নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে পরিবার

আনিসুর রহমান এরশাদ
ইদানীং ক্যারিয়ার গড়ার জন্য দেরিতে বিয়ে করতে গিয়ে অনেক নারী সন্তান ধারণের ক্ষমতা হারাচ্ছেন, কর্মজীবনের ব্যস্ততায় বিয়ে করার আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক পুরুষ। বিয়েতে দেরি হলেও অবৈধ সম্পর্কে জড়ানোয় বাড়ছে ভ্রুণ হত্যা, পরকীয়া, আত্মহত্যা। শিশু-নারী নির্যাতন বাড়ছে, ধর্ষণ ও হত্যা এমনভাবে বাড়ছে যে পরিবারগুলোও অনিরাপদ হয়ে উঠছে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় প্রতারণা ও অপরাধ বাড়ছে, কমছে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস। বয়স্কদের যেতে হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে আর সন্তান লালন-পালন করছে গৃহকর্মীরা।

ভাঙ্গনের ধাক্কায় পারিবারিক মূল্যবোধ তথা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন ও পারস্পরিক দ্বন্দ্ব পৌঁছেছে চরমে। অনেকের পারিবারিক জীবন অসুস্থ ও নড়বড়ে হওয়ায় তথা ভাঙন ও বিপর্যয় দেখা দেওয়ায় তাদের সমাজ জীবনে নানা অশান্তি ও উপদ্রব সৃষ্টি হচ্ছে। দুর্বল বিশ্বাস আর স্নেহ-ভালোবাসার ঘাটতির ফলে পারিবারিক সদস্যদের ক্রমাগত মানসিক উৎপীড়ন অনেককে আত্মহননের পথে যেতে বাধ্য করছে। সুস্থ পরিবার গঠন না হওয়ায় সমাজের সাফল্য ও সামাজিক জীবনের কল্যাণ লাভ তাদের ভাগ্যে জুটছে না। নিরাপত্তাহীনতা, বাল্যবিবাহ ও অপুষ্টি বাংলাদেশে কন্যা শিশুদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চবিত্ত পরিবারই হোক বা নিম্নবিত্ত কোথাও কন্যা শিশুরা যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের মতো ঘটনা থেকে বাদ পড়ছে না এবং তা ঘটছে পরিবারের অভ্যন্তরে, যাত্রাপথে সকল ক্ষেত্রে। কন্যা শিশু জন্ম নিলে পরিবারে মনঃক্ষুণ্ণ হওয়ার বিষয়টি এখনও রয়ে গেছে।

পড়াশুনা, চাকরি তথা জীবন-জীবিকার তাগিদে অনেকে পরিবার ছাড়ছে, গ্রাম থেকে শহরে কিংবা দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। পরিবারের সাথে তাদের দূরত্ব বাড়ছে, ফলে পারিবারিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো অজানা রয়ে যাচ্ছে। পরিবারের সদস্যরাও জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধ প্রবণতায়। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষ অনেক বহির্মুখী হয়েছে। জীবনের ধারণায় আকাশপাতাল বদল এসেছে। পরিবারের গন্ডিতে বাঁধা পড়তে মানুষ আর অতটা স্বচ্ছন্দ নয়। সে স্বাধীনচেতা। তার উচ্চাশা বাড়ছে, জীবন ধারণে ঔজ্জ্বল্য চায়, কেনাকাটায় ব্র্যান্ড চায়, আয় যাই হোক ফ্ল্যাট চায়, গাড়ি চায়। সামাজিক জীবনের চাহিদা বদলে যাওয়ায় পরিবার ভেঙ্গে যাচ্ছে, ভেঙ্গে না গেলেও বন্ধন ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। বর্তমান প্রজন্ম বেড়ে উঠছে- বয়োজ্যেষ্ঠদের অনৈতিকতা, দুর্নীতি ও মিথ্যাচার দেখে; ভেজাল খাবার খেয়ে, দূষিত আবহাওয়া আর অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির মধ্যে; ধর্মীয় উন্মত্ততা দেখে, ধর্মের নামের ভন্ডামি দেখে। ছোটরা দেখছে বড়রা কীভাবে চুরি করছে, দুর্নীতি করছে, কীভাবে ভোট জালিয়াতি করে নির্বাচনে জিতে যাচ্ছে। খেলাধুলা, শরীরচর্চা, সুকুমারবৃত্তির অনুশীলনসহ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন গড়ার উপাদানসমূহ থেকে তারা বঞ্চিত থাকছে। পরীক্ষায় ভালো করার চাপে মা-বাবাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে তাদের স্বাভাবিক সম্পর্কও নষ্ট হচ্ছে।

স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন- এমন শিরোনাম খুব সাধারণ বাংলাদেশে। কিন্তু হঠাৎ করে ‘মা’র হাতে সন্তান খুন’ প্রায় নিয়মিত শিরোনাম হয়ে উঠছে। মাদকাসক্ত মা বা বাবা সন্তানকে মেরে ফেলছে। মা বা বাবা কোনো অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে সন্তানরা সেটি জানতে পেরে তাদের হত্যা করছে। একসঙ্গে একাধিক সম্পর্কে জড়িয়ে যাচ্ছে ছেলেমেয়েরাও। আর বাবা-মা এতে বাধা দিলে তাদের হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না সন্তান। দারিদ্র্য, ভূমিহীনতা, সামাজিক আদর্শ ও মূল্যবোধের পরিবর্তন, স্থানান্তর, শিল্পায়ন ও নগরায়ণ, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, বস্তুতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনা, ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবোধ ইত্যাদি কারণে যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙ্গে ছোট ছোট একক পরিবারে রূপ নিচ্ছে। বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে বড় বড় শহরগুলোতে জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে ফ্ল্যাটবাসীর সংখ্যা। দেখা দিচ্ছে এক ধরনের বন্ধনহীনতা।

নারীরা পূর্বের তুলনায় বর্তমানে বিপুল সংখ্যায় বাড়ির বাইরের কর্মজগতের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, আত্মীয়তার বন্ধন কমে যাচ্ছে, বিবাহ বিচ্ছেদের হার বাড়ছে, পরিবারের স্থিতিশীলতা কমে যাচ্ছে, একের অধিক সন্তান না নেওয়ার সংস্কৃতি চর্চা হচ্ছে, অবৈধ সন্তান গ্রহণ ও প্রতিপালন করা হচ্ছে, পরিবারে নারীদের ভূমিকায় পরিবর্তন এসেছে, পারিবারিক বন্ধনে শিথিলতা দেখা দিয়েছে। পারিবারিক কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তনই প্রমাণ করে পরিবার প্রথা একটি অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে। ভাঙ্গনমুখর পরিবারের সন্তানেরা প্রচন্ড মানসিক সমস্যার মধ্যে পড়ছে, বার্ধক্যেও অসহায় হয়ে পড়ছে প্রবীণরা।

কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ভিডিও গেমস, স্মার্টফোন আর ডিশ সংযোগ সহজলভ্য হওয়ায় পিতামাতা সন্তানদেরকে চিন্তার জগতে ও চারিত্রিক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। অনেক-সিনেমা নাটকেরই মূল্যবোধ হলো টাকা, শ্রেষ্ঠত্বকামিতা, লাগামহীনতা, সমকামিতা, স্বাধীন মেলামেশা, বিশ্বাসভঙ্গ, পুরুষে পুরুষে বা নারীতে নারীতে পরিবার গঠন কিংবা যৌনতা চর্চা, যৌন সহিংসতা ও অনৈতিক-অবৈধ সম্পর্ক। এসবের মাধ্যমে অবাধ, স্বাধীন ও নিয়ন্ত্রণহীন জীবনযাপনে উৎসাহিত করা, ধন-সম্পদ আর খ্যাতি অর্জনের জন্যে পরিবার থেকে দূরত্ব বজায় রাখার প্রতি অনুপ্রাণিত করা হচ্ছে। পরিবার প্রথাকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিস্তারের পথে প্রতিবন্ধক হিসেবে উপস্থাপন করায় বৈধ পারিবারিক সম্পর্কের ব্যাপারেও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়ছে। বাবা-মায়ের প্রতি অবিশ্বাস এবং বিশ্বাসভঙ্গের কারণেই পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক সম্পর্কগুলো মন্থর হয়ে পড়েছে। হারিয়ে যাচ্ছে পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মানুষের স্বাভাবিক মানবিক মূল্যবোধ।

পরিবার সম্পর্কিত বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত নাটক, সিনেমাগুলোতে পারিবারিক মূল্যবোধের বিষয়ের চেয়ে পারিবারিক কলহকে আবশ্যিক করে দেখানো হচ্ছে। স্টার প্লাস, জি বাংলার মতো ভারতীয় চ্যানেলগুলো বাংলাদেশের পারিবারিক বন্ধনকে ধ্বংস করছে। দেশের টেলিভিশনগুলোতে প্রচারিত বিদেশি সিরিয়াল আমাদের পারিবারিক বন্ধনকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। বিদেশি সিরিয়াল এবং ডাবিংকৃত সিরিয়াল উভয়ই আমাদের সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং পরকীয়ার জন্য প্রধান দায়ী। চলচ্চিত্র এবং সমাজ বাস্তবতা থেকেও অপরাধের পাঠ নিচ্ছে কিশোর-তরুণরা। পারিবারিক ভাঙনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। যে সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অমিল থাকে, সেখানকার সন্তানরাও মানসিক সমস্যায় ভোগে। ভবিষ্যতে ওই সন্তান জড়িয়ে পড়ে নানা অপরাধে।

মোবাইল ফোন, চ্যাটবক্স, ফেসবুক, যৌতুক, নেশার উন্মাদনা, বিপরীত লিঙ্গ থেকে যৌন চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়ে দাম্পত্য কলহ, পরকীয়া, আর্থিক দৈন্য, বিদেশি (বিশেষ করে ভারতীয়) টিভি চ্যানেলের নাটক-সিনেমার প্রভাবসহ মানসিক হীনম্মন্যতার কারণে বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে। ফলে ভাঙছে সংসার। মূল বিষয় পরকীয়া, উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন ও দাম্পত্য যৌনজীবন। মোবাইল ফোন আর ফেসবুকের মাধ্যমে দিনে দিনে মানুষ এই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এসব অপরাধকে উসকে দিচ্ছে বিদেশি টিভি চ্যানেলের নাটক ও সিনেমা। আজকাল ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কোনো বিষয়কে উদযাপন করার জন্য এই উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনকে বেছে নিচ্ছে। ডিজে পার্টি, বিভিন্ন নিষিদ্ধ পানীয় পান থেকে শুরু করে রাত যাপন এখন অনেক সহজসিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

বিষয়গুলো যে শুধু পারিবারিক বাঁধনই ছিন্ন করছে তা নয়, আত্মহত্যার মতো অসংখ্য ঘটনারও জন্ম দিচ্ছে। আমাদের উদার মানসিকতায় ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন রকমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। শুধু যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন তা নয়, সন্তানরাও হরহামেশা ঘটিয়ে যাচ্ছে এই অপরাধ। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়া অবস্থায় অনেকেই প্রেমে জড়িয়ে পড়ে গোপনে বিয়ে সেরে ফেলছে। এরপর কয়েক বছর যেতে না যেতেই পরিবারের মনরক্ষা অথবা নানা দৈন্যদশায় পড়ে তারা তালাকের দিকে যাচ্ছে। বিশেষ করে ধনাঢ্য পরিবারে সবচেয়ে বেশি বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। বাদ পড়ছে না মডেল-তারকা পরিবারও।

এমতাবস্থায় করণীয় হচ্ছে- প্রথমত: সবাইকে সচেতন থাকতে হবে যাতে পারিবারিক সমস্যা বড় আকার ধারণ না করে আর পারিবারিক কলহ, পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি আর দূরত্ব সামাজিক সমস্যা সৃষ্টির কারণ না হয়। পারিবারিক ছোট ছোট সমস্যা থেকে কোমলমতি শিশুদেরকে দূরে রাখুন এবং তা সামলে নিন নিজেরাই। সপ্তাহিক অথবা মাসিক পারিবারিক মিটিংয়ের ব্যবস্থা করে সবার কথা জানুন, বুঝে-শুনে সরাসরি কথা বলুন, অন্যের কথা বলার মাঝে কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। বড় সমস্যায় পড়লে তাড়াহুড়া না করে ধৈর্যসহ তা মোকাবিলা করুন। যাতে পরিবারে সবসময় দৃঢ়বন্ধন আর অটুট ভালোবাসা বজায় থাকে।

দ্বিতীয়ত: মাদকাসক্তদের মাদক থেকে দূরে রাখতে প্রধান ভূমিকা রাখতে হবে পরিবারকে। যারা মাদকাসক্ত হয়ে গেছে, তাদের সুচিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের আওতায় আনতে হবে। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হতে হবে। অসৎ সঙ্গে মিশে ছেলে-মেয়ে যাতে নষ্ট না হয়ে যায় সেদিকে পরিবারের অভিভাবক ও সদস্যদের তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতে হবে। তারা কার সাথে চলাফেরা, উঠাবসা, খেলাধূলা ও বন্ধুত্ব স্থাপন করে সে বিষয়ে খোঁজখবর নিতে হবে। যৌতুক নামক পরিবার বিধ্বংসী প্রথা বন্ধে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

তৃতীয়ত: অনেক অভিভাবককের অতিরিক্ত আদর-সোহাগ পেয়ে যেমন বেপরোয়া হয়ে উঠছে সন্তানেরা, তেমনি জাতে উঠতে বা থাকতে চেয়ে এমন অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচরণ গড়ে উঠছে যা রীতিমত ক্ষতিকর। ছোট বাচ্চাদের চোখে চশমা, মাত্রাতিরিক্ত মুটিয়ে যাওয়া, বিষণ্নতা, হতাশা ও অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধিই এর প্রমাণ। অন্যদিকে মাত্রাতিরিক্ত শাসনে অস্থিরতা, সেরা হবার প্রতিযোগিতার চাপে মানসিক ভারসাম্যহীনতা অনাকাঙ্ক্ষিত এক বাস্তবতা। নারী-পুরুষ উভয়েই যাতে স্ব স্ব অবস্থানে থেকে পরিবারকে নতুন ধরণের চ্যালেঞ্জ থেকে রক্ষা করে দেশ ও জাতির উন্নয়নে কাজ করতে পারে সে লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধিই হতে পারে এসব সমস্যা সমাধানের সর্বোৎকৃষ্ট উপায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *