আয়নায় নিজের মুখটা দেখুন! বাতির নিচে অন্ধকার নেইতো!

আনিসুর রহমান এরশাদ

আপনার যা কিছু দৃশ্যমান, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু ভেতরে; ফলে ভেতরটাতে নজর দিন, বাহিরটা এমনিতেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। আজ যে আপনার থেকে এগিয়ে তাকে আপনি পেছনে ফেলতে পারবেন না এমনটি নয়; তবে তাকে পেছনে ফেলতে হলে আপনার গতি তার চেয়ে বেশি হতে হবে, গতি সমান বা একই থাকলে অবস্থানের পরিবর্তন সম্ভব নয়।

আপনি অনেক কিছু হারানোর ভয় ছেড়ে শুধুমাত্র যথাযথভাবে সময় ব্যয় করলে অনেক কিছুই আপনা-আপনি আপনার কাছে ধরা দিবে। মনে রাখবেন- আপনার জন্যই সহায়ক এমন কোনো সৃষ্টির থেকেই আপনি ছোট নন; যদি না আপনি নিজের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে গাফিল থাকেন। যতবেশি আপনি অন্যের ওপর পরমুখাপেক্ষি বা নির্ভরশীল হবেন, স্বকীয়তা-নিজস্বতা-স্বতন্ত্রতা বিলীন হয়ে আপনি ততবেশি তার অস্তিত্ব ধারণ করবেন।

যার যেটা নেই তার সেটারই চাহিদা বেশি। যার হুল নেই সে হুল ফুটাবে কী করে! সব হাসিই মিষ্টি নয়, তিক্ত-বিষাক্তও বটে। বিষ দিয়ে মধুর কাজ হয় না, বড়জোর অভিনয় করা যায় মাত্র। চোখে খুব কমই দেখা যায়, বেশি দেখতে মন লাগে। ফলে দেখার ক্ষমতা অনেকক্ষেত্রে চক্ষুষ্মানের চেয়ে অন্ধেরও বেশি হতে পারে।

সম্মান আদায়ের চেয়ে রক্ষা করা ঢের কঠিন! প্রতারকের পথ শয়তানের পথ। কাউকে ঠকিয়েছেন মানে আপনি তার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান- এমনটি নয়। মনে রাখবেন- অনেকক্ষেত্রে বিজয়ের চেয়ে হেরে যাওয়াতেই সার্থকতা লাভ হয়। চারপাশের স্থবিরতা আপনার গতি কমিয়ে দিতে সহায়ক, চারপাশের গতিময়তা আপনার গতিও বাড়িয়ে দিবে। তাই নিজেকে বদলানোর পাশাপাশি চারপাশ তথা পারিপার্শ্বিকতা বদলাতেও উদ্যোগী হোন।

যে যা পাওয়ার যোগ্য তাকে তার চেয়ে কম বা বেশি দেয়া- দু’টোতেই অকল্যাণ; যথাযথ প্রাপ্য দেয়াই বেশি কল্যাণকর। নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন মানুষের পক্ষে- অন্যের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা যতটা সহজ, ইতিবাচক ধারণা পোষণ ততটাই কঠিন। ফেসবুকে লাইক-রিচ-ভিউ কিংবা সালাম-শ্রদ্ধা দিয়ে আপনার জনপ্রিয়তা বিচার হতে পারে, চরিত্র নয়।

অবিবেচক কর্মী বাড়লে দল বড়জোর পানিতে পড়ে; কিন্তু অবিবেচক নেতার বৃদ্ধিতে দল পানিতে ডুবে যায়। মরতে শেখার চেয়ে সঠিকভাবে বাঁচতে শেখা অনেক কঠিন।‍ জগত কোনো খেলার মাঠ নয়, জীবন কোনো খেলা নয়; এখানে সবাইকে হারিয়ে আপনাকেই জিতে আসতে হবে এমন কোনো কথা নেই। সবাইকে জিতিয়ে দিয়েও আপনি বেশি জিততে পারেন। অন্যকে ছোট ভাবলে ‍আপনিই ছোট হবেন, অন্যকে বড় ভাবতে শিখুন- আপনিই বড় হবেন।

সব পথের সন্ধান আপনাকে পেতেই হবে- এমনটা জরুরি নয়; তবে প্রয়োজনীয় পথের সন্ধান অবশ্যই আপনাকে খুঁজে নিতেই হবে। আপনি যত শক্তিমানের সাথে সম্পৃক্ত হবেন, ততই বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবেন। পিছিয়ে থাকা মানে পেছনে থাকা নয়, পিছিয়ে থাকা মানে সামনে এগিয়ে যাবার চেষ্টা সাধনা না করা। গণ্ডি সীমিত-সীমাবদ্ধ-সংক্ষিপ্ত মানেই ভিত্তি মজবুত হবার গ্যারান্টি নয়; ভিত্তি মজবুত হলেই কেবল তা বিস্তৃত পরিসরে জানান দেবার সম্ভাবনাময়।

আপনি মানুষকে যতবেশি ওজন-রং-উচ্চতা দিয়ে মাপতে থাকবেন, আপনার দ্বারা মানুষের ‍ততবেশি অপমান হবে, মানুষের স্রষ্টাকেও ছোট করা হবে। মানুষ এমন যে- মানুষকে বিচার করতে হবে তাই দিয়ে যেজন্য সে মানুষ, অন্য প্রাণি থেকে শ্রেষ্ঠ। সৃষ্টি কর্তৃক সৃষ্টির বিচার শতভাগ পক্ষপাতমুক্ত-নিরপেক্ষ-যথাযথ হওয়া সম্ভব নয়। যে যেটার জন্য দায়ি নয়, তাকে সেটার জন্য তিরস্কৃত বা পুরস্কৃত কোনোটাই করা সমীচীন নয়। আপনি সবসময় যা চাইবেন তাই পাইবেন- এমটি নয়; মাঝেমাঝে যা পাইবেন তাতেও সন্তুষ্ট থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

চারপাশে-আশেপাশে যা আছে তা নিয়েই ব্যস্ত অধিকাংশ মানুষই সাধারণ; যারা দূর ভবিষ্যতকেও দেখতে পারেন তারাই এগিয়ে থাকেন, অসাধারণ বলে বিবেচিত হন। চাহিদা অসীম, প্রাপ্তি সীমিত; তাই চাহিদা বাড়ানোর পেছনে ছুটে প্রাপ্তিকে উপভোগ করার আনন্দ নিতে ভুলে যাবেন না। আপনি নিজের ওপর যতবেশি নিয়ন্ত্রণ হারাবেন, আপনার জীবন তত বেশি অনিশ্চিত ও অনিরাপদ হয়ে উঠবে। আপনি যদি সবাইকে সন্তুষ্ট করতে বা রাখতে চান তবে আপনি নিঃশেষ হয়েও ব্যথিত হবেন, ত্যাগী হলেও অযাচিত যন্ত্রণা-কষ্ট পাবেন; সবাইকে খুশি রাখতে চাওয়া পূরণ হবে না।

অন্য সবার চেয়ে নিজের ব্যাপারে আপনিই বেশি জানেন। তাই আপনি যদি নিজের বিবেকের কাছে পরিচ্ছন্ন থাকেন, তবে পাছে লোকে কিছু বলে ভেবে আপনাকে কাবু হতে হবে না। আপনি নিজেই যদি নিজের সমালোচনা করতে শিখেন, তবে অন্যের যৌক্তিক সমালোচনার তীক্ষ্ন তীর আপনাকে বিদ্ধ করবে না; প্রকৃত নিন্দা-সমালোচনার মুখে আপনাকে পড়তে হবে না। তাই আয়নায় নিজের মুখটা দেখুন। বিবেকের কাঠগড়ায় দাড়ানোর অভ্যস্থতা মানুষের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর পীড়া থেকে আপনাকে মুক্তি দিবে।

কর্মে কে অগ্রসর-অগ্রগামী-এগিয়ে, বুঝতে হলে কার ভুল-ত্রুটি নিয়ে সমালোচনা বেশি হচ্ছে তাকে খুঁজে বের করুন। অধিক নিরাপত্তার জন্য আমরা যখন পরিবেশ-প্রতিবেশ-চারপাশকে অনিরাপদ করছি, তখন অবধারিতভাবে বিদ্যমান ন্যূনতম নিরাপত্তাটুকুও হারিয়ে নিরাপত্তাহীনতা বাড়াচ্ছি। নিকট সুখের জন্য আমরা দূরের দুঃখকেও স্বাগত জানাচ্ছি। কাজের চাইতে প্রদর্শনেচ্ছা যখন প্রবল হতে থাকে, কর্মোদ্দীপনা-পরিশ্রমপ্রিয়তা তখন কমতে থাকে।

পুণ্যবানের নিরবতা পাপীর সরবতার জন্য দায়ি। আপনি কী তারচেয়ে বড় কথা আপনি কতটা ব্যবহারযোগ্য! ব্যবহারিক বা প্রায়োগিক যোগ্যতা বা সময়োপযোগিতা হারালে অনেক মূল্যবান জিনিসও মূল্যহীন হয়ে পড়ে। আপনি যা পেতে চান তার সাথে আপনি যা দিতে চান- তার মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য রাখুন। আপনার জীবন অনেক মূল্যবান, স্রষ্টার সেরা উপহার; তাই জগতের বৈরি বাস্তবতার কাছেও কখনো হেরে যাবেন না। নিজেকে ও নিজের জীবনকেও ভালোবাসুন! প্লিজ!

বিক্ষিপ্ত চিন্তার অগোছালো বাক্যালাপ
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ৯টা, ৩১ জু্লাই ২০১৭
যানজটে পাবলিক বাসে বসে লেখা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *