ভালোবাসায় ভরপুর ভাই-বোনের সম্পর্ক, দৃঢ় বন্ধনে প্রকৃত আনন্দ

আনিসুর রহমান এরশাদ

অনেক বড় ভাই, বন্ধু, বাবার মতো; অনেক বড়বোনও মায়ের মতো। পরিবারে যদি বাবা-মায়ের বিয়োগ-বিচ্ছেদ ঘটে তবে বড় ভাই-বোনই ছোটদের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করে। ছোটভাই যদি বেশি দক্ষ হয়, ভালো গেম খেলে, জোরে দৌড়ায়, ভালো রেজাল্ট করে, সম্মানজনক চাকরি পায় তা’ ভালোলাগে। ছোটবেলায় অন্যদের সাথে মারামারি লাগলে ভাই-বোন হন্তদন্ত হয়ে আগে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে।

পিঠাপিঠি ভাই-বোন থাকলে মিষ্টি দ্বন্ধের শেষ নেই। কে কোন খাটে শুবে, কোন পাশে শুবে, কোন চেয়ার-টেবিলে বসে পড়বে, কোন প্লেটে খাবে তা’ নিয়ে তর্ক-বিতর্কের শেষ নেই। জগতের হেন কোনো তুচ্ছ বিষয় নেই যা সেই বয়সে সেই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হবার অযোগ্য। এমনও হতো যে একজনের প্রয়োজন অথচ আরেকজনের প্রয়োজন নেই- অথচ ঠিকই দু’টোই কিনতে হতো! এমনকি রং থেকে শুরু করে ব্রান্ড সবই এক হতে হতো! চোখে মুখে ঝিলিক দিয়ে যেতো দুষ্টুমি!

দুঃস্বপ্ন দেখে মাঝে মাঝে রাতে ভয় পেয়ে ঘুম থেকে একজন উঠে পড়লে আরেকজনের হাতের স্পর্শে ভয় কেটে যেত। বড় হলে এতো কাছের একজনও আরেকজনকে আশে পাশে পায় না, একেকজন শিক্ষা বা কর্মের জন্য একেদিকে ছুটে যায়, হাতটা ধরতে বড় ইচ্ছে করলেও পাওয়া যায় না। প্রতিযোগিতা চলে-মোড়ক উন্মোচনের পর নতুন সাবান দিয়ে প্রথম গোসল করা নিয়ে, টুথপেস্টের ঢাকনা খোলার পর সেটা দিয়ে প্রথম ব্রাশ করা নিয়ে, বিদেশ থেকে পাঠানো বাবার চিঠির খামে লাগানো ডাকটিকিট সংগ্রহ নিয়ে, নতুন টাকা কিংবা কয়েন সংগ্রহ নিয়ে। জিতে গেলে ভ্রু উঁচু করে একখানা বাঁকা হাসি দেয়া! এইসব পাগলামি ভীষণ স্মার্ট হয়তো বানায় না, বড়দের মাঝে হুলুস্থুলও পরে না; কিন্তু বোনের ঈর্ষাতুর চোখগুলোর হাহাকারের দিকে তাকিয়ে বিজয়ের হাসি দেয়া যায়।

আমি বড় ছিলাম বলে অনেক সময় আম্মুর কথা শুনতে হতো ‘তুমি বড় হয়েছ। ছোট ভাই-বোনদের সাথে এসব করবে না’। অথচ মায়াময় জীবনটা মনে হলে এখনো ভাবতে ইচ্ছে করে- আমি এখনো ছোট। এখনো চোখ বন্ধ করে শুয়ে ভাবতে ইচ্ছে করে ছোট বোন রোজিনা থাকলে কী করত এখন। ভাই পছন্দ করে বলে নানান মুখরোচক আচার বানিয়ে দেয়া, এমনকি অফিস শেষে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হয়ে ঘরমুখী ভাইকে বাজার করার কষ্টটুকুও না দিতে তাঁর নানান কৌশল। এখনো একত্র হলে শৈশব-কৈশরের স্মৃতিচারণ, চেঁচামেচি, দুষ্টুমি কম করা হয় না। আমার এখনো দ্বিধা-দ্বন্ধ আছে নিজের হাতে এটা-সেটা রান্না করার মাতব্বরিটা কি ওর শখের ছিল, নাকি কষ্টের।

ছোটবেলায় বোনের কোনো কথা ও কাজ খুব ভালোলাগলেও বা পছন্দ হলেও বলতাম কিচ্ছু হয়নি। আসলে ওকে ক্ষ্যাপায়ে মজা নিতে মুখে নেতিবাচক কথা বললেও ভেতরে ঠিকই খুশি হতাম। এখন আর বকা দেয়া হয় না, ঝগড়া করা হয় না, রাগ-অভিমানের খেলা চলে না। আসলে অনেক মিস করি ছোট ভাই-বোনদের সাথে করাহইচই, মায়ের ফোলা চোখ, বাবার উদ্বেগ। ছোটবোনের চায়ের স্বাদ এখনো যেন জিহ্বায় লেগে আছে, টেবিলে অকারণেই তর্কের ঝড় কিংবা তুচ্ছ কথায় হাসির রোল এখনো কানে বাজে। ওকে ‘গাধা’ বা ‘বেকুব’ বলার মানে ছিল ওর সরলতায় মুগ্ধতা। ভাই খায়নি বলে নিজের পছন্দের খাবারটিও খাওয়া থেকে বিরত থাকা, ভাইসহ একসাথে খাবার জন্য ক্ষুধা পেটে নিয়ে ঘুমোঘুমো চোখে রাতে অপেক্ষা করায় দেয়া বকুনি আসলে বকা ছিল না। ছিল চাওয়ার চেয়েও পাওয়া বা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি প্রাপ্তিকে সহজে হজম করতে পারার অক্ষমতা বা বোনের আবেগ-অনুভূতির কারণে ওর কষ্ট মেনে নেবার মানসিক শক্তি আমার না থাকা।

বোনের বিয়ে হয়েছে, ছোটভাই আসিকও সংসারী। কেউ আর কিছু একটা বলে জবাব শুনার জন্য অনেকক্ষণ কান পেতে থাকে না, ভাইয়া বাড়িতে আসলে আনন্দের হিল্লোল বহে না। সারা বাড়িটা কী ভীষণ নিঃশব্দ। রাগ ভাঙাতে গালে চুমু খাওয়া, আদর করে চুল টেনে দেয়া, কেঁদে মার কাছে নালিশ করা, অসময়ে রুমে ঢোকার জন্য বকাবকি – আজ আর নেই। বাইরে থেকে বাসায় ফিরে দেখতাম- টেবিলের ওপর এলোমেলো বইয়ের পাহাড় সুন্দরভাবে গুছানো, মেঝেতে থাকা অগোছালো কাপড়ের স্তূপ নেই, বিছানার এলোমেলো চাদরটাও চমৎকার টান টান রুপে। জানতাম এসব কোনো জ্বিন-ভূতের কাজ ছিল না, ছিল ছোটবোনের কাজ। আজ আমার পছন্দের অনেক কিছুই অযত্নে পড়ে থাকে, শখের জিনিসেও ধুলার হালকা আস্তরণ জমে, দেখি না যত্ন করে মুছে দেয়ার ঝোঁক। বেসুরো গান, ঝংকারহীন আবৃত্তি, চেঁচানোর মতো বয়ান হাসিমুখে মনোযোগ দিয়ে শুনে কানের ওপর অত্যাচার মেনে নেয় না কেউ।

কখনো বলা হয় নি ছোটবোন বা ভাইকে ভালোবাসার কথা; অথচ তাদের দুঃখে চোখে ঠিকই পানি চলে আসে, তাদের ছাড়া বাড়িটা শুধু নয় মনটাও একদম নিষ্প্রাণ হয়ে থাকে। এখন রিমোট নিয়ে মারামারি চলে না, লাঞ্চ রেডি করতে দেরি হলেও শাস্তি-তিরস্কার মিলে না। ভাই কিংবা বোনটি কোনোদিন চুপচাপ হয়ে গেলে, কিনে দেয়া কাপড়-জুতা পছন্দ না করলে, খেলতে বা মজা করতে রাজি না হলে, কারো খারাপ ব্যবহারে কষ্ট পেলে- সবার আগেতো ওদের মন ভালো করাটাই গুরুত্ব পেতো। বয়সে বড় মানেই যে বেশি বোঝে, বেশি জানে, বেশি স্বপ্ন দেখে, বেশি স্মার্ট হয়, বেশি বকবক করে, পটিয়ে পটিয়ে আবদার পূরণ করে, গিফট বেশি পায়- এমনটি নয়। তবে একজন বড়ভাইয়ের পক্ষেই সম্ভব হয় নিজে সাধারণ সেট ব্যবহার করেও ছোটভাইকে স্মার্টফোন কিনে দেয়া। আবার একজন বোনই পারে- নিজের হাতখরচের টাকা বাঁচিয়ে, নাস্তা না করে টাকা জমিয়ে ভাইকে নতুন শার্ট-পাঞ্জাবি কিনে দিয়ে চমকে দিতে।

ছোটদের সুবিধে হচ্ছে- আইসক্রিম খেতে ইচ্ছা করছে, ঘর লুডু-সাপ লুডু-পৃথিবী ভ্ৰমণ লুডু খেলতে ইচ্ছে করছে; বড় ভাই কিংবা বোনের কাছে একটু ঘ্যান ঘ্যান করলেই সহজে রাজি করায়ে ফেলতে পারে। বড় ভাই কিংবা বোন যদি টিউশনী-চাকরি বা কিছু করে টাকাটা জোগাড় করতে পারে তাহলে তো আর কথাই নেই; আর না পারলেও বাবার কাছ থেকে আদায় করে দিতে পারে সহজেই। ভাইবোন খেলায় জিতলে ভীষণ খুশি অনুভূত হয়, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলে গর্ব অনুভূত হয়, সাফল্য অর্জন করলে পুরো আনন্দহীন বাড়িটাও ঝলমলে হাসিতে আনন্দময় হয়ে ওঠে। সব মানুষের একই সাথে ভাই-বোন সবসময় থাকে না, আমি সৌভাগ্যবান আমার একটি ছোটভাই ও একটি বড় আদরের ছোটবোন আছে। অবশ্য চাচাতো (কাকাতো-জ্যাঠাতো), মামাতো, খালাতো (মাসিতো), ফুফাতো (পিসিতো) ভাই-বোনও আছে। তবে এ লেখাটি সহোদরদের নিয়েই।

বোন ও ভাই ছোট থাকায় তাদেরকে কম-বেশি আদর করতে পারলেও বড় ভাই-বোন না থাকায় তাদের কাছ থেকে আদর পাওয়া যায়নি। বড় ভাই না থাকায় মিষ্টি অথবা দুষ্টু ভাবী পাইনি, দেবর হিসেবে সুবিধা আদায় করা যায়নি, তালত ভাই-বোনদের সাথে বেশ দুষ্টুমি করাও যায়নি। বড় বোন না থাকায় পাওয়া যায়নি দুলাভাই আর শ্যালক হিসেবে শুনতে হয়নি বিভিন্ন কথা। আমার বড় এক বোন এই পৃথিবীতে এসেছিলেন কিন্তু কয়েকদিন থেকেই পরজগতে চলে যান, পরস্পরের দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ মিলেনি। ছোট বোনের বিয়ে হলেও এখনো মামা হওয়ার আশা পূরণ হয়নি। বড় ভাই হিসেবে নিজে দাদাগিরি দেখানো আর ছোট ভাই-বোনদের গম্ভীর হয়ে থাকা কোনোটাই আমার পছন্দের নয়।

ছোটবেলায় ভাই-বোন একসাথে মিলে হৈচৈ করা, রাতে ঘুমাতে গিয়ে কে কোথায় শোবে তা নিয়ে জল্পনা কল্পনা করার মজাই আলাদা। কেউ বলে তুই বেশি নড়াচড়া করিস আমি তোর পাশে শোব না। কেউ বলে তুই নাক ডাকিস, কেউ বলে এটা, কেউ বলে ওটা- এভাবে পরস্পরের দোষ ধরার প্রতিযোগিতা চলে। ছেলেবেলায় দেখতাম গ্রামে বিয়ে অনুষ্ঠান উপলক্ষে ছোটরা একত্র হলে রাতের অনেকটা সময় কাজিনদের সাথে গল্প করেই কেটে যেতো। কেউ সবার চেয়ে লম্বা হলে তার নাম হতো লম্বু, মোটা হলে মুটকি-মুটকা, চিকন-শুকনো হলে শুটকি। ভাইবোনদের মাঝে যেমন কিছু কমন মিল থাকে, আবার অনেকক্ষেত্রে একেক জনের একেক রুচি হয়। কেউ লম্বা টাই পড়তে চায় তো কেউ নেক টাই; কেউ মাথায় ফুল দিতে চায় তো কেউ টিকলি। এমনকি সম্পত্তির জন্য ভাই বোনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে, ভাই ভাইকে খুন করে এমন ঘটনাও বিরল নয়। কেউ হয়তো ভাবেন- জীবন যাপনের জন্য নয়, জীবন উপভোগের জন্য। ফলে ধীরে ধীরে সম্পর্ক হালকা হয়ে যায়, গল্প-গুজব দূরে থাক দেখা-

বড় ভাইবোনদের জন্য অনেক বেশি আনন্দের বিষয়টি হচ্ছে- তারা ছোটদের রোল মডেল, অনুকরণ যোগ্য ব্যক্তি, অনেক কিছু অনুকরণ করে, অদ্ভুত প্রশ্নের জবাব দিতে হয়। পরিবারে বড় ছেলে-মেয়ে হবার অনুভূতি অসাধারণ- ছোটো কেউ না থাকলে কিন্তু তরাই পরিবারের সবচাইতে ছোটো হতেন। ছোট ভাইয়েরাও বড় হয়ে বড় বড় ভাব ধরে, কিন্তু ছোটো বোনেরা তা করে না। না বলা কথাগুলো ছোটবোনকে বলা যায়, মনের অনেক কথা বলার জন্যই মানুষ খোঁজা লাগে না, তাতে মন হালকা হয়। ছোটবোন থাকলে তার কারণে বন্ধুদের বাড়তি মনোযোগ পান ‍অনেক বড়ভাইয়েরা। মজার কিছু দেখলে চোখে চোখে কথা বলে আলাদা ধরণের আনন্দ নেওয়া যায় শুধুমাত্র ছোট ভাইবোন থাকলেই। মজা নিতে বলতে পারেন ‘তোকে, আমি এ এক আঙুলের সমান দেখেছি’। অনেক ছেলেমানুষি কাজ করা থেকেও নিজেকে বিরত রাখতে পারেন ছোটদের দিকে তাকিয়ে। বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু মা দিচ্ছেন না একা বাইরে যেতে। ছোটবোনকে দেখিয়ে অনায়েসেই বলা যায় ‘ওকে পার্কে নিয়ে যাই’ বা ‘ও আইসক্রিম খেতে চাচ্ছে’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *