পরিবারকে সময় দিন, পরিবারের যত্ন নিন

আনিসুর রহমান এরশাদ
আপনার গৃহ কতটা প্রশস্ত, বড় ও চাকচিক্যময়; তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আপনার গৃহে থাকা পরিবারের সদস্যগণ কতটা সুখি। পরিবার হচ্ছে সঙ্গীতের মতো, কিছু স্বর উঁচু আবার কিছু স্বর নীচু। কিন্তু সবমিলিয়েই একটি চমৎকার সঙ্গীত। পরিবার অতীতের সাথে সংযোগ তৈরি করে এবং ভবিষ্যতকে উজ্জ্বল করে। পরিবারের চেয়ে বেশি খাঁটি ভালোবাসা ও আন্তরিক যত্ন নিতে আর কেউ পারে না। পরিবার প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ উপহার, সেরা শিল্পকর্ম। পরিবারেই জীবন শুরু হয় এবং যেখানে ভালোবাসা কখনোই নি:শেষ হয় না।

সুখি পরিবার বড় আশির্বাদ; পরিবার ছাড়া নিজেকে কল্পনা করুন তো। কল্পনা করুন এমন একটি পৃথিবীর কথা, যেখানে কোনো পরিবার নেই। দেখবেন পরিবার বিচ্ছিন্ন করে আপনি নিজের অস্তিত্ব ভাবতেই পারবেন না। পরিবারই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ ও যত্ন পাবার দাবি রাখে। আপনি ভালো আছেন মানে আপনার পরিবারও ভালো আছে। পরিবারের সদস্যদের কষ্টে রেখে আপনি কেনো, কোনো মানুষই শান্তিতে থাকতে পারে না। সন্তানের কাছে Family এর মানে হচ্ছে- F-Father, A-And, M-Mother, I, L-Love, Y-You. মা-বাবা, ভাই-বোনের পারস্পরিক ভালোবাসাকে ভিত্তি করেই পরিবার। পারিবারিক বন্ধন সব সময় রক্তের নয় তবে এটি পরস্পরকে সম্মান করতে ও ভালোবাসতে শেখায়। অন্যের জীবন ও সম্মানকে নিজের কাছে মূল্যবান ও দামি করে তুলে। পারস্পরিক ভালোবাসাময় পারিবারিক পরিবেশ জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার।

আমার পরিবার মানে সবকিছুই আমার; পরিবার ছাড়া আপনি গন্তব্যহীন কোনো পথিক। আনন্দময় সময় কাটানোর জন্য পরিবার সর্বোৎকৃষ্ট। বন্ধু আসে এবং যায় কিন্তু পরিবার সব সময়ের জন্য। একটি সুখি পরিবার হচ্ছে এক টুকরো স্বর্গের মতো। পরিবার হচ্ছে এমন জায়গা, যেখানে বর্তমান প্রজন্ম আগামী প্রজন্মকে গড়ে তোলে। রক্ত কিংবা বিবাহ কাউকে পরিবারের সাথে সম্পর্কিত করে কিন্তু আনুগত্য ও বিশ্বস্ততাই কাউকে পরিবারের সাথে যুক্ত রাখে। মাদার তেরেসা বলেছেন, তুমি যদি বিশ্ব পরিবর্তন করতে চাও, গৃহে ফিরে যাও এবং তোমার পরিবারকে ভালোবাসো।

পরিবারই বিশ্বে সবচেয়ে দামি, মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র; মানসিক শক্তির অন্যতম উৎস। এই পরিবার থেকেই নারীদের সম্মানের জায়গা তৈরি করতে হবে, গৃহিণী পেশাটিকেও মর্যাদায় আনতে হবে। গৃহিণী পেশা সম্মানিত হলে সম্মানিত হবে পরিবারের নারী; এতে নারীদের হতাশা কমবে, বাড়বে কর্মস্পৃহা এবং ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সামাজিক ব্যবস্থার অনেক ক্ষেত্রে। পরিবারের সদস্যরা অঘোষিতভাবে যেন এমন প্রতিশ্রুতি প্রত্যেককে দিয়েছে যে- তুমি আমাকে নাম ধরে ডাকলে আমি শুনব, তুমি আমার কাছে আসলে আমি তোমাকে রাখব, যদি আমাকে তোমার প্রয়োজন হয় তবে আমি সেখানে যাব, যখন তুমি রাখবে তখন আমি থাকব।

প্রবীণ কিংবা নবীন, স্ত্রী কিংবা সন্তান- এমনকি কাজের লোক প্রতিও সদয় আচরণ কাম্য। গৃহকর্মীকে কোনো প্রকারের শারীরিক নির্যাতন মোটেই যৌক্তিক নয়। যারা বাসা বাড়িতে কাজ করে তাদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেয়া, নিজেরা যা খায় তা খাওয়ানো, বদ্ধ ঘরে মশারিবিহীন না রাখা, রোগাক্রান্ত হলে চিকিৎসা করানো; এসব মানবিক ও নৈতিক দায়িত্বই শুধু নয়, সময় ও শ্রম দেয়ার বিনিময়ে তার ন্যায্য পাওনা ও অধিকার। নবী (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো দাস-দাসী তোমাদের জন্য খাবার তৈরি করে এনে দেয় তখন নিজের সঙ্গে বসিয়ে তাকে খাওয়াবে। কেননা সে ধোঁয়া ও তাপ সহ্য করেছে। আর কোনো খাবার যদি পরিমাণে কম হয় তবে অন্তত দু-এক মুঠো তার হাতে দেবে।’-সহিহ মুসলিম। অর্থাৎ গৃহকর্মীরা পরিবারের সদস্যতুল্য গণ্য হবে, তাদের প্রাপ্য অধিকার দিতে হবে। সুবিচার করতে না পারলে গৃহকর্মী রাখাই উচিৎ নয়।

মনে রাখতে হবে- সঠিকটাকে গ্রহণ করেই প্রকৃত সুখি হওয়া সম্ভব। পরিবার এমন একটি জায়গা, যেখানে একটি জগতেই অনেকগুলো গল্প থাকে, উজ্জল ভবিষ্যত নির্মাণে পরস্পরের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস তীব্র মাত্রায় দেখা যায়। পরিবারে সবার সুখ-শান্তি নিশ্চিতকরণে আজকেই আগামীর পরিকল্পনা নিন; আপনার স্বপ্ন সত্যে পরিণত হবেই। একটি পরিবারের সম্পূর্ণ নিঁখুত ও পূর্ণাঙ্গ হবার প্রয়োজন নেই, ঐক্যবদ্ধ থাকাটা প্রয়োজন। এই একতা খুব সহজ, সততা ও বিশ্বস্ততার মাধ্যমেই এটি অর্জিত হয়। জীবনের অনেক কিছুই পরিবর্তন হয় কিন্তু মানুষের জীবনের শুরু ও শেষ হয় পরিবারেই- এটা অপরিবর্তিত।

তাই কঠোরতা নয় পরস্পরকে ভালোবাসাকেই বেছে নিন। তাহলে ভালোবাসা অনেক কিছুকেই সহজ ও আলোকিত করবে। পরিবার একটি গাছের শাখা প্রশাখার মত, আমরা বিভিন্ন নির্দেশনায় বেড়ে উঠি; যদিও আমাদের মূল গন্তব্য বা শিকড় একই। তাদের জন্য আপনার সময় থাকা উচিৎ নয় যারা আপনাকে অপছন্দ করে, আপনি ব্যস্ত থাকুন তাদের নিয়ে যারা আপনাকে অনেক ভালোবাসে। দিনশেষে ভালোবাসাময় পরিবারের সবাই শুধু ভালোবাসা মনে রাখে, এর বিপরীতে সবকিছুই ভুলে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *