কত বছর বয়সে শিশুকে স্কুলে পাঠাবেন?

মা-বাবা দুজনই চাকরিজীবী হলে শিশুর ভর্তির বয়স হওয়া উচিত তিন-সাড়ে তিন। আবার মা গৃহবধূ  হলেও যদি তাকে ঘরে-বাইরে নানা কাজ সামলাতে হয় তাহলেও শিশুকে যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না। ফলে মায়ের কাছে শিশুর যে সঙ্গ-যত্ন-দেখভাল পাওয়া দরকার, যা শিশুকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে উঠতে সাহায্য করে, সেই সঙ্গ তারা পায় না। ছোট্ট অপরিসর ফ্ল্যাট, সবুজবিহীন কংক্রিটের পরিবেশে শিশুদের সময় কাটে টেলিভিশনে বা ইন্টারনেটে। সঠিক ও যুগোপযোগী গাইডেন্স না পাওয়ায় এই পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুরা অমনোযোগী, জেদি ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। তাই শিশুমনকে সুস্থ, স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ ও আত্মকেন্দ্রিক  হওয়া থেকে মুক্তি দিতে তিনবছর বয়সেই স্কুলে পাঠান।

তিন বছর বয়সের মধ্যেই শিশুর সুস্থ মানসিকতা ও অভ্যাস গড়ে ওঠে। এই বয়সের শিশুদের স্কুলগুলোতে সিলেবাসের বইয়ের বোঝা থাকে না। সেখানে সমবয়সী বিভিন্ন মানসিকতার শিশুর সংস্পর্শে আসে, গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। স্কুলের প্রশস্ত প্রাঙ্গণে বন্ধুদের সঙ্গে খুনসুটি, টিফিন খাওয়া, লুকোচুরি বা খেলা তারা দারুণ উপভোগ করে। খেলাচ্ছলে শেখে যৌথ জীবনের মূল্যবোধ, ব্যক্তিগত চাহিদাকে সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া ও মানিয়ে নেওয়া।

সমবয়সীদের সঙ্গ পেয়ে তাদের মুখে ফোটে  বুলি, বাড়ে কমিউনিকেশন স্কিল। খেলার উপকরণ, সঙ্গী, সময় ও উপযুক্ত স্থান পেয়ে মুকুলগুলো যথার্থভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়, বন্দিজীবন থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে পায় প্রাণচাঞ্চল্য। শিক্ষকদের সহৃদয় সাহচর্য তাদের সহমর্মী, ব্যক্তিত্বময় ও আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করে। স্কুলে যাতায়াতের পথে নানা দৃশ্য, পাখি দেখা, কখনো রেলগাড়ি দেখা শিশুর জানার পরিধি বাড়ায়। শিশুর মানসিক যে খোরাক থাকে অন্তরে, তা পায় স্কুলের বৃহত্তর পরিবেশে।

শিশুকে স্কুলে পাঠাতে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে স্কুল সম্পর্কে আগে থেকেই বাচ্চার সঙ্গে কথা বলুন। তাদের পছন্দের কোনো চরিত্র প্রথম দিন স্কুলে যাচ্ছে এমন গল্প শোনান। স্কুল নিয়ে সাধারণ কথাবার্তা বলুন, সে কোন স্কুলে পড়বে, তার শিক্ষক কে হবেন, কতক্ষণ স্কুলে থাকতে হবে এসব তাকে জানান; তাহলে স্কুলকে তার কোনো অচেনা জায়গা বলে মনে হবে না। স্কুলে যাওয়ার অনুশীলন হোক আগেই। নিজে নিজে কিভাবে স্কুলের পোশাক পরতে হয়, ব্যাগ গুছিয়ে কাঁধে নিতে হয়, টিফিন বের করে খেতে হয় আগেভাগেই শেখান। বাড়িতে কয়েকবার চর্চা করান। স্কুলের দিন সকালে ঘুম থেকে ওঠা বাচ্চাদের জন্য কষ্টদায়ক হতে পারে, তাই কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই খেলাচ্ছলে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি চলতে থাকুক। স্কুলে ভর্তির পরপরই ছবি আঁকা কিংবা নাচ-গানের মতো পাঠ্যক্রম বহির্ভূত কাজে দেবেন না, প্রথম তিনমাস শুধুই স্কুল। তাকে ধাতস্থ হতে দিন, পরিবেশ ও  নতুন রুটিনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় দিন। এই সময়ে স্কুল শেষে বাড়ি ফিরলে বিকেলবেলা সন্তানকে একটু অবসর দিলে তার কচিমনে চাপ পড়বে না।

সন্তানের টিফিনবক্সে কিভাবে মজাদার এবং পুষ্টিকর খাবার দেয়া যায় তা ভেবে দিন পার করেন অনেকেই, কিন্তু তাদের আশার গুড়ে বালি পড়ে যখন আধখাওয়া টিফিন নিয়ে বাড়ি ফেরে ছোট্ট সোনামণি। দুপুরের এই ক্ষতি পুষিয়ে দিন বিকালে বাড়িতে বানানো স্বাস্থ্যকর কোনো নাশতা খাইয়ে। বাড়ি বা পরিচিত গণ্ডির বাইরে প্রথম এতটা সময় একা একা কাটাতে গিয়ে বাচ্চারা বিরক্ত ও হতাশ হয়ে পড়তে পারে। বাচ্চার উপর চটে না গিয়ে নিজে শান্ত থাকুন। বাচ্চা জেদ করলে কিংবা বিরক্ত হলে ধৈর্য হারাবেন না বরং তাকে বুকে টেনে নিন। ভালোবাসা ও আদর দিয়ে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করুন এবং বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ দিন।

সাধারণত শিশুরা ১০০ বিলিয়ন ব্রেন সেলস নিয়ে জন্মায়। শিশুর মস্তিস্ক তিন বছর বয়সের ভেতর দ্রুত পরিণত হতে থাকে। প্রতি সেকেন্ডে একটি শিশুর মস্তিষ্কে সাতশো নতুন সাইন্যাপ্টিক সংযোগ তৈরি হয়। যেহেতু শিশুদের ব্রেনের বিকাশ প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় দ্বিগুণ তাড়াতাড়ি হয় তাই শেখার ক্ষেত্রে তাদের সহায়তা করলে বিকাশ আরো দ্রুতহারে ঘটবে এবং ব্রেন সেলস স্টিমুলেট হবে।

এই বয়সটা বাচ্চাদের পড়তে শেখার এবং নতুন শব্দ জানার সবচেয়ে সেরা সময়। স্কুলে যাওয়ার আগের সময়ে যদি তারা নতুন জিনিস শেখার জন্য সহায়তা না পায় তবে তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ অনেকটাই দেরিতে হয়। বাচ্চার মস্তিষ্কের বিকাশ তার ব্যক্তি সম্পর্কগুলি, অভিজ্ঞতা এবং পারিপার্শ্বিকের ওপরেও নির্ভর করে। এই ব্যাপারগুলো মাথায় রেখে শেখানোর জন্য মজাদার পাঠ্যক্রম, উৎসাহ বর্ধক ও সহজ উপকরণ এবং শেখার সহায়ক চমৎকার পরিবেশ আছে এমন প্রি-স্কুল নির্বাচন করুন।

শিশুর ওপরে যেন ভালো ফল করার বা তাড়াতাড়ি শেখার জন্য কোনরকম মানসিক চাপ না পড়ে। বিভিন্ন খেলা ও অ্যাক্টিভিটির মাধ্যমে নতুন, নতুন জিনিস শিখতে উৎসাহ দেয়। বয়সোপযোগী অ্যাক্টিভিটিগুলোই ওদের ভাষা, হাত-পা সঞ্চালন এবং কগনিটিভ উন্নয়নে সাহায্য করে। একটি ভালো প্রি-স্কুল শিশুকে নতুন শেখার আনন্দ উপভোগ করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়, বাচ্চার সামাজিক বিকাশ ঘটায়, পড়াশোনা শেখার ক্ষমতা বাড়ায় এবং আবেগগত অনুভূতির ওপরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই এটিকে প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করার একটা মাধ্যম হিসেবে নেবেন না।

প্রি-স্কুল বেছে নেবার সময় নজর দেওয়ার বিষয়গুলো হলো আপনার বাড়ি থেকে দূরত্ব, পাঠ্যক্রম, শেখানোর পদ্ধতি, পরিচ্ছন্নতা, ধর্মভিত্তিক শিক্ষা, বার্ষিক মাহিনা, খেলার জায়গা, প্রযুক্তির ব্যবহার, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিশুর অনুপাত, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের যোগ্যতা, ক্লাসরুমের আকৃতি, প্রতি ক্লাসে পড়ুয়াদের সংখ্যা, ইনক্লুসিভ শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রি-স্কুলটিতে ভর্তি হওয়ার পদ্ধতি। মনে রাখবেন শিশুর বিকাশ খরচ সাপেক্ষ নয়, যত্ন সাপেক্ষ।

পরিবার.নেট

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *