ছলচাতুরি রুগ্নতা ও নিম্নমানের চাকরি

ছলচাতুরি কখনো কাজে প্রকৃত গতি আনে না। সততার জায়গাটি দুর্বল হলে দীর্ঘদিন কাজে উজ্জীবিতও থাকা যায় না। মহৎ উদ্দেশ্যের জায়গায় সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থ স্থান করে নিলে মনের দরিদ্রতা কমেও না। আর্থিক রুগ্নতার চেয়ে মনের রুগ্নতা কোনো দিক থেকেই কম ক্ষতিকর নয়!

অনেকের বাইরে থেকে উদ্দেশ্য অনেক মহৎ মনে হয়, ভেতরে যাবার পর সামগ্রিক কল্যাণবোধের বিষয়গত চিন্তার চেয়ে বৈষয়িক চিন্তার প্রবল উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বাইরে থেকে ভালো ভালো কাজ করায় আগ্রহী সেরা সমাজসেবক ও জনদরদীর ভেতরও অমঙ্গল প্রবণতার কুৎসিৎ রূপ স্পষ্ট দেখা যায়!

প্রাইভেট সেক্টরে নিম্নমানের চাকরি মনের উপর খারাপ প্রভাব ফেলে। অসন্তোষ বাড়ে। কাঙ্ক্ষিত সাড়া মিলে না বলে আলোর মুখও দেখে না। যেখানে মালিকরা শুধু মুনাফা-লাভের খোঁজখবর রাখেন আর কর্মরতদের খোঁজখবর রাখেন না, তারা তাঁদের দুঃখকষ্ট বোঝেন না। আক্ষেপ নিয়ে দিন কাটে হতাশায়। এদের জীবনযাপনের মান খুব বেশি নেতিবাচক, ক্যারিয়ারেও উন্নতি করে না, উন্নত জীবনযাপনে পৌঁছাতেও পারে না।

চাকরিজীবীরা বেতন বৃদ্ধি পেলে খুশি হয়, বেতন কমে গেলে ভীষণ বেজার হয়। কত বেতন স্কেল, কত বেতন কাঠামো- তবু ভালো নেই কম বেতনে কর্মরতরা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেকে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। এর মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। এমতাবস্থায় ঘামের মূল্য পুঁজির মূল্যের চেয়ে কম হতে পারে না; উভয়ের স্বার্থ নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

কে কত বেশি টাকা উপার্জন করে তা সম্মান নির্ধারণেরও যেন একটি সূচক! অনেকে উপার্জনের চেয়েও বেশি টাকা খরচ করে! টাকা উপার্জন করাই যার জীবনের উদ্দেশ্য সে যেন টাকার মেশিন মাত্র! ব্যাংকে কোটি টাকা থাকায় গর্ব করার কিছু নেই। টাকার উৎস কোথায় ও কীভাবে টাকা আসে- তা ভাবাটাও গুরুত্বপূর্ণ!

প্রাইভেট সেক্টরে কোথাও কোথাও চাকরির নিশ্চয়তা নেই, কোথাও কোথাও বেতন-বোনাস নেই, কোথাও কোথাও ইনক্রিমেন্ট নেই। চাকরিজীবীর এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এমন জায়গায়ও; যেখানে সেই কোম্পানি-প্রতিষ্ঠানের মালিক রাজা-বাদশাহদের চেয়েও বিলাসী যিন্দেগী যাপন করে! অনেকক্ষেত্রে বেতনভুক্তরা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কাজ করে আর প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ মালিকের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়!

অনেক চাকরিজীবীকে একটা ফ্ল্যাট কিংবা প্লটের জন্য আজীবন আরামদায়ক ঘুম বিসর্জন দিতে হয়, অপছন্দের কাজেও নিবেদিত থাকতে হয়, অসন্তুষ্ট থেকেও হাসিমুখে বিনাবাক্য ব্যয়ে কাজ করে যেতে হয়! অথচ অনেক মালিক বড় বড় চিন্তা করে, আদর্শের কথা বলে; অথচ আত্মমর্যাদা বিকিয়ে দিয়ে নিরীহ অধীনস্তদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বেতন-ভাতা বাড়ানো দরকার!

আত্মমর্যাদা বিকিয়ে দিয়ে টাকা উপার্জনের চেয়ে মেহনত করে প্রতিষ্ঠার লড়াই চালানো ঢের শ্রেয়।প্রতারণা-জালিয়াতি করে শত কোটি- হাজার কোটি টাকা থাকার থেকে অল্প টাকা থাকা বেশি সম্মানজনক! কারণ দুর্নীতিবাজরা সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আপসহীন লড়াই করতে পারেন না । মুষ্টিমেয়র জন্য অধিকাংশই চরম কষ্টের মধ্যে নিপতিত হয়; সন্তানদের শিক্ষা ও পরিবারের লোকদের চিকিৎসাও করাতে পারে না।

অনেক দেশেই চাকরিতে নিরাপত্তা রয়েছে, দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে, ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে প্রবাসীদের জন্যেও নানাবিধ সুযোগ এবং কাজের ভালো পরিবেশ রয়েছে। সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, সুইডেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, নরওয়ে, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রিয়া, হংকং, যুক্তরাজ্য ও বাহরাইনে সবচেয়ে বেশি বেতন পান প্রবাসীরা।

সুইজারল্যান্ডে একজন প্রবাসীর বার্ষিক গড় বেতন ১ লাখ ৮৮ হাজার ২৭৫ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দেড় কোটি টাকা); এ হিসেবে মাসে আয় ১২ লাখ টাকার ওপরে। জার্মানিতে একজন প্রবাসীর বার্ষিক গড় আয় ৯৭ হাজার ৬৯৩ মার্কিন ডলার।

সুইডেনে একজন প্রবাসীর বার্ষিক গড় আয় ৮৪ হাজার ৮০২ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। সংযুক্ত আরব আমিরাতে একজন প্রবাসীর বার্ষিক গড় আয় ১ লাখ ১২ হাজার ৮২০ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৯ লাখ টাকা); মাসে আয় প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা।

নরওয়েতে একজন প্রবাসীর বার্ষিক গড় আয় ৯৭ হাজার ৪৮৬ মার্কিন ডলার। সিঙ্গাপুরে একজন প্রবাসীর বার্ষিক গড় আয় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৪১ ডলার। অস্ট্রিয়ায় প্রবাসীদের বার্ষিক গড় বেতন ৮৫ হাজার ২৮৮ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬৭ লাখ টাকা)। হংকংয়ে প্রবাসীদের বার্ষিক গড় আয় ১ লাখ ৬৯ হাজার ৭৫৬ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা)।

অনেকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে যেনতেন চাকরি নেন! চাকরি না থাকার চেয়ে নিম্নমানের চাকরিকে শ্রেয় মনে করেন। কিন্তু মানসিক অতৃপ্তি নিয়ে উচ্চ চাহিদার কাজে দীর্ঘদিন আঞ্জাম দেয়া যায় না! কম বেতনভুক্ত মানেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপর কম নিয়ন্ত্রণ। কম বেতনভুক্ত মানেই কম ক্ষমতা, কম গুরুত্বপূর্ণ; আর বেশি নিরাপত্তাহীনতা!

অক্সফামের প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে মজুরি অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। বাংলাদেশে বসবাসের জন্য শোভন মজুরি প্রয়োজন ২৫২ মার্কিন ডলারের সমান অর্থ। এর বিপরীতে বাংলাদেশের একজন শ্রমিক পায় ৫০ ডলার। ভিয়েনাভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের আইটিইউসির গ্লোবাল রাইটস ইনডেক্স-২০২১ মতে, শ্রমিকের অধিকার বিবেচনায় বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ ১০ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ।

ব্যাংকের এন্ট্রি লেভেলে নিযুক্ত কর্মকর্তারা শিক্ষানবিস কালে বেতন-ভাতা হিসেবে ন্যূনতম ২৮ হাজার টাকা পান। এ সময় শেষ হলে প্রারম্ভিক মূল বেতনসহ তাদের ন্যূনতম মোট বেতন-ভাতা হয় ৩৯ হাজার টাকা। এছাড়া, ব্যাংকের মেসেঞ্জার, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, নিরাপত্তা কর্মী, অফিস সহায়ক অথবা সমজাতীয় পদ বা সর্বনিম্ন যে কোনো পদের কর্মচারীদের ন্যূনতম প্রারম্ভিক বেতন-ভাতাদি হয় ২৪ হাজার টাকা।

অথচ বিভিন্ন খাতে আয়ের দিক থেকে ভালো রেজাল্টধারী অনেক উচ্চশিক্ষিতদের অবস্থা ড্রাইভার-পিয়ন-মেকানিক এর চেয়েও খারাপ। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের অষ্টম শ্রেণি পাস পিওনের চেয়েও কম বেতন পান বেসরকারি হাইস্কুলের অনার্স-মাস্টার্স পাস করা শিক্ষকরা।

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *