উদ্দেশ্য বিবেচনায় আনুন, সময়কে কাজে লাগান

একজন মনীষী বলেছিলেন, একজন ব্যক্তি গোটা মানবজাতির কণ্ঠরোধ করলে তার যে অপরাধ হবে গোটা মানবজাতির একজন ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করলে তাদেরও সেই অপরাধ হবে। আসলে সংখ্যাধিক্যের মতামতই সব সময় সঠিক হওয়াটা মোটেই যুক্তিসঙ্গত নয়। আমরা দেখেছি গোটা মানবজাতি একসময় মহানবী (সা) এর বিপক্ষেই ছিল। তিনি একাই এক পক্ষে ছিলেন। কিন্তু তার অবস্থান সঠিক ছিল। ফলে পরবর্তীতে অনেকেই তার পক্ষে চলে এসেছে। গ্যালিলিওকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে।

সমাজ সংস্কারক, বড় বড় মহামানবরা অনেকেই বিরোধীতার সম্মুখীন হয়েছেন, অধিকাংশ মানুষই তাদের বিরোধীতা করেছে, স্বল্প সংখ্যকই করেছেন সমর্থন। গণতন্ত্রে সঙ্কট এখানেই। প্রতিটি নাগরিক ভোটার যদি সজাগ ও দূরদর্শি না হয় তবে তাদের অধিকাংশের মতামতও সম্পূর্ণ ভ্রান্ত হতে পারে। তাই কোন দলের সমর্থক কত বেশি তা দেখে শ্রেষ্ঠত্ব বিচারের যৌক্তিকতা নেই। সবক্ষেত্রে মাথা গুণে হিসাব করে এক প্রকারের মুর্খরা। কেননা জ্ঞানীরা মস্তিষ্কের উর্বরতা ও তার প্রয়োগে ফলাফলটা বিচার করেই মূল্যায়ন করে ব্যক্তিকে। আর দলের আদর্শ, চেতনা, লক্ষ-উদ্দেশ্য, কর্মপদ্ধতি বিবেচনায় এনেই শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করে।

অর্থের জন্য জীবন নাকি জীবনে জন্য অর্থ। অর্থের পিছনে বিরাম-বিরতিহীন ছুটে চলা মানুষের নজরে পরার মত সংখ্যাধিক্য এক্ষেত্রে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি করে। অর্থ উপার্জনের জন্য নয়া নয়া নানা কৌশল আবিষ্কৃত হচ্ছে-যা কারো জন্য সুখপ্রদ হলেও অনেকের জন্য মরণফাঁদ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। অর্থাৎ একটি আয়োজনের ফলে সৃষ্ট প্রভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্রও দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। অর্থের লোভে অনেক সময় বন্ধুও শত্রুতে পরিণত হয়। স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে শত্রুর সাথেও গলাগলি ধরে চলতে আপত্তি থাকে না। আপনজন পর হয়ে যায় আর পর আপন হয়। অর্থের প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও মানুষ জীবনে নানা পদক্ষেপ নেয়। বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। অর্থ প্রেম অনেক মানুষকে মানবিকতা বিবর্জিত যান্ত্রিক মানুষে পরিণত করে। অর্থ উপার্জন বা হাসিলের প্রত্যাশা ব্যক্তিকে সক্রিয়-কাজে-কর্মে গতিশীল রাখে, কর্মতৎপর ও ব্যস্ত রাখে।

প্রত্যাশা অনেক সময় সীমানা ছাড়িয়ে গেলেই বিপদ। মানুষ এত বেশি ভোগ করতে চেয়েছে যে আশা পূরণ করতে গিয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশের বিপর্যয় ডেকে এনে নিজেকে ধ্বংসের মুখোমুখি করেছে। আসলে অর্থ তো জীবনেরই জন্য। সেই জীবনকে বিপন্ন করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রয়াস মারাত্মক ক্ষতিকর নিঃসন্দেহে। অর্থকে মুখ্য ধরে জীবনকে যখন গৌণ জ্ঞান করা হয় তখন সেটা মেনে নেয়াটা বড়ই কঠিন। কেননা অর্থকে সবার উপরে স্থান দেয়া মানেই নিজের জীবন, সময়কে তুচ্ছ জ্ঞান করা। এতে সৃষ্টির অপমান, স্রষ্টার অপমান।

জীবন মানে সময়ের সমষ্টি। এখন সময়ের দাম বেশি নাকি টাকার দাম বেশি? অর্থ-সম্পদ ব্যবহার করে অনেক মানুষে সময়কে, মেধাকে, কিনে নেয়া যায়। অর্থাৎ একজন মানুষ অর্থ শক্তির জোরে আরেক মানুষের কর্মঘণ্টা, সময়কে তথা জীবনকে, জীবনের একটি অংশকে ইচ্ছামতো নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারে। যার অর্থ নেই সে অনেক সংখ্যক মানুষকে ব্যবহার করতে পারেন না। এক্ষেত্রে অর্থ যেহেতু সময়কে কিনে নিতে পারে মনে হয় তাই অনেকে বলতেই পারে অর্থের মূল্যই বেশি। আসলে ব্যাপারটাকে এতটা সরলীকরণ করে ব্যাখ্যা দেয়া যায় না। সময় যদি না থাকে, জীবনই যদি না থাকে তবে টাকা দিয়ে কি করবেন? অনেকে হয়তো বলবেন- যে বেশি দামে বিক্রি হয় সেই বেশি মূল্যবান আর যে যত কম দামে বিক্রি হয় সেই তত বেশি দরিদ্র। প্রশ্ন উঠতেই পারে- সবাই কি বিক্রি হয়? সবাইকে কি টাকায় কেনা যায়?

প্রাণহীন মানুষের কাছে তার অর্থ-সম্পদ, মূল্যহীন বিবেচিত হয়। আমি আপনাকে যত টাকা চান, যত অর্থ চান দেব। আপনি কি আমাকে একজন টমাস আলভা এডিসন কিংবা আলবার্ট আইনস্টাইন দিতে পারবেন? পারবেন না? অর্থাৎ কিছু জীবন, কিছু মানুষের সময়কে অর্থমূল্যে পরিমাপ করা যায় না। এখন কথা হলো, অধিকাংশ মানুষই তার মূল্যবান সময়কে নষ্ট করে। হেলায়-খেলায়-অবহেলায়-অথবা অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যস্ত থেকে সময় কাটায়। আসলে সময়ই জীবন। সুতরাং সময় যার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয় তার জীবনটাই মূল্যহীন। জীবনটাকে যিনি অবমূল্যায়ন করবেন তিনি তো অপমানিত হওয়ার যোগ্য। আর এই নীচু স্তরের মানুষেরাই ৫ টাকাকে যেভাবে দেখেন ৫ মিনিটকে  সেভাবে মূল্যবান মনে করেন না। জীবনের গত হয়ে যাওয়ার আগে প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে অন্তিম মুহূর্তের ৫ মিনিটকে কে কিভাবে দেখেন জানি না। কিন্তু তখন সময়ের মূল্য বুঝে কোনো লাভ হয় না।

আমরা দুই ধরনের মানুষ দেখি। একধরনের মানুষের জীবন ও সময়ের চেয়ে মনে হয় যেন টাকাই বেশি মূল্যবান। তাই টাকার যেমন মায়া, সময়ের প্রতি, জীবনের প্রতি দরদের পরিমাণ অতটা নেই। আবার আরেক ধরনের মানুষের সময়ের দাম, জীবনের দাম বেশি। যাদেরকে অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না, কেনা যায় না। যারা অর্থের বিনিময়ে আরো মানুষের শ্রম, মেধা, সময়কে কিনে নিতে পারেন। যিনি টাকার কাছে নিজের সবকিছু বিক্রি করেন আর যিনি অন্যের জীবন ও সময়কে টাকার বিনিময়ে ক্রয় করে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেন দু’জন সমান নয়। কে শ্রেষ্ঠ সেটি বলছি না তবে কে শক্তিশালী সেটা সহজেই অনুমেয়।

এখন এই দুর্বল মানুষগুলোর দুর্বলতার জন্য কে দায়ী? সে নিজে নাকি অন্য কেউ। অন্য কেউ দায়ী থাকতে পারে তবে সে নিজেও কম দায়ী নয়- এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। নিজের মাথাকে নত যে হতে দেয় সে অপমানিত হবার যোগ্য। তাই নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সচেতন না হয়ে নিজের পরিণতি, অবস্থার জন্য অন্যকে দোষারোপ করে লাভ নেই। আপনার পরিবর্তন না হলে অন্য কারো পরিবর্তন হবে এটা আশা করতে পারলেও দাবী করতে পারবেন না।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *