অর্থবহ জীবন সার্থক চেতনার বিকশিত রুপ

আনিসুর রহমান এরশাদ

ব্যর্থতা মানে কাঙ্ক্ষিত প্রচেষ্টা না করা, লক্ষ্যে না পৌঁছানো। চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেও শিক্ষা লাভ হয়, বাস্তবিক জ্ঞান অর্জন হয়, অভিজ্ঞতা বাড়ে। অলস-অবোধরা জীবনটাকে সার্থক-অর্থপূর্ণ করতে পারে না। উদ্যমী-পরিশ্রমীরা বুঝে জীবন একটাই, যে সময় চলে যায় তা’ আর ফিরে আসে না। ফলে যারা পৃথিবীকে সুন্দর করার ব্রত নিয়ে কাজ করে তারাই প্রকৃতপক্ষে সার্থকতা লাভ করে। জীবন হচ্ছে- চেতনার বিকশিত রুপ, স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ উপহার, একটি পরীক্ষাক্ষেত্র, সদা গতিময়; তাই জীবন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

চলার পথে বাধা আসবেই, বাধাকে অতিক্রমের যোগ্যতাই সফলতার পরিমাপক। স্থবিরতা থেকে আসে হতাশা, আর হতাশা ব্যক্তিগত উন্নয়নের অন্তরায়। মানুষ আচরণ দেখে, মন দেখে না; বাইরে দেখে, ভেতরে দেখে না। অথচ ভেতরে যা আছে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে বাইরে, আর তারই কিঞ্চিৎ চোখে পড়ে মানুষের, বেশিরভাগই প্রকাশ পায় না, যা প্রকাশ পায় তারও ‍অনেক কিছু লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকায় পরিপূর্ণ ধারণা সম্ভবপর হয় না। ফলে এই ভেতরের মানুষটা গুরুত্বপূর্ণ, ভেতরে দেখতে পারাটা গুরুত্বপূর্ণ, নিজেকে নিজে চিনতে পারাটা গুরুত্বপূর্ণ।

পৃথিবীতে আমরা কেউ চিরদিন থাকতে আসিনি। তাই মানুষের নিষ্ঠুরতা মেনে নিয়ে নিরব থাকার চেয়ে প্রতিবাদ করা বেশি সম্মানজনক। যতক্ষণ দেহে প্রাণ আছে সমাজের অবিচার আর অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে লড়ে যেতে হবে। তারুণ্যের জয়গান গাওয়ার মানেই হচ্ছে সমাজ থেকে অন্যায় ও অসুন্দর দূর করতে সক্রিয় কর্মী হওয়া। নিষ্ক্রিয় ও নিরব থেকে ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করাও বোকামি। প্রাণপণে প্রচেষ্টা না চালালে পৃথিবীর জঞ্জাল সরানো দূরে থাক, নিজেকে পরিবর্তন করাই অসম্ভব।

আপনি যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করেন, জুলুম-নির্যাতনের প্রতিরোধে এগিয়ে না আসেন ও বঞ্চিত-নির্যাতিত মানুষের পক্ষে না দাঁড়ান তবে আপনার দ্বারা শোষণহীন সমাজ গড়া অলিক কল্পনা। আপনার মানসিক পরিশুদ্ধতার প্রমাণ আপনার কথায় নয় কাজে রাখতে হবে। যারা শক্তিশালী-ক্ষমতাধরদের অন্যায্য কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হতে পারেন মানবতার পক্ষের শক্তি তারাই। তৈলবাজি-চাটুকারিতার রাজ্যে সব শিশুর বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিতের কথা বলা যতটা আরামপ্রদ, মানুষ-পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সবকিছু বন্ধের কথা বলা সুফলভোগি-স্বার্থান্বেষীদের বিরোধীতার সম্মুখীন হওয়ায় ততটাই তিক্ত।

দুঃখজনকভাবে আমরা অনেক কিছু নিয়ে ভাবলেও নিজেকে নিয়ে ভাবি না, আবার অনেকক্ষেত্রে আমার আমার বলে নিজেকে নিয়ে এত বেশি ব্যস্ত থাকি যে ভুলেই যাই চোখ বন্ধ করলেইতো নিজের দেহ দেখা যায় না। তবে চোখ বন্ধ করলেও নিজের ভাবনা-অনুভূতি-চিন্তা-চেতনা চলতে থাকে। যে নিজের মনের কথা শুনতে পারে, নিজেকে নিয়েও ভাবতে পারে সে অন্যকেও ইচ্ছে করলেই সহজে বুঝতে পারে। ইচ্ছে না থাকলে, স্বপ্ন না থাকলে, চেষ্টা-সাধনা না করলে অস্থিরতায় ভরে যায় জীবন।

আপনার ব্যক্তিত্ব আপনার ভেতরে অবস্থান করে আর চরিত্র দেখা যায়। ফলে শুধু সংশয় প্রকাশ করে বা অভিযোগ করলে আপনার কর্ম বদলাবে না; আপনার লক্ষ্যপানে এগিয়ে যেতে হবে, লেগে থাকতে হবে, পূর্ণ মনোযোগ দিতে হবে। গ্রহণের চেয়ে প্রাপ্তির ইচ্ছা বেশি হলে চলবে না, মনে রাখতে হবে গ্রহণ করতে হলে প্রাপ্তি ছেড়ে দিতে হয়। চিন্তা যার সুন্দর তার মন সুন্দর, যার মন সুন্দর তার কর্ম সুন্দর, যার কর্ম সুন্দর তার জীবন সুন্দর, যার জীবন সুন্দর তার জগৎ সুন্দর। আপনি যেমন ভাবনা মহাশক্তির কাছে পাঠাচ্ছেন, আপনি তেমনই বাস্তবতা ফেরৎ পাবেন।

আপনি যদি প্রশ্ন করতে না পারেন কোনোদিনই জবাব মিলবে না, প্রতিবাদ করতে না পারেন পরিবর্তন হবে না। আপনি যদি অপরাধীর কাছে নত হন, সন্ত্রাসীর ভয়ে মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন, ক্ষমতাবানের বিরাগভাজন হবার আশঙ্কায় স্বেচ্ছা নির্বাসনে যান, ঝামেলা এড়াতে অন্যায় আপদারকে মামা বাড়ির আপদার বলে মেনে নেন তবে আর যাই হোক আপনার দ্বারা কোনো সংস্কার আন্দোলন বা সৃষ্টিশীল সংগ্রাম পরিচালিত হতে পারে না।

ভীরু-কাপুরুষরা নিজেদের কাছে আলো থাকলেও চারপাশের অন্ধকার দূরীকরণে লড়তে পারে না, মনটা সুন্দর হলেও কর্ম সুন্দর রাখার অঙ্গীকার করতে পারে না। প্রবল স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে স্বপ্নচারী হওয়া যায় না, বড়জোর স্বপ্নবিলাসী হওয়া যায়। বঞ্চনাহীন সমাজ সৃষ্টির স্বপ্ন সত্যিকারেই যিনি দেখেন তিনি অলস ও অকর্মণ্য হতে পারেন না। স্বপ্ন দেখা আর বাস্তবে স্বপ্নের সৌধ নির্মাণ করা একই কথা নয়। স্বপ্ন শতভাগ পূরণ হবে এমন নিশ্চয়তা না থাকলেও স্বপ্ন দেখতে হবে এবং স্বপ্ন পূরণে চেষ্টা-সাধনা করতে হবে।

অঙ্গীকার করে পালন না করার চেয়ে অঙ্গীকার না দেয়া ভালো। বিশ্বাসের মূল্য দিতে না পারলে কারো বিশ্বাস অর্জন না করাই উত্তম। যার নিজের কিছুই নেই তার হারানোর ভয়ও নেই। যার যা আছে তাতেই মানসিকভাবে সন্তুষ্ট ও প্রত্যাশায় সীমাবদ্ধ তার উন্নতি-অগ্রগতির কোনো আশা নেই। একবার যদি কেউ পথ হারিয়ে ফেলে তবে পথ খোঁজে নিতে তার যে সময় ব্যয় হবে, সঠিক পথের পথিক সেই সময়েই নতুন পথ তৈরি করতে পারবে। অনেক প্রতিশ্রুতিবান মানুষও বিপথে যাওয়ায় স্বপ্ন পূরণ হয় না, অঙ্কুরিত গোলাপ কুসুমেই ঝরে পড়ে। স্বপ্ন ভঙ্গ হওয়ায় দুর্ভাগ্য বাড়ে হতভাগাদের। তাই সরল থাকুন, সচেতন থাকুন, সতর্ক থাকুন। যেকোনো পথ-পদ্ধতি-উপায়ে সফল হবার মানসিকতা ছেড়ে অর্থবহ কাজ করুন এবং সার্থক জীবন গড়ে তুলুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *