কোথায় বিপ্লবী মানুষ? কোথায় প্রতিবাদের ঝড়?

সৈকতের বালুতে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা শিশু আয়লান কুর্দির ছোট নিথর দেহও বিশ্ববাসীর ঘুম ভাঙাতে পারে না। ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের উপকূল থেকে পুতুলের মতো তুলতুলে শিশুর লাশও মোহ কাটাতে পারে না। মানবতার ভেসে যাওয়ায় অপরিসীম শোকের আধারেও নিরুচ্ছাসে লজ্জা! বেদনা অপার! পানি খেয়ে ফোলা পেট নিয়ে উপুড় হয়ে বালির কথা যেন কান দিয়ে শুনছে বাচ্চাটি!

ফুটফুটে চেহারার নিষ্পাপ শিশুর নির্মমভাবে বিদায় আলোড়ন তুলেছিল হৃদয় থেকে হৃদয়ে। নিষ্প্রাণ দেহও অনেকের বিবেককে নাড়ায়েছিল, অপরিচিত-অনাত্মীয়দেরও হৃদয়কে কাঁপায়েছিল-কাঁদায়েছিল। আয়লান চির ঘুম ঘুমালেও জাগেনি নীতিনির্ধারক শাসকদের বিবেক, বেদনার পাহাড়েও থামেনি মৃত্যুর মিছিল। সাগরজলে অনেকের চোখের জল মিশলেও বাড়েনি মানবিক উদ্যোগ।

লাল টি-শার্ট গায়ে, গাঢ় নীল শর্ট প্যান্ট ও হালকা কালো জুতো পায়ে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকা শিশুটি! জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম না থাকায় ডুবে গেছে। তার অসহায়ত্বে স্থবির হয়েছে পৃথিবী! আকাশ-বাতাস হয়েছে ভারী! কিন্তু স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি মিলেনি। আমরা চাই না সংঘাতময় বিশ্ব, সহিংসতা। চাই আশ্রয়হীনের ঠাঁই, নিশ্চিন্ত জীবনের স্বপ্ন পূরণ। হৃদয়বিদারক দৃশ্যে আলোচনার ঝড় বাড়ানোয় কী লাভ? যদি দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে থাকে অক্ষমতা। বিবেকের হিসাব মিলাবে না কভু লাশের কফিন।

আবদুল্লাহ কুর্দির কাছে আয়লানই ছিল সবচেয়ে সুন্দর। অথচ নৌকাডুবে বাবার হাত ফসকেই তলিয়ে গেল সে।প্রিয় ছেলেটি আর কোনোদিন ঘুম ভাঙাবে না বাবার, খেলা করবে না বাবার সাথে! সুন্দর মুহূর্তগুলো হারিয়ে যাওয়ায় শোকার্ত উচ্চারণ ছাড়া আবদুল্লাহ‘র আর কিইবা করার আছে?

ইউরোপে পাড়ি জমাতে চেয়ে পরপারেই চলে গেল আয়লান। অথচ কেন তাকে দেশ ছাড়তে হলো স্বপরিবারে? তিন বছর বয়সেই নিষ্প্রাণ হলো কেন দেহ? ছেলের কবরের কাছে বসে বাবা আবদুল্লাহ নিজেকে অপরাধী ভাবে, প্রিয়জনের সাথে স্মৃতি স্মরণ করে মনোকষ্ট পায়। অথচ প্রকৃত অপরাধীদের অনুশোচনা নেই, বিচার নেই, শাস্তি নেই।

আসলেই ভেসে যাওয়া মানবতার এক অশ্রুসজল ট্রাজেডি আয়লান। লোভ-ক্ষমতা-ব্যক্তিস্বার্থে মানবতা যেন ধুয়ে গেছে সাগরের তীরে। মানবীয় লাশের কফিনে জ্বলছে বেদনাদায়ী আগুন। এমন প্রাণ দান! ভাবতে বাধ্য করে- পৃথিবীতে কি আদৌ কোনো মানুষ আছে? মানবীয় বোধকে ডুবিয়ে দিয়ে কি আর জীবিত থাকা যায়?

কোথায় বিপ্লবী মানুষ? কোথায় প্রতিবাদের ঝড়? যুদ্ধের নীলনকশা! অস্ত্রে শান দেয়া! অসহায়ত্ব চাপিয়ে দেয়া! উচিৎ কাঁদা তবু হাসে। একচক্ষু মানবতায় লজ্জা! এগোনোর পথ স্থবির হয়ে গেছে। পাঁচ বছর বয়সেই বাঁচার সংগ্রামে হেরে যাওয়া শিশু তৈরি করেছে তীব্র শূণ্যতা। মায়ের সাথে সলিলসমাধি গভীর আবেগের জন্ম দিয়েছে। বন্ধ করুন বিলাপ, বন্ধ করুন শোকবার্তা পোস্ট করা। শরণার্থী তৈরির আয়োজন বন্ধে ও শরণার্থীদের  আশ্রয় দেয়ার দাবি তুলুন। নৃশংসতার করুণ সুর বন্ধ হোক।

এত সংকীর্ণ কেন জমিন! এই মাটির মালিকতো মাটির মানু্ষের জন্য কোনো জমিনকে নিষিদ্ধ করেনি। প্রাণই যদি না থাকে তবে পৃথিবী দিয়ে কী হবে? প্রাণ আগে। অথচ কানাডা তাদের শরণার্থী আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। তুরস্ক থেকে গ্রিসে পৌঁছানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে।যুদ্ধকবলিত সিরিয়া থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে জলপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় ২০১৫ সালের এক বিকেলে খালার কাছে নয়, স্রষ্টার কাছেই ফিরে গেছে আয়লান।

কোথায় সাহসী দুর্দান্ত বিপ্লবীরা! যারা মানুষ মারার যুদ্ধ বাঁধিয়ে ফায়দা লুটেরাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হবে। কেঁপে ওঠবে বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ব্যবসায়ী ও খুনিদের হৃদয়! আগ্রাসনকারীদের প্রহসন বন্ধ হবে। সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন আবেগের ঝড় আড়াল করতে পারবে না নিষ্ঠুর রাজনীতি। বাড়বে নিন্দা ও ঘৃণা, স্বপ্নভঙ্গে ক্ষোভ! বুকের ভেতর ভয়ানক দাগ কাটে রক্ত গোধূলি!

ভূলুণ্ঠিত মানবতা উগরে দেয় বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রত্যয়! মনে করায়ে দেয়-নির্মম ও হিংস্র মানুষ আসলে মানুষ নয়। মূল্যবোধ-শ্রদ্ধাবোধ-সম্মানবোধ ও সহমর্মিতা কমলে নির্যাতনকারী অত্যাচারীদের সংখ্যা বাড়বেই।  প্রতিটি ভোরেই নিষ্কলুষ-অবুঝ শিশুর লাশের দৃশ্য চোখে জল আনবেই। তারপরও শিশুর নিষ্প্রাণ শরীর যাদের হৃদয়কে তৃপ্ত করবে তারা আসলে পশুর চেয়ে অধম পিশাচ বৈ কিছুই নয়।

পরিবার.নেট

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *