পরিবার যত সুন্দর হবে, সমাজ তত সুন্দর হবে

পরিবারে অনেকে আছেন যারা বাইরের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই সফল কিন্তু নিজের ঘরকে ঠিকভাবে সামলাতে পারেন না, পরিবারকে প্রভাবিত করতে পারেন না, সুখী-সুন্দর পরিবার গঠন পারেন না। যে যত বড় ক্ষমতাধর ব্যক্তিই হোন না কেন, স্ত্রীর কাছে স্বামী কিংবা সন্তানের কাছে বাবা ছাড়া আর কিছু নন। বৈধ বিবাহের মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের সামাজিক স্বীকৃতিই শুধু স্থাপিত হয় না, ভরণ-পোষণ, সন্তান জন্মদান-লালন-পালন-নিরাপত্তাদানের দায়িত্বও চলে আসে। এই যে পারিবারিক পরিসরের অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলমান সম্পর্ক এবং যারা চলে গেছেন, যারা এখন আছেন ও যারা ভবিষ্যতে আসবেন তাদের মধ্যকার সেতুবন্ধন তৈরি এসব হয় পরিবারের মাধ্যমেই। তাই পরিবার যত সুন্দর হবে, সমাজ তত সুন্দর হবে।

বর্তমানে পরিবারগুলো নৃশংস ও অযৌক্তিকভাবে বহুমুখী আক্রমণের শিকার হয়েছে। তন্মধ্যে রয়েছে বেকারত্ব ও চরম বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং ক্ষুধা, আধুনিক প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব, কর্মব্যস্ততা বৃদ্ধির কারণে পরিবারকে সময়দানের সুযোগ কমে যাওয়া, নতুন ধরণের যৌন প্রবণতা, মাদকাসক্তি, ভ্রুণ হত্যা, অপহরণ, ধর্মান্ধতা, তালাকের হার বৃদ্ধি, বিধবা বা অবিবাহিতদের সংখ্যা বৃদ্ধি, অশ্লিল বিনোদনে আসক্তি, অপহরণ, শিশু ও নারী পাচার, প্রতিবন্ধী ও শিশু শ্রম বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি।

আগে ভিডিও এডিটিং সফটওয়্যার ছিল না, ফটোশপের কারসাজি ছিল না, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আধিক্য ছিল না, হাতে হাতে স্মার্টফোন-ল্যাপটপ ছিল না; ফলে অনেক সাইবার অপরাধ হতে পারত না। এসব নয়া নয়া চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করেই পরিবারকে স্বর্গের টুকরো অনাবিল শান্তি ও সুখের নীড় বানাতে হবে। এদেশের হাজার বছরের পুরনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা পরিবারে যত বেশি হবে, সেই পরিবারের সদস্যগণ জীবনে ততবেশি সার্থকতা লাভে সক্ষম হবেন। শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চায় মানবীয় গুণাবলীর উৎকর্ষ সাধন হয়, আলোকিত মানুষ গড়া সম্ভব হয় ।

বাস্তবতা হচ্ছে- আয়-রোজগারের জন্য, চাকরি-ব্যবসার কারণে স্বামী থাকছে শহরে আর স্ত্রী থাকছে গ্রামে কিংবা স্ত্রী থাকছে দেশে আর স্বামী থাকছে বিদেশে। দীর্ঘ সময়ের দূরত্ব পরকিয়া বাড়াচ্ছে, কষ্টার্জিত শ্রমে উপার্জিত অর্থেই প্রিয় মানুষটি অন্যের সুুখ-ভোগের মাধ্যম হচ্ছে। প্রযুক্তি জীবন যাপনকে সহজ করার পাশাপাশি কমিয়েছে নিরাপত্তা। তারুণ্যের আবেগে বন্ধুর সাথে প্রাণখুলে আড্ডা দিতে গিয়ে বলা কথা অডিও রেকর্ড হচ্ছে, একান্ত আপন করে কাটানো আনন্দদায়ক সময়ের ভিডিও তার অজান্তেও হচ্ছে; যা ইউটিউভে আপলোড হওয়ায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। হয়ত মেয়েটি বা ছেলেটি জাানতেও পারছে না তাদের কথা ও কর্মকা- দেশ-বিদেশে সবার জন্য এবং সব সময়ের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ১৬-২৫ বছরের এই ছেলে মেয়েটির কথোপকথন ও অঙ্গভঙ্গি যে ভবিষ্যতে তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিরাও দেখতে পাবে এমনটিই শুধু নয়; তারা নিজেরাও ৭০-৮০ বছর বয়সে দেখে বিব্রত-লজ্জিত হবে।

গোপন ক্যামেরা কিংবা উন্নত প্রযুক্তির রেকর্ডার সম্পর্কে যেমন অনেকের ধারণা নেই, তেমনি কোনো ডিভাইস থেকে ডিলেট করলে বা কোনো সাইটে আপলোড করার পর তা মুছে ফেললেই যে তা শেষ হয়ে যায় না; বিভিন্ন বিকল্প উপায়ে তা যেকোনো সময় নতুন করে হাজির করা যায় এই সম্পর্কে অনেকের সচেতনতা নেই। তারা ভাবছে ফেসবুকে চ্যাট করছি, স্কাইপিতে কথা বলছি কিংবা জিমেইলে টেক্সট-ছবি পাঠাচ্ছি- তাতে চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু তারা বুঝতে পারছে না একবার শুধু আপলোড হওয়া বা পাঠানোর পর তা সংশ্লিষ্ট ডাটাসেন্টারে সংরক্ষিত হয়ে যাচ্ছে, ব্যাকআপ থেকে যাচ্ছে। নিজে মুছে ফেলার পরও তা শত বছর পর সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে তা’ উদ্ধার হতে পারে। হয়ত! অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রদর্শন বন্ধ করে তাই বলে তা হারিয়ে যায় না। অর্থের বিনিময়ে কর্তৃপক্ষ যে তা’ ভবিষ্যতে অন্যকে সরবরাহ করবে না এমন নিশ্চয়তাও নেই।

এখন বই পড়ার সংস্কৃতি হারিয়ে টিভির চাকচিক্যের সংষ্কৃতি আর স্মার্টফোনের ব্যবহারে, ফেসবুকে মাদকতায় তরুণরা ভাবনার বদলে, প্রশ্ন করার বদলে অনুকরনে আকৃষ্ট হচ্ছে। এমতাবস্থায় বাবা-মা সন্তানকে সঠিকভাবে বাঁচতে ও চলতে-ফিরতে শেখাতে পারেন। নিজেদের কাজ-কর্মের মাধ্যমে বাস্তব উদাহারণ হয়েই সন্তানদের প্রকৃত শিক্ষাদান করা যায়। শুধু মুখে বলে, উপদেশ-পরামর্শ দিয়ে সন্তানদের শেখানো যায় না। সন্তানরাও জানে মা-বাবাও তাদের মতই মানুষ, তাই তারা বাবা-মাকে সবক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিখুঁত হয়ত মনে করে না; তবে তারা একটি পর্যায়ে প্রত্যাশা করে। তাই বাবা-মাকে সেই প্রত্যাশার নূন্যতম মানের নিচে যাওয়া ঠিক হবে না। জীবনে হাজারো ব্যর্থতা সত্ত্বেও সন্তানদের জন্য ভালো কিছু উদাহরণ স্থাপন করা উচিত হবে। বাবা-মায়েরা যদি সঠিকভাবে তাদের সন্তানদের দায়িত্ববান ও সুঅভ্যাস সম্পন্ন করে গড়ার প্রচেষ্টা চালায়, তবে শিশুরা অবশ্যই দায়িত্ববোধ সম্পন্ন ও বাধ্য হবে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দায়িত্ব পালন করতে হবে, বয়স্কদের প্রতি দায়িত্বও মনে রাখতে হবে।

পরিবার হচ্ছে ক্ষুদ্র-সমাজ; বৃহত্তর সমাজের ভিত্তি; শিশুদের গঠনের প্রথম স্তর। পরিবারের সবাই মিলে ভালো থাকার জন্য কাজ করা পরিবার-কেন্দ্রিক ভালো অনুশীলন। পারিবারিক সমস্যা সমাধানের জন্যও দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে পরিবারের বড়দের অন্যদের দুর্বলতা ও সামর্থ্য, প্রয়োজনীয়তা ও পছন্দ এবং উন্নতি বুঝতে হয়। শিশুদের স্বাস্থ্য এবং কল্যাণ নিশ্চিত করতে পরিবারগুলির অনন্য ভূমিকা রয়েছে। মাতাপিতা অসুস্থ সন্তানদের মানসিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করে; রোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যসেবা দেয়, অসুস্থতার সময়ে যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করে। পরিবার সবার জন্য, সব বয়সীর জন্য। পরিবার মানবাধিকার শেখায় এবং মানুষের মানবিক গুণাবলী জাগ্রত করে। গৃহহীন মানুষ, শিকড়চ্যুত বা ঠিকানাহীন মানুষ প্রকৃত পারিবারিক পরিবেশ পায় না।

সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে এবং সব বয়সের সকলের জন্য ভালো থাকা নিশ্চিত করতে পরিবারের বিকল্প নেই। পরিবারের মধ্যে জেন্ডার সমতা থাকলে, শিশু ও প্রবীণদের অধিকার সংক্রান্ত সচেতনতা থাকলে এবং প্রতিবন্ধী সদস্যদের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব থাকলে তা’ হয় সুখী পরিবার। যেহেতু উন্নয়নের মূল লক্ষ্য মানুষের উত্তরোত্তর আরো বেশি ভালো থাকা নিশ্চিত করা, সেহেতু টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিবার গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামে কিংবা শহরে, ক্ষুদ্র কিংবা জনগোষ্ঠিতে যেহেতু সবাই পরিবারে বাস করে; সেহেতু সামাজিক সংহতি তৈরিতেও অগ্রণী ভূমিকা রাখে পরিবার। পরিবারের সদস্যদের কর্মে ভারসাম্য নিশ্চিত হলে পারিবারিক দারিদ্র্য নিরসন সহজ হয় এবং সামাজিক বর্জনের মুখোমুখি হওয়া থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। অভিবাসিত পরিবার যদি শিকড়কে ভুলে না যায় তবে তার প্রভাব হয় ইতিবাচক। যে পরিবারে সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের বেশি ত্যাগ থাকে, সে পরিবাওে সাধারণত সন্তানও ত্যাগী হয়ে গড়ে ওঠে; তবে শাসন ও আদরের ভারসাম্য দরকার হয়।

পরিবারই সমাজের ভিত্তি। পরিবার সমাজের দর্পণ; কোনো জাতি-সমাজ-রাষ্ট্র কতটা সুসভ্য-ভদ্র-উন্নত তা প্রকাশ পায় পরিবারগুলোর মাধ্যমেই। যেখানে পরিবারগুলো সুন্দর সেখানকার সমাজও সুন্দর, রাষ্ট্রও সুন্দর। পরিবারের পরিবেশ ভালো মানে পরিবারের সদস্যরা ভালো মনের অধিকারী। ভালো মানের ও মনের নাগরিক জাতিকে উপহার দেয় পরিবার। একটি জাতিও অনেক পরিবার সমূহের সমন্বিত একটি পরিবার। তাই পরিবারগুলো শক্তিশালী করার মানেই দেশকেও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়া। তাই পরিবারের যত্ন নিন, পরিবারকে সময় দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *