নেতা, নেতৃত্ব ও নেতৃত্বের বিকাশ

নেতা মানেই তার কিছু অনুসারী থাকে, অনুসারীদেরকে পরিচালনা করার যোগ্যতা থাকে, লক্ষ্য থাকে। শাব্দিক অর্থে নেতৃত্ব হচ্ছে- চালিত করা, পথ দেখানো ও আদেশ করা। সাধারণ অর্থে নেতৃত্ব হচ্ছে, একজন ব্যক্তি মানুষের নানান গুণাবলীর সমাবেশের মাধ্যমে একটি দলের বা গোষ্ঠীর কিংবা একটি সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সমন্বিত পরিচালনা, কাক্ষিত লক্ষ্যে জনগণকে প্রভাবিত করা ও সিদ্ধান্ত প্রণয়নে কর্তৃত্ব অর্জনের অধিকার ও অনুশীলন।

নেতৃত্বের ৪টি উপাদান হচ্ছে- নেতা, প্রতিষ্ঠান, অনুসারী ও পরিবেশ।প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে সৃষ্টি হওয়া নেতৃত্ব  আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব, একসাথে কাজ করতে গিয়ে অনেকের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া নেতৃত্ব অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্ব। অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্বও দলভুক্তদের উপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তারকারী হন।উৎসাহ ও স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে কাজ আদায় করে ইতিবাচক নেতৃত্ব, ভয়-ভীতি প্রদানের মাধ্যমে কাজ আদায় করে নেয়  নেতিবাচক নেতৃত্ব, ইচ্ছামত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে  স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব, স্নেহ-মমতার মাধ্যমে শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করে কাজ আদায়ের চেষ্টা করে পিতৃসুলভ নেতৃত্ব এবং প্রয়োজনীয় কর্তৃত্ব অধস্তনদের কাছে হস্তান্তর ও অধস্তনদের সাথে পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে নেতৃত্ব প্রদান করা অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব। পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হওয়া এবং  সবাই খুশি না হওয়ার সমস্যাও রয়েছে। লাগামহীন নেতৃত্ব অধস্তনদেরকে লক্ষ নির্ধারণ করে দিয়ে অধস্তনদের কাছে দূরে থাকেন।

নেতার ক্ষমতার উৎস হচ্ছে-আইনানুগ ক্ষমতা, বাধ্য করার ক্ষমতা, পুরস্কৃতকরণের ক্ষমতা, প্রশংসা অর্জনের ক্ষমতা, বিশেষজ্ঞজনিত ক্ষমতা, মানবীয় গুণাবলি বা আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অধস্তনদের মান ও মনোভাব, আনুগত্য ও শৃঙ্খলা এবং প্রতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য।সাংগঠনিক কাঠামোতে পদমর্যাদাগত ক্ষমতা আইনানুগ ক্ষমতা, অধস্তনদের বাধ্য করা বা শাস্তি প্রদানের ক্ষমতা বাধ্য করার ক্ষমতা, দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে অধস্তনদের পদন্নতি বা পুরস্কৃত করা পুরস্কৃতকরণের ক্ষমতা, অন্যের প্রশংসা অর্জনের ক্ষমতা, নেতার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে উচ্চ ধারণার ফলে সৃষ্ট বিশেষজ্ঞজনিত ক্ষমতা, তথ্য আদান-প্রদানের পদ্ধতি ও যোগাযোগের সক্ষমতাজনিত ক্ষমতা, অধস্তনদের যথাযথ মান-যোগ্যতা-দক্ষতা-দৃষ্টিভঙ্গি  ও মনোভাব,  আনুগত্য ও শৃঙ্খলা ও প্রতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য।

নেতার কাজ হচ্ছে- প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণ, উপযুক্ত সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি, কর্মী নির্বাচন ও মানোন্নয়ন, নির্দেশ প্রদান, তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় সাধন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ। অধস্তন জনশক্তি ও কর্মীদের আস্থা সৃষ্টি, দলগত প্রচেষ্টার উন্নয়নের মাধ্য, অধস্তনদের সমানভাবে কাজে লাগানো, প্রেষণা দান ও যোগাযোগ রক্ষা।নেতৃত্বের জন্মগত গুণাবলী হচ্ছে- উচ্চ বংশ হওয়া, মেধাবী হওয়া, সাহসী ও দৃঢ় মনোবল, আমানতদার হওয়া, ধৈর্য ও সংযমী হওয়া, শালীনতা, দয়া ও ক্ষমাশীল হওয়া, শক্তিমত্তা থাকা, স্বভাবজাত আকর্ষণ ও ব্যক্তিত্ব, মানসিক শক্তি, দৃঢ় সংকল্প ও স্থিতিশীলতা, নম্র ও সদ্ব্যবহার, অল্পে তুষ্ট ও ত্যাগী হওয়া, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হওয়া ও দায়-দায়িত্ব গ্রহণের মানসিকতায় থাকা। নেতৃত্বের অর্জিত গুণাবলী হচ্ছে- জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব তথা ধর্মের জ্ঞান, নিজ পেশা ও কাজের সার্বিক জ্ঞান, ভাষা জ্ঞান, ইতিহাস সংক্রান্ত জ্ঞান, সমকালীন দেশ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিজ্ঞানের আবিষ্কার সম্পর্কিত জ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞান ইত্যাদি।

উন্নত আমল ও সাংগঠনিক দক্ষতা তথা সাংগঠনিক শৃংখলা বজায় রাখা, আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন, সাংগঠনিক প্রজ্ঞা, অন্যদের পরিচালনার যোগ্যতা, অফিস ব্যবস্থাপনা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব সৃষ্টির যোগ্যতা, পরামর্শভিত্তিক কাজ করা ও যোগাযোগের দক্ষতা ইত্যাদি।সামাজিক হওয়া মানে অপরের অধিকারকে প্রাধান্য দেয়া ও অপরের প্রতি সদয় হওয়া। এছাড়া বাগ্মিতা ও সময়ানুবর্তিতা তথা সময় হত্যা না করা, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কাজ করা, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর করা, সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করা ও একত্রে অনেক কাজ করা ইত্যাদি।ভারসাম্যপূর্ণ আচরণের মধ্যে রয়েছে- কর্মীদের মাঝে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা, প্রটোকল রক্ষা করা ও স্বজনপ্রীতি না করা। প্রেরণা সৃষ্টির যোগ্যতা ও টার্গেটভিত্তিক কাজ করা।

নেতা বিলাসপ্রিয় হবে না, রাগ-বিদ্বেষভাবে স্বজনপ্রীতি-স্বেচ্ছাচারিতা করবেন না। নেতা হবেন কাজ ও সম্মানের পথ প্রদর্শক, মিতব্যয়ী, দুর্নীতিমুক্ত, নিজস্ব পেশা ও কাজের প্রতি ভালোবাসা থাকবে, গাম্ভীর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী, মহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী। নেতা তার অধস্তন নেতাদের সাথে তিনভাবে যোগাযোগ করবেন- তার দেয়া নির্দেশের মাধ্যমে, তার পাওয়া তথ্যের মাধ্যমে, তার পরিদর্শনের মাধ্যমে। সত্যিকার নেতা তার কৃতকর্মের দায়কে সর্বদাই কাঁধে নিতে প্রস্তুত থাকবেন, সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকবেন, পরিবেশ ও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবেন, শৃঙ্খলা বিধান ও  পরিস্থিতি বিশ্লেষণের যোগ্যতা থাকবে, অবশ্যই জানবেন কখন-কিভাবে-কী করতে হবে।ধৈর্য ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা, দলীয় কারণে প্রচণ্ড আবেগ, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মী বাহিনী গঠন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার ও অন্যকে বোঝার কৌশল।

নেতৃত্বের অভ্যাসগত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- সময় কিভাবে ব্যয় হচ্ছে, ফলাফলের ওপর গুরুত্ব প্রদান, দুর্বলতা দূর করার দিকে নজর দিতে হবে, কতিপয় প্রধান ব্যাপারে পরিশ্রম ও সাধনা কেন্দ্রীভূত করা উচিত যা ভাল ফল দেবে। নেতার নিজস্ব সমস্যা হচ্ছে- নেতৃত্বের অদক্ষতা, অহমিকাবোধ, মাত্রা জ্ঞানের অভাব, দায় এড়ানোর প্রবণতা, অতি আবেগ ও নিরপেক্ষ মনোভাব সংরক্ষণে ব্যর্থতা ইত্যাদি।নেতৃত্ব গঠন পদ্ধতি হচ্ছে- টার্গেট করা, টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে সান্নিধ্যে রেখে যোগ্য করে গড়ে তোলা, দীক্ষা দেওয়া, পূর্ণাঙ্গ দীনের অনুশীলন করানো, জ্ঞান দান করা ও প্রশিক্ষণ দেয়া ইত্যাদি।আত্মত্যাগ, শ্রম ও সাধনার মানসিকতা তৈরি করা; মূর্খতা, সংকীর্ণতা, কৃপণতা, দুনিয়াপ্রীতি, কাপুরুষতা মুক্ত হওয়ার মনন গঠন করা; উদারতা, দানশীলতা, পরকালমুখী চিন্তা ও বীরত্বপূর্ণ মনোভাবসহ মৌলিক মানবীয় গুণাবলীর প্রকাশ ঘটানোর মনন গঠন করা; আন্তরিকতার সাথে ভুল সংশোধন করা, ভালো কাজে উৎসাহ প্রদান ও স্বপ্ন সৃষ্টি করা ইত্যাদি।

নেতৃত্ব হল বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বাসযোগ্যতা, মানবিকতা, সাহস, ও শৃঙ্খলাবোধের বিষয়। সত্যিকারের নেতা নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করেন, অসম্ভবকে সম্ভব করেন, বাস্তববাদী হন, পৃথিবীর সাথে নিজেদের খাপখাইয়ে নেন, দুঃসাহসী হন, পৃথিবীকে পরিবর্তনে কাজ করেন, বাক্সবন্দি বা প্রথাগত চিন্তার বাইরে আসেন, সব সমস্যাকে ভিন্নভাবে বা নতুন করে দেখেন। নেতৃত্ব উত্তরাধিকারের বিষয় নয়, কর্তৃত্বের বিষয় নয়, শুধু হুকুম দেওয়ার ক্ষমতা নয় এবং জোর করে অর্জনও করা যায় না। নেতৃত্ব হল এমন এক সামাজিক প্রভাবের প্রক্রিয়া যার সাহায্যে মানুষ কোনো একটি সর্বজনীন কাজ সম্পন্ন করার জন্য অন্যান্য মানুষের সহায়তা ও সমর্থন লাভ করতে পারে।নেতৃত্ব হল মানুষের জন্য একটি পথ খুলে দেওয়া যাতে তারা কোনো অসাধারণ ঘটনা ঘটানোর ক্ষেত্রে নিজেদের অবদান রাখতে পারে। নেতৃত্ব মানে শুধুই সভায় আলোচ্য বিষয়সূচির প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখানো নয়, নিজে সেই কর্মসূচি স্থির করা, সমস্যা চিহ্নিত করা এবং শুধুই পরিবর্তনের সঙ্গে সামাল দিয়ে না চলে নিজেই এমন পরিবর্তনের সূচনা করা যা উল্লেখযোগ্য উন্নতির পথ প্রশস্ত করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *