এবার ঈদের বড় সম্বল ছোটবেলার বর্ণিল ঈদস্মৃতি

আনিসুর রহমান এরশাদ

ছেলেবেলার ঈদে নিজের মতো করে সময় কাটানো যেত। সেসব স্মৃতিই করোনাকালের ঈদের বড় সম্বল। সাধারণত ছোটবেলায় ঈদ আনন্দ নতুন জামা-জুতা ঘরে আসার পর থেকেই শুরু হয়ে যেত! ঈদের মৌসুমে নতুন জামাকাপড় নিয়ে বেশ একটা আমেজে থাকতাম। বাড়িতে বাড়িতে ইফতার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ফলে অনেকের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ছিল আনন্দের; ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে দীর্ঘ সময় ধরে মোনাজাত হতো। ঈদের চাঁদ দেখার জন্য সুমনদের বাড়ির উত্তর পাশের খোলা জায়গায় ছোটদের সাথে বড়রাও যোগ দিতেন। ঈদের চাঁদ একসাথে দেখা যে কতটা আনন্দের হতে পারে তা তখনকার স্মৃতি ভুলে গেলে আর অনুভবই করতে পারতাম না। চাঁদ দেখার পর রীতিমতো আনন্দ মিছিল হতো, শ্লোগান দিতো!  ভোরবেলায় ঈদের গোসলের সাবান নতুন হতে হতো, কে আগে গোসল করবে তা নিয়েও ভাই-বোনদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো!

নতুন জামা-কাপড় পড়ে টুপি মাথায় দিয়ে আতর মেখে সেমাই খেয়েই মতিয়ার ভাই, সেলিম নানা, হারুন নানা, হাবিবুর, সুমনসহ দলবেঁধে ইদগাহে যেতাম। চোখে-মুখে থাকতো আনন্দের ঝলক। ঈদের নামাযের আগে কবিতা আবৃত্তি-কুরআন তেলাওয়াত-ইসলামিক গান করতাম! নামাজ শেষে কোলাকুলি, সাথে পরিচিতজনদের বাসায় নিয়ে আসা, দলবেঁধে বেড়ানোর অনুভূতি ছিল অন্যরকম আনন্দের। কোনো কোনো ঈদের দিন বিকেলে কিংবা পরদিন সকালে বালিয়াটায় নানীর বাড়ি বেড়াতে যেতাম; মাঝে মাঝে মেঝো মামার কাঁধেও সওয়ার হতাম। এতটা পথ কতটা কষ্ট করে উনারা হাসিমুখে নিয়ে যেতেন, ভাবলেও হৃদয় থেকে দোয়া চলে আসে। সেখানে বাকি ভাইয়ের সাথে ছিপ দিয়ে মাছ ধরতাম, ছোট মামার সাথে শাপলা তোলতাম।

ঈদ আসে ঈদ যায়। তবে এবারের ঈদ একটু বেশিই ব্যতিক্রম। এবার বাবা-মাকে ছাড়াই ঈদ উদযাপন করলাম। হানারচালা গ্রামের মধুর ঈদের দিনগুলো খুবই মিস করি। দাদীকে মনে পড়লে ভীষণ শূণ্যতা অনুভব করি, মাথায় হাত বুলানো আদর ছিল আমার ভালোলাগার এক অফুরন্ত উৎস। দাদীর মুখে ‘দাদা ভাই’ ডাক শুনার ইচ্ছে আর পূরণ হবার নয়। দাদির জানাযায় শরিক হতে না পারা আমাকে আজও আবেগাপ্লুত করে। ঈদে দাদির সাথে আত্মিয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়ানো খুব উপভোগ করতাম। বেড়ানোর আনন্দটাই ছিল স্বর্গীয়। ঈদে এখনো হাতীবান্ধায় গ্রামে যেতে খুব ইচ্ছে করে। সাধারণত তক্তারচালায় ঈদের নামাজ আদায় করলেও দড়ানীপাড়া জামে মসজিদকে মিস করি! মরহুম মাওলানা আব্দুল মান্নান আনসারী তখন ঈদের নামাজে ইমামতী করতেন ও খুৎবা প্রদান করতেন!

ঈদের আগে টাঙ্গাইলে ছোটফুফু ও বাসাইলে বড়ফুফুদের বাড়িতে উনাদের আনতে যেতাম। অনেক সময় ইবরাহিম কাকাও আমার সফর সঙ্গী হতেন। বড় কাকার দরাজ গলায় পুথিঁ পড়া, ছোট ফুফুর মুখে মাওঃ ক্বারী মোঃ শামছুজ্জামান কাকার লেখা কবিতা শুনা খুব আনন্দের ছিল। ঢাকা থেকে হাফেজ মাওঃ সাঈদুর রহমান কাকা গ্রামে আসলে সুমধুর কণ্ঠে কোরআন তেলাওয়াত শুনাতেন- গান শুনাতেন। হাফেজ মাওঃ আনিসুর রহমান মাদানীর কথা খুব মনে পড়ে! যিনি তারাবীহ পড়াতেন ও নামাজের আগে-পরে ধর্মীয় ও নৈতিক বিষয়াদি নিয়ে হৃদয়স্পর্শী বয়ান দিতেন। কাক ডাকা ভোরে মৃত্যুহীন প্রাণ মরহুম হাজী আজিজুল ইসলাম খলিফা ভাই এর সাথে মসজিদে নামাজ পড়তে যেতাম। রমজান মাসের শেষ দশকে শামসুজ্জামান কাকাসহ হাজী মরহুম ফয়েজ উদ্দিন মেম্বার, ক্বারী আহমাদ আলী হুজুর, মসজিদের মোয়াজ্জিন ও মক্তবের প্রশিক্ষক মুন্সি হাফিজ উদ্দিন কাকা ইতিকাফে বসতেন। উনাদের জানাশুনা-অভিজ্ঞতা থেকে জেনেও আমরা সমৃদ্ধ হতাম। আসলে আমার বেড়ে ওঠা অনেকের অবদানে ভরপুর।

প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত গ্রামেই পড়েছি; সে সময়ের ঈদগুলো ছিল এমনই। শৈশবের ঈদের স্মৃতি গ্রামকে ঘিরেই। কী যে মায়া আর আনন্দঘেরা ছিল গ্রামীণ ঈদ! ছোটবেলায় হাতে লিখে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে ঈদকার্ড বানাতাম! ঈদের আগে প্রবাসী বাবার পাঠানো চিঠি পেলে তা নিয়েই অনেক আনন্দে দিনটা কেটে যেত আমার। তখন অতি অল্পতেই অসাধারণ আনন্দ হতো। মনটা ছিল প্রশস্ত নদীর মতো। মনে এত বেশি জায়গা ছিল যে ছোট একেকটা ঘটনায় প্রাণখোলা আনন্দ হতো।গনি ভাই কর্তৃক কিনে আনা প্যান্ট-শার্ট ছিল দারুণ উত্তেজনার, আনন্দের জোয়ারে ভেসেছিলাম। খুবই দুরন্ত ছিলাম বলে ছেলেবেলায় আমাকে চোখে চোখে রাখতো আমার দুই ফুফু। তবে ঈদের সময় একটু স্বাধীনতা বেশি পাওয়া খুবই প্রাণভরে উপভোগ করতাম। বড়দের কাছ থেকে নতুন টাকা বা ঈদের সেলামি পাওয়া আনন্দে ভিন্ন মাত্রা যোগ করতো। গ্রামে শৈশবের প্রাণখোলা ঈদ অনেক বেশি তাড়িত করে আমাকে।শৈশবের ঈদ ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়েছে এবং হচ্ছে এখনো। এবারের ঈদটাতো স্বাভাবিক ভাবে হচ্ছে না। কোনো কোলাকুলি হয়নি, কোনো সেলামি আদান প্রদান হয়নি, কারো বাসায় যাওয়া হয়নি, কেউ বাসায় আসেনি। করোনাকালের এই ঈদটা আমার ছোট্ট মেয়ে দুজনের সাথেই কাটলো। ভাবনায় ছিল পুরোনো দিনের কথা। মনে পড়ছিল ছোটবেলার ঈদ-স্মৃতি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *