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬৫০ প্রজাতির পাখি এবং ১৫৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। (Bangladesh Encyclopedia of Flory and fund)

বিজ্ঞানীদের ধারণা ২১০০ সালের ভিতর বিশ্বের প্যারাবন ব্যাপকভাবে কমে যাবে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ার কারণে বাংলাদেশের মূল প্যারাবন সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আই ইউ সি এন) কর্তৃক প্রকাশিত রেড ডাটা বুকে বাংলাদেশের ২৩টি প্রজাতির বন্য প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারো কারো গবেষণায় বের হয়ে এসেছে এদেশে ২৭টি বন্য প্রাণীর প্রজাতির অস্তিত্ব বিপণ্ন এবং ৩৯ টি প্রজাতি হুমকির সম্মুখীন।

আই ইউ সি এন এর সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, দেশের উদ্ভিদকুলের ৫ হাজার ১৭৩ টি প্রজাতি, আড়াই হাজার প্রজাতির কীটপতঙ্গ, ৭ শতাধিক সামুদ্রিক ও স্বাদু পানির মাছ, ১৫০ প্রকার উভচর ও সরীসৃপ, ৬০০ প্রজাতির পাখি এবং ১১৩ ধরনের সামুদ্রিক ও অভ্যন্তরীণ স্তন্যপায়ী প্রাণীর জীবন হুমকির মুখে।

ইতোমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে নেকড়ে, বনমহিষ, নীলগাই, হায়েনা, দুই প্রজাতির হরিণ, তিন প্রজাতির গণ্ডার, দুই ধরনের বন গরু, ৪৩ প্রজাতির মাছ, ২১ প্রজাতির কীটপতঙ্গ। বিলু্িপ্তর পথে রয়েছে আরো ৮০০ ধরনের উভচর প্রাণী, ৬৩ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪৭গ প্রজাতির পাখি ও ৪৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীসহ ২৫৭ প্রজাতির প্রাণী।

ওভারসজি ডেভেলমেন্ট অথরিটির (ওডিএ) ১৯৮৫ সালের জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৫০ টি। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচীর (ইউএনডিপি) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কষিসংস্থার (এফএও) বিশেষজ্ঞদের ১৯৯৪ সালের জরিপে দেখা যায়, বাঘের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ২৬০ টিতে। চিত্রল হরিণ ছিল ৮০ হাজার, জরিপের সময় পাওয়া যায় মাত্র ৬০ হাজার। কুমারীসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীও হ্রাস পাওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।

পানিপ্রবাহের পরিবর্তন। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, উপকুলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে মৎস সম্পদ। আজ হুমকির মুখে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু বৈচিত্র্যেপূর্ণ পৃথিবীর স্বপ্ন দেখলেই চলবে না, বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

ইতোমধ্যে ১৯৯২ সালে জীববৈচিত্র্য কনভেশনে স্বাক্ষর করার পরে বাংলাদেশ ‘National Conservation Strategy-NCS’ এবং ‘National Environment Management Action Programme-MEMAP’ তৈরি হয়েছে। পরিবেশ ও বনমন্ত্রণালয় ইউএনডিপির সহায়তায় Sustainable Environment Mangagement Plan-SEMP এর অধীনে বেশ কিছু জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশ National Biodiversity Strategy and Action Plan-NBSAP তৈরি করেছে। Biodiversity Act এবং Traditional Knowledge Protection Act  করেছে, যা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

বিদ্যমান বাস্তবতায় বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক মহলের উচিত Millenium Development Goals MDG এবং PRSP সহ মূলধারার উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয়ের সাথে সব বহুপাক্ষিক পরিবেশ চুক্তিগুলোতে সম্পৃক্ত করা। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মতো বিশাল কর্মযজ্ঞে কতগুলি আন্তর্জাতিক সংস্থা,যেমন – IUCN, Man and Biosphere, WWF, UNEP ইত্যাদি সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই আমাদেরকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব অনুধাবণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশে ব্যাপকহারে বৃক্ষ নিধনের কারণে প্রকৃত বনের পরিমাণ পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি নেমে গেছে। প্রায় ডজন খানেক প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং তার চেয়েও অধিক সংখ্যক প্রজাতির পাখিস আরো বহু প্রজাতি বর্তমানে বিলুপ্তির পথে।

UNFCCC সুস্পষ্টভাবে দূষণ কমানোর দায় দায়িত্ব দিয়েছে অ্যানেক্স-১ বা শিল্পোন্নত রাষ্ট্রসমূহকে। সুতরাং তাদেরকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। বাংলাদেশকে ক্ষতিপূরণ নিতে হবে।

কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণীর সংরক্ষণ করার গুরুত্ব ঐ উদ্ভিদ বা প্রাণিটি অর্থনৈতিকভাবে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তার ওপর নির্ভর করে না। জীববিজ্ঞানীরা মনে করেন কোনো প্রজাতির তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক গুরুত্ব থাকুক বা নাই থাকুক, সকল প্রজাতিকেই সংরক্ষণ করতে হবে।

জীববৈচিত্র্যে ও তার সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব সম্বন্ধে সচেতনতার এবং মানবিকতার অভাবে বিবেকহীন মানুষ নিজেই উদ্ভিদ ও প্রাণিসম্পদের অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর সার্বিক পরিবেশ মানুষের বাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।

এমতাবস্থায় অভিযোজন খাতে ব্যয় বাড়াতে হবে। ‘বাংলাদেশে অভিযোজন খাতে প্রস্তাবিত অর্থের পরিমাণ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)

তহবিলের উৎস  প্রস্তাবিত অর্থ
সরকারের রাজস্ব বাজেট (২০০৯-’১০ অর্থবছরে) ১০২
মাল্টি (ডানার ট্রাস্টফাণ্ড (যুক্তরাজ্য ও ডেনমার্ক হতে)  ৯৭.৯
পাইলট প্রোগ্রাম ফর ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স (বহুমাত্রিক ব্যাংক) ৩০-৫০
জাইকা কর্তৃক বাজেট সহায়তা (জাপান হতে) ৭১
জাপান ডেবট ক্যানসেলেশন ফাণ্ড ( ঋণের সুদ হিসেবে অর্জিত) ১০২

এটি মোটেই যথেষ্ট নয়।

জীববৈচিত্র্যের ওপর আঘাত শুধু বাংলাদেশের মানুষ নয় পৃথিবীর প্রতিটি দেশ, জাতি, জনগণের জন্য বিপদ ডেকে আনবে। তাই মানব বসবাসের অযোগ্য যাতে হয়ে না পড়ে এ’বসুন্ধরা সে জন্য সংকট, সমস্যা গুলো সমাধান কিংবা নিয়ন্ত্রণে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চালাতে হবে।

জীববৈচিত্র্যপূর্ণ পৃথিবীর স্বপ্ন পূরণে করণীয়

বৈচিত্র্য নির্ভর প্রাকৃতিক সম্পদের উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবার কফলে মানুষের জীবন-জীবিকা আয় উন্নতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এ সকল বিষয়ে সঠিকধারণা পেতে অঞ্চলভিত্তিক আরও গবেষণা ও মোকাবেলা পদ্ধতি আবিষ্কার প্রয়োজন।

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ব্যক্তিগত এবং সামাজিক দায়-দায়িত্ব বাড়াতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে এবং সকলকে উৎসাহিত করতে হবে। সকল পর্যায়ে সংরক্ষণমূলক কাজকে উৎসাহিত করতে হবে এবং ক্ষতিকর ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের যথাযথ শাস্তি বিধান করতে হবে।

সরকার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারের জন্য জাতীয় কৌশল প্রণয়ন করে নীতিমালা ঘোষণা করার মাধ্যমে।

জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পতিত হওয়ায় অনেক দেশের অবস্থা বিভিন্ন দিক থেকে ভীষণ নাজুক। এ জাতীয় বিপদ মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক, জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ দরকার।

পাশাপাশি দরকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে আইন বিষয়ে সচেতনতা, বিশ্ব জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে দরকার সমন্বিত উদ্যোগ ও যৌথ প্রচেষ্টা।

ব্যক্তিবিশেষের অজ্ঞতা ও অসচেতনতার ফলে পৃথিবীতে জীববৈচিত্র্য উদ্বেগজনভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। যদি এ প্রবণতা বন্ধ করা না যায় তবে ২০২৫ সালের মধ্যে ২০-২৫% প্রাণী ও উদ্ভিদ পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে এমনটাই ধারণা পরিবেশ-বিজ্ঞানীদের। তাই বিশ্বব্যাপী ব্যাপক জনমত তৈরির ব্যাপারে ত্বরিত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সকলকে সংবেদী করে তুলতে হবে এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। বাস্তবধর্মী, দীর্ঘমেয়াদী এবং নমনীয় প্রকল্প গ্রহণ করতে বে। নির্ভরশীল দরিদ্র জনগণের জন্য বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টিতে সহায়তা প্রদান করতে হবে।

জীববৈচিত্র্যপূর্ণ পৃথিবীর স্বপ্ন পূরণে প্রতিবেশ ভিত্তিক (Ecosystem Based) সংরক্ষণমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সংকটাপন্ন প্রজাতি চিহ্নিত করে তাদের সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গবেষণার মাধ্যমে সংরক্ষণের নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করতে হবে যেন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা যায়। সম্পদ ব্যবহারকারীদের সংগঠিত করে স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠন তৈরি করা যেতে পারে।

সর্বোপরি, সরকারি নীতিমালা, আইন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব দূর করতে হবে। এলাকার স্বার্থবাদী গোষ্ঠীসমূহের কার্যকলাপ বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে। সংশি¬ষ্ট বিষয়সমূহে দেশীয় প্রেক্ষিতে গবেষণালব্ধ জ্ঞান এবং তথ্যের অভাব দূর করতে হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীববৈচিত্র্য সম্পদসমূহের উপর নির্ভরশীলতা জনসংখ্যার চাপ এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা জনিত প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ]

উপসংহার

ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখার উদ্দেশ্যে বর্তমানে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে এবং জীববৈচিত্র্য বিশে¬ষণ এবং সংরক্ষণের জন্য বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। মানুষের অস্তিত্বের স্বার্থেই জীববৈচিত্র্যকে সংরক্ষণ করে সম্মিলিতভাবে আমাদের কল্যাণের জন্যে তার সকল সুফল ব্যবহার করতে হবে।

আমাদের বৈচিত্র্যময় প্রাণী ও উদ্ভিদ জগৎ কে রক্ষা করতে এখনই জরুরীভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় সরকারের পাশাপাশি সকল ধরণের সংগঠন, ব্যবসায়ী পেশাজীবীগণ এবং ব্যক্তিপর্যায়ে সকলকে সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে। যার যার ক্ষেত্রে সকলেই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এগিয়ে আসবেন এবং ভূমিকা রাখবেন, এটাই প্রত্যাশা।

 

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.