মানবিক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ুক সর্বত্র

এক ফটোসাংবাদিককে ক্ষুধার্ত ভেবে খাবার খাওয়ার জন্য নিজের খাবার এগিয়ে দিয়েছিল সিরিয়ার শরণার্থী শিবিরের এক শিশু। খাবারের প্লেট নিয়ে মাটিতে বসে থাকা সাদা-গোলাপী ফ্রক পরা আলুথালু চুলের শিশুটির এই মানবতাবোধটুকু যদি অস্ত্রব্যবসায়ী ও যুদ্ধবাজ বিশ্বনেতাদের থাকত! জামাটি তার ভীষণ নোংরা, কিন্তু হৃদয়টি ভীষণ আলোকিত। মুখে আঘাতের চিহ্ন, কিন্তু ত্যাগের মানসিকতা সুস্পষ্ট। পায়ে জুতা নেই, তবে মনে ভালোবাসা ও সহানুভূতি আছে। শরণার্থী শিবিরে দয়ায় বেঁচে থাকা আপনজন হারানো শিশুটির এই পবিত্র অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ুক সর্বত্র-বিশ্বময়। মানবিক গুণের এক উজ্জল ও বিরল উপমা শিশুটি।
একজন ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে খাবারের চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় কিছু নেই। যেই রান্নাঘরে চাল-ডাল-নুন নেই, হাড়ি-পাতিল আর চুলা সেখানে কোনো কাজে আসে না। ক্ষুধাতুর শিবিরে ক্ষুধার্ত মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করে উঠে, আয় নেই, কাজ নেই, খাবার উপার্জনের সুযোগ নেই। ক্ষুধার জ্বালায় চোখে ঘুম আসে না, কষ্ট-যন্ত্রনায় কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকায়। ময়লা কাপড়, স্বজন হারানোর বেদনার চেয়েও পেটের ক্ষুধাই বড় হয়ে ওঠে। অবহেলিতরা বেঁচে থাকে খাবারের আশা নিয়ে, জীবনের স্বপ্নগুলো হারিয়ে যায়। কারো চিৎকার কাউকে আবেগাপ্লুত করে না। ক্ষুধিত জন ক্ষুধার যাতনায় আত্মার সম্বোধন ভুলে। বুভুক্ষু উদরের কাছে মহত্ত্বের বাণীর চেয়ে খাবারই জরুরি হয়ে ওঠে। সামান্য আহারের জন্য লাঞ্ছিত হয় কতজন! তাইতো সুকান্ত ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, রুচির রহস্য ক্ষুধায়। যেখানে ক্ষুধা নেই সেখানে রুচিও নেই।
এশিয়ায় প্রায় ৪৮ কোটি ৬০ লাখ ক্ষুধার্ত মানুষ রয়েছে। এই অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত ভালো শহর ব্যাংকক ও কুয়ালালামপুরে এমন অনেক দরিদ্র পরিবার আছে যারা তাদের শিশুকে ভালো খাবার দিতে পারে না। ভালো খাদ্যের অভাবে বিভিন্ন স্বাস্থ্য জটিলতায় পড়ে এসব শিশু। ব্যাংককে ২০১৭ সালে এক তৃতীয়াংশের বেশি শিশু পর্যাপ্ত খাদ্য পায়নি। অন্যদিকে পাকিস্তানে মাত্র ৪ শতাংশ শিশু গ্রহণযোগ্য মাত্রার সর্বনিম্ন পর্যায়ের খাবার পেয়েছে। শুধু এশিয়ায় নয়, বিশ্বে আবার বেড়ে চলেছে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা। ২০১৭ সালে বিশ্বের ৮২ কোটি ১০ লাখ মানুষ ছিল অপুষ্টির শিকার। অর্থাৎ বিশ্বের প্রতি নয় জন মানুষের একজন প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় না। আর পাঁচ বছর থেকে কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ১৫ কোটির দৈহিক স্বাভাবিক বিকাশ আটকে আছে পুষ্টিহীনতায়। এই সংখ্যা বিশ্বের মোট শিশুর ২২ শতাংশ।
ক্ষুধা এমন একটি অবস্থা যাতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একজন ব্যক্তি মৌলিক পুষ্টিগত চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত খাবার খেতে অক্ষম। তাই ক্ষুধা মুক্তির ক্ষেত্রে ক্ষুধা শব্দটি খাবারের জন্য মানুষের সাধারণ চাহিদাকে ছাড়িয়ে যাওয়া অর্থে ব্যবহৃত হয়। অনাহার, ক্ষুধা বা খাদ্য বঞ্চনা যাই বলি এটি মানবতার জন্য অপমান। ২০১৮ সালে এফএও কর্তৃক প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধা ভোগকারী মানুষের সংখ্যা গত তিন বছরে বেড়েছে। ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যার শতকরা এক ভাগ অর্থাৎ প্রায় ৮২১ মিলিয়ন মানুষ সম্পূর্ণরূপে ক্ষুধা কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছিল । ২০১৫ সালে ক্ষুধার্তদের সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি ঘটেছে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *