কে বেশি স্বার্থপর?

আশেক ওসমানী
সে আমার এসএমএস এর কোনো উত্তর দেয় না, কিন্তু দেখে। মোবাইলে কল করলে নাম্বার ওয়েইটিং, বার বার কল কেটে দেয়। বিকালে ওদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকি কিন্তু ও বারান্দায় আসে না আমায় দেখতে। ইমুতে একটিভ দেখায় কিন্তু আমাকে নক দেয় না। এখন দেখা হলেও কথা বলে না।
আমার সামনে বসে মেয়েটির নামে অভিযোগ করেই যাচ্ছে ছেলেটি। আমি বললাম তা হলে আমি কি করতে পারি? ছেলেটিকে এ প্রশ্ন করবো। তার মধ্যেই আমার ইংরেজী শিক্ষকের ফোন। সামনে কেউ থাকলে, সে ছোট হউক বা বড়ো হউক তার অনুমতি নিয়ে কল রিসিভ করার অভ্যাস আমার।
ছেলেটার অনুমতি নিয়ে কল রিসিভ করে সালাম দিলাম স্যারকে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে স্যার বললেন, তোমার কাছে আমার ছোটভাইকে পাঠাইছি। সামনে ওর অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। পড়ালেখা, খাওয়া দাওয়া, ঠিকমতো ঘুম, বাসায় সবার সাথে কথা বলা, ও সবই কমিয়ে দিয়েছে। উপায় না দেখে তোমার কাছে পাঠালাম, আমার বিশ্বাস তোমার কথায় ছোটভাইটা নতুন জীবন পাবে, এটুকু বলেই ফোনটা রেখে দিলো।
স্যারের ছোটভাইকে প্রশ্ন করলাম- আপনি কেমন আছেন? ছেলেটি মাথা নিচু করে বললো- আমি আপনার অনেক ছোট তুমি করে বলতে পারেন। আমি বললাম ঠিক আছে। এবার বলো- তুমি কেমন আছো? ছেলেটি অসহায় সুরে বললো- সবইতো বলে ফেললাম আর কি বলবো। এখন আমি কি করে ওকে পাবো এ পরামর্শ দেন। বড়ভাইয়া বলেছে- আপনি নাকি সঠিক পরামর্শ দেন সবাইকে। কথা না বাড়িয়ে আমি প্রশ্ন করলাম ওর সাথে তোমার শেষ কবে দেখা হয়েছে এবং কি কি কথা হয়েছে ওর সাথে?
ছেলেটি বললো- গত রোববার সকালে। কথা খুব একটা হয়নি শুধু বলেছে, তার ভাই নাকি আমার সাথে সম্পর্ক রাখতে নিষেধ করেছেন। কারন আমাদের পরিবার নাকি ওদের সাথে যায় না, ওদের চাহিদাও মেটাতে পারবে না। আমার বাবা নাকি অল্প বেতনের চাকরি করে, আমার মা অসুস্থ, আমরা নাকি ভাড়া বাসায় থাকি, নিজস্ব মাথা গুজার ঠাই নেই, তার বাবাও এ সম্পর্ক মেনে নিবেন না। তাই সে নিজেও এ সম্পর্ক রাখবে না বলে আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে।
বলেন ভাইয়া- এখানে আমার কি দোষ? ছেলেটাকে বললাম- দোষ তোমার নয়! সব দোষ তোমার বাবার, যে নিজে ছোট একটা চাকরি করে ভাড়া বাসায় থেকে তোমাকে পড়ালেখা করিয়ে আজ এ পর্যন্ত এনেছেন। আজ যদি তোমার বাবা তোমাকে পড়ালেখা না করাতেন, তাহলে কি মেয়েটার সাথে তোমার দেখা হতো? বা কোনো সম্পর্ক হতো?
যদি মা-বাবা তোমাকে মোবাইল কিনে না দিতেন তাহলে কি আজ তুমি তার ফোন অন্য কারো সাথে ওয়েটিংয়ে থাকে এটা জানতে পারতে? বাব-মা যদি তোমাকে হাতখরচের টাকা না দিতো, তুমি কি তার ইমু একটিভ এটা দেখতে পেতে? এবার ছেলেটা একটু রেগে গিয়ে আমাকে বললো- আমার সব অবস্থাতো ও আগে থেকেই জানতো, সব জেনে তাহলে আমার কাছে আসছিল কেন?
আমি কি ওকে পায়ে ধরেছিলাম আমার সাথে সম্পর্ক করার জন্য, উল্টো ও আমাকে বলতো আমার সব কিছু নাকি তার ভালোলাগে। আর এখন যেগুলো বলছে- এগুলো সব আমাকে ছেড়ে অন্য কারো সাথে সম্পর্কে জড়ানোর বাহানা মাত্র, আমি সব বুঝি। ও একটা স্বার্থপর মেয়ে, নিজের সার্থ ছাড়া কিছুই বুঝে না।
আমি বললাম- তুমি তো মেয়েটার চাইতে বেশি স্বার্থপর? ও এবার চোখ ২টা বড় বড় করে বললো- আমি মোটেও ওর মতো না। আমি বললাম- তোমার পরীক্ষার ফি, সারাবছরের বেতনসহ সব টাকা তোমার বাবা কষ্ট করে পরিশোধ করেছে তুমি যেন ভালো করে পরীক্ষা দাও। কিন্তু তুমি নিজের স্বার্থের জন্য পড়াশুনা, খাওয়া, ঘুম সবই বাদ দিয়ে তাকে পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছো।
তুমি হয়তো ভুলে গেছো তোমার মা হাই প্রেশারের রুগী হয়েও তোমার চিন্তায় অস্থির। তুমি এটাও ভুলে গছো যে তোমার বাবা ছোট চাকরি করলেও শত কষ্টরে মাঝে তোমার পড়াশোনা বন্ধ করেনি। এটাও ভুলে গেছো, তোমার ভাই আমার শিক্ষক হয়েও তোমার ভালোর জন্য আমার কাছে তোমায় পাঠিয়েছেন, ফোন করেছেন।
এবার তুমিই বলো, কে বেশি স্বার্থপর? যে তোমায় ঠকিয়েছে সে? নাকি যে পুরো পরিবারকে ঠকাচ্ছে সে? একদম চুপ হয়ে গেলো ছেলেটি প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। ওকে প্রশ্ন করলাম, তুমি প্রিয়জন আর প্রয়োজনের পার্থক্য বুঝ? বেঁচে থাকতে হলে প্রিয়জন ও প্রয়োজনের পার্থক্য বুঝতে শেখো।
আত্মসম্মানবোধ নিয়ে নিজের বাবার মতো বাঁচো। যারা তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে তাদের জন্য বাঁচো। যে তোমার কাছ থেকে দূরে সরার জন্য নানা রকম কারণ খুঁজে বেড়ায় তার জন্য সময় ব্যয় না করে নিজেকে তৈরি করো। আমার কথা হয়তো তোমার ভালোলাগছে না কিন্তু এটাই বাস্তবতা।
হঠাৎ খেয়াল করলাম ছেলেটির চোখে পানি। আমি জানি, এ পানি কষ্টের নয়, নিজের ভুল বুঝতে পারার পানি, এ পানি নিজেকে পরিশুদ্ধ করার পানি, এ পানি স্বার্থপর চেনার পানি, এ পানি প্রয়োজন ও প্রিয়জন বুঝার পানি..
লেখক: কারাতে, স্ট্রিট ফাইট এন্ড ফিটনেস ট্রেইনার

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *