গ্যাং কালচারের নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

আহসান হাবীব

ঢাকার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বা রিকশায় চলতে চলতে বিভিন্ন দেয়ালে খেয়াল করলেই দেখা যাবে অদ্ভুত সব শব্দ— গ্যাং জিরো জিরো জিরো নাইন, রিক্স জোন, ভাই গ্যাং, নাইট স্টার, ডিসকো বয়েজ, হ্যালো গ্যাং প্রভৃতি। কালো, বেগুনি, নীল মার্কার পেন দিয়ে আনাড়ি আর্টিস্টের মতো বিক্ষিপ্তভাবে এ লেখাগুলো দেখা যায়। বিশেষ করে উত্তরা, গুলশান, ধানমন্ডি এমনকি মিরপুরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় এ ধরনের লেখা দৃশ্যমান। ২০১০ সালের কোনো এক সময় কল্যাণপুর থেকে শ্যামলী যাওয়ার পথে হাতের বামপাশে একমি ভবনের দেয়ালে সর্বপ্রথম এ ধরনের একটি লেখা আমার নজরে আসে। তার পর থেকে ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় এ রকম বহু শব্দ বা নামের লেখা দেখেছি। এখন শুনছি এরা নাকি বিভিন্ন গ্যাং গ্রুপ। নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজে এরা জড়িত। যাদের অধিকাংশের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছরের মধ্যে।

৬ জানুয়ারি উত্তরায় ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণীতে পড়ুয়া শিক্ষার্থী আদনান কবির খুন হয়। তার খুনের কারণ অনুসন্ধানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও সংবাদকর্মীরা এর পেছনে ভয়ঙ্কর গ্যাং কালচারের দায় দেখতে পান। তাদের অনুসন্ধানের আলোকে বিভিন্ন সংবাদপত্র মারফত জানা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এলাকার কিশোররা ফেসবুকে দুটি গ্রুপ গড়ে তোলে। একটি ‘ডিসকো’ গ্রুপ, আরেকটি ‘নাইটস্টার’ গ্রুপ। উত্তরা এলাকার বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে সংবাদ মাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, এর সূত্রপাত দুই বছরেরও আগে। প্রথম দিকে এসব গ্রুপের সদস্য কিশোররা পার্টি করা, দেয়াল লিখন, প্রচণ্ড শব্দে হর্ন বাজানো, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা এবং ক্ষেত্রবিশেষে ধূমপান ও মাদকগ্রহণের কাজে যুক্ত ছিল। কিন্তু প্রায় এক বছর ধরে এরা আধিপত্য বিস্তার, প্রেম ও মাদকসহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিকবার সরাসরি মারামারিতে লিপ্ত হয়েছে, যার সর্বশেষ পরিণতি আদনান কবিরের খুন হওয়া।

এই গ্যাং কালচারের এতটা বিস্তৃতি এবং এটি এত পুরনো একটি বিষয় কিন্তু সাধারণ মানুষের নজরে এত দিনে এল কেন? সাধারণ মানুষের নজরে আসার প্রয়োজনীয়তা আদৌ ছিল কিনা, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কি মনের অজান্তেই তাদের ফোকাস পরিবর্তন করে ফেলেছে, নাকি কোনো অঘটন ঘটার আগে তারা ওই বিষয়ে জানলেও নীরব থাকে। গত কয়েক বছরে সারা দেশে বিভিন্ন সামাজিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটেছে। এর পেছনে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় অবশ্যই একটি কারণ। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও এ সময় স্বাভাবিক ছিল না। বিরোধী দলের প্রতি অধিক মনোযোগ দিতে গিয়ে সামাজিক শৃঙ্খলা ও ভারসাম্য রক্ষায় তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে এই গ্যাং গ্রুপগুলো সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে আসছে, অথচ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

আমরা দেখছি, যখনই কোনো অস্বাভাবিক খুন বা হত্যার ঘটনা ঘটে এবং তা নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে বিতর্ক শুরু হয়, তখন প্রশাসন সে ব্যাপারে সচেতন হয়। তাহলে সচেতনতা তৈরির বিনিময় কি এক বা একাধিক মানুষের জীবন। যদি শুরু থেকেই এ ব্যাপারে প্রশাসন সচেতন থাকত, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে এ নিয়ে উত্কণ্ঠা দেখা দিত না। এখনো অনেকেই এটা বিশ্বাস করেন যে, বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীকে যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া হয়, তাহলে মৃত মানুষ জীবিত করা ছাড়া অনেক কিছুই তারা সম্ভব করতে পারে। প্রশাসনের উচিত সরকার ও সরকারি দলের সুরক্ষা নিশ্চিতের মতো সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্যও চেষ্টা করা।

বর্তমান সময়ে বিশেষ করে নগর প্রেক্ষাপটে মা-বাবা, শিক্ষকমণ্ডলী ও স্কুল প্রশাসকদের একটি বড় উদ্বেগের জায়গা শিশুদের অপরাধ-প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া। গ্যাং কালচারের বিষয়টি সামনে আসার পরে অনেক অভিভাবকেরই এ বিষয়ে চিন্তিত হয়ে পড়া স্বাভাবিক। যখন অভিজাত এলাকার স্কুলগুলোয় এমন গ্যাং গ্রুপ শক্তিশালীভাবে তাদের অবস্থান জানান দেয়, তখন সন্তানদের অভিভাবকদের চিন্তার যথেষ্ট কারণ থাকা স্বাভাবিক। এ রকম গ্যাং গ্রুপে একজন সন্তানের জড়িয়ে পড়ার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমন— প্রথমত. এমন হতে পারে যে, অনেক সময় একজন শিশুর কোনো একটা গ্যাং গ্রুপে যোগ না দিয়ে কিছুই করার থাকে না। তাকে ভয় দেখিয়ে গ্রুপে যোগদানে বাধ্য করা হতে পারে। দ্বিতীয়ত. অন্য কোনো বিপরীত গ্যাং গ্রুপ থেকে নিজেকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য ভিন্ন গ্রুপে যুক্ত হওয়া। তৃতীয়ত. শিশুরা তাদের বন্ধু বা প্রতিবেশী কারো মাধ্যমে এর মধ্যে জড়িয়ে যেতে পারে। চতুর্থত. শিশুদের এমন অনেক সময় থাকে, যখন তারা করার মতো কিছুই খুঁজে পায় না। এমন সময়ে তারা একাকিত্ব দূর করার জন্য কোনো গ্রুপে যুক্ত হতে চায়। পঞ্চমত. শিশুরা সাধারণত চ্যালেঞ্জিং কোনো কিছুতে উত্তেজনা অনুভব করে, এ রকম কিছুতে তারা যুক্ত হতে চায়। ষষ্ঠত. কোনো একটি নির্দিষ্ট গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা একই ফ্যাশনের পোশাক পরিধান করে, বিশেষ ধরনের চুলের কাটিং অনুসরণ করে, কিছু প্রতীকী শব্দ ব্যবহার করে, নির্দিষ্ট এলাকায় আড্ডা দেয়। এগুলো কিশোর মনকে খুব আন্দোলিত করে, যার কারণে শিশু-কিশোররা এসব গ্রুপের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকতে পারে। সর্বোপরি অনেক সময় এ ধরনের গ্রুপের পেছনে বড় কোনো চক্রও কাজ করে, যারা এসব গ্রুপকে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। নগদ অর্থ ও তা খরচ করার লোভ শিশুদের জন্য এড়িয়ে যাওয়া অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে।

এই ভয়ঙ্কর চক্র থেকে নিজের সন্তানকে বের করে আনা বা বিরত রাখার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক সবাইকে আরো সচেতন হওয়া দরকার। প্রত্যেক মা-বাবাই তার সন্তানকে ভালোবাসেন। মা-বাবা যে চাকরি বা ব্যবসা করেন, তা নিজের পরিবারের খরচ বহনের পাশাপাশি সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই। যদি এমন হয় সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য পরিশ্রম করতে গিয়ে সন্তানকে সময় দিতে পারলেন না, আর নিজের সন্তান কোনো অপরাধ চক্রে জড়িয়ে পড়ল, তাতে উভয়েরই ক্ষতি। মা-বাবার উচিত সন্তানদের খেলার সাথি ও বন্ধু হয়ে যাওয়া। বন্ধুত্বের অংশ হিসেবেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় সন্তানের সঙ্গে যুক্ত থাকা। নিজের সন্তান কোথায় যায়, কী করে, কার সঙ্গে মিশে— এসব ব্যাপারে আরো সচেতন হওয়া। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও প্রশাসকদের দায়িত্ব শুধু ক্লাসরুমের ভেতরেই না। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সামাজিক যুক্ততার ব্যাপারে সচেতন করা এবং এসব বিষয়ে খোঁজখবর রাখাও তাদের দায়িত্ব। নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাই সচেতন হলে এ ধরনের যেকোনো সমস্যা থেকে শিশু-কিশোরদের নিরাপদ ভবিষ্যত্ নির্মাণ সম্ভব হবে।

লেখক: নৃবিজ্ঞানের শিক্ষক, গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *