বিজ্ঞাপনের প্রভাব, প্রতারণা ও বিতর্ক

বর্তমানে অনেক ভোক্তা বিজ্ঞাপন দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেন, চ্যানেল বদলে ফেলেন এবং ভিডিও পুরোপুরি দেখেন না৷ বিজ্ঞাপনহীন কন্টেন্ট চান বলেই নেটফ্লিক্সের মতো প্লাটফর্ম পয়সা খরচ করে দেখেন৷ বিজ্ঞাপনে ভরসা পান না বলেই পণ্যের বিজ্ঞাপনী রিভিউ থেকে দূরে থাকেন৷ অনেক পণ্য প্রস্তুতকারী ইউজার জেনারেটেড কন্টেন্ট দিয়ে বিজ্ঞাপন করে জীবনযাপন পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণও করে, অপ্রয়োজনীয় পণ্যকে জীবনের অতিপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বানিয়ে দেয়, ব্র্যান্ডেড প্রোডাক্টের প্রতি মধ্যবিত্তদের আকর্ষণ বাড়ায়, শিশুদের মধ্যেও বাস্তব প্রয়োজন ছাড়াই মোবাইল ও কম্পিউটারসহ বিভিন্ন পণ্য ব্যবহারের প্রবণতা তথা পণ্যমুখীনতা বাড়ায়৷  বিজ্ঞাপনে নানা কৌশল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন: বিএসআরএম সিমেন্ট- ‘এখন বুয়েট কতৃক পরীক্ষিত’, হরলিক্সে আছে- ‘এত পার্সেন্ট ক্যালরি, যা আপনার শিশুকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে’,রক্সি পেইন্ট- ‘সেই ১৯৫৩ সাল থেকে’, লাইফবয়- ‘অন্যান্য সাবানের চাইতে দেয় বেশি সুরক্ষা, এখন ৯৯% জীবানুমুক্ত করে’ বা এরোমেটিক-‘১০০ ভাগ হালাল সাবান’ । কিসের ভিত্তিতে এবং কিভাবে বলছে একটু বেশি পিওর বা ‘একশোর ওপরে অসুখ ভালো হয়’ ?  ‘পৃথিবীর সেরা হালাল পানীয়’ এর সার্টিফিকেট কে দিল? ‘আমার পণ্যই সেরা’ বললে অন্যের পণ্যকে খাটো করা হয়। খেলে অসম্ভব হবে সম্ভব, রাতারাতি কমে যাবে বয়স, ভেজাল প্রমাণে লাখ টাকা পুরস্কার, ১০০% পিওর, ত্বক হয়ে উঠবে উজ্জ্বল, রোগ থেকে দেয় সুরক্ষা, সম্পূর্ণ ক্যামিকেল মুক্ত, বাজারের সেরা, পণ্যটি যেন অমৃত সুধা- এসব অভিব্যক্তি ও দাবি কতটা যৌক্তিক?

এসবের মধ্যেও মানুষের মৌলিক আবেগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে নির্মিত কার্যকর বিজ্ঞাপন রুচি পাল্টায়, ফ্যাশন পাল্টায়, দুনিয়াটাকে দেখার ভঙ্গি পালটে যায়৷ বিজ্ঞাপনটি যদি যথাযথ হয়, মানুষের কল্যাণে হয়, একটু গঠনমূলক হয়, আপনার ও সমাজের উপকারে তৈরি হয়, তা হলে তো কোনো কথাই নেই৷ কিন্তু দু:খজনকভাবে বিজ্ঞাপনে বাড়িয়ে বলার বৈশ্বিক ট্রেন্ড থাকলেও ভুল বার্তা বা মিথ্যা তথ্য দেয়ার নীতিবিরুদ্ধ প্রবণতা উপমহাদেশে বেশি লক্ষ্যণীয়৷ শিশুকে তিনগুণ দ্রুত লম্বা করা, স্ট্যামিনা বাড়ানোর দাবিকারী হেলথ ড্রিংকের বিজ্ঞাপন পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে নিষিদ্ধ৷ অথচ এদেশে বিজ্ঞাপনে এনার্জি ড্রিংক খেলে ব্রেইন খোলে ও সতেজ থাকে দেখে বাচ্চাকে কিনে খাওয়ানোর ফলে আসক্তির ঘটনাও ঘটেছে৷ চাকরি হচ্ছে না? ব্যবহার করুন ‘এফ এন্ড এফ সাদা ক্রিম’, চাকরি সুনিশ্চিত! সোনামণি পরীক্ষায় লিখে শেষ করতে পারছে না? খেতে দিন ‘হারকিউলিস ড্রিঙ্কস’ আর তাকে করে তুলুন এক্সাম রেডি! যেন অনুভূতি নিয়ে খেলা! নিজেদের পণ্য গছিয়ে দেয়ার জন্য গালভরা মিথ্যা প্রলোভনের আবেদন!

বিজ্ঞাপন দেখে সন্তানকে আরো লম্বা, আরো শক্তিশালী, আরো বুদ্ধিদীপ্ত বানাতে হরলিকস নিয়ে আসেন বাবা৷ অথচ জীবনে হরলিকস না খেয়েও অনেকে নিয়মিত হরলিকস খাদকের চেয়ে টলার, স্ট্রংগ্রার এবং শার্পার হন৷ বিজ্ঞাপনের দাবীর কোনো ভিত্তি না থাকায় উন্নত দেশে বিজ্ঞাপনটি নিষিদ্ধ হয়েছিল৷ তারা এটা স্বীকার করে নিয়েছিল যে, বিজ্ঞাপনটি অনুন্নত দেশের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, ভুলে তা উন্নত দেশে (ব্রিটেনে) প্রচারিত হয়েছে৷  বিশ্বখ্যাত নেস্লের ম্যাগি নুডুলস এর বিজ্ঞাপনও ব্রিটেনে নিষিদ্ধ হয়েছিল৷  বিজ্ঞাপনের ভাষ্য ছিল- এই নুডুলস খেলে হাড় ও মাংশের গড়ন বৃদ্ধি পায়! ‘হাতের স্পর্শ নেই বলে কোনো প্রিজারভেটিভ দেওয়া হয় না’- এ কথা যারা বলেন তারাও মিথ্যা বলেন৷  এসব তারা বলেন কিসের ভিত্তিতে? হাতের স্পর্শ না থাকলেও প্রিজারভেটিভ দিয়ে থাকেন অনেকে৷ ঔষধ প্রশাসনের নীতিমালাকে তোয়াক্কা না করে টিভি চ্যানেলে প্রচার হয়- হোমিওপ্যাথি, হারবালসহ নানা চিকিৎসা পদ্ধতির বিজ্ঞাপন৷  ফলে এসব বিজ্ঞাপন বিরক্তি আর আকর্ষণ মিলে মিশ্র অনুভূতি সৃষ্টি করে৷

একটি কার লোনের বিজ্ঞাপনে একটি মেয়ে বৃষ্টির মধ্যে নিজ গাড়িতে উঠছে, সহপাঠী ছোট্ট ছেলেটি তার সাথে গাড়িতে উঠতে গেলে মেয়েটি সজোরে বন্ধ করে দেয় গাড়ির দরজা৷ এখানে কী শেখানো হলো- সহপাঠীকে বিপদে সাহায্য করা যাবে না৷ একজন বৃষ্টিতে ভিজলে আরেকজন সাহায্য করবে না, অবজ্ঞা করবে! একটি বিজ্ঞাপনে মেয়ের অনেক বান্ধবী বাসায় আসবে শুনে মা মেয়ের রুমে গেছেন৷ মেয়ের বান্ধবীদের জন্য মা নিজে রান্না করার কথা জানালে মেয়েটি দোকান থেকে রান্না করা খাবার আনিয়ে নেবে বলল এবং মায়ের মুখের সামনে দরজাটা ধাক্কা মেরে বন্ধ করে দিল৷ আমরা কি আমাদের মায়ের মুখের সামনে দরজা এভাবে বন্ধ করে দেব?

বিজ্ঞাপনে বিভিন্ন পণ্য ও সেবা সম্পর্কিত প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় তথ্য সম্ভাব্য গ্রাহক শ্রেণি তৈরি করে, মানুষের চাহিদাকে বাড়িয়ে দেয়, কেনার প্রয়োজন বোধ করায়; যা ভালো-মন্দ নানারকম বার্তা তুলে ধরে আকৃষ্ট করে, প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক গ্রাহকের আবেগ আর লুকানো চাহিদাকে নাড়া দেয়৷ বলা হয়ে থাকে- নান্দনিকতার নিন্দনীয় কোনো রূপ নাই আর সুন্দর সর্বদা নমস্য৷ অথচ সাদরে গ্রহণ করার মতো শিল্পগুণ সমৃদ্ধ সুন্দর, রুচিশীল ও স্পর্শী বিজ্ঞাপন কয়টি আসছে? কালো মেয়ে ফর্সা হয়ে ভালো বর পেতে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি মাখে৷ যখন দিনের পর দিন ফেয়ারনেস ক্রিম মেখেও আয়নায় তাকিয়ে পরিবর্তন দেখে না তখন একসময় হাল ছেড়ে দেয়৷ গরীবের মেয়ে ভালো কোম্পানির ট্যালকম পাউডার, আর বড় লোকের মেয়ে ম্যাক কোম্পানির মেকআপ মেখে বিয়ে করে ফেলে৷ ছেলেরাও ব্যবহার করে পারফিউম৷ শেভ করার জন্য ক্রিম যথেষ্ট হলেও ‘ম্যানলি এবং মাচো’ ভাব আনার জন্য জিলেটের ‘কুল’ জেল, ‘ম্যাক থ্রি’ রেজর আর ব্লেড ব্যবহার করে৷  মেয়েদের রং ফর্সাকারী একটি ক্রিমের বিজ্ঞাপনে  ‘বিভিন্ন দেশের সব ক্রিমকে হারিয়ে এলো অমুক ক্রিম।’  কোন কোন ক্রিমের সাথে তারা কম্পিটিশন দিয়েছে?

প্রশ্ন হচ্ছে- একটা মেয়েকে ভালো বিয়ে ও ভালো চাকরির জন্য ফর্সা হতে হবে কেন? শ্যামবর্ণের মেয়েদের কপালে চাকরিও নেই এমন ধারণা ছড়াবে কেন? মেয়েদের রং ফর্সাকারী ক্রিম, পুরুষদের ফেয়ারনেস ক্রিমের কী দরকার? স্থূলতাকে হাস্যকর-অপমানজনক বার্তা দেয়া মানে বর্ণবাদ ও বাহ্যিক রূপকে যোগ্যতার ওপর গুরুত্ব দেয়া৷ তাছাড়া পণ্যের গুণাগুণ নিয়ে অতিরঞ্জন আছে, মানুষের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে নানাভাবে হেয় করে পণ্য বিক্রির চেষ্টা চলছে৷ আঞ্চলিক ভাষাকে নিয়ে বিদ্রুপ করা হচ্ছে, কখনো নারীকে দেখানো হচ্ছে লোভী হিসেবে৷ কারণ বিশেষ ব্র্যান্ডের ফ্রিজ না কিনে না দিলে সংসারই করবেন না তিনি! আবার এত বছরের প্রেমিককে ছেড়ে শুধু পারফিউমের ঘ্রাণে পাগল হয়ে অন্য পুরুষের পেছনে ছুটলেন আরেক নারী৷ ২০০৯ সালে বিখ্যাত ডিওডরেন্ট ব্র্যান্ড ‘এইক্স’-এর বিরুদ্ধে ভারতের আদালতে মামলা করেন ২৬ বছরের যুবক বৈভব বেদী৷ বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়, কোনো এক পুরুষ গায়ে এই ব্র্যান্ডের বডি স্প্রে দেয়ার পর অর্ধনগ্ন নারীরা ছুটে আসেন৷ কিন্তু বৈভবের অভিযোগ, সাত বছর ধরে তিনি এইক্স ব্যবহার করছেন, কিন্তু তার কোনো বান্ধবীই নেই৷

বিজ্ঞাপনে শৈল্পিকভাবে উপস্থাপিত ভিন্নধর্মী ও পরিশীলিত বার্তা হৃদয় ছুঁয়ে যায়, আবেগ আর বিবেককে আলোড়িত করে, ভাবতে শেখায় এবং চিন্তাধারা ইতিবাচকভাবে বদলে দেয়৷ অথচ বাচ্চাদের ক্যান্ডি থেকে শুরু করে ফ্রুট জুসের বিজ্ঞাপনে ‘একটু চাপ দাও, আসল মজা নাও আসল মজা ভেতরে’, ‘চলো ঝাঁকাই’ এমন দ্ব্যার্থবোধক স্লোগান-জিঙ্গেল ব্যবহার হচ্ছে!  ‘তৃষ্ণায় দু’হাত বাড়ালে তোমায় পাওয়া যায়’ কোমল পানীয়র বিজ্ঞাপনে পানীয়টা হাতে থাকলেও তৃষ্ণার্ত পুরুষ ব্যক্তিটি হাত বাড়ান চারপাশে নাচতে থাকা নারীর দিকে৷ বর্ণবাদী বিজ্ঞাপন প্রচারের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল প্রসাধনী পণ্যের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ডাভ৷ তিনটি ছবি যুক্ত বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী তার শরীরের টি-শার্ট খুলে ফেলছেন৷  তার চামড়ার নিচে একজন সাদা নারীকে প্রকাশ করতে টি-শার্ট খুলে ফেলেন তিনি৷  তৃতীয় ছবিতে টি-শার্ট খুলে ফেলার পর মুহূর্তের মধ্যেই কৃষ্ণাঙ্গ থেকে একজন শেতাঙ্গ এশীয় নারী বেরিয়ে আসে৷  অর্থাৎ ডাভ সাবান ব্যবহারের পর একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীর শরীরের রঙ পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে গেছে৷  কৃষ্ণাঙ্গ থেকে মুহূর্তের মধ্যেই শেতাঙ্গ হয়ে যান তিনি৷ অসঙ্গতিযুক্ত চটকদার বিজ্ঞাপনে মনে রাখার মতো কোনো বার্তা বা সারবস্তু নেই৷

বিজ্ঞাপন নির্মাতারা নারীকে পণ্যই বানিয়ে ফেলছেন৷ বডি স্প্রে, ডেউডারেন্ট, কনডম ইত্যাদির বিজ্ঞাপন যৌনতাকে আশ্রয় করে তৈরি হয় না- একথা কেউ বলতে পারবে না৷ পুরুষ স্প্রে করলেই পরীসদৃশ নারীরা বাড়ি ঘর ভেঙ্গে মর্তে পড়ে; পুরুষের বডি স্প্রের বিজ্ঞাপনে নারী ভাষ্যকার প্রশ্ন করেন, আজ রাতে কোথায় যাবেন? নাসির গোল্ড নামে একটি সিগারেটের বিজ্ঞাপনে নারীকে অসম্মানজনকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল৷ বিজ্ঞাপনের কারণেই অনেকে এখনো বিশ্বাস করে কোকাকোলা ‘জিরো’তে আসলে কোনো চিনি নেই৷ অথবা বাজারের বিভিন্ন ফ্রুট জুসে আসলেই ফ্রুট আছে, কোনো কৃত্রিম খাদ্যদ্রব্য নেই৷ দেশি লিজান মেহেদির বিজ্ঞাপন কেন শাহরুখ আর ক্যাটরিনাকে দিয়ে করানো হয়? পাক্কা মুসলমান হতে, আশেকে রাসুলের মন নিয়ে ইবাদত করে খোদার দিদার লাভ করতে চাইলে কোন্ পিরের কাছে যেতে হবে তারও বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছে টিভিতে! অবস্থা কতটা ভয়াবহ তা এ থেকেই অনুমান করা যায়!

রিহ্যাব আয়োজিত ‘রিহ্যাব ফেয়ার ২০১৯’ শীর্ষক আবাসন মেলায় চটকদার ও বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন দিয়েছিল র‌্যাংগস প্রপার্টিজ৷ গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে র‌্যাংগস প্রপার্টিজের স্টলের ওয়ালে স্কল আকারে বারবার লেখা আসছিল ‘৩৫ হাজারে ৮৫ লাখের ফ্ল্যাট’৷ লেখাটা দেখে মনে হচ্ছিল ৮৫ লাখ টাকা মূল্যের ফ্ল্যাট তারা ৩৫ হাজার টাকায় দিচ্ছে৷ কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন৷ ফ্ল্যাট বুঝে নিতে গ্রাহকদের ৮৫ লাখ টাকায় পরিশোধ করতে হবে৷ কিস্তিতে ফ্ল্যাট নিতে চাইলে ৩৫ হাজার টাকা থেকে ইএমআই (ইক্যুয়াল মান্থলি ইনস্টলমেন্ট) শুরু হবে৷ এ ধরনের চটকদার বিজ্ঞাপন এক ধরণের প্রতারণা৷

শিশু জন্মের আগেই ফেসবুকে তাকে বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন শিশু দত্তক নামক একটি গ্রুপে হানা মোহাম্মদ নামের এক নারী৷ বিজ্ঞাপনে ছিল- দুই সপ্তাহের মধ্যে ভূমিষ্ঠ হবে এক শিশু৷ কেউ যদি কিনতে আগ্রহী থাকেন; তাহলে ফেসবুকে ক্ষুদে বার্তায় যোগাযোগ করুন৷ ভূমিষ্ঠ হওয়ার অপেক্ষায় থাকা শিশুর বাবা-মার কাছ থেকে সরাসরি শিশুটিকে কিনতে পারবেন৷ ফেসবুকের এক ব্যবহারকারী এ বিজ্ঞাপন দেখে ওই নারীর সাথে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয়, শিশুটি বিক্রি হবে ২ হাজার মিসরীয় পাউন্ডে৷ পরে ওই নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার তদন্ত শুরু করে আলেক্সান্দ্রিয়া পুলিশ বিভাগ৷ ওই নারী ও তার স্বামীকে গ্রেফতারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দুই হাজার পাউন্ডে শিশুটিকে কিনে নেয়ার শর্তে রাজি হয় পুলিশ৷ জন্মের সময় ঘনিয়ে এলে পুলিশ দালালের মাধ্যমে শিশুটিকে দেখতে চায়৷ পরে শিশুটির ৩০ বছর বয়সী বাবা ও মাকে গ্রেফতার করা হয়৷ বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপনে জায়গা পাওয়া এই শিশুটি ওই দম্পতির দ্বিতীয় কন্যা সন্তান৷

ভালো বিজ্ঞাপন যে হচ্ছে না তা নয়৷ একটি টেলিকম কোম্পানির বিজ্ঞাপনে শাশুড়িকে পুত্রবধূর স্কুটি শেখানো, মায়ের সাথে যোগাযোগের জন্য ফোন কিনে নিয়ে যাওয়া অথবা স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাটির প্রিয় ললিপপটি পথশিশুকে দেয়ার গল্প৷ নারী দিবস উপলক্ষে‘আর এক চুলও ছাড় নয়’ স্লোগানের নির্যাতনবিরোধী সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন সমাদৃত হয়েছে৷ প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিজ্ঞাপনে অনেকে নিরুৎসাহিত করলেও বিপদসংকুল অভিযাত্রায় সাহস ও সরঞ্জাম দিয়ে উৎসাহ দেয়ায় এক তরুণ অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে সুউচ্চ পর্বতে আরোহন করতে চেয়ে সফল হয়৷ শত বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও কার্যকর সহযোগিতা ও সমর্থন পেলে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব- এমন বার্তা খুবই অর্থবহ৷

টেলিটক থ্রি জি’র বিজ্ঞাপন৷ বড় ভাই বিদেশে থাকে৷ বাকশক্তিহীন ছোট বোন পরিবারের সকলের সাথে ইশারায় কথা বলে৷ ভাইয়ের ফোন এলে মা খালাদেরকে ইশারায় সে জানিয়ে দেয়, ‘বলে দাও, আমি ভালো আছি৷  তারা শেষপর্যন্ত ফোনটি নিয়ে মেয়েটির কাছে আসে৷ ভিডিও কলের মাধ্যমে প্রথমবারের মত ইশারায়-ইশারায় কথা হয় ভাই-বোনের৷  ভাইয়ের ফোন এলে তার সাথে কথা বলতে না পারা, তাকে দেখতে না পাওয়ার দুঃখ নিমিষেই দূর হয়ে যায়৷ ভাই-বোনের শাশ্বত মধুর সম্পর্ককে প্রতিভাত করে এই বিজ্ঞাপন৷

ঈদে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে নতুন জামা উপহার দেয়ার উদ্যোগে গ্রাহকদের সহযোগিতা কামনায় রবির বিজ্ঞাপনটিতে উপস্থাপিত গল্প চমৎকার৷ সবচেয়ে স্পর্শী দৃশ্য হচ্ছে, ছোটভাইটি তার গায়ের জামাটি খুলে উল্টিয়ে আবার পড়ে নেয়৷ বড় ভাইকে দেখিয়ে বলে, ‘ভাই, দেহ, আমার নতুন জামা, নতুন অইছে না?’ তখন অনেক কষ্টে টাকা জমিয়েও ছোটভাইয়ের জন্য পছন্দের জামা কিনতে না পারায় বড় ভাইটির দুঃখ মুহুর্তেই মিলিয়ে যায়৷ এই বিজ্ঞাপনে ‘রবি শিশুশ্রমকে উৎসাহিত করে না’ ট্যাগ লাইনটির ব্যবহার করে সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় দেয়৷

বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের বিজ্ঞাপনে একজন বিদেশিনী বাংলাদেশকে দেখছে আর নতুনভাবে আবিস্কার করছে৷ দেখানো হয়েছে- প্রাকৃতিক দৃশ্য ও পর্যটন এলাকা, বাংলার মানুষের জীবন ও জীবনসংগ্রাম৷ স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে ‘জীবনের সমারোহ’ বা ‘ ‘School of Life’৷ একটি ঢেউটিনের বিজ্ঞাপনে মা তার স্বামীর ভিটেবাড়ি ছেড়ে যেতে চান না- ছেলে মায়ের অনুভূতির কথা বিবেচনায় নিয়ে টিন পরিবর্তন করে দেন৷  এটা মায়ের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ৷  একটি গুঁড়া সাবানের বিজ্ঞাপনে ছোট্ট ছেলেটি  বলে- আজ হেরেছি, কাল জিততেও তো পারি৷  ছোট্ট ছেলেটির কথা ক্রিকেটপ্রেমিক প্রতিটি মানুষ, খেলোয়াড়, কোচ ও সংগঠনকে অনুপ্রাণিত করে৷  একটি ঢেউটিনের অ্যাডের ভালো টিন কেনার জন্য প্রিয় শিক্ষকের কাছে যাওয়া এবং অভিজ্ঞ লোকের থেকে বুদ্ধি নেওয়া হয়৷ সমাজের গুণীজন ও অভিজ্ঞদের কাছে পরামর্শের জন্য যাওয়ার রীতি বহুল প্রচলিত৷  একটি মসলার বিজ্ঞাপনে- ঠিক যেন মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ৷  বিদেশে বসে দেশের কথা ভাবা এক প্রবাসী শ্রমিকের রান্নায় ব্যবহূত মসলার গল্প কী অসাধারণ অনুভূতি তৈরি করেছে! এসব বিজ্ঞাপন আমাদের মধ্যে সব পণ্যের বাজারজাত প্রক্রিয়াকে সহজ করে, আমাদের নৈতিকতাকে জাগ্রত করে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভালোভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে৷

ধূমপানের মারাত্মক ক্ষতিকর দিক নিয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণায় ‘আত্মজিজ্ঞাসা’ নামের একটি টিভি স্পট জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল, স্বাস্থ্য অধিদফতরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিস-এর যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হয়৷ এর দৈর্ঘ্য ৩০ সেকেন্ড৷ এতে দেখা যায়, একজন কর্মজীবী মানুষ প্যাকেট থেকে একটি সিগারেট বের করতে গিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হন এবং নিজেকেই প্রশ্ন করেন- এই সিগারেট খেলে আমার কী ক্ষতি হবে? তার মনে বিভিন্ন আশঙ্কা দেখা দেয়- স্ট্রোকে চলৎশক্তি হারিয়ে পরিবারের উপর তিনি বোঝা হয়ে যাবেন না তো? ফুসফুস ক্যান্সার হয় যদি, কিংবা হার্ট অ্যাটাক? এতে ধূমপানের ভয়াবহ ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহন ধূমপানমুক্ত রাখতে সবাইকে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে৷

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সামনে রেখে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নির্মিত  মাত্র দুই মিনিটের বিজ্ঞাপনের বার্তা ভীষণ শক্তিশালী৷ ছোট্ট এক শিশু বলছে ভাষাকে সে কীভাবে দেখে৷ বলা, না বলা, ভালো লাগা, না লাগা, কষ্ট, বেদনা, ঘৃণা, ভালোবাসা সব প্রকাশের ভিন্ন ভিন্ন ভাষা রয়েছে৷ শিশুটি বলছে, ভাষা তার কাছে ছবির মতো৷ এরপর নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে দেখানো হয়েছে, কোন ভাষা দিয়ে সে কী ধরণের ছবি আঁকে৷ সেখানে উঠে এসেছে অপমানজনক কথা, ঘৃণার কথা, বাজে কথা, অসম্মানজনক কথা৷ কোনটাকে সে ভালো ছবি বলেছে, কোনটা বলেছে ভয়ের কথা৷

থাইল্যান্ডের ক্রিয়েচার ল্যাব সলিউশন লিমিটেড ২০১৫ সালে একটি সিসি ক্যামেরা বাজারে আনে৷ ২৭ অগাস্ট ভিজারের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল থেকে এবং পরেরদিন ফেসবুকে একটি ভিডিও বিজ্ঞাপন শেয়ার দেয়৷ বিজ্ঞাপনটিতে দেখা যায়, রাতে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এক দোকানের সামনে প্রতিদিন এক গৃহহীন ব্যক্তি এসে ঘুমায়৷ যিনি ভিক্ষা বা টোকাইয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন৷ এক সকালে দোকানদার দোকান খুলে দেখেন, ওই ব্যক্তি ঘুমিয়ে আছে৷ তিনি তার গায়ে বালতি-ভরা পানি ঢেলে দেন৷ ওই ব্যক্তি চিৎকার করতে থাকলে ছুঁড়ে মারেন ধাতব সেই বালতি৷ এতে পালিয়ে যান ওই ভিক্ষুক৷ পরের দিনও ঘুম থেকে জেগে একই পরিস্থিতি দেখে দোকানদার তাকে তাড়িয়ে দেন৷ এক সকালে দোকানদার জেগে দোকানের সামনে পেশাবের গন্ধ পান৷ তিনি ধরেই নেন এটা ওই গৃহহীন ব্যক্তির কাজ৷ ঘুমন্ত সেই গৃহহীনকে দোকানদার লাথি দেয়৷ এতে জেগে যান অনাহার-অপুষ্টি ক্লিষ্ট সেই ব্যক্তি৷ এভাবে আক্রমণে প্রথমে বিস্মিত হলেও দোকানির ক্রোধ দেখে পালিয়ে যান তিনি৷ ওইদিন গৃহহীন সেই ব্যক্তির সঙ্গে এ ধরনের আচরণে এক তরুণী এসে তিরস্কার করে যায় দোকানদারকে৷ এরপর এক সকালে দোকানদার ঘুম থেকে জেগে দেখেন, দোরগোড়ায় ঘুমানো সেই ব্যক্তি নেই৷ পরপর কয়েকদিন না দেখায় তিনি অবাক হন৷ এদিক ওদিক চলে যায় অনুসন্ধিৎসু চোখ৷ এ সময় পাশের দোকান থেকে একজন এই দোকানদারকে বলেন, তার (গৃহহীন) খোঁজ করছো? সে অনেক দূরে চলে গেছে৷ কিছুই বুঝতে পারলো না দোকানদার৷ তখন মনে পড়ে যায় দোকানের সামনে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার কথা৷ পুরাতন ভিডিও ঘেটে তিনি দেখেন, অন্য এক ব্যক্তি পেশাব করতে শুরু করার পর ওই গৃহহীন তাকে তাড়িয়ে দেয়৷ এভাবে একদিন গৃহহীন এসে দেখতে পায়, হেলমেট পরা কিছু মানুষ দোকানের তালা ভাঙার চেষ্টা করছে৷ তিনি তা রুখে দাঁড়ান৷ কিন্তু দুর্বল শরীর নিয়ে এবং একাকী তাদের সাথে পেরে উঠেননি৷ এক পর্যায়ে ওরা তাঁর মাথা পদপিষ্ট করে৷ তাতেও তিনি দমে যাননি৷ এরপরও তাঁকে থামাতে না পেরে দুষ্কৃতিকারীরা তাঁর পেটে ছুরি চালিয়ে দেয়৷ এতে ঢলে পড়েন তিনি৷ এদিকে একের পর এক দিনের ভিডিও দেখছিলেন আর আত্মগ্লানিতে ভেঙে পড়ছিলেন দোকানদার৷ শেষে স্ক্রিনে ভেসে উঠে, দেয়ার ইজ মাচ মোর ট্রুথ দ্যাট ইউ আর ব্লাইন্ড টু৷ এরপরই ভিজার সিসিটিভির নাম, পণ্যের ছবি এবং মনোগ্রাম ভেসে উঠে৷ এর মাধ্যমে নিজ দেশেও অপরিচিত এই ব্র্যান্ড পরিচিতি পেয়েছে বিশ্বজুড়ে৷

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে র‌্যাবের তৈরি বিজ্ঞাপনের শুরুতে দেখা যায়, এক মোটর সাইকেল আরোহী নামতে গিয়ে হঠাৎ পড়ে যান৷ সেই ছবি তুলে আরেকজন ফেসবুকে শেয়ার করেন৷ তবে সঙ্গে লিখে দেন, ‘‘মারাত্মক দুর্ঘটনা৷ ভাংচুর-তোলপাড়৷ রাস্তাঘাট সব বন্ধ৷” ছবিটি দ্রুত শেয়ার হতে থাকে৷ একটিতে দেখা যাচ্ছে, একজন মানুষ ‘মাছ’ শব্দকে ‘লাশ’ ভেবে ফেসবুকে শেয়ার করছেন৷ আরেকটিতে মশা মারার ওষুধের ধোঁয়াকে আগুন লাগার ঘটনা হিসেবে শেয়ার করা হচ্ছে৷ বিজ্ঞাপনের শেষদিকে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘গুজবে কান না দিয়ে, সবকিছু বিশ্বাস না করে, আগে সত্য জানবো, এবং মিথ্যে দিয়ে তৈরি গুজব রুখে সত্য জানাবো৷’

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে জুঁই নারিকেল তেলের জন্য নির্মাতা আশুতোষ সুজনের তৈরি নারী নিগ্রহ ও নির্যাতনবিরোধী বিজ্ঞাপনচিত্র বেশ প্রশংসিত হয়৷ প্রায় দুই মিনিট ব্যাপ্তির এই বিজ্ঞাপনচিত্রটিতে দেখা যায়, এক তরুণী পার্লারে যান তার লম্বা চুল ছোট করতে৷  বিউটিশিয়ান যত ছোট করেন তিনি শুধু বলেন, আরো ছোট৷  শেষে নারীটি বলেন, এমন ছোট করুন যেন কেউ এটি মুঠো করে ধরতে না পারে৷  মূলত এ সংলাপটি মানুষের মনে দাগ কেটে যায়৷

কাপড় ধোয়ার গুড়া সাবানের একটি বিজ্ঞাপনে স্কুল বালকেরা খেলার সময় ক্রিকেট বল দিয়ে একটি বাড়ির জানালার কাচ ভেঙ্গে ফেলে৷  বল কুড়াতে কে যাবে এ নিয়ে জটলা৷  একজন সাহস দেখিয়ে ভিতরে যায়৷ ‘ক্রিকেট খেলবে, ছক্কা হাকাবে, কাচ ভাঙ্গবে’, বলতে বলতে বালকটির এক হাতে শাস্তি দিতে উদ্যত হন বাড়ির মালিক৷ বালকটি তখন দুই হাতই বাড়িয়ে দেয়৷  বলে,‘আংকেল, দুই হাতেই মারেন৷  কারণ, পরের বলটাও ছক্কা হবে৷  এ সময় বালকটির চেহারায় যে ধৃষ্টতা ফুটে উঠে তা যেকোন গোঁয়ার বালকের থেকে কম নয়৷  এই যে একের বদলে দুই হাত বাড়িয়ে দেওয়া, এটাকে ভাষ্যকার বলে দিচ্ছেন, ‘লক্ষ্য যদি হয় দ্বিগুণ উজ্জ্বল, তবে কাপড় কেন নয়?’ ব্যাস, শাস্তির বদলে তার উপহার মিলল বল, আদর আর সার্টের কলার ঠিক করে দেওয়া৷  ভাগ্যিস! বালকের সার্টটি ঐ গুড়া সাবান দিয়ে ধোয়া ছিল৷

একটি শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপনে  হোস্টেল সুপার মেয়েদের রুমে এসে সাবধান করে দিচ্ছেন, ‘রাত দশটার পর বাইরে যাওয়া নিষেধ৷  মেয়েরা ‘বাইরে’ যাবে না বলে দোহাই দেয়, ‘ম্যাম, কিভাবে? এই ভিজা চুল নিয়ে?’ অথচ, এই ভিজা চুল নিয়েই লুকিয়ে তারা বাইরে যায়, পার্টিতে অংশ নেয়৷  নেচে গেয়ে বেড়ায়৷  কী শেখানো হচ্ছে? বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ শাসন করলে আরো বেশি উদ্ধত হবে; নিয়ম না থাকলেও মিথ্যা বলে, লুকিয়ে নিয়ম ভাঙ্গবে। ক্যান্ডির বিজ্ঞাপনে  বাসর রাতে নববধূর হাতে অমুক+তমুক উল্কি দেখে বেচারা স্বামীর মন বেদনা, ‘তুমি এখনো ‘তমুক’কে ভুলতে পারনি?’ ‘অ্যাটম খাও, চাপার জোর বাড়াও’- চাপার জোরে ‘তমুক’ হয়ে যায় আজকের এই স্বামী৷ এর মানে কী? সত্য ভুলে চাপার জোর বাড়াবে। চারিত্রিক বৈকল্যকে বাড়িয়ে দিচ্ছে এসব বিজ্ঞাপন।

কোমল পানীয়ের বিজ্ঞাপনে মা-বাবা-বোন ইফতারি সাজিয়ে বসে আছে৷  হালিম (অন্য কিছুও হতে পারে) আনতে ছেলের দেরি হচ্ছে৷  এদিকে ইফতারির সময়ও ঘনিয়ে আসছে৷  একসময় এক হাতে হালিম আর অন্য হাতে সেভেন আপের বোতলসহ তার চাচা ও চাচাত ভাইকে নিয়ে ছেলেটি ঘরে ফিরে৷  তখন যা কর্তব্য তাই করলেন ছেলের মা-বাবা৷  দ্রুত চেয়ার দেখিয়ে বসতে দিলেন৷  কিন্তু, ইফতারির পূর্ব মুহুর্তে অনাহূত অতিথি আসায় বাবা-মায়ের বিরক্তমাখা পরস্পর দৃষ্টি বিনিময়- ইফতারির মত অনুষ্ঠান বা ঐ কোমল পানীয়টির সাথে কী অর্থ প্রকাশ করে বুঝা গেল না৷ অতিথি এলে বিরক্তভাবকে অদৃশ্য রেখে অলীক আতিথেয়তা দেখানো; শঠতার আশ্রয় নেওয়া- কি বিজ্ঞাপনের উপজীব্য হতে পারে?

ইন্টারনেট মডেমের বিজ্ঞাপনে  বিদেশি প্রতিষ্ঠানে ভিডিও চ্যাটের মাধ্যমে চাকরির ইন্টারভিউ হবে৷  ছেলেটির এত সময় নাই৷  বন্ধুবান্ধবসহ কমলাপুর রেল স্টেশনে সময় কাটাচ্ছে, সম্ভবত ট্রেনে চড়ে কোথাও যাবে৷  এমন সময় কল আসলে ছেলেটি সবাইকে নিয়ে দ্রুত পরিবেশ বদলের চেষ্টা করে৷  কোন একজনের কাছ থেকে কোট টাই ধার করে থ্রি কোয়ার্টার পেন্টের সাথে পড়ে নেয়, পর্দা দিয়ে আড়াল করে স্টেশনের হট্টগোল, লোকজনের আনাগোনা ইত্যাদি৷  এক সময় সফলতার সাথে ইন্টারভিউ শেষ হয়৷  তখন ভাষ্যকার বলে উঠেন, ‘দ্রুত গতির ইন্টারনেটে এখন এমন কিছু হবে, যা কেউ ভাবেনি আগে৷

বিজ্ঞাপনের পক্ষে বিপক্ষে তীব্র তর্ক-বিতর্ক বা আলোচনা-সমালোচনা হতেও দেখা যায়৷ ডিটারজেন্ট ব্র্যান্ড সার্ফ এক্সেলের বিজ্ঞাপনের ভিডিওতে  কথিত ‘লাভ জিহাদ’ বা হিন্দু মেয়ের সঙ্গে মুসলিম ছেলের প্রেমে প্রশ্রয় দেয়ার তিক্ত প্রতিক্রিয়ায় হিন্দুস্থান ইউনিলিভারের যাবতীয় পণ্য বর্জনেরও ডাক দেয় অনেকে৷ অনেকে ভালবাসা, বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতির নজির হিসেবে বিজ্ঞাপনটির প্রশংসাও করে৷ বিজ্ঞাপন নিয়ে রাজনীতিও হয়৷ পাকিস্তানে তাপল চা ব্রান্ডের বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে ভারতীয় বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানের উপস্থিতি তার প্রমাণ৷ পাক ওই চায়ের বিজ্ঞাপনের একটি অংশে চায়ের কাপ হাতে অভিনন্দনকে দেখা যায়৷ তিনি চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলছেন, চমৎকার চা৷ আপনাকে ধন্যবাদ৷

নব্বইয়ের দশকে টিভি বিজ্ঞাপনগুলো ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল৷ বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলে কণ্ঠ দিয়েও তারকা হয়েছেন অনেকে৷ বিজ্ঞাপনের মিউজিক করে রিপন খান বা রেশাদদের মতো সংগীত পরিচালকরাও নিজেদের আলাদাভাবে চিনিয়েছেন৷ তখন মানুষ আগ্রহভরে বিজ্ঞাপন দেখত৷ মাছের রাজা ইলিশ আর বাতির রাজা ফিলিপ্স- সে তো খুব সাধারণ আপ্তবাক্যই হয়ে গেল মানুষের মাঝে৷ অলিম্পিক ব্যাটারির বিজ্ঞাপনটিও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে৷ চান্দা ব্যাটারির বিজ্ঞাপন দেখানোর সময় টিভির সামনে গিয়ে ‘তান্দা তান্দা’ বলে নাচতেও শুরু করতো ছোটোরা৷  সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু বদলাবে। তবে বিজ্ঞাপনে ভুল বার্তা দেয়ার নেতিবাচকতাকে সমর্থন করা ঠিক হবে না। এতে শুধুমাত্র ভোক্তারাই ক্ষতিগস্ত হন না, অনৈতিক বিজ্ঞাপনের প্রভাবে গোটা সমাজও বিকারগ্রস্ত হতে পারে৷ প্রসারের জন্য রুচীহীন ও ভুল বার্তা বহন করে বা অনৈতিক বার্তা প্রকাশ পায় এমন বিজ্ঞাপন তৈরি ও প্রচার নিষিদ্ধ করা উচিৎ৷  অরুচীকর বিজ্ঞাপন তৈরি না করে রুচিশীল ও প্রকৃত সত্য উপস্থাপনে অর্থবহ ও নৈতিক বার্তাবহ বিজ্ঞাপন আপনার সামাজিক দায়বদ্ধতা৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *