ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধ জলাঞ্জলি দেয় মুনাফিক!

আনিসুর রহমান এরশাদ

মুনাফিক মানেই প্রতারক বা “ভন্ড ধার্মিক” ব্যক্তি। মুনাফিকের চিহ্ন চারটি- ১. যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে ২. যখন অঙ্গীকার করে, তা ভঙ্গ করে ৩. বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালাগালি করে এবং ৪. আমানতের খেয়ানত করে। মুনাফিককে বিশ্বাস করে কিছু দিলে, সে সেটা ফেরত দেয় না। মুনাফিকি তথা কপটতা একটি মারাত্মক রোগ। এ ব্যাধির ক্ষতিকর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। মানুষের মনকে কলুষিত করার যত রকম ব্যাধি আছে তন্মধ্যে মুনাফিকী অন্যতম বড় ব্যাধি।

মুনাফিকের রুপ দুই, সুযোগ সুবিধা মতো রুপ পাল্টায় তাকে বুঝাটা বেশ দুর্বোধ্য। একজন ঘসেটি বেগম কিংবা মীর জাফর ছাড়া কেউ বড় ধরনের ক্ষতি সহজে করে উঠতে পারে না। ফলে মুনাফিকের সমাজে আস্থা ও বিশ্বাস দুরাশা। আন্তরিকতা, ক্ষমাশীলতা ও সরলতা মুনাফিকের জন্যে আনন্দের আর শয়তানের জন্যে তৃপ্তির। আপনি কে হিন্দু, কে মুসলিম, কে খ্রিস্টান তা আলাদা করতে পারবেন নাম-পোষাক-জীবন যাপন দেখে; তবে কে মুনাফিক তা আলাদা অত সহজে করতে পারবেন না। আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে সব সময় চেনা না গেলেও সময়ের সাথে সাথে তাদের স্বরুপ উন্মোচিত হয় এটা সত্যি তবে এটা সবাই ভালোভাবে বুঝতে পারে না।

মুনাফিক কিভাবে চেনা যায়? যখন দেখবেন- কেউ যা লিখছেন কিংবা বলছেন কাজে তা করছেন না। কিংবা যা ভাবছেন তা বিশ্বাস করছেন না অর্থাৎ একধরনের দ্বৈততা বিরাজ করছে, একধরণের দ্বি-চারিতা আছে। সুযোগ বুঝে এরা প্রতিশ্রুতি দেন আবার সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না। সে নারী নাকি পুরুষ, শিক্ষিত নাকি অশিক্ষিত, গ্রামে থাকে নাকি শহরে থাকে, কিশোর নাকি বৃদ্ধ, রাজনীতিবিদ নাকি ব্যবসায়ী সেটি বড় কথা নয় বড় কথা হচ্ছে যে যত বেশি মিথ্যা বলতে পারেন তিনি তত বড়মাপের মুনাফিক। মানসিক দ্বৈততার ব্যাপারটা কর্মে স্পষ্ট হয়। মুনাফিক ঘৃণিতও হতে পারে আবার অভিনন্দিত হতে পারে তবে মুনাফিক প্রকৃত মানুষ হতে পারে না। যে অন্যকে ঠকায়ে আনন্দ পায়, অন্যকে প্রতারিত করতে পেরে তৃপ্তির ঢেকুর গিলে সে আর যাই হোক সত্যিকারের মানুষ নন। কারণ যিনি আসলেই রুপে ও গুণে মানুষ তিনি কখনোই মানুষের সাথে ছলনা করতে পারেন না, মানুষের কষ্ট দেখে আনন্দ করতে পারেন না।

যে মানুষের সাথে কথা দিয়ে কথা রাখে না সে ব্যক্তিত্বহীন। যার নিজের কথার মূল্য নিজের কাছেই নেই সে পৃথিবীর এক মূল্যহীন জীব। কেউ যদি মিথ্যা বলাকে কৌশল ভাবেন, অন্যের আমানতের খেয়ানত করাকে বৈধ ভাবেন তিনি পশুর স্তরটা ছাড়িয়ে যান। কারণ পশু প্রাকৃতিক আইন মানে কিন্তু মুনাফিক ধর্মের কিংবা রাষ্ট্রের কোনো আইন মানে না। অন্যকে ধোঁকা দিতে পারলে নিজেকে যোগ্য ভাবেন, অন্যের ক্ষতি করেও নিজের লাভটা নিশ্চিত করতে পারলে তিনি নিজেকে সফল ভাবেন। মুনাফিকের এই ভাবনা তাকে অহংকারী করে তোলে, নিজের ভেতরের কদর্য রুপটাকে গোপন করার প্রয়াসে তিনি বাহাদুরী দেখান। মুনাফিক বড় হতে চেয়েও ছোট হয় আর নিজের ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়েও হাসিখুশিতে মেতে থাকে।

মুনাফিক সংকীর্ণতার উর্ধ্বে ওঠতে পারে না বলেই উদারতাকে সহ্যও করতে চায় না। নিজের নীচুতাকে ডেকে রাখার সুতীব্র ইচ্ছাটা প্রকাশ পায় গর্ব ও অহংকারী আচরণের মাধ্যমে। নিজের দুর্বলতা ও অপ্রকাশিত রুচিহীন কর্ম তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে। এই দুর্বলতা ঢাকতে সে প্রশংসিত হতে চায়, অন্যের কাছে অতিব গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে চায়। কখনো অতি মাত্রায় কদর যত্ন কিংবা মনোযোগ না পেলেই ভাবে সে হেরে গেছে ফলে সে বিজয়ী হতে হিংসাত্মক ও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। সে মানবতাবোধ ও মনুষ্যত্ববোধকে বিসর্জন দিয়ে পাশবিকতার চর্চায় লিপ্ত হয়। এতে মুনাফিক কখনো বা সমাজের চোখে বিজয়ী হলেও তার বিবেকের কাছে চরমভাবে পরাজিত হয়। ফলে মুনাফিকের ঔদ্ধত্য শির আমরা যতটা দেখি তার নাস্তানাবুদ অবস্থা আমরা ততটা দেখি না। আসলে আমাদের দৃষ্টিসীমায় বাইরের জগতের অস্তিত্ব থাকলেও ভেতরের জগৎটা অগোচরেই থেকে যায়। তবে প্রত্যেকেই তার একটি নিজস্ব জগতের সন্ধান পায় যেই জগৎ তাকে যেভাবে মূল্যায়ন করে সেটাই যে যথাযথ মূল্যায়ন তা অধিকাংশ মুনাফিকই সঠিকভাবে বুঝতে চায় না।

মুনাফিকের অস্তিত্ব থাকার কারণেই আমাদের সমাজে যে কোনো শুভ উদ্যোগকে হাসিমুখে স্বাগত জানিয়ে সংশ্লিষ্টদের অভিনন্দন জানানোর মাধ্যমে উৎসাহ দান ও কল্যাণকর প্রয়াস চালানোর যথোপযুক্ত স্বীকৃতি প্রদানের ক্ষেত্রে উদার মনোভাব প্রদর্শনের অভাব রয়েছে। অনুপ্রেরণা জোগানো ও স্বীকৃতি প্রদানের ঘাটতি সত্ত্বেও স্বপ্নবান ও কর্মপ্রিয় মানুষ তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। সমাজ, দেশ ও জাতি উপকৃত হয়। কিন্তু মুনাফিক চরম সুবিধাবাদী। যখন যেদিকে চললে বা থাকলে স্বার্থ হাসিল করা যায় সেদিকেই তার দৃষ্টি। ফলে মুনাফিক মানেই এই সমাজের রহস্যময় ও দুর্বোধ্য চরিত্র। সে দেখতে মুসলমানের মতো, কিন্তু প্রকৃত মুসলমান নয়। মুনাফিক দেখতে মানুষের মতো কিন্তু সে অমানুষের চেয়েও ভয়ঙ্কর। মুনাফিকের অস্তিত্ব অশুভ অস্তিত্ব, তার অস্তিত্ব বিশ্বস্তের নয় বরং অস্বস্তির। খুলে যাক মুনাফিকদের মুখোশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *