করোনা পরিস্থিতি ও আগামীর সাংবাদিকতা

আনিসুর রহমান এরশাদ

সাংবাদিক বাঁচলে যেমন গণমাধ্যম বাঁচবে, তেমনি গণমাধ্যম বাঁচলে সাংবাদিক বাঁচবে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও যেহেতু সংবাদপত্রের প্রকাশনা অব্যাহত থাকে; সেহেতু মহামারির সঙ্কটে সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ রাখা যৌক্তিক হবে না। কারণ পেশাদার গণমাধ্যম বন্ধ হলে সোশ্যাল মিডিয়া নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে, সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সংবাদপত্র প্রকাশনা শিল্প অব্যাহত রাখতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছে সংবাদপত্রগুলোর যা পাওনা তা পরিশোধে সরকারকে বিশেষ উদ্যোগী হতে হবে আর ব্যবসায়ীদেরও সংবাদপত্র শিল্পকে বাঁচাতে ব্যয় করার মানসিকতা রাখতে হবে। কারণ সংবাদপত্রবিহীন সমাজ এখন আমরা কল্পনাও করতে পারি না। মহামারির সংকটে প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবা যেমন জরুরি, তেমনি সত্যনিষ্ঠ তথ্যসেবাও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
করোনাভাইরাস মহামারি সাংবাদিকতার শিল্পকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করেছে এবং সাংবাদিকদের কাজকে প্রভাবিত করেছে। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ জার্নালিস্টস (আইএফজে) কর্তৃক প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, চাকরির ক্ষয়ক্ষতি ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের কারণে করোনাভাইরাস মহামারি চলাকালে বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশের অবনতি হয়েছে। করোনাভাইরাস সংকটের সময় কাজ করা সাংবাদিকদের চারজনের মধ্যে তিনজনই বিধিনিষেধ, বাধা বা হুমকির মুখোমুখি হয়েছেন; যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। গ্রিস থেকে ইন্দোনেশিয়া এবং চাদ থেকে পেরু পর্যন্ত সাংবাদিকরা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিবেশ নির্ণয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, সমস্যাযুক্ত, ভয়াবহ, আরও খারাপ, ক্ষয়িষ্ণু এবং সীমাবদ্ধ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করেছেন।
সংবাদকর্মীদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বেড়েছে, বিজ্ঞাপনজনিত আয় দীর্ঘ সময়ের জন্য কমে যাওয়া মিডিয়া হাউজগুলোর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি- বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকায় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রায় শূন্যের কোটায়। যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ায় পত্রিকা গ্রাহকদের কাছে সরবরাহে বিঘœ ঘটছে, বিক্রির আয় থেকে সরবরাহের ব্যয়ও ওঠানো যাচ্ছে না। সংক্রমণ আতঙ্কে বাসায় বাসায় ঢুকে পত্রিকা বিলি করাও হকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। হকাররা পত্রিকা বিলি করতে না পারলে ভেঙে পড়ে সংবাদপত্রের বিলি-বিতরণ ব্যবস্থা। তাছাড়া যেসব ঘরবন্দি মানুষ চাল-ডাল কিনতে পারছে না, তারা সংবাদপত্র কেনার চিন্তাও করছে না। এমতাবস্থায় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পুঁজির সমর্থন থাকা সংবাদপত্রও ব্যয় সংকুচিত করতে ছাঁটাই করছে, বেতন বকেয়া রাখছে, বেতন কাটছে ও প্রকাশনা সীমিত কিংবা বন্ধ করছে। সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনজনিত আয় যেহারে কমেছে; সে তুলনায় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে সংবাদপত্রের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের গুজবে অনেকে পত্রিকা কেনা ও পড়া বন্ধ করেছেন। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ‘সংবাদপত্র করোনাভাইরাস বহন করে না, এর মাধ্যমে সংক্রমণ হয় না। কাগজে এ ভাইরাস বেঁচে থাকতে পারে না।’ এছাড়া পাঠক ও হকাররা বাড়ি যাওয়ায় বিক্রি কমেছে। তবে মফস্বলে বিক্রি কমছে না। বিজ্ঞাপনদাতারা বিজ্ঞাপন বন্ধ করায় অনেক পত্রিকা প্রকাশ সংকুচিত হয়েছে তথা ছাপানোর সংখ্যা ও পত্রিকার নির্ধারিত পাতা কমিয়েছে অথবা শুধু অনলাইন ভার্সন চালু রাখছে। শুধু করোনাভাইরাসের সংবাদ দিয়েতো একটি পত্রিকা তৈরি করা যায় না। এসব নানা কারণে চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় অনেক পত্রিকা বন্ধের পর্যায়ে চলে গেছে। অনেক সংবাদকর্মী বেকার হয়ে পড়ার বা চাকরিচ্যুত হবার আশঙ্কায় আছে। এমতাবস্থায় দেশ, মানুষ ও সমাজের জন্য কাজ করার আকর্ষণ থেকে সাংবাদিকতায় আসা কেউ করুণা চায় না; মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বাঁচতে চায়, ন্যায্য বেতনভাতার নিশ্চয়তা চায় মাত্র।
করোনা সংকটে সংবাদপত্র শিল্পে এখন নেই সাংবাদিকতার মর্যাদা, গ্ল্যামার ও সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। করপোরেট সমর্থিত দু-একটি হাউজ ছাড়া দেশের খুব কম গণমাধ্যমে সংবাদকর্মীরা নিয়মিত বেতন পান। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেও জীবিকার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নন সাংবাদিকরা। বৈশ্বিক মহামারির প্রভাবে বিপর্যস্ত অর্থনীতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কিভাবে সংবাদপত্র প্রকাশনা শিল্প অব্যাহত থাকবে তা একটা বড় প্রশ্ন। সংবাদপত্রের সংকট এমন- মুদ্রণ বন্ধ করা সমাধান নয়, আবার আয় ছাড়া ব্যয় করাও সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় আকারে ছোট করে হলেও প্রকাশনা অব্যাহত রেখে টিকে থাকতে হবে। কারণ প্রকাশনা বন্ধ করা মানে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যোদ্ধাদের পালানো, পরাজয় মেনে নেয়া। একবার গতিশীল কিছু বন্ধ হলে তা পুনরায় চালু করতে অনেক কাঠ-খড় পুড়াতে হয়, বেশি শক্তি খরচ করতে হয়! প্রয়োজনে নতুন চেহারায় তথা ৮ পৃষ্ঠা ছেপেও প্রকাশনা অব্যাহত থাকলে সংবাদপত্রটির জন্য ভালোবাসার মানুষরা তৃপ্ত থাকবে।
অনেকেই একমত হবেন- সাংবাদিকতা না থাকলে করোনাভাইরাসে আরও বেশি লোক মারা যেত। প্রচারণার কারণে মানুষ যেমন সচেতন হয়েছে, তেমনি ঝুঁকিতে থাকা জীবন বাঁচাতে কর্তৃপক্ষও পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। গুজবের ভিড় এবং তথ্য গোপনের চেষ্টা সত্ত্বেও পাঠক প্রকৃত পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পেরেছে। সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে সরকারের নির্দেশনা ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ জেনে করণীয় ঠিক করে নিতে পেরেছে। প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াও গণমাধ্যমকর্মীরা দুর্ভোগে-দুঃসময়ে অধিকার বঞ্চিত ও বিপদাপন্ন মানুষের পাশে থেকেছেন, অব্যবস্থাপনা-দুর্নীতি-অনিয়মের খবর তুলে ধরেছেন; ফলে কর্তৃপক্ষও যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পেরেছে। সেফটি ফার্স্ট কার্যকর করার ন্যূনতম ব্যবস্থা না নিয়ে মিডিয়া হাউজগুলো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পাঠিয়েছেন সহকর্মীদের। যেন জেনে শুনে বিষ পান করার মতো! তাদের পরিবারগুলোর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভাবেননি! যে কয়েকজন সংবাদকর্মীর করোনা পজেটিভ হয়েছে তার দায় কার? আক্রান্তরা ঠিকই নীরবে যন্ত্রণা পোহায়েছেন, দেখার কেউ না থাকায় পরিবারগুলো অসহায় হয়ে পড়েছে! এসব বাস্তবতা বিবেচনা করে- প্রযুক্তি নির্ভরতা বাড়িয়ে সংবাদকর্মীদের বাঁচিয়ে রাখতে নতুন ধারার সাংবাদিকতা দরকার।
মানুষ যখন ঘরে বসে ছিলেন, রিপোর্টাররা ছুটে বেড়িয়েছেন। সম্পাদনার টেবিলের লোকেরাও জনগণের তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সচেষ্ট থেকেছেন। ফটোগ্রাফার, প্রযোজক, উপস্থাপক, প্রুফ রিডার, ক্যামেরা অপারেটর, সাউন্ড টেকনিশিয়ান, ডিজাইনার, শিল্পী ও অন্যান্যরা সঠিক চিত্র তুলে ধরতে কাজ করেছেন। যার ফলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কম দেখিয়ে ভুল তথ্য প্রকাশকারীরাও পরবর্তীতে অসৎ উদ্দেশ্য ধামাচাপা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, চিকিৎসাব্যবস্থার ত্রুটি ও সমন্বয়হীনতাজনিত ভুল সংশোধন করেছেন, মিথ্যাচারের জন্য ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছেন। সত্য প্রকাশিত হয়েছে এবং মানুষ সঠিকটা বিবেচনা করতে পেরেছে। গণমাধ্যম হাউস বন্ধ হয়ে গেলে, মিডিয়া না থাকলে সাংবাদিকের কলমও বন্ধ হয়ে যাবে; পেটে কিছু না পড়লে কি আর জাতির সেবা করতে পারবে! ফলে গণমাধ্যমকর্মী ছাড়াও পত্রিকার এজেন্ট, হকার, পত্রিকা পরিবহনের সঙ্গে যারা যুক্ত তারাও যাতে করোনা সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।
সাংবাদিকতা না থাকলে মজুতদাররা আরো লাগামহীন হতে পারতেন, ত্রাণ চোরেরা পার পেয়ে যেতেন, দুর্নীতি-লুটপাট আরো ব্যাপকতা পেত। জনগণকে বোকা বানানো বা অন্ধকারে রাখা সহজ হয়ে যেত। সাংবাদিকরা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আহত হন, নিহত হন, কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্রে পড়েন। তবে তারা নিজেদের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা না পেলেও অন্যরা ঠিকই তাদের সাহায্য-সহযোগিতায় অনেক সমস্যার সমাধান করেন। অনেক সময় একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টে সরকারের নীতি-নির্ধারনী পর্যায়ে পরিবর্তন আসে, ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ফলে সাংবাদিকতা যে কোনও চাকরির চেয়ে বেশি মানুষের জীবন বাঁচায়। সাংবাদিকেরা প্রকৃত সত্য ও মিথ্যা তুলে ধরেন বলেই ফাঁকফোকর ধরা খায়, গোমর ফাঁস হয়, মুখোশ খুলে যায়।
যত কথাই বলি, বাস্তবতা হচ্ছে- ‘করোনাভাইরাস সংক্রান্ত খবর শুনতে বিশ্ব মরিয়া। অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি ব্যবসাগুলোর নতুন গ্রাহক পাওয়ার জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া দরকার। লকডাউন চলাকালীন টিভির দর্শক বেড়েছে এবং অনলাইন মিডিয়ার পাঠক বেড়েছে। আর ব্যবসায়ীরা লাভ চান, লোকসান চান না।’ এসবের মধ্যেও পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার চিন্তা করতে হবে। করোনাভাইরাস নিয়ে আরও ভালো রিপোর্ট করতে হবে, লেখাগুলো আরও উদ্ভাবনী পদ্ধতিতে তুলে ধরতে হবে; যাতে পাঠক আগ্রহ ধরে রাখেন এবং অনলাইনে পড়ার পরেও ছাপা পত্রিকায় পড়ার জন্য অপেক্ষা করেন। ইতালিতে লকডাউনের মধ্যেও পত্রিকার বিক্রি বাড়ার ঘটনাও ঘটেছে; কারণ মানুষ যথাযথ তথ্য পেতে ছাপা পত্রিকার ওপর আরও বেশি আস্থা রেখেছে। মিডিয়ায় নানা তথ্যের কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল বোঝা কঠিন। চীনের কোথাও ছাপা পত্রিকা সরবরাহ বন্ধ হয়নি। ভুয়া তথ্যের খপ্পরে আক্রান্ত হওয়া থেকে বেঁচে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য প্রকাশ করতে ছাপা পত্রিকাকে অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে।
নিউজরুমে নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে কর্মীদের বসা নিশ্চিত করতে হবে, বাড়িতেও করা যায় এমন কাজেরক্ষেত্রে বাড়িতে থেকে কাজের অনুমতি দিতে হবে, সম্পাদকীয় সভাগুলোতে শিরোনাম ও পেজ লেআউটের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগে অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করতে হবে, আমাদের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে, ছাপাখানায় যাতে একসঙ্গে কম কর্মীকে কাজ করতে হয় এমন ব্যবস্থা করতে হবে, অনলাইন ব্যবহারকারী ও পেজভিউ বাড়ায়ে আলাদা আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে, ডিজিটালাইজেশনের সম্ভাবনাকেও স্মার্টলি কাজে লাগাতে হবে, মাল্টি প্লাটফরমের সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে নয়া নয়া কৌশল বের করতে হবে, কনটেন্ট পৌঁছাতে মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন বহু সংবাদ সংস্থার জন্য সংবাদ তৈরি করছে তখন নবীন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার মতো কনটেন্ট তৈরির যোগ্যতা না থাকলে দাপটের সাথে টিকে থাকা হবে অসম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *