পারিবারিক রুটিন: কী, কেন ও কীভাবে?

দৈনন্দিন রুটিন সব পরিবারকে প্রাত্যহিক কাজগুলো শেষ করতে সাহায্য করে। রুটিনই পারিবারিক বন্ধন নির্মাণ করতে পারে। একটি ভালো রুটিন পরিবারের সব সদস্যের চাহিদা পূরণে সহায়ক।

রুটিনের মূলসূত্র

রুটিন হচ্ছে কীভাবে পরিবারগুলি নিজেদের সংগঠিত করে কাজ সম্পন্ন করতে, একসাথে সময় কাটাতে এবং মজা করতে। প্রতিটি পরিবারের নিজস্ব অনন্য রুটিন আছে। রুটিন পরিবার সদস্যদের জানতে সাহায্য করবে কার কী করা উচিৎ এবং নির্দেশনা দিবে কখন-কীভাবে-কতবার করা উচিৎ।

আপনার পরিবারের কাজ এবং সকালে স্কুল, গোসলের সময়, শয়নকাল, খাবারের সময়, শুভেচ্ছা এবং বিদায়ের সময়ের জন্য প্রাত্যহিক রুটিন থাকতে পারে। গৃহকর্মের জন্য সাপ্তাহিক রুটিন থাকতে পারে। যেমন ধোলাই এবং পরিষ্কার করা। ছুটির দিন এবং যৌথ পরিবারের সবার একত্র হওয়ার অন্যান্য রুটিন থাকতে পারে।

পারিবারিক জীবন প্রায়শই কয়েকটি রুটিনে স্বচ্ছন্দপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই রুটিন শুধু রুটিনই নয় এতে রয়েছে রুটিনের চেয়েও আরো বেশি কিছু। কারণ রুটিনগুলির মাধ্যমে সন্তানরা জানতে পারে আপনার পরিবারে কী গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ রুটিনকে কখনো কখনো অনুষ্ঠান বলা হয়। এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ বিশ্বাস এবং মূল্যবোধকে শক্তিশালী করতে এবং পরিবারের মধ্যে একাত্মতা ও একসাথে থাকার চেতনা গড়তে সাহায্য করে।

দৈনন্দিন রুটিনগুলি স্বাভাবিকভাবে বজায় রাখা শিশুদের জন্য চাপপূর্ণ ঘটনা মেনে নেয়াকে সহজ করে তুলতে পারে। যেমন একটি নতুন সন্তানের জন্ম, বিবাহবিচ্ছেদ, অসুস্থতা বা পরিবারের কোনো সদস্যের মৃত্যু অথবা একটি নতুন শহর বা দেশে স্থানান্তরিত হওয়া ইত্যাদি।

শিশুদের জন্য রুটিন ভালো কেন?

রুটিন অন্যদের চেয়ে কিছু বাচ্চারা বেশি পছন্দ করে এবং তাদেরই রুটিন বেশি প্রয়োজন। সাধারণত রুটিন শিশুদের নিম্নলিখিত সুবিধা দেয়:

নিরাপত্তা এবং একাত্মতা

গৃহে সংগঠিত ও প্রত্যাশিত পরিবেশে বাচ্চা এবং কিশোররা নিরাপদ-নিশ্চিন্ত  বোধ করে। বিশেষ করে চাপের সময় বা বয়:সন্ধিকালসহ দৈহিক বিকাশের কঠিন সময়েও দেখাশোনা করতে সহায়ক রুটিন।

এছাড়াও একসাথে সময় কাটানো ও আনন্দের মাধ্যমে  পারিবারিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করে রুটিন। বিছানায় যাবার আগে বা ফুটবল অনুশীলনের পর হালকা নাস্তা গ্রহণের সময় একসাথে একটি গল্প পড়ায় অংশগ্রহণ আপনি এবং আপনার সন্তানের জন্য একটি বিশেষ সময় হতে পারে।

দক্ষতা এবং দায়িত্ব

পারিবারিক রুটিনানুযায়ী পরিবারের টুকিটাকি কাজে অংশগ্রহণ শিশু এবং কিশোরদের মাঝে দায়িত্ব জ্ঞান এবং সময় ব্যবস্থাপনার মতো কিছু মৌলিক দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করে। এই দক্ষতাগুলো শিশুরা জীবনে ব্যবহার করতে পারবেন।

যখন শিশুরা রুটিন অনুযায়ী তাদের ভাগের কাজগুলো বড়দের কাছ থেকে কম সাহায্য বা তত্ত্বাবধানেই করতে পারে, তখন এটি তাদের আরো স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করে।

সুস্থ অভ্যাস

রুটিন অল্পবয়সী শিশুদের সুস্থ অভ্যাস শেখানোর উপায় হতে পারে, যেমন তাদের দাঁত ব্রাশ করা, নিয়মিত ঔষধ গ্রহণ করা, কিছু ব্যায়াম করা, বা টয়লেট ব্যবহারের পর হাত ধুয়ে ফেলা।

এর অর্থ হল রুটিন শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ যারা নিয়মিত বারবার হাত ধুয়ে ফেলেন তারা হয়তো ঠান্ডা এবং অন্যান্য সাধারণ অসুস্থতায় আক্রান্ত হতে পারেন। এছাড়া রুটিন চাপ কমাতে পারে এবং নিম্ন চাপ শিশুদের পরিপাক ব্যবস্থার জন্যও ভালো।

দৈনিক রুটিন আমাদের দেহঘড়ি চালু রাখতে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ দৈনন্দিন রুটিন বাচ্চাদের শরীরকে ঘুমানোর সময় কখন তা জানায়ে সাহায্য করে।এটি বড় ধরনের সাহায্য করতে পারে যখন শিশুরা কৈশরে পৌঁছে এবং তাদের দেহ ঘড়িগুলি পরিবর্তন হতে শুরু করে।

রুটিন অতিরিক্ত কাজের চাপ থেকে পারিবারিক জীবনকে সহজ করে দিতে পারে। রুটিনে প্রচুর সুবিধা রয়েছে। এটি বাচ্চাদের এবং পিতামাতাকে বিনামূল্যে দেয় খেলার সময়, অবসর ও সৃজনশীল হওয়ার সুযোগ।

বাবা-মার জন্য রুটিন ভালো কেন?

রুটিন তৈরির জন্য কিছু প্রচেষ্টা চালাতে হয়। কিন্তু একবার রুটিন তৈরি করে ফেললে পরে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। রুটিন আপনাকে আপনার দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজগুলি সম্পন্ন করতে সহায়তা করে এবং অন্যান্য কিছু করার জন্যও সময় বের করে দেয়। নিয়মিত এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ রুটিনে আপনি অনুভব করবেন আপনি পিতামাতা হিসেবে ভালো কাজ করছেন। জীবনে যখন ব্যস্ততা বেশি তখনো রুটিন আপনাকে আরো সংগঠিত এবং নিয়ন্ত্রিত হতে সহায়তা করতে পারে, যা আপনার চাপ কমাবে। রুটিন প্রায়ই বিরোধ-বিতর্ক-সিদ্ধান্তহীনতা থেকে মুক্তি দিবে এবং সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। উদাহরণস্বরূপ যদি রোববার রাত হয় পিৎজার রাত  তবে কেউ ডিনারের মেন্যু নিয়ে বিতর্ক করতে পারবে না।

আপনি যদি মনে করেন আপনার সন্তানদের সাথে কাটানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় আপনার নেই তবে আপনার সন্তানরা বিদ্যমান রুটিনগুলিতে আরো বেশি জড়িত হতে পারে কিনা সে সম্পর্কে আপনি ভাবতে পারেন। আপনি কিভাবে আপনার সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করে রুটিন পরিবর্তন করবেন? যদি এমন কিছু কাজ থাকে যা আপনি করতে চান কিন্তু সেজন্য সময় বের করতে পারছেন না, আপনি পরিবারের নিয়মিত রুটিনে সেরকম কিছু কাজ অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন।

একটি ভালো দৈনন্দিন রুটিন কী তৈরি করে?

আপনার কতগুলি বা কত ধরণের রুটিন থাকতে হবে তার কোনো ধরাবাধা নিয়ম নেই। সব পরিবারই ভিন্ন এবং একটি পরিবারের জন্য যেটি ভালো কাজ করে অন্য আরেকটি পরিবারের জন্য সেটি ভালো কাজ নাও করতে পারে। আপনার রুটিন আপনার নিজ পরিবারের প্রয়োজনের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা প্রয়োজন।

একটি কার্যকর রুটিনে তিনটি মূল বৈশিষ্ট্য থাকে:

সুপরিকল্পিত: একটি ভালো রুটিন থেকে প্রত্যেকে তাদের ভূমিকা বুঝতে পারে, তারা কী করতে চায় তা জানে এবং তাদের ভূমিকাকে যৌক্তিক এবং ন্যায্য হিসাবে দেখে। যেমন আপনার বাচ্চারা জানে যে রাতের খাবার পরে ধোয়া এবং শুকানোর পালাক্রমে আসা দায়িত্ব সম্পর্কে।

নিয়মিত: ভালো রুটিন দৈনন্দিন পারিবারিক জীবনের অংশ হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ কাবাব খাবার জন্য শিশুসহ শিশুর দাদা পর্যন্ত সবাইকে রোববার রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

পূর্বাভাসযোগ্য: একটি ভালো রুটিনে একসময়ে একই নির্দেশে  অনেক কিছু ঘটে। যেমন আপনি সবসময় সপ্তাহান্তে স্কুল ইউনিফর্মগুলি  ধুয়ে ফেলেন, আপনি জানেন যে তারা সোমবার সকালে প্রস্তুত হবে।

প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য রুটিন একটি বড় সাহায্যকারী হতে পারে। তারা বাচ্চাদের কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতে পারে যদি বাচ্চারা বোঝে পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেয়া কত কঠিন।

স্কুলে যাওয়ার আগেই ছোট বাচ্চার দৈনন্দিন রুটিন

স্কুলে যাওয়া শুরু করার আগে ছোট বাচ্চার জন্যও দৈনন্দিন রুটিন থাকতে পারে।

সকাল বেলায় প্রস্তুত হওয়া। অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে একসাথে খেলা, হতে পারে খেলার মাঠে। খাবার খাওয়া। একসাথে খেলা ও কথা বলার মাধ্যমে প্রতিদিন সময় কাটানো। বই পড়া বা গল্প বলা। একসাথে বিশ্রামের সময় কাটানো এবং রাতে বিছানায় ঘুমোতে যাওয়া। ছোটদের শয়নকালের রুটিন হতে পারে- দাঁত ব্রাশ করা এবং কাপড় পরিবর্তন করা। ঘুমানোর পূর্বে বিছানা মধ্যে শান্ত সময় কাটানো যেতে পারে একটি বই পড়ে, বিশেষ গান শুনে এবং শুভ রাত্রি বলে চুম্বন করে।

স্কুলগামী শিশুদের দৈনিক রুটিন

স্কুলগামী শিশুদের জন্য আপনার দৈনিক রুটিন থাকতে পারে: সকালে র প্রস্তুতি এবং রাতে বিছানায় যাওয়া, খেলনা গুছানো, সপ্তাহে একবার বা দুইবার স্কুলের পরে অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে একসাথে খেলা, নিয়মিত পকেট মানি নির্দিষ্ট সময় এবং দিনে প্রদান করা, স্কুল শেষের কাজ যেমন শখ বা খেলাধুলা। এছাড়া নানান কাজ যেমন- ডিনার টেবিল সেট করা, থালা-বাসন ধোয়ার গুড়ার প্যাকেট খোলা, কাপড় ধোয়ায় সাহায্য করা বা পোষা প্রাণী যত্ন নেয়া।

স্কুলে বয়সের বাচ্চাদের জন্য এমন একটি দিন থাকতে পারে যেদিন তাকে অন্য কোনো কাজ দেয়া হবে না অনেক সময় খেলার সময় পাবে। ধরুণ সোমবার স্কুলগামী সন্তানকে স্কুলের পরে তার একজন বন্ধুকে বাসায় আমন্ত্রণ জানানোর অনুমতি দেওয়া হবে। হতে পারে বন্ধু ৫টায় আসলো একেবারে ডিনার করে চলে গেলো।

১৩ থেকে ১৯ বছরের বালক-বালিকাদের জন্য দৈনন্দিন রুটিনের ধারনা

১৩ থেকে ১৯ বছরের বালক-বালিকাদের জন্য রুটিন করতে চ্যালেঞ্জ কিছুটা বেশি। এদেরকে রুটিনে অভ্যস্ত  করতে বা মানাতে সম্ভবত আপনাকেও  একটু বেশি নমনীয় হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ এদের জন্য আপনারও ঘুমানোর রুটিন পরিবর্তন করতে হতে পারে বা শিশুদের রুমের পাশে করা কাজগুলি পরিবর্তন করতে হতে পারে। টিনেজারদের জন্য আপনার রুটিন থাকতে পারে: বিছানা বা কাপড় পরিষ্কার করা, কক্ষ গুছানো বা  পরিষ্কার করা, ঘরের কাজ করানো, শখ বা খেলাধুলাসহ স্কুলের পরের কার্যক্রম।

আপনার কিশোর সন্তানের জন্য সপ্তাহে একদিন সন্ধ্যায় রুটিন থাকতে পারে- ঘরের কাজ, খেলাধুলার প্রশিক্ষণ, খাবার পরিবেশন ও ধোয়ার কাজে সাহায্য করা এবং দ্রুত বাড়ির কাজ করার প্রশিক্ষণ দেয়া হতে পারে।

পুরো পরিবার জন্য রুটিনের ধারণা

পুরো পরিবার জন্য রুটিন থাকতে পারে: একসাথে খাবার তৈরি এবং খাওয়া, পরিবারের সাথে সময় কাটানো, যেমন নিয়মিত দুপুরের খাবারের পর হাঁটা বা সিনেমা-নাটক দেখতে বিশেষ রাত। পারিবারিক সভাগুলো করা, দিনশেষে কর্মকাণ্ড নিয়ে কথাবার্তা, পিতামাতার সাথে একের পর একজনের একান্ত সময় ব্যয়, বর্ধিত পরিবার এবং বন্ধুদেরকে একসাথে করা, বিশেষ দিন উদযাপন বা সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *