করোনা নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক হোন

করোনাভাইরাস কী?

করোনা ভাইরাসটির আরেক নাম ২০১৯-এনসিওভি। ভাইরাসটির অনেক রকম প্রজাতি আছে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৭টি মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসটি মানুষের দেহকোষের ভেতরে ‘মিউটেট করছে’, অর্থাৎ গঠন পরিবর্তন করে নতুন রূপ নিচ্ছে এবং সংখ্যাবৃদ্ধি করছে। ফলে এটি দিনদিন আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

ইতিহাস

করোনাভাইরাস ১৯৬০-এর দশকে প্রথম আবিষ্কৃত হয়। মুরগির মধ্যে সংক্রামক ব্রঙ্কাইটিস ভাইরাস হিসেবে এটি প্রথম দেখা যায়। পরে সাধারণ সর্দি-হাঁচি-কাশিতে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে এরকম দুই ধরনের ভাইরাস পাওয়া যায়। মানুষের মধ্যে পাওয়া ভাইরাস দুটি ‘মনুষ্য করোনাভাইরাস ২২৯ই’ এবং ‘মনুষ্য করোনাভাইরাস ওসি৪৩’ নামে নামকরণ করা হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন সময় ভাইরাসটির আরো বেশ কিছু প্রজাতি পাওয়া যায় যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০০৩ সালে ‘এসএআরএস-সিওভি’, ২০০৪ সালে ‘এইচসিওভি এনএল৬৩’, ২০০৫ সালে ‘এইচকেইউ১’, ২০১২ সালে ‘এমইআরএস-সিওভি’ এবং সর্বশেষ ২০১৯ সাল চীনে ‘নোভেল করোনাভাইরাস’। এগুলোর মধ্যে অধিকাংশ ভাইরাসের ফলে শ্বাসকষ্টের গুরুতর সংক্রমণ দেখা দেয়।

করোনায় আক্রান্তের লক্ষণ

* ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় ৫-১৪ দিন লাগে।

* বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রথম লক্ষণ হচ্ছে জ্বর।

* তারপর দেখা দেয় সর্দি, শুকনো কাশি ও গলা ব্যাথা।

* নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে।

* কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অন্যান্য উপসর্গ দেখা গেলেও জ্বর নাও থাকতে পারে।

* অ্যাজমা বা হাঁপানি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, শাসকষ্ট, হৃদরোগ, কিডনী সমস্যা ও ক্যান্সার থাকলে দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হতে পারে।

* অবসাদও দেখা যায়।

* বয়স্ক ও আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য করোনার সংক্রমণ মারাত্মক হতে পারে।

* গর্ভবতী নারীদের জন্য এটা গুরুতর রূপ নিতে পারে।

প্রতিকার

* কোনোভাবে আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে এসে থাকলে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকুন বা বাড়িতে থেকে সেলফ কোয়ারেন্টাইন করুন।

* করোনায় আক্রান্ত হলে বেশিরভাগ মানুষই কিছুদিন পর সুস্থ হয়ে ওঠেন। স্বাভাবিক সর্দি কাশির মতোই প্রথম কয়েকদিন বিশ্রাম নিলে তারা সেরে ওঠেন।

* জ্বর, সর্দি, শুকনো কাশি, মাথাব্যথা, গলাব্যথা ও শরীরে ব্যথা হলে হাসপাতাল-ক্লিনিক-ফার্মেসি-ডাক্তারখানায় ছুটে না গিয়ে দ্রুত ফোনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

* নিজেকে সকলের কাছ থেকে আলাদা করে রাখুন।

* প্রচুর ফলের রস ও পুষ্টিকর খাবার খান।

* মাছ, মাংস ও ডিমসহ ভালো করে সেদ্ধ করা খাবার খান।

* পর্যাপ্ত পানি পান করুন; শরীর যাতে পানিশূন্য হয়ে না যায়।

* যথাযথ বিশ্রাম নিন।

* কাশি বা হাঁচির আগে মুখ ঢেকে নিন। হাঁচি বা কাশির পরে হাত ধুয়ে নিন।

* সংক্রামিত হলে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলুন।

* ধোঁয়াটে এলাকা বা ধূমপান করা এড়িয়ে চলুন।

* এ ভাইরাস একজন মানুষের দেহ থেকে আরেকজন মানুষের দেহে ছড়াতে পারে। তাই ভিড় থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন, আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করবেন না।

প্রতিরোধ

* হ্যান্ডওয়াশ-সাবান ও পানি দিয়ে নিয়মিত কমপক্ষে ২০-৩০ সেকেন্ড ধরে হাত পরিষ্কার করুন।

* প্রতিদিন সাবান দিয়ে গোসল করুন।

* পরিচিত বা অপরিচিত ব্যক্তির সাথে করমর্দন ও কোলাকুলি থেকে বিরত থাকুন।

* রান্নার আগে মাছ-মাংস ও ডিমসহ খাবার ভালো করে ধুয়ে নিন ও সিদ্ধ করুন।

* হাঁচি-কাশির সময়ে টিস্যু, বাহু অথবা কাপড় দিয়ে বা বাহুর ভাজে নাক-মুখ ঢেকে ফেলুন।

* ব্যবহৃত টিস্যু ঢাকনাযুক্ত ময়লার পাত্রে ফেলুন ও হাত পরিষ্কার করুন; সম্ভব না হলে জীবানুনাশক হ্যান্ডস্যানিটাইজার বা জীবাণুমুক্ত করার জেল হাতে মেখে নিন।

* যেখানে-সেখানে থুথু ফেলবেন না।

* ময়লা কাপড় জমিয়ে না রেখে দ্রুত ধুয়ে ফেলুন।

* বিছানাপত্র ধোয়ার ব্যবস্থা করুন।

* নিয়মিত থাকার ঘর, কাজের জায়গা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখুন।

* ময়লা-আবর্জনা যথাযথ স্থানে ফেলুন।

* যত্রতত্র পানি ও ময়লা জমাবেন না।

* প্রয়োজন না হলে ঘরের বাইরে যাবেন না। যথাসম্ভব জনসমাগম এড়িয়ে চলুন।

* সম্ভব হলে গণপরিবহন ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।

* বাইরে যেতে হলে বা জনবহুল স্থানে মুখে মাস্ক ব্যবহার করুন। তবে যাদের ফুসফুসে সমস্যা আছে তারা সতর্ক থাকুন, কারণ মুখে মাস্ক পরলে শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

* কুসুম গরম পানি পান করুন, আইসক্রিম খাবেন না।

* লবণ মিশ্রিত গরম পানি দিয়ে গারগেল করুন।

* যথাসম্ভব এসি এড়িয়ে চলুন।

* নাকে-মুখে আঙ্গুল বা হাত দেবার অভ্যাস পরিত্যাগ করুন; কারণ মানব শরীরে জীবাণু প্রবেশের সদর দরজা হলো নাক-মুখ-চোখ।

* ঠান্ডা ও ফ্লু আক্রান্ত মানুষ থেকে দূরে থাকুন।

* কেউ আক্রান্ত হলে তাকে দেখতে যাওয়া বাদ দিন, যদি না আপনি ডাক্তার হন।

* বিদেশফেরত আত্মীয়দের দেখতে যাবেন না; সুস্থ থাকলেও তাদের দাওয়াত দেবেন না।

* অপ্রয়োজনে ট্রাভেল বন্ধ করুন, আপনি জানেন না আপনার পাশের সিটের যাত্রীর কী অসুখ।

* আক্রান্ত দেশ ভ্রমণে বিরত থাকুন।

* বিদেশে অবস্থানরতদের দেশে আসা পরিহার করতে আপাতত উৎসাহিত করুন।

* অসুস্থ হলে জনসমক্ষে ঘোরাফেরা অবশ্যই বন্ধ করুন, উপসর্গ খুব খারাপ না হলে দুই সপ্তাহ ঘরেই থাকুন।

* পরিবারে কেউ অসুস্থ হলে তাদের মাস্ক পরতে বলুন। তাদের স্পর্শ করবেন না। সাহায্য করতে হলে গ্লাভস ব্যবহার করুন, ধরার পর হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে নেবেন, এক পাত্রে পানি পান বা খাবার খাবেন না।

* বন্য জীবজন্তু কিংবা গৃহপালিত পশুকে খালি হাতে স্পর্শ না করা।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ হলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কন্ট্রোল রুমের হটলাইন ০১৯৩৭১১০০১১, ০১৯৩৭০০০৯১১, ০১৯২৭৭১১৭৮৪ ও ০১৯২৭৭১১৭৮৫ এ যোগাযোগ করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *