ব্যক্তিত্ব বিকাশে পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

আনিসুর রহমান এরশাদ

সামাজিকীকরণের মাধ্যমগুলোর মধ্যে পরিবারের ভূমিকাই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়ে থাকে, শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথে বংশগতি কাঁচামাল জোগায়, সংস্কৃতি নকশা জোগায় এবং পরিবারে পিতা-মাতা কারিগর হিসেবে কাজ করেন। কারণ শিশুর দৈহিক, মানসিক, পার্থিব ও অপার্থিক যাবতীয় প্রয়োজন মেটায় পরিবার। কীভাবে কথা বলতে হবে, নিজের আবেগ কীভাবে প্রকাশ করা যায়, তা শিশু পরিবার থেকে শিক্ষালাভ করে। পরিবারেই শিশু তার চিন্তা, আবেগ ও কর্মের অভ্যাস গঠন করে। পরিবারেই তৈরি হয় ব্যক্তিত্ববান কিংবা ব্যক্তিত্বহীন মানুষ।

ব্যক্তিত্ব হল-কার্যকরী সম্পদ, সাফল্যের চাবীকাঠি, চৌম্বক শক্তি, অগ্রণী শক্তি, এগিয়ে নেয়ার শক্তি,মানুষের চালনা শক্তি, একটি আদর্শ, একটি দর্শন, চারিত্রিক গুণাবলী । অন্যের সঙ্গে কীভাবে মিশতে হবে, চালচলন বা ভাবভঙ্গী কেমন হবে- এসব শিক্ষা প্রথম পরিবার থেকেই শুরু হয়। মা-বাবা এবং চারপাশের পরিবেশ থেকে কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক এসব সঠিকভাবে শেখার ফলে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিত্ব সহজেই গড়ে ওঠে। মৌলিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে কোনও সমস্যা দেখা দেয়ার ফলে শুধু ব্যক্তির নিজেরই নয়, আশেপাশের লোকদেরও সমস্যা দেখা দেয়।

ব্যক্তি জীবনের ব্যক্তিত্বের সীমারেখা নির্ধারিত হয় কথাবার্তায়, আচার-আচরণে, চালচলনে, ধ্যান-ধারণায় ও মন-মানসিকতায়। ব্যক্তিত্বহীনদের আত্ম-নিয়ন্ত্রণ থাকে না, আত্ম-নির্ভরশীল হতে পারে না, পরনির্ভরশীল হয়ে পরে; আত্ম-জ্ঞান, আত্ম-শিক্ষা, আত্ম-উপলব্দি থাকে না; আত্ম-বিশ্লেষণ, আত্ম-সমালোচনা, আত্ম-জিজ্ঞাসা ও আত্ম-শুদ্ধি করতে পারে না; আত্ম-ত্যাগের মন-মানসিকতা হারিয়ে ফেলে; আত্ম-সম্মান করে না, মানবতা লোপ পায়, ইচ্ছা-স্বপ্ন-লক্ষ্য হারায়, ভয় পায়, হীনমন্যতায় ভোগে, কর্মদক্ষতা হারায়, ব্যর্থ হয়। ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন সুনাগরিকরা শালীন ভাষা ব্যবহার করে, সবাইকে তার প্রাপ্য সম্মান দেয়, মার্জিত ও স্বাভাবিক আচার আচরণ করে, ক্রোধ-উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখে, আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা গড়ে তোলে, অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে না, কথা বলার সময় সুন্দর সুন্দর ভাষা ব্যবহার করে,পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মার্জিত পোশাক পরিধান করে, হাসি মুখে কথা বলে,অতিরিক্ত কথা বলা থেকে বিরত থাকে, যেখানে যেমন যথাযথ তেমন থাকে, চরিত্রবান হয়, ইতিবাচক চিন্তা করে, বাঁকা বা জটিল কথা বলে না, অন্যের কাজকর্মের প্রশংসা করে এবং ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে।

ফলে ব্যক্তিত্ব গঠন একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। পারিবারিক শিক্ষা বা সংস্কৃতিই ব্যক্তিত্ব গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অস্বাভাবিক ব্যবহার ও চালচলন, অন্যকে ঠকানো, অন্যকে সহজে অবিশ্বাস করা, অসামাজিক কাজ করা, নিজের স্বার্থে অন্যকে সুকৌশলে পরিচালনা করা হচ্ছে ব্যক্তিত্বের বিকার। বিকারগ্রস্থ ব্যক্তিরা নিজের স্বার্থের জন্য পরের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেন, যেকোনো মূল্যে নিজের সুযোগ-সুবিধা আদায় করার পক্ষপাতী হন, আশেপাশের লোকজনের প্রতি উদাসীন এবং পরের অধিকারকে উপেক্ষাসুলভ মানসিকতা থাকে। পরিবারে বড়রা যদি খামখেয়ালী, নাটকীয় এবং আবেগপ্রবণ ব্যবহার করে; দুশ্চিন্তাগ্রস্থ এবং ভয়ার্ত ব্যবহার করে তবে ছোটরাও এমনভাবে বেড়ে উঠবে যে-লোকজনের সাথে মানিয়ে নিতে পারবে না, পরিবর্তিত জীবনযাত্রায় মানিয়ে নিতে সমস্যা হবে, নিজের দোষ বুঝতে পারবে না, অতি আগ্রহী কিংবা সম্পুর্ণ উদাসীন মনোভাব পোষণ করবে, অন্যের সমস্যা হচ্ছে তা বোঝার পরেও নিজের চালচলন পাল্টাতে পারবে না। ফলে সচেতন থাকতে হবে- যাতে ছোটবেলায় বিভিন্ন দুর্ব্যবহার, অত্যাচার, হিংসাজনিত মানসিক আঘাত না পায়।

পরিবারে ভালোবাসাপূর্ণ বা সুস্থ সম্পর্কে বড় না হলে বাচ্চাদের সবার সাথে মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়, আবেগজনিত সমস্যায় ভুগে, মনমত না হলে নিজের ক্ষতি করার চেষ্টাও করে, অঝথা দুশ্চিন্তা করে। নেতিবাচক দিকটা সে সহজে আয়ত্ব করে। একজন শিশুর সামনে কেউ মিথ্যা বললে, ঝগড়া করলে, গালি দিলে খুব সহজেই শিশু শিখে ফেলে। কিন্তু প্রয়োজনীয় পড়া, আচরণ মাতা-পিতা ও পরিবারের অন্যরা কষ্ট করে শেখাতে হয়। তাই একজন শিশুর শিক্ষা, জ্ঞান ও ব্যক্তিত্বের বিকাশে পরিবারের গুরুজনদের ভূমিকাই প্রধান। পারিবারিক শিক্ষা শিশুর চরিত্র, আচরণ ও ব্যক্তিত্ব গঠনের ভিত্তি। তাই পরিবারের বড়দের দায়িত্বই হচ্ছে ছোটদেরকে সচেতন-বিবেকবান-রুচিবান-ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী সম্পন্ন করে গড়ে তোলা। ছোটবেলা থেকে ব্যক্তিত্বহীনভাবে বেড়ে উঠলে, পরবর্তীতে স্বভাব-অভ্যাস-চরিত্র পাল্টানো খুবই কঠিন।

হাঁসের ছানা জন্মের পর পানিতে সাতার কাটতে পারে। মুরগির ছানা জন্মের পর দৌড়াতে পারে। গরু-ছাগলের ছানা জন্মের পর লাফালাফি করতে পারে। কিন্তু মানবসন্তানের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হবার কারণ, মা ও সন্তানের মধ্যে এবং পাশাপাশি পরিবারের অন্যদের সঙ্গে শ্রদ্ধা-ভালোবাসার এক শক্তিশালী বন্ধন তৈরি করা। মানুষের অনুভব-অনুভূতির (চরম দুঃখ-ভালোবাসা, হতাশা-অশান্তি) মতো শক্তিশালী অনুভূতি অন্যকোনো প্রাণীর নেই। একটি শিশু তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অনুকরণ করে, তাই পরিবারের সদস্যদের দায়িত্ব-কর্তব্য হচ্ছে- সন্তানের সামনে ঝগড়া-ঝাটি না করা, নেশা না করা,খারাপ ভাষায় কথা না বলা, শিশুদের আদর্শ ব্যক্তিদের জীবনী অনুসরণ করতে অনুপ্রেরণা যোগানো, সামাজিক নিয়ম-কানুন শেখানো ইত্যাদি। পারিবারিক এসব চর্চা সন্তানের নীতি আদর্শ শিক্ষায় অনুপ্রাণিত করবে।

শিশুর দেহ-মনের পূর্ণ বিকাশের জন্য আনন্দ, ভালোবাসা ও সমঝোতাপূর্ণ পরিবেশে তাকে বেড়ে উঠতে দিতে হবে। পরিবারে ধর্মীয় রীতিনীতি, নৈতিকতা, সততা এসব বিষয় শেখাতে হবে। শিশুর সম্ভাব্য সর্বোত্তম চাহিদা পূরণে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিশুর সফলতার প্রশংসা করতে হবে।শিশুর অকৃতকার্যতার বিষয়গুলো বড় করে তুলে ধরলে শিশু হীনমন্যতায় ভুগবে। পরিবারে ছোটরা বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ছোটদের প্রতি বড়রা আন্তরিক হলে — তা থেকেই শিশুরা এসব গুণাবলি অর্জন করবে। শিশুর শিক্ষার ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। শিশুকে গালমন্দ বা তিরস্কার করা যাবে না। “তোমার দ্বারা কিছু হবে না” এমন নেতিবাচক বাক্যও শিশুকে বলা যাবে না। শিশুর মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ, শৃঙ্খলা ও সংস্কৃতিচর্চার জন্য উপদেশমূলক ও শিক্ষামূলক গল্প -ছড়া শোনাতে হবে।

একটি শিশু যখন আমি-তুমি সম্পর্ক, নিজের নাম অথবা সকল বস্তু বা ব্যক্তির নাম সম্পর্কে কৌতুহলী হয় তখন থেকেই তাকে হ্যা-না, ভাল-মন্দ, সুন্দর-অসুন্দরের ধারণাকে সুস্পষ্ট করে দেয়া মায়ের কর্তব্য। শিশু মায়ের পছন্দের বিষয়গুলোকে বারবার করতে পছন্দ করে, উৎসাহিত হয় এবং অপছন্দের বিষয়গুলো করে না। তাই মাকে ভাল-মন্দের বিচার করে শিশুকে বুঝিয়ে দিতে হবে তাঁর পছন্দ ও অপছন্দের বিষয়। মায়ের আচরণ যদি মার্জিত হয় তাহলে শিশুর ক্ষেত্রে মার্জিত ও শিষ্ট আচরণ আশা করা যায়। দৈনন্দিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে মাকে খোলাখুলি, সহজ ও অকপট হতে হবে, এমন কি আদর, ভালোবাসার কথাগুলিও সুন্দর করে গুছিয়ে বলতে হবে। মাকে শিশুর ব্যক্তিত্বগঠন ও শিষ্ট আচরণ শেখাতে হবে।

পরিবারে শিশুর চরিত্রের ভিত্তিপ্রস্তর রচিত হয়। ছোটবেলা থেকেই ব্যক্তিত্ব অর্জনের ফলে – সমস্ত বাধা, ভয়, হীনমন্যতা, দুশ্চিন্তা, সন্দেহ, ঘৃণা, ঈর্ষা, হতাশা, ক্ষতি, ব্যর্থতা, কদর্যতা, তিক্ততা, কষ্ট, অশান্তি ইত্যাদি দূর করা বা জয় করা যায়। ব্যক্তিত্বের শক্তি প্রয়োজনের সময় কর্তৃত্বের অবস্থা দান করে। ব্যক্তিত্ব অর্জনের মাধ্যমে-গ্রহণযোগ্যতা লাভ করা যায়, প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়, প্রভাব বিস্তার করা যায়, নেতৃত্ব দেয়া যায়, জনপ্রিয় হওয়া যায়, খ্যতি লাভ হয়, সাফল্য পাওয়া যায়, শ্রদ্ধা পাওয়া যায়, ক্ষমতা দখল করা যায়, বন্ধু লাভে সহায়ক হয়, বেচে থাকার আনন্দ পাওয়া যায়, নিজেকে জানা/ আবিষ্কার করা যায়, অন্ধভাবে ভুল করার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তাই আসুন ব্যক্তিত্ব বিকাশের সফল কেন্দ্র হিসেবে পরিবারকে গড়ে তুলি; পরিবার হোক ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ গড়ার সর্বোত্তম জায়গা। ব্যক্তিত্ব বিকাশে পরিবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণই শুধু নয়, পরিবারের কোনো বিকল্পই নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *