প্রকাশনা শিল্পে ঝুঁকি ও সাম্প্রতিক প্রবণতাসমূহ

বই প্রকাশনার সাথে শুধুই টাকার সম্পর্ক নয়; এটির প্রভাব ও ব্যাপকতা আরো গভীরে। জ্ঞান ও মননশীলতার উৎকর্ষ সাধন, সাহিত্যমনস্ক ও জ্ঞানসমৃদ্ধ জাতি ও সমাজ গঠন এর ভূমিকা রয়েছে। বই পাঠের আগ্রহ ও সচেতনতা বাড়াতে জনসাধারণকে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করা না গেলে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন সম্ভব হবে না। সৃষ্টিশীলতার বিকাশ ও প্রসার ঘটাতে পুস্তক বা গ্রন্থ প্রকাশনা শিল্প খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সর্বসাধারণের মধ্যে ভালো লেখার পরিচিতি বাড়ায়ে জাতি বিকাশে ভূমিকা পালন করা ও জনশিক্ষার উপযোগী সহজ ও জনপ্রিয় গ্রন্থাদি প্রকাশ করার মাধ্যমে বৃহত্তর খেদমত হয়।  পরভাষায় পাঠকদের বড় অংশ স্বাভাবিক সৃজনশীলতা দেখাতে পারেন না তাই অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশের পাশাপাশি নতুন জ্ঞান তৈরিতে অবদান রাখতে  প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কাজ করতে পারে। প্রকাশনা শিল্পে অনেক ঝুঁকিও রয়েছে। যেমন:

পাঠকের অভাব: তথ্য-প্রযুক্তির প্রসার মানুষের পাঠাভ্যাসের উপর প্রভাব ফেলেছে। মানুষের পাঠের সময় দখল করে নিয়েছে ভার্চুয়াল মাধ্যম। ফলে খুব দ্রুত বই পাঠকের সংখ্যা কমছে। দিন দিন প্রকাশনার মুদ্রণসংখ্যা কমে আসছে। আগে যে বইটা ১২০০ কপি প্রকাশ হতো, এখন সেটা ৫০০ থেকে ২৫০ কপিতে এসে ঠেকেছে। বই বেশি কপি ছাপা হয় না বলে এর কপি প্রতি খরচ অনেক বেশি হয়। পাঠককে বেশি টাকা দিয়ে এক এক কপি কিনতে হয় বলে আবার বই বিক্রিও হয় কম। ফলে লোকে কম কেনে বলে বইয়ের দাম বাড়ে, আবার চড়া দামের বই লোকে কম কেনে।

ভালো পান্ডুলিপির অভাব: বইয়ের সংখ্যা বেশি হলেও মান কম। বই ব্যবসা তেমন লাভজনক না হওয়ার কারণ হলো, ভালো লেখক ও ভালো পান্ডুলিপির অভাব। ফলে ভালো বই বছরে হাতে গোনা কয়েকটি বেরুচ্ছে। খুব কম লেখকের বই এক দুই হাজারের বেশি বিক্রি হয়। একসময় হুমায়ূন আহমেদের বই এক মেলায় বিক্রি হয়েছে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার কপি। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর তার পাঠকসংখ্যা কমলেও হুমায়ুন আজাদের বই বিক্রি হয় আগের মতোই। এটা বইয়ের মান, গুরুত্ব, মেজাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। একটা বইমেলায় ১০টা ভালো বই পাওয়া যায় না। অথচ সাড়ে তিন থেকে চার হাজার বই বেরোয়!

বইয়ের দাম বেশি: সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশনা শিল্পের সঙ্কট হচ্ছে কাগজ, ছাপা ও বাঁধাইয়ের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বইয়ের দামও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি ফর্মা বইয়ের দাম ২৫-৩০ টাকা রাখা হচ্ছে। ফলে ১০০ পৃষ্ঠার একটি বইয়ের দাম দাঁড়াচ্ছে ১৫০ টাকা। এ দামে পাঠক বই কিনছে কম। ফলে যারা শুধু সৃজনশীল প্রকাশনা করে তাদের জন্য সারা বছর টিকে থাকা কঠিন। এখানে রিটার্ন খুবই কম। এ ব্যাপারে  প্রকাশকরা বলছেন, পাঠক বই কেনে না বলে বইয়ের দাম কমানো যায় না।

বইক্রেতা প্রতিষ্ঠানের অভাব: আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, পাবলিক লাইব্রেরী, গ্রন্থকেন্দ্র প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বই ক্রয় করতো। বর্তমানে রাজনৈতিক বিবেচনায় কিছু বই মন্ত্রণালয় থেকে ডিসির মাধ্যমে চিঠি দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্রয় করানো হচ্ছে। পাবলিক লাইব্রেরী ও গ্রন্থকেন্দ্র সামান্য পরিমাণে বই ক্রয় করলেও তাতে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে। সরকারী রাজনৈতিক দর্শনমূলক, মন্ত্রী, এমপি, সরকারী নেতা, কর্মী, সমর্থক ও আমলাদের লেখা বই সেখানে ক্রয়ে প্রাধান্য পাচ্ছে।

বিপণনের সমস্যা: প্রকাশনা ব্যবস্থায় একটা বড় সমস্যা হচ্ছে বিপণনের সমস্যা। বহু প্রকাশনা সংস্থা এই সমস্যার পেশাদারি সমাধানে আসতে না পেরে একটু খুঁড়িয়ে চলে; মার্কেট সম্প্রসারণের নেটওয়ার্ক বাড়ানোর আকর্ষণীয় প্রক্রিয়া, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কিংবা বাজেট নেই। ফলে বই বিক্রির টাকা থেকে অথবা আলাদা ফান্ড থেকে মার্কেটিং এবং সেলসের খরচ জোগাতে পারে না।

সাম্প্রতিক প্রবণতা

এক. নামকরা লেখক না হলে প্রকাশকরা তা ছাপতে চান না। ফলে লেখককেই টাকা বিনিয়োগ করে মার্কেটিংয়ের জন্য কোনো প্রকাশনীর নাম দিয়ে বই প্রকাশ করতে হয়। অনেক নবীন লেখক আর্থিক লাভের আশায় বই প্রকাশ করেন না; তিনি চান পরিচিতি, খ্যাতি বা নামযশ। তাছাড়া ব্যক্তিগত প্রকাশনা তৈরিতে ব্যয় কম পড়লেও বিপণন, বিজ্ঞাপন এবং বিক্রির অভাবে জনগণের কাছে না পৌঁছানোর কারণেও অনেকে প্রকাশনীর আশ্রয় নেন। অনেকে মনে করেন নিজের টাকায় বই প্রকাশ করলে কোনো প্রকাশককে দায়িত্ব না দেয়া ভালো।

দুই. প্রকাশনা ব্যবসা এখন বিনাপুঁজির ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।  লেখকের টাকায় বই ছাপিয়ে প্রকাশনীর মালিক হন প্রকাশকেরা। প্রকাশিত বই বিক্রি হলে টাকা পরিশোধ করেন। লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রকাশক ভালো না হলে মুশকিল।  কারণ সেই বই বিক্রিরও কোনো হিসাব প্রকাশকরা লেখককে দেন না, রয়ালিটি তো দূরের কথা। প্রকাশকদের যুক্তি হচ্ছে লেখকের সহায়তা না নিলে টিকে থাকা সম্ভব নয়। যৌথ বিনিয়োগ হলে নিজের ভাগের সবগুলো বই ছাপার সঙ্গে সঙ্গে বুঝে নেওয়া লেখকের জন্য সুবিধাজনক মনে করা হয়। ঢাকার বাংলাবাজারের বেশ কিছু প্রকাশক নতুন লেখকদের বই প্রকাশ করে থাকেন। সেক্ষেত্রে গ্রন্থস্বত্ব কিনে নেওয়া হয় ৫-৬ হাজার টাকায়। স্বত্বটা প্রকাশকের কাছে ১০ বছর থাকে।

তিন. প্রকাশকদের কেউ কেউ সারা বছর এই ‘মুরগি লেখক’ ধরার ফাঁদ পাতেন। চার ফর্মার একটা বইয়ের ২০০ কপি ছাপতে খরচ হয় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। কিন্তু প্রকাশকরা ‘মুরগি লেখকের’ কাছ থেকে নেন লাখ টাকার বেশি। তার ওপর থাকে বই কিনে নেওয়ার শর্ত। বছরে এমন ৫-৭ জন মুরগি লেখক ধরতে পারলেই একজন প্রকাশকের হয়ে যায়। এমন বইয়ের পাশাপাশি প্রকাশক সমাজে নিজেদের মর্যাদা বজায় রাখার জন্য প্রকাশকরা কয়েকজন নামি লেখকের বইও ছাপেন। নামি হলেও তাদের বই বিক্রি হয় হয়তো ৯৫ কপি। মুরগি লেখকের লাভ থেকে, এই ক্ষতিটা প্রকাশকরা পুষিয়ে নেন।

চার. ব্যক্তিগত উদ্যেগে বই প্রকাশ করতে লেখককেই দায়িত্ব নিয়ে প্রকাশকের ভূমিকা পালন করতে হয়। তারপর অনেক সময় বিক্রির কাজটা পর্যন্ত লেখককে করতে হয়। এক্ষেত্রে বাকিতে লাইব্রেরিতে বই দিয়ে আসতে হয়। বই বিক্রি হলে টাকা পাওয়া যায়। বই প্রকাশের পর বিভিন্ন পরিবেশকের কাছে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।

পাঁচ. সম্পাদনা ছাড়া বই কখনো মানের হয় না। উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের পান্ডুলিপিরও সম্পাদনা হয়েছে। অথচ এদেশে অনেক প্রকাশনা সংস্থায়ই সম্পাদনার চর্চা নেই। ফলে দুর্বল বই প্রকাশিত হচ্ছে অনেক। বইয়ের গুণমাত মানের দিকে মনোযোগ দেয়া হচ্ছে না।

ছয়. বাংলাদেশে গ্রন্থনীতিমালা না থাকায় প্রকাশনার ব্যবসা সঠিক নিয়মের মধ্যে চলে না। সংশ্লিষ্টরা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ঘুষ দিয়ে কাজ করেন। সরকারি বরাদ্দ প্রাপ্তরা গ্রন্থ প্রকাশে বিপুল অপচয় এবং চুরির বন্দোবস্ত করেন এবং প্রকাশিতব্য গ্রন্থটির মান বিষয়ে মোটেই সতর্ক থাকেন না। এসব বইয়ের দাম তুলনামূলকভাবে কম হয়ে থাকে। বই কেনার সংকীর্ণ বাজেটের ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্রেতার সাধ সাধ্যকে অতিক্রম করায় পাঠক চড়া দামে নবীন লেখকের বই কিনেন না।

সাত. এখন অনেক প্রকাশক ও লেখক বইয়ের অ্যাপ প্রকাশ করছে।  প্রকাশনা ব্যবসার ক্ষেত্রে এটার প্রভাবকে অস্বীকার করা যাবে না। তারপরও সম্পাদনা (প্রুফ, পেজিনেশন, ডিজাইন), প্লেট, কাগজ, কালি ও মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ এবং বিজ্ঞাপন খাতগুলিতে অনেকে টাকা খরচ করছেন।

আট. আমাদের এখানে অধিকাংশ প্রকাশনাই কোনো চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই হয়ে থাকে। বই পড়া, ক্রয় ও বিক্রয়ের কর্মকাণ্ডটি আমাদের দেশে মুষ্টিমেয় সামর্থ্যবান মানুষের ওপরই নির্ভরশীল। বই মান দেখে বিক্রিও হয় না, বিক্রি হয় হাঙ্গামা দেখে। এ কে খন্দকারের বই যত লোক কিনেছেন, তত লোক কি পড়েছেন?

নয়.  অনেক লেখক গাঁটের পয়সা খরচ করে লেখক হিসেবে নাম ফাটানোর জন্য বইয়ের বিজ্ঞাপন দেন। প্রথম আলোতে একটা ছোটখাটো বিজ্ঞাপন দিতেও হাজার দশেক টাকা লাগে। কিন্তু অনেক লেখক বা প্রকাশক দিনের পর দিন বড় বড় সাইজের বিজ্ঞাপন দেন। প্রথম আলোতে আগাম টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন দিতে হয়। কোনো কোনো লেখকের বিজ্ঞাপনই ছাপা হয় কয়েক লাখ টাকার, কিন্তু রয়্যালিটি পান বড়জোর কয়েক হাজার টাকা।

দশ.  সৃজনশীল ভালো প্রকাশনা অনেক ক্ষেত্রে লাভজনক হয় না। তাই পাঠ্যবই আর টেস্ট পেপার ছাপিয়ে অনেকে টিকে থাকেন। বাংলা বাজার কেন্দ্রিক প্রকাশনা শিল্পর বাণিজ্য মূলত পাঠ্যবই কেন্দ্রিক। মুদ্রণ প্রক্রিয়াটি ব্যয়বহুল, এবং এর মান নিয়ন্ত্রণের জন্যে যে জনবল ও সময় প্রয়োজন হয়, তা অনেকেরই নেই। অর্থ সংকুলান ও ব্যয়-ব্যবস্থাপনা সুসংগঠিত নয়।

এগার. বাংলাদেশে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কিন্তু তাদের বইপড়া কর্মসূচির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আজ প্রকাশনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের মালিক। সবচেয়ে ভালো এবং বিস্তৃত বিপণন চ্যানেল তৈরিকারী প্রতিষ্ঠানটিরও প্রথম দিককার বইগুলোর প্রকাশনাটা  মোটেও লাভজনক ছিল না। এখন  লাভজনক।

বার. প্রকাশকরা অনেকেই পুরোদস্তুর পেশাদার প্রকাশক না হওয়ায় প্রকাশনা শিল্পে বিতরণ ব্যবস্থার অবস্থা শোচনীয়। বাংলাদেশের প্রকাশনাগুলোর মার্কেটিং এবং প্লানিংয়ে দুর্বলতা অনেক।

তের. প্রকাশনা শিল্পের খেলার মাঠটি ইদানিং অসমতল হয়ে উঠেছে। প্রথমা অন্য প্রকাশকদের ব্যবসা সত্যি কঠিন করে দিয়েছে। প্রথমার বইয়ের যে বিজ্ঞাপন প্রথম আলোতে ছাপা হয়, অন্য কোনো লেখক বা প্রকাশকের পক্ষে তার দশ ভাগের এক ভাগও দেওয়া সম্ভব নয়। প্রথমা প্রকাশিত কোনো বই যদি ৫ হাজার বিক্রি হয়, সেই একই বই অন্য কোনো প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হলে পাঁচশও বিকোবে না।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *