বিশ্বাসে চাই গভীরতা, কর্মে নয় বৈপরিত্য

মানুষের ভিতরের দ্বিমুখী চেতনা তাকে বাস্তবিক জীবনে বহুরূপী সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করে। বিশ্বাসের প্রতিফলন কর্মে ঘটে। বিশ্বাসের বিভিন্ন মাত্রা বা পর্যায় থাকে। সেজন্যই বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ ব্যক্তিভেদে নানান রূপে ঘটতে দেখা যায়। বিশ্বাসী মন অত্যন্ত শক্তিশালী ।  সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিশ্বাস সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দারুণভাবে ক্রিয়াশীল হয়।

বিশ্বাস অন্তর্নিহিত ব্যাপার। তাই সত্যিকারে বিশ্বাস করা না করার প্রসঙ্গটা প্রমাণিত হতে পারে না । মৌখিক স্বীকৃতি বা ক্রিয়াকর্মকে বিশ্লেষণ করে বিশ্বাসের মাত্রার ব্যাপারে ধারণা করা হয়, তবে সিদ্ধান্তে আসা যায় না।  বিশ্বাস ও কর্মে বৈপরীত্য ব্যক্তিকে উপলব্ধির ব্যাপারকে জটিল করে তুলে। সরল ও জটিল চিন্তার মানুষের পার্থক্য তাদের বাস্তব কাজ-কর্মেই প্রকাশ পায়। যা বলা হয়, যা চিন্তা করা হয়, যা বিশ্বাস করা হয়, যা আশা করা হয়, তার মধ্যে যদি নির্ভরযোগ্য সমন্বয় করা সম্ভব হয় নিঃসন্দেহে তা গ্রহণযোগ্য হবে।

তবে ভেতর এবং বাহিরটা সম্পূর্ণ একই রকম হওয়াটা সবার জন্য মোটেই সহজ নয়। যদি দুটোকেই কাঙ্ক্ষিত ও বাঞ্চিত মানে আনা যায় তবে প্রকৃত মানুষের উপস্থিতিই দৃষ্টিগোচর হবে। বিশ্বাসের বিভিন্ন ধরণ আছে, সূর্য পূর্ব দিকে উঠে পশ্চিম দিকে অস্ত যায়-এটা অবিশ্বাসের কিছু নেই। এটা প্রকাশিত সত্য, ঘটমান দৃষ্টান্ত, চলমান প্রক্রিয়া ও বাস্তব। আমগাছে আম ধরবে, কাঁঠাল গাছে কাঁঠাল ধরবে-তথা প্রকৃতিকে যতটা সহজেই বুঝা যায় মানুষকে অত সহজে বুঝা অসম্ভব। কারণ প্রকৃতি তার স্বাভাবিক নিয়মে চলছে। এটির রূপ পাল্টানোর স্বাধীনতা বা ক্ষমতা নেই। অন্যের হস্তক্ষেপের ফলেই তার বিদ্যমান চলার গতিপথ পাল্টায়।

অতীতে যা ঘটে গেছে তাতে বিশ্বাস যতটা অনায়াসে করা সম্ভব, ভবিষ্যতে কি ঘটবে তাতে বিশ্বাস অতটা সরল প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হতে পারে না। যা আমাদের  কাছে আছে, যা ছিল, যা থাকবে তিনটির সময়ের ব্যবধান ও সংশ্লিষ্ট বাস্তবতা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে নানান প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ভবিষ্যতের বিশ্বাসও সব এক ধরনের নয়। আগামীতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সমুদ্র উপকুলবর্তী অঞ্চল তলিয়ে যেতে পারে-এই বিশ্বাস আর মরার পরও একটি জগৎ আছে এই বিশ্বাস এক নয়। একটিতে অতীত ও বর্তমান বিরাজমান পরিস্থিতিকে যাচাই বাছাই করে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়েছে আর অন্যটিতে কোনো সাধারণ বিদ্যা-বুদ্ধি-যুক্তি-প্রমাণের সুযোগ নেই।

মানুষ যা করে, যা বলে তা যেমন সব সময় নিজে বিশ্বাস করে না আবার যা বিশ্বাস করে তার আলোকেই কাজ-কর্ম সবসময় করে না। অর্থাৎ মাঝে মাঝে বিশ্বাস ও কর্মে যেমন মিল থাকে তেমনি অমিলও থাকে। এখন কথা হলো-‘বিশ্বাস কী নিস্ক্রিয়, নির্জীব বা প্রতিক্রিয়াবিহীন হতে পারে?’ ব্যক্তিবিশেষে এর ভিন্নতার স্বরূপ কি উন্মোচিত হতে পারে? কোনটি দুর্বল বিশ্বাস? শক্তিশালী মানুষের বিশ্বাস শক্তিশালী আর দুর্বল যিনি তার বিশ্বাস দুর্বল-ব্যাপারটা কী এক রকম? বিশ্বাসও ব্যক্তির যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনায় চলে আসতে পারে। অর্থাৎ বিশ্বাস যার মজবুত, গভীর, শক্তিশালী কর্মক্ষেত্রে তার সফলতা তত বেশি।

বিশ্বাসের বসবাস কোথায়? অন্তর বা মনে। সুতরাং বিশ্বাসের রূপ- সৌন্দর্যে  মনের চেহারাকে পাল্টে ফেলে। আবার মনের অবস্থার কারণে বিশ্বাসটারও সুগন্ধি, সৌরভের ব্যপ্তি কমে বাড়ে। অর্থাৎ যে পাত্রে রাখা হচ্ছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। মনটা রাখা যে দেহে সেই দেহের সুস্থতা, অবস্থাও যেমন মনকে প্রভাবিত করে সেই দেহটার পরিবেশ তার প্রভাবও দেহে মনে পড়ে। সুন্দর অস্তিত্ব যে মনের জন্য দরকার সুস্থ-সবল সুন্দর দেহ, আবার শারীরিক প্রশান্তি সুখের জন্যও প্রয়োজন তৃপ্ত, আলোকিত মন।

কাঙ্ক্ষিত দেহ ও মন কাঙ্ক্ষিত পরিবেশেই গড়ে উঠতে পারে। সুতরাং পারিপার্শ্বিকতা, চারপাশের জগৎটাকে এড়িয়ে চলার মতো পশ্চাদপদতা আর নেই। তাই বিশ্বাস বাস্তবতার আলোকে হতে হবে তথা বাস্তবসম্মত হতে হবে। অবাস্তব ও কল্পনাবিলাসী বিশ্বাসের মতো ক্ষতিকর আর কিছু নেই। অপ্রয়োজনীয়, অযৌক্তিক বিশ্বাস জমা করে বিশ্বাসের পাল্লা ভারী করা হবে বোকামী। যে তার বিশ্বাসকে মূল্যায়ন করতে পারে না, সে প্রকৃত বিশ্বাসী নয়।  বিশ্বাসীর কৃতকর্মের ফলাফল ইতিবাচক হলে আত্মবিশ্বাসের যে বৃদ্ধি ঘটে তা অবশ্যই বিশ্বাসের অস্তিত্বকে আরো সজীব ও প্রাণবন্ত করে তোলে।

অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বাস গভীর হলে যেমন কাজে নিয়োজিত হওয়া যায় তেমনি অনেক সময় কাজ করতে করতে বিশ্বাস তৈরি হয়। বিশ্বাস করে শুরু করা কাজ, আর কাজ করতে বিশ্বাস সৃষ্টি হওয়া-এক নয়। বিশ্বাসের মাত্রা বাড়ে আবার কমে। জীবন ও জগৎ এর বিদ্যমান বাস্তবতা যেমন বিশ্বাস সৃষ্টি করে, বিশ্বাসকে ভেঙ্গেও ফলে। পুরাতন বিশ্বাসকে দূরে ঠেলে নতুন বিশ্বাসের সৃষ্টি হয়।

তাই বিশ্বাসের জন্ম-মৃত্যুর খেলার ধরণ সময়ের ব্যবধানে নানান তালে দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্যমান সরবতাকে হাজির করে। তাই কি বিশ্বাস করবে? কিভাবে বিশ্বাস করবে? বিশ্বাসের নানা প্রসঙ্গ এবং ধরণ বা প্রক্রিয়া রয়েছে। বিশ্বাসী হৃদয়গুলো হোক আরো প্রাণচঞ্চল-সুন্দর, দেহগুলো হোক কর্মচঞ্চল, আর পরিবেশটা হোক ভারসাম্যপূর্ণ, উপযোগী । সুন্দর সমাজ গঠনে সুন্দর মনের মানুষ বৃদ্ধি পাক।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *