শুধু থার্ড ক্লাস মানুষ দিয়ে ফার্স্ট ক্লাস কাজ হয় না

আনিসুর রহমান এরশাদ

শুধু থার্ড ক্লাস মানুষ দিয়ে ফার্স্ট ক্লাস কাজ করানো যায় না। মানের কাজের জন্য মান-গুণসম্পন্ন মানুষের দরকার হয়। অবশ্য সক্ষম-উপযুক্ত মানুষের সহায়ক শক্তি হিসেবে সাধারণ স্তরের বোধজ্ঞান সম্পন্নরাও ভূমিকা রাখতে পারে। ড্রাইভার ঘুমিয়ে পড়লে যানবাহন ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে এবং যাত্রীদেরও প্রাণহানী ঘটবে। ঠেলাগাড়ি চালক দিয়ে আপনি বিমান চালাতে পারবেন না। তাই স্বপ্ন-সাধ আর সামর্থ্যের মধ্যে ভারসাম্য থাকা অপরিহার্য। কম তেলে মচমচে ভাজা কিংবা কম গুড়ে বেশি মিষ্টি- অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

অযোগ্য মানুষ যে কতটা বিপদজনক তা তাকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব না দিলে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া সম্ভব নয়। তারা দুর্বলকে আশ্রয় করে সবল হতে চান এবং শক্তিমানকে এড়াতে পেরে নিজেকে নিরাপদ ভাবেন। ভীরু কাপুরুষরাই নিজেদের অক্ষমতাকে গোপন রাখতে সক্ষমদের থেকে দূরে থাকতে চান। মান উন্নয়নের দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তির ভুমিকায় মানের যদি আরো অবনতি ঘটে তাহলে কি দুরাবস্থাই না হয়। এরপরও যদি সামর্থ্যবান ব্যক্তিকে অক্ষম প্রমাণের প্রয়াসে তৎপরতা চালানো হয় তা কতই না কুৎসিৎ দেখায়। আমার এক বন্ধু মজা করে বলছিলেন, অযোগ্য বলে কেউ নেই। টিকে থাকার জন্যেও যোগ্যতা দরকার। কেউ বলায় যোগ্য, কেউ লেখায় যোগ্য আর কেউ করায় যোগ্য। আসলে কেউ তৈল দিতে পছন্দ করে, কেউ খাইতে পছন্দ করে। হজমও এক ধরনের যোগ্যতা। ফলে অস্তিত্ব আছে মানেই যোগ্যতা আছে। প্রশ্ন উঠতে পারে যোগ্যতার রকমফের নিয়ে।

এটি বলতে দ্বিধা নেই যে- ন্যায্য ও প্রত্যাশিত প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হলেই মানুষ নিজের অসহায় আক্রোশ অন্যের ওপর বর্তিয়ে দিয়ে আপন মনে কাউকে প্রতিপক্ষ বিবেচনা করে। নিজের অক্ষমতার জন্য নিজের চেয়ে সক্ষম কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়ী করার প্রবণতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিকর। সব সময় নিজের মনকে প্রশ্রয় দিয়ে অন্যের আবেগ-অনুভূতিকে মূল্যহীন ভাবার বিদ্বেষ বৃক্ষের প্রভাব ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিরতা সৃষ্টি করে। তাই সংকীর্ণমনা ও স্বার্থপর না হয়ে উদার হওয়াতেই বৃহত্তর কল্যাণ নিহিত।

মনে রাখতে হবে- চন্দ্র সর্বত্রই চন্দ্র। চন্দ্রের রূপ সর্বত্রই এক। এটির রূপ পাল্টায় না। কিন্তু মানুষ রূপ পাল্টায়। সুবিধার জন্য স্বার্থপরতা ও চতুরতার আশ্রয় নেয়। তাই মানুষ নিয়ে কাজ করা বড়ই কঠিন। এটি সত্য যে শুধু রূপ-সৌন্দর্য আকর্ষণের একমাত্র উপায় নয়। রূপের প্রভাবটা অনেক সময় রহস্যে পরিপূর্ণ থাকে। যে এই রহস্য উন্মোচন করতে পারে সেই গুণের সন্ধান পায়। কেউ রূপের আকর্ষণে সুন্দর হাসির আহ্বানে সহজেই সাড়া দিয়ে পৃথিবীতেই স্বর্গসুখের আশা করে। মানতে দ্বিধা নেই, মানুষের শ্রেষ্ঠ অলংকার হাসি। তবে সব হাসিকেই গ্রহণ করব কি করব না সেটি চিন্তার ব্যাপার। সৃষ্টিশীল মানুষের স্বপ্ন থাকাটা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছার পূর্বশর্ত। এ পূর্বশর্ত যিনি পূরণ করেন তিনি প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী হন। এদের বিশাল চিন্তা ও মুক্তমন অন্যদেরও নতুন প্রেরণায় উজ্জীবিত করে। তাই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিত্ব গঠনে উদারতার প্রয়োজনীয়তা ও সংকীর্ণতামুক্ততার অপরিহার্যতা নি:সন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

জীবনে চলার পথে অনেকের সাথেই পরিচয় হয়। এদের কারো সাথে হয় গভীর বন্ধুত্ব। কিন্তু জীবন সংগ্রামের নিদারুণ বাস্তবতায় কত বন্ধু আসে কত বন্ধু যায়! সত্যিকারের বন্ধুদের সুখে-দুঃখে সর্বযুগে লোকেই পাশে পাওয়া যায়। এই যে বন্ধুর সুখে সুখী হওয়া, বন্ধুর দুঃখে দুঃখী হওয়া, বন্ধুর হাসিমুখ দেখে হাসা,বন্ধুর কান্না ভেজা চোখ দেখে দু’চোখের জল গড়িয়ে পড়া- এসবই অন্যরকম। এমন পবিত্র ও খাঁটি বন্ধুত্বের কথা আমি কেন কেউই কোনো কালেই ভুলতে পারে না। কার কোন পর্যায়ে কত মানুষের সাথে বন্ধুত্ব আছে তা দিয়ে তার ব্যক্তিত্ব পুরোপুরি মাপা না গেলেও কিছুটা আন্দাজ করা যায়। মূল হচ্ছে একত্র হওয়া বা থাকার উদ্দেশ্য নিয়ে। বন্ধুদের মধ্যে দেশপ্রেম থাকার মানেই হচ্ছে শুভ এবং কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকা। নিজস্ব সত্তাকে আবিষ্কার করায় সহায়তাদানকারী আত্মত্যাগীদের প্রতি কৃতজ্ঞ ও বিনয়ী থাকা। সাধারণ মানুষের ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেবার সংগ্রামে আন্তরিকভাবে নিয়োজিত হবার মাধ্যমেই দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। চারপাশের মানুষকে বিপদগ্রস্ত রেখে নিজে আনন্দের সাথে বাঁচতে চাওয়াটাই অমানবিকতা ও স্বার্থপরতা। তাই প্রেম-মানবতাকে মূল্য দিয়ে দুঃখ-কষ্টকে হাসিমুখে বরণ করতে পারা বেশ আনন্দের।

আমরা দেখি- জীবিকার অণ্বেষণে মানুষ অনেক দুর্লঙ্ঘ বাধা অতিক্রম করে, জীবনের ঝুঁকি নেয়, গ্রাম ছেড়ে শহরে কিংবা দেশ ছেড়ে পরদেশেও পাড়ি জমায়, নীতি-নৈতিকতারও বিসর্জন দেয়। প্রয়োজন কোনো বাধা মানে না বলেই ভবন ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও রানা প্লাজায় পোশাক শ্রমিকেরা কাজে আসে। দু’মুঠো খাবার, পিপাসায় জল ও বেঁচে থাকার ন্যূনতম সামগ্রীর প্রাপ্যতার আশায় ঘর ছাড়ে, পরিবার-স্বজন ছেড়ে একাকি জীবন যাপন করে। আবাসস্থলের পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, দৈনন্দিন জীবন এমনকি আচরণেও পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। স্থান থেকে স্থানান্তরে, দেশ থেকে দেশান্তরে মানুষ কর্মসংস্থানের হাতছানিতে প্রলুব্ধ হয়ে যেভাবে যুগ থেকে যুগান্তরে ছুটে চলছে তাতে মনে হয় অনেকের কাছে জীবনের চেয়েও যেন শক্তিশালী হয়ে ওঠছে জীবিকা। জীবিকার বাইরে ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় মানুষ পরিবার-সমাজ-ইতিহাস-ধর্ম এসবের সঙ্গে সম্পর্ককে এড়াতে না পেরে সম্পৃক্ত থাকে। যারা বিশ্বাসে ও আচরণে ভারসাম্যপূর্ণ ও উদার হতে পারেন তারাই মূলতঃ কল্যাণব্রতী হয়ে থাকেন। সঠিক বিশ্বাস মানুষকে সচলতার পথে অগ্রসর করে এবং ভেদবুদ্ধি মুক্ত করে। আর অন্ধ বিশ্বাস বা ভ্রান্ত জীবন-দর্শন মানুষকে বিপথে পরিচালিত করে। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে নয় বরং ধ্বংসাত্মক কাজের মাধ্যমে সুখ প্রাপ্তি মূলত: বিভ্রান্তির ফলেই ঘটে। তাই অন্যকে অসচেতন রেখে সচেতন মানুষের পক্ষেও নিরাপদে ও নিশ্চিন্তে থাকা সম্ভবপর হয় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *