‘সততার চর্চা বাড়ান, প্রতারণা ছাড়ুন’

আনিসুর রহমান এরশাদ

সততার চর্চা সুন্দর জীবন ও আলোকিত সমাজ গড়তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। অভিভাবকর‍া যথাযথভাবে সততা চর্চা করলে সন্তানদেরও সততার ভিত গড়ে ওঠে। একজন পরোপকারি ও ভালো মানুষ হবার জন্যে যে সততা চর্চার কোনো বিকল্প নেই, তা’ বুঝেছি বাবার কাছ থেকে। মানুষ হওয়ার জন্যই সততার চর্চা দরকার, যা আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়তে সহায়ক। যারা সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন, অবৈধ উপার্জন ও লোভ-লালসাকে সংবরণ করেন –তাঁরা জাতির বড় খেদমত করেন। ব্যবসা ক্ষেত্রে ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা বন্ধ হলে, মানুষকে সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মনোভাব থাকলে তা’ সবার জন্যই কল্যাণকর।

ব্যবসায়ীরা টেকসই উৎপাদনে অনন্য ভূমিকা রাখে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের কার্যাবলী সুষ্ঠুভাবে সমাধান করে, উৎপাদনশীল করে তোলে, উন্নয়ন সম্ভাবনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, গ্রাহকের সাথে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে। ব্যবসায়ীরা অন্যের জন্য চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করেন, বেকারত্ব দূরীকরণে ভূমিকা রাখেন, আয়-রোজগার তথা আর্থিক স্বচ্ছলতা অর্জনের পথ প্রশস্ত করেন, কল্যাণকর-মঙ্গলজনক সেবার দ্বার খুলে দেন, মানব সম্পদের উন্নয়ন ঘটান।

ব্যবসায়ের মধ্য দিয়ে জাতির কল্যাণ হয়, অর্থনীতি গতিশীল হয়, প্রয়োজনীয় পণ্য-দ্রব্যের সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় জীবন সুন্দর ও সহজ হয়। ব্যবস্থাপনা, অর্থায়ন, শিক্ষা, গ্রাহক ডিলিং, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বহুবিধ আকার ও ধরণে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয় ব্যবসার মাধ্যমে। সচেতন ব্যবসায়ীরা স্থান, পণ্য, জনগণ, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ইত্যাদি অনেক বিষয়ে জানতে পারেন। এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জীবনকে সমৃদ্ধ করে, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধির বাইরেও তা কাজে লাগে।

কিন্তু খুব কম সংখ্যক ব্যবসায়ী সততার সঙ্গে ব্যবসা করছেন, বেশির ভাগ ব্যবসায়ীই বেশি লাভের জন্য আশ্রয় নিচ্ছেন নানান প্রতারণার। ফলে বিশ্বাসের ওপর চলা ব্যবসা থেকেও ক্রেতাদের আস্থা ওঠে যাচ্ছে । স্বর্ণ ব্যবসায় খাঁটি সোনা বলে ভেজাল সোনা বিক্রি ও ২২ ক্যারেট বলে ১৮ ক্যারেটের সোনা দিয়ে প্রতারণা করা হচ্ছে। সঠিকভাবে স্বর্ণের ক্যারেট মেপে ভোক্তাদের বুঝিয়ে না দেয়ায় ভোক্তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। প্রতারণার মাধমে এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) আইন -২০১৩ পাস হলেও বন্ধ হয়নি প্রতারণা।

ডায়াগনস্টিক ব্যবসায় প্রতারণা চলছে দেশব্যাপী।প্রতিদিন প্রতারিত হচ্ছে শত শত রোগী। পণ্যে ভেজাল দিয়ে, পণ্যমূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি করে ভোক্তাদের পকেট কাটায় ব্যস্ত ব্যবসায়ীরা ব্যবসায়ী নামের কলংক। ভেজাল ঘি কারখানার সন্ধান, ভেজাল সেমাই তৈরি, মসলায় ভুসি-ইটের গুঁড়া মেশানো, দুধে ফরমালিন মিশিয়ে দেদারছে বিক্রি, মুড়িতে রাসায়নিক দ্রব্যের মিশ্রণ প্রভৃতি ভেজাল কারবারের খবর বের হচ্ছে অহরহই। অধিক মুনাফা জুলুম ও দস্যুবৃত্তির পর্যায়ভুক্ত হলেও আপত্তিকর ও ঘৃণ্য এই কাজ দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের নামি-দামি ব্রান্ডের পণ্যেও। বাহারি বিজ্ঞাপন আর ধান্দাবাজ প্রতারক চক্রের কারসাজিতে গ্রাহক-ক্রেতা ঠকলেও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা দুঃখজনক বাস্তবতা। শত নকলের ভীরে এক আসল চেনা বড় দায়! ক্ষতিকারক উপাদানেই তৈরি হচ্ছে মুখরোচক কিংবা নয়ন কেড়ে নেয় এমন পণ্যসামগ্রী।

একদিকে গলাকাটা দাম আর অন্যদিকে ভেজালের দৌরাত্ম্য বাড়ছেই। কয়েকজন বিদেশির প্রতারণার শিকার হয়ে জাল ডলার কিনে বিপুল অঙ্কের অর্থ খুইয়েছেন অনেকে। ই-কমার্সের কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের পণ্য ওয়েবসাইটে দেখতে দেখাচ্ছে খুব ভালো মানের অথচ পণ্য হাতে নেয়ার পর দেখা যাচ্ছে মানসম্মত নয়। এর ফলে ক্রেতারা পরেছে চরম ভুগান্তিতে। অনেক ভুক্তভোগী আছেন যারা ফ্ল্যাট কিনতে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোতে টাকা দিয়েছেন কিন্তু বছরের পর বছর ঘুরিয়েও তাদের প্রাপ্য ফ্ল্যাট তো দূরের কথা পাওনা টাকাটাও ফেরত দিচ্ছে না। শক্তিশালীর ঠকবাজিতে পরাজিত অসহায় ভোক্তভোগী। সস্তায় বিভিন্ন দামী সামগ্রী দেয়ার প্রলোভনে নিরীহ মানুষকে ঠকানো হচ্ছে।

সার ব্যবসায়ীরা সহজ-সরল কৃষকদের সাথে প্রতারণা করে দিনের পর দিন তাদের ঠকিয়ে অধিক দামে সার বিক্রি করছে। অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডারে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে সিলিন্ডার রিফিল করে প্রতারণার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। নগরীতে বিশুদ্ধ খাবার পানি সংকটকে পুঁজি করে মিনারেল ওয়াটারের নামে এই প্রতারণা চলছে। ইন্টারনেট ব্যবসায় প্রতারণা দীর্ঘদিনের। ভেষজ ওষুধের নামে অসাধু ব্যবসায়ী ও তথাকথিত চিকিৎসকেরা ফুটপাত ও দোকানে লতা-পাতা চিকিৎসার নামে প্রতারণা করছেন। গরুর মাংসে মহিষ মিশিয়ে বিক্রির প্রবণতা বাড়ছে। নামি দামি ব্রান্ডের মোড়কেও বিক্রি হচ্ছে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ থেকে শুরু করে প্রসাধনী সামগ্রী, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী। নামি-দামি ব্র্যান্ডের লোগো লাগ‍ালেই অস্বাস্থ্যকর খাবার দ্রব্য স্বাস্থ্যকর হয়ে যায় না, মানহীন পণ্য-দ্রব্য গুণমানের হয়ে যায় না।

গণতন্ত্রেও সততার চর্চা সংশ্লিষ্ট সবার কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। সকল সেক্টরেই সততার চর্চা চলুক সবসময়, সবখানে মানুষ মিথ্যা ও প্রতারনার আশ্রয় নিয়ে স্বার্থ হাসিলের মানসিকতা পরিহার করুক। পূর্ণাঙ্গ আন্তরিকতা ছাড়া সততার সার্বক্ষণিক চর্চা অসম্ভব। সত্যবাদিতা বিশ্বস্ত, আস্থাশীল ও নির্ভরশীল বানায়। মিথ্যাবাদিতা হীনমন্যতা ও দ্বিধা-দ্বন্ধ বাড়ায়, সম্পর্কে ফাটল তৈরি করে, সংকীর্ণতা ও ভীরুতা বাড়ায়। সত্যবাদী মাত্রই স্পষ্টবাদী, সহজ-সরল, উন্নত চারিত্রিক মাধুর্যতা সম্পন্ন, কপটতাহীন।

যিনি সদা সত্য বলেন তিনি প্রতারক হতে পারেন না, অন্যের ক্ষতি করতে পারেন না, স্বার্থপর ও লোভী হতে পারেন না। সততা চর্চার মানেই হচ্ছে- স্বার্থান্বেষণ, আত্মরতি ও স্বার্থপরতার অবসান। মিথ্যাবাদির পক্ষেই কপটতা, ধোঁকাবাজি ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়া সম্ভব। সততার চর্চাকারী সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য লালায়িত থাকেন না, যখন তখন অন্যের সমালোচনায় মুখর হতে পারেন না, নিজেকে সবজান্তা শমসের হিসেবে উপস্থাপন করতেও চান না। তার জন্য কাউকে বিরক্ত হতে হয় না; কারণ তিনি গুরুত্ব দিয়ে শুনেন, হৃদয় দিয়ে মানেন, মগজ দ্বারা চালিত হন। সত্যবাদি মানুষের জন্য কাউকে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয় না, ঋণ দিয়ে টাকা ফেরৎ পেতে দিনের পর দিন তার পেছনে পেছনে ঘুরতে হয় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *