জীবনের সৌন্দর্য সততা

সততা কী?

সততা মানব চরিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও মহৎ গুণ। অনেক সৎ গুণের বৈশিষ্ট্য সততা। সততা মানে সাধুতা, মানবতা, সত্যবাদিতা। নিজের স্বার্থ বড় করে না দেখা এবং অপরের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হোক তা না চাওয়ার নামই সততা।যার মধ্যে এই মহৎ গুণটি রয়েছে তাকে সৎ ব্যক্তি বলা হয়।

যার মধ্যে সততা আছে সে ন্যায়নীতির প্রতি শ্রদ্ধা রাখবে।তার মধ্যে মানবতাবোধ থাকবে। সে সর্বদা সত্য কথা বলবে এবং মানুষের বিশ্বাস অর্জন করবে। এমনকি চরম শত্রুরাও তাকে বিশ্বাস করে।সততা মানুষকে ভালো কাজের দিকে পরিচালিত করে।আর ভালো কাজ মানুষকে জান্নাতে পৌঁছে দেয়।

সততার প্রয়োজনীয়তা

মানব জীবনে সততার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

সততার ফলাফল

সততা থাকলে আল্লাহতায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। ঈমান ও ইসলামের পূর্ণতা দান করে সততা। সততার গভীরতা অনেক বেশি।

সততার মূল্য

সত্যিকার মুমিন সততাকে চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ্য থেকে ঊর্ধ্বে মনে করেন। যে সমাজে সততার অভাব রয়েছে,সেখানে সুখ ও শান্তি নেই।সেখানে অশান্তি আর অশান্তি। অসত্য ও সততার অভাব মানুষকে সমাজে হেয় করে তোলে।

যে সমাজে সত্যবাদিতা ও সততার অভাব ঘটে সে সমাজ আস্তে আস্তে ধ্বংসের পথে চলে যায়।ধ্বংস হয়ে যায়।প্রতারণা ও দুর্নীতি সে সমাজকে আচ্ছন্ন করে।মহানবি (স) বলেছেন,  “সততা ও সত্যবাদিতা মানুষকে মুক্তি দেয় আর অসত্য ও মিথ্যা মানুষকে ধ্বংস করে।”

সততার প্রভাব

সৎ লোকের সততার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে অসৎ-মন্দলোক ও জীবনের গতি পরিবর্তন করতে পারে। বড় পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানি (রঃ) বাল্যকাল থেকেই সততা ও সত্যবাদিতার জন্য সকলের প্রিয় পাত্র ছিলেন। ডাকাতদলের হাতেধরা পড়েও তিনি মিথ্যার আশ্রয় নেননি। ফলে বালক আবদুল কাদের জিলানীর সতায় মুগ্ধ হয়ে ডাকাতদল ডাকাতি ছেড়ে দিয়ে ভাল মানুষ হয়ে যায়। কাজেই সুখী, সমৃদ্ধ ও সুন্দর জীবনযাপনের জন্য আমাদেরও সততা অর্জনে ব্রতী হতে হবে।

সততার বৈশিষ্ট্য

সততা বলতে সৎ থাকার গুণকে বুঝানো হয়। সত্যের অনুসারী মানুষের সৎ থাকার প্রবণতার মধ্য দিয়ে সততার প্রকাশ ঘটে। অন্যায়, অবৈধ কাজ না করে ন্যায় ও সত্যের সপথে জীবন পরিচালনা করাই সততার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

জীবনকে সফল ও সার্থক করে তোলার প্রধান উপায় হলো সততা। সৎ চিন্তা ও সৎ কাজের মধ্য দিয়েই বিকাশ ঘটে সততার মত মহৎ গুণ। তাই আদিকাল থেক মানুষ সততার চর্চা করে সমাজে সত্য ও ন্যায় প্রতিসমা কর আসছে। সততার গুণে সমৃদ্ধ মানুষ সমাজের আদর্শ মানুষ।

সততার সুফল

সততার সুফল শত ধারায় বিকশিত। জীবনকে সুন্দর, সফল ও সার্থক করে তুলতে হলে সৎ থাকার অভ্যাস অর্জন করতে হয়। সৎ গুণ সম্পন্ন মানুষ কখনও অসৎ কিংবা মন্দকাজে লিপ্ত থাকতে পারে না। সৎলোক মাত্রই চরিত্রবান ও মহৎ হয়ে থাকে।

সৎ লোক সমাজে সবার বিশ্বাসভাজন হয়ে থাকে। সৎ লোক সমাজে সবার বিশ্বাসভাজন হয়ে থাকে। সততা মানুষকে নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান করে থাকে। সৎ ব্যক্তি কখনও অন্যায় ও অসত্যর কাছে মাথানত করে না। মানব জীবনে তাই সততার গুরুত্ব অপরিসীম।

কুরআনে সততা

আল্লাহ বলবেন, এই সেই দিন যেদিন সত্যবাদিগণ তাদের সত্যতার জন্য উপকৃত হবে, তাদের জন্য আছে জান্নাত যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট; এটা মহাসফলতা। (সূরা মায়িদা, আয়াত : ১১৯)

সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গ লাভ করার প্রতি আহ্বান জানিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সৎ-সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গী হও। (সূরা তওবা, আয়াত : ১১৯)

মহান আল্লাহ বলেন, আর কেউ আল্লাহ এবং রাসূলের আনুগত্য করলে সে নবী, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ-যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন-তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কত উত্তম সঙ্গী। (সূরা নিসা, আয়াত : ৬৯)

আল্লাহ সত্যবাদীদেরকে পুরস্কৃত করেন তাদের সত্যবাদিতার জন্য এবং তার ইচ্ছা হলে মুনাফিকদেরকে শাস্তি দেন অথবা তাদেরকে ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আহজাব, আয়াত : ২২-২৪)

আল্লাহ তায়ালা তা অন্য আয়াতে এভাবে বলেছেন, মুমিন তো তারাই যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে অতপর তাতে কোন সন্দেহে পতিত হয়নি এবং তাদের জানমাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে। তারাই তো সত্যবাদী। (সূরা হুজুরাত, আয়াত : ১৫)

হাদিসে সততা

রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়তের বিশুদ্ধতা ও সততা সঙ্গে আল্লাহর পথে শহীদ হওয়ার সৌভাগ্য অর্জনের প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাকে শহীদের মর্যাদায় পৌঁছাবে…. যদিও সে বিছানায় মৃত্যুবরণ করে।’ –সহিহ মুসলিম

অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি সততা আন্তরিকতার সঙ্গে শাহাদত লাভ করতে চায়, শহীদ না হলেও শহীদের র্মযাদা ও সওয়াব দেয়া হবে।’ –সহিহ মুসলিম

রাসূল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের উচিত সততা ও সত্যতা অবলন্বন করা। কেননা সততা ও সত্যতা মানুষকে পুণ্যের পথে পরিচালিত করে আর পুণ্য জান্নাতের দিকে পরিচালিত করে। কোনো ব্যক্তি যখন সত্য কথা বলে এবং সততা ও সত্যতার গুণ বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। তখন আল্লাহর কাছে সত্যবাদী সিদ্দিক হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়। আর তোমরা মিথ্যা থেকে বিরত থাক। নিঃসন্দেহে মিথ্যা পাপের দিকে চালিত করে। পাপ জাহান্নামে নিয়ে যায়। ব্যক্তি যখন মিথ্যা বলে এবং মিথ্যায় মনোনিবেশ করে তখন তার নাম আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়। ’

হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মিথ্যার আমল পরিত্যাগ করল না, তার খাদ্য ও পানীয় পরিত্যাগ করার আল্লাহর কোনই প্রয়োজন নেই। -সহীহ বুখারী।

নবীজি (সা.) বলেন, সত্যবাদী ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী সিদ্দীক ও শহীদগণের সঙ্গে থাকবে। সত্যবাদী ব্যবসায়ী কারা তা হাদিসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, যদি ক্রেতা-বিক্রেতা সত্য বলে এবং ভালো-মন্দ প্রকাশ করে দেয় তাহলে তাদের লেনদেন বরকতময় হবে। আর যদি উভয়ে মিথ্যা বলে এবং দোষত্রুটি গোপন করে তাহলে এ লেনদেন থেকে বরকত উঠিয়ে নেওয়া হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৩২)

সাহাবি হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, স্বভাবগতভাবে একজন মুমিনের মাঝে (ভালো-মন্দ) সকল চরিত্রই থাকতে পারে, দুটি চরিত্র ছাড়া এক. খিয়ানত, দুই. মিথ্যা। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২২১৭০; শুআবুল ঈমান, বাইহাকি, হাদিস : ৪৪৭১)

নবীজি (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে তবে তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস। (সুনানে আবু দাউদ)

স্বচ্ছতার প্রশংসা করে নবীজি (সা.) বলেন, আমার সুপারিশ তার জন্য যে সাক্ষ দেবে আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। এমন এখলাসের সাথে যে, তার অন্তর তার মুখকে সত্যায়ন করবে এবং মুখ অন্তরকে সত্যায়ন করবে। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৮০৭০)

ইসলামে সততা

সিদ্দিক তথা সততা বলতে আন্তরিক বিশ্বাস এবং মনের ঐকান্তিকতার সঙ্গে সেই বিশ্বাসের স্বীকৃতি বুঝায়। আর বান্দা তার সব আমল বা কাজের প্রতিফল একমাত্র আল্লাহর কাছে আশা করে। মুমিনরাই যে সত্যবাদী

আল্লাহতায়ালার সর্বাগ্রে বিচার্য বিষয় হচ্ছে, বান্দার আন্তরিকতা নিয়্যতের বিশুদ্ধতা। এর ভিত্তিতে আল্লাহতায়ালা বান্দাকে পুরস্কৃত করবেন। অতএব বান্দাকে সদা-সর্বদা কথা-কাজে সততা, সত্যতা ও স্বচ্ছতা রক্ষা করতে হবে এবং মিথ্যার অভিশাপ, গ্লানি থেকে বাঁচাতে হবে।

সততার কাহিনী

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ছিলেন হযরত ওমর (রা)। তিনি তাঁর রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ন্যায়বিচার করতেন। কোন প্রকার অন্যায় কাজ হলে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা নিতেন।বিচারে কোন প্রকার পক্ষপাতিত্ব হতো না। তিনি রাতের অন্ধকারে ছদ্মবেশে মদিনার অলিতে গলিতে ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষের খোঁজ খবর নিতেন। তাদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবগত হতেন।

তথ্যসূত্র

সততার শিক্ষা এবং শিক্ষায় সততা, জিনাত রেজা খান
স্পিকোলা ডট কম
মুমিনের জীবনে সত্য ও সততা, ড. মাহের আল মুয়াইকিলি
সততা, নৈতিকতা ও নীতিজ্ঞান নির্বাসনের পথে- ইকতেদার আহমেদ
ব্যবসায় সততার বিকল্প নেই, সাইফুল হুদা
সততা: মুক্তির পথ, আরিফুল ইসলাম
সত্যবাদিতা ও সততা, উবায়দুর রহমান খান নদভী
সততা স্টোর সততার পাঠ দিচ্ছে, শাওন আহমেদ
সততার সুফল শত ধারায় বিকশিত যা জীবনকে সুন্দর-সফল ও সার্থক করে, মোঃ আলতাফ হোসেন
শাকিলের সততা, মুজাহিদ বিল্লাহ
রাইজিংবিডি.কম

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.