মানবিক দীনতা থেকে উত্তরণে চাই সঠিক প্যারেন্টিং

আনিসুর রহমান এরশাদ

পরিবার-দেশ-জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ সন্তানদের জীবন গঠনে প্রত্যেক পিতা-মাতাই উদ্বিগ্ন, ব্যস্ত, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। ছেলের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য পিতার হাতে হাতকড়া লাগানো হচ্ছে, পিতাকে জেল খেটে পুলিশের বেতের আঘাত সহ্য করতে হচ্ছে। সন্তানের হাতে পিতা-মাতাকে খুন হতে হচ্ছে। মেয়ের অনৈতিক প্রেমের দরুন পিতা-মাতাকে জীবন দিতে হচ্ছে! পরকিয়ার কারণে সাজানো গুছানো সুখের সংসার ভেঙ্গে তছনছ হয়ে যাচ্ছে। ছেলে-মেয়েরা উচ্চ ডিগ্রীধারী ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও পিতা-মাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে বা আশ্রয় কেন্দ্রে বা সরকারের বয়স্ককালীন ভাতা নিয়ে দু’মুঠো ভাতের যোগান দিতে হচ্ছে।

এমতাবস্থায় সঠিক প্যারেন্টিংই জাতিগঠনের মূল সূত্র। একটি পরিবারের মূল প্রাণশক্তি বা চালিকাশক্তি হলো প্যারেন্টিং, যা পরিবারকে যথাযথভাবে কার্যকর বা সক্রিয় রাখে এবং সমাজ মানস গঠনের মূল জায়গাটিতে অবস্থান করে। সমাজ মানসের যথার্থ পরিগঠন, উন্নয়ন ও বিকাশে পরিবার যেমন অগ্রণী ভূমিকা পালন করে; তেমনি এর দৈন্যতা, বিকৃতি, ভাঙন ও বিপর্যয়ও মূলত পরিবার থেকেই শুরু হয়। ঐশীর হাতে তার জন্মদাতা বাবা-মা একসাথে খুন হওয়ার পরও ক্রমবর্ধমান মাদক, অশ্লীলতা ও সহিংসতার ছোবলে তরুণ প্রজন্ম ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যেভাবে সমাজ মানসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অসুস্থতা, অস্থিরতা ও দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ছে তা রোধ করা না গেলে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

অনেকে বলবেন আমরাতো প্যারেন্টিং শব্দের সাথেই পরিচিত ছিলাম না। তারপরও ছেলে-মেয়েদের মধ্য থেকে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বড় আমলা কী হননি? অবশ্যই হয়েছেন। কিন্তু সেই সময়ে হাতে হাতে স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট ছিল না এমনকি মোবাইলও ছিল না। পর্নোগ্রাফি ছিল না। পরকিয়া বা প্রেমের যোগাযোগ সহজ ছিল না। যেহেতু ডিশ-টিভি সহজলভ্য ছিল না; ফলে বই পড়া , ডাক টিকিট সংগ্রহ করা, ফুলের বাগান করা, ফলের গাছ লাগানো, মাছ ধরা, কবুতর ও টিয়া পাখি পালন এসব ছিল ছোটদের শখের বিষয়। এখন যৌথ পরিবার ভেঙ্গে যাওয়ায় জীবন ও জগতের বাস্তবতা সম্পর্কে যতটা না ছেলেমেয়েরা সচেতন হতে পারছে; তারচেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী হচ্ছে রঙিন কল্পনা ও আবেগের জগতের প্রতি।

অনেক প্যারেন্টরা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে বৈধ-অবৈধ বাছ-বিচার না করে ছেলেমেয়েদের প্রতি অত্যধিক ভালোবাসার কারণে অর্থ উপার্জনের নেশায় পাগল থাকে, এমনভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে যা তার বা তার পরিবারের লোকেরা খেয়ে শেষ করতে পারবে না; কিন্তু তারপরও অত্যধিক সম্পদের লোভ ও প্রাচুর্য তাকে ভোগবাদ, দুর্নীতি ও চরিত্রহীনতার দিকে টেনে নেয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হচ্ছে, যাদের জন্য সে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে সেই সন্তান-সন্ততি ও আপনজনরা কিন্তু দুর্নীতিবাজ পিতা-মাতা বা আত্মীয়কে কখনও মন থেকে সম্মান করতে পারে না বরং মনে মনে ঘৃণা করে। সমাজ ও মানুষের ঘৃণাই হচ্ছে এসব লোকদের ভাগ্যলিপি।

পিতা-মাতাদের সতর্ক ও দায়িত্ববান হওয়া প্রয়োজন। মানুষ প্রকৃতিগতভাবে অপরাধপ্রবণ নয়, স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষ ন্যায়ের ওপরই থাকতে চায় কিন্তু পারিপার্শ্বিকতাই তাকে অপরাধ প্রবণ করে তোলে। শুধু হিতোপদেশ নয়, সন্তানদের সাথে কথায় ও কাজের মিলের মাধ্যমে সত্যকে প্রত্যক্ষ করে তুলতে হবে। কথায়-কাজে মিল যদি না থাকে তাহলে সন্তানদের সঠিক পথে চালানোর নৈতিক শক্তি প্যারেন্টরা হারিয়ে ফেলবে। মাদকের ছোবল, পর্ণ, সন্ত্রাস থেকে সন্তানকে বাঁচাতে হলে রোল মডেল হতে হবে পিতা-মাতাকেই। শুধু ক্যারিয়ার গঠন, শুধু অর্থ উপার্জন, উদরপূর্তি ও বৈষয়িক প্রতিপত্তি অর্জনকে শিক্ষার লক্ষ্য না বানিয়ে দেহ, মন ও আত্মার উন্নতির বিষয়টিও নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হতে হবে পিতা-মাতাকেই।

ছেলেমেয়েদের সাথে পিতা-মাতা বা অভিভাবকদের দূরত্ব তৈরি হওয়া মানেই সন্তানদের বিপদে ফেলা। সন্তানের মনের কাছাকাছি থাকতে চাইলে তার সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে, ঝোক-প্রবণতা সম্পর্কে জানতে হবে, সঠিক সময়ে সঠিক উপায়ে যথাযথ পরামর্শ দিতে হবে। সন্তান যাতে বুঝে মা-বাবাই তার বেস্ট ফ্রেন্ড, প্রকৃত বন্ধু, নিঃস্বার্থ বন্ধু, শুভাকাঙ্খী এবং অভিভাবক। ছোট বয়স থেকেই সন্তানের সাথে সময় কাটাতে হবে, সব কথা শোনতে হবে। মাঝে মাঝে গল্প ছলে নিজের মূল্যবোধ, পারিবারিক নিয়মনীতি, সাংস্কৃতিক পরিচয় ইত্যাদি জানিয়ে দিতে হবে। কেবল টাকা খরচ করে দামি-দামি খেলনা কিনে দেয়ার মাঝে স্বার্থকতা নেই। সন্তানের জীবনকে নিবিড়ভাবে স্পর্শ করে, কল্যাণ, জ্ঞানে বোধে, শিক্ষায় রুচিতে তাকে মানবিক দীনতা থেকে উত্তরণের এক পথের ঠিকানা করে দেয়ার মাঝেই প্রকৃত কল্যাণ নিহিত।

নিজের সন্তানকে খাটো করে তুলনা দিবেন না, তার কোনো গুণকেই উপেক্ষা করবেন না। শুধু খুঁত দেখলে শিশুর মনে মারাত্মক চাপ পড়ে, তাই প্রশংসা করুন। ‍অতিরিক্ত উপদেশ দিয়ে সন্তানের কাছে গ্রহণযোগ্যতা কমাবেন না, ভালো শ্রোতা হন, ভুল হলে ‘সরি’ বলুন। টিনএজে পারিবারিকভাবে বিশেষ সময় দিতে হবে, খোঁজ রাখতে হবে সে কাদের সঙ্গে মিশছে। ওর ফ্রেন্ড সার্কেলের গেট-টুগেদার বাড়িতেই করুন, আপনারাও তার বন্ধু হন, বন্ধুদের সঙ্গে কিছুটা সময় দিন। মূল্যবোধ, দেশাত্ববোধ, পারিবারিক বন্ধন, মানবতাবোধে, শিক্ষায় আলোকিত করুন সন্তানকে। তার মধ্যে তাকে অভ্যস্ত করান বেশি বেশি বইপড়া, সৃজনশীল কাজ করতে। গুণী ব্যক্তিদের আদর্শ ও বই তুলে ধরুন তাদের সামনে। কোয়ালিটি টাইম দিন, ভালো-মন্দ বুঝান, মনের কাছাকাছি থাকুন।

আমরা চাই আমাদের সন্তানরা ইভটিজিং করবে না, এসিড নিক্ষেপ কিংবা ধর্ষণের মতো অমানবিক কাজে যুক্ত হবে না, জঙ্গি হয়ে মানুষের গলাকেটে রক্তের লাল বন্যা দেখে জীবনের সার্থকতা খুঁজবে না। আর এজন্য দরকার সঠিক পারিবারিক শিক্ষা। পারিবারিক শিক্ষা সঠিক হলে সে রাজনীতি করলেও গাড়ি পুড়াবে না, পদোন্নতির জন্য অন্যায়কে ন্যায় বলবে না, সাফল্যের জন্য মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নিবে না; অশ্লীলতা-মাদক-নৃশংসতা কে ঘৃণা ভরেই প্রত্যাখ্যান করবে। সঠিক প্যারেন্টিং ছাড়া সুশিক্ষিত-ভদ্র-নম্র-বিনয়ী মানুষ গড়ে উঠা বর্তমান সময়ে স্বাভাবিক নয়। আসুুন, আমরা প্যারেন্টরা সন্তানকে কোয়ালিটি টাইম দেই এবং একটি কাঙ্ক্ষিত মানের প্রজন্ম গড়ে তুলি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *