নতুন প্রজন্মকে মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলুন

শিশু-কিশোরদের রয়েছে সুন্দরভাবে বাঁচার অধিকার। একজন মানুষ যদি শুধু পেটসর্বস্ব জীব হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে তবে তো পশুর সাথে আকৃতিগত পার্থক্য ছাড়া কোনো পার্থক্যই থাকে না। পশুকে খাবারের জন্য অনেক কষ্ট স্বীকার করতে হয়, কঠিন পরিশ্রম করতে হয়। মৌমাছি ফুলে ফুলে রেণু সংগ্রহ করে। বাঘ সিংহ থেকে শুরু করে পিপীলিকা পর্যন্ত সবারই শিকারের জন্য বেশ ছুটাছুটি করতে হয়, কষ্ট ছাড়া কারোরই খাদ্যলাভ হয় না। তখন সৃষ্টির সেরাজীব মানুষও যদি শুধু শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে উদরপূর্তির ব্যবস্থাটুকু করে ক্ষ্যান্ত হয় তবে তো আমি পশুর সাথে তার কোনো পার্থক্য দেখি না।

ক্ষুধা নিবারণ ও যৌন চাহিদা পূরণ হলেই তো বেঁচে থাকা ও বংশ বিস্তার সম্ভব। কিন্তু কথা হচ্ছে এভাবে বেঁচে থাকার মধ্যে আর পশু-পাখি বা অন্যান্য জীবের বেঁচে থাকার মধ্যে পার্থক্য কী আছে? না-কি নেই? কেননা তারাও তো বাস করে। এখন একজন মানুষের কার্যক্রমও যদি এগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, অন্য কিছু চিন্তা-ভাবনা না করে তবে সে তো পশুদের মতই। সে শ্রেষ্ঠ হল কিভাবে? কেননা শক্তিতে সিংহের সাথে, বাঘ ও বাঙরের সাথে সে পারবে না।

সৌন্দর্যে প্রজাপতি, ফুল, পূর্ণিমার আকাশ আর প্রকৃতির সাথে কতটুকু তুলনা করা যায় মানুষকে। তবে শ্রেষ্ঠত্ব কিসে? বুদ্ধিতে, চিন্তায়, বিবেক ও জ্ঞানে। কিন্তু যদি শারীরিক শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমেই জীবন কাটানো হয়। চিন্তাশক্তি বা বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিকে ব্যবহার না করা হয়, তবে তো সে জীবন বৃথা। অন্যান্য জীবের উপর তার শ্রেষ্ঠত্ব যে কারণে সে ব্যাপারটিই যদি উপেক্ষিত হয় তবে সেটা সাংঘাতিক দুঃখদায়ক ব্যাপার। নতুন প্রজন্মকে উপযুক্ত মানে গড়ে তুলুন।

মানুষকে সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই সম্মিলিত প্রয়াস। শিশু-কিশোরো শারীরিক পরিশ্রম করে পশু পাখির মত খেয়ে বেঁচে থাকবে এটা নিশ্চিত করাই যথেষ্ঠ নয়। বরং তার মেধা, মননশীলতা, প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে হবে। শিক্ষা-দীক্ষায়, চিন্তা- চেতনায়, উন্নত ও জ্ঞানী করে গড়ে তুলতে হবে। এটা না হলে জাতি এগুবে না। কেননা আজকের এ শিশুটি যদি তার মেধা, বুদ্ধির বিকাশের সুযোগ না পায়, তবে সেটি হতে পারে জাতির জন্য বড় ধরণের বিপর্যয়ের কারণ।

যা বয়ে আনবে অভিশাপ। কেননা বলা তো যায় না-জ্ঞানের আলোকে আলোকিত হলে এই শিশুটিই একদিন হয়তোবা মাহাথির মুহাম্মদের মত রাষ্ট্রনায়ক , বড় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক, সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ হতো, হতো ড. মু. ইউনুসের মত নোবেল বিজয়ী। সুতরাং তুচ্ছ করে দেখার তো সুযোগ নেই। একজন মাহাথির মুহাম্মদ একটা জাতির জন্য বড় পাওয়া। অকালে হারিয়ে যাওয়া মেধা, প্রতিভার অপমৃত্যু-এগুলো তো দেশ, জাতি তথা বিশ্বমানবতাকে বঞ্চিত করছে। প্রত্যেকটি শিশু কিশোরই সম্ভাবনাময়। তাদের যত্ন নিতে হবে। উপযুক্ত পরিবেশ, সুযোগ, সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু কি দেখি আমরা? বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র।

এখান থেকে জাতির নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। এখানকার সচেতন (!) মানুষগুলোর চোখের সামনে ও অনেক শিশু শ্রমের ঘটনা ঘটছে, যারা দেশ ও জাতির সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান করবে, সম্ভাবনা চিহ্নিত করে তা বিকশিত করবে তাদের বিবেকই দেখা যায় এক্ষেত্রে নিস্ক্রিয়। শিশুশ্রম তাদের চিন্তাজগতে একটা নাড়া দেয় কি-না সন্দেহ! আসলে ব্যাপারটা জাতির জন্য একটি অশনি সংকেত। সচেতন (!) মানুষদের আচরণ যদি এমন হয় তাহলে অচেতন যারা তারা কি করেন আল¬াহই মালুম। শিশু শ্রমিক যারা যদি তাদের পড়াশুনার ব্যবস্থা করা হত। হতে পারত ওরাও অনেক বড় কিছু।

সুযোগ পেলে ওরাও যে জাতিকে অনেক বড় কিছু দিতে পারত না, ব্যাপারটি এমন নয়। যদি ড. ইউনুস শিক্ষিত না হতেন, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু না করতেন তবে ব্যাপারটি শুধু তার বা তার পরিবারের জন্যই ক্ষতির কারণ হতো না; এটা হতো জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। কেননা তার নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি গোটা জাতির মুখকেই উজ্জ্বল করেছে। এখন ওদের কেউ যে ইউনুসের মত হবে না, নোবেল পাওয়ার উপযোগী মেধা নেই এই গ্যারান্টি কী দেয়া যাবে? কখনোই না। তাহলে ব্যাপারটা কি চিন্তার নয়?

যদি জাতিকে উন্নত করতে হয়, অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হয়, নানাবিধ কল্যাণ ও মঙ্গল হাসিল করতে হয় তবে নবীন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে যোগ্য দক্ষ করে। প্রত্যেক শিশু কিশোরের জন্য শিক্ষা লাভের সুযোগকে নিশ্চিত করতে হবে। যদি আমরা জাতির সদস্যদের শারীরিক শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি, চিন্তা শক্তি ও মনন শক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি তবে জাতির উন্নতি অবশ্যম্ভাবী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *