ধর্ষকের কোনো সমাজ নেই, সংস্কৃতি নেই, ধর্ম নেই

আনিসুর রহমান এরশাদ

সুন্দর সংস্কৃতির সঙ্গে সন্ধি সবার হয় না। অপসংস্কৃতি একটু একটু করে চাদর ছড়িয়ে দিয়ে অনেককেই আপন করে নেয়। অপসংস্কৃতির উষ্ণতা দিয়ে হৃদয় ও মন আলোড়িত করে শরীরকে চাঙ্গা করে নিচ্ছে অনেক মুখোশধারী ভদ্র মানুষ। দিনে ঝলমলে সূর্যের আলোয় দেখা তাদের রুপ পাল্টে রাতের নিস্তব্ধতায় মেতে ‌ওঠে উদ্দাম উন্মাদনার পাশবিক আনন্দে।

ধর্ষকের কাছে ধর্ষিতার অশ্রু-রক্ত-চিৎকার-ভীত চাহনি যেন অন্ধকারের শোভা হিসেবে দেখা দেয়। সাময়িক তৃপ্তির বর্ণিল সময় কাটাতে যেয়ে অহঙ্কার-ঈর্ষা-লোভ-কাম তাকে শয়তানে পরিণত করে। ধর্ষকের পাপিষ্ট আত্মা ও কলুষিত অন্তর যে ঘটনাটিকে সাফল্যের-অর্জনের-স্মরণের উত্তম কিছু ভেবে সুখ পায়, ধর্ষিতার কাছে তা’ অসম্মানের-ব্যর্থতার-তিরস্কারের-লজ্জার-অপমানের-নিরানন্দের অফুরন্ত উৎস।

অসামাজিক ও অমানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখে, স্বার্থপরতা-ভোগবাদীতা-বিলাসিতা-নগ্নতা-বেহায়াপনাকে জিইয়ে রেখে, দুর্নীতি-অবিচার-বিচারহীনতা-কুপ্রথাকে অভিনন্দিত করে; আপনি সুস্থ-সুন্দর-শান্তিময় সমাজ গড়তে পারবেন না। আপনার কৃপণতা-কুচর্চা-কুঅভ্যাস-কুমন্ত্রণা শুধুমাত্র আপনারই ক্ষতি করবে না, আপনার ভবিষ্যত প্রজন্মকেও দিকভ্রান্ত-উদভ্রান্ত-বিপথগামী করবে। ফলে আপনাকেই ঘরে সুস্থ বিনোদনের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে, বাইরের অশুভ শক্তির অপতৎপরতার মরণ ছোবল থেকে বাঁচাতে শক্তিশালী ও সুরক্ষিত দূর্গ গড়ে তুলতে অহর্নিশ পরিশ্রম করতে হবে। মনে রাখবেন- শরীর অসুস্থ হবার পরে চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হওয়ায় অনেক সময় সুস্থতা ফিরে আসলেও, মন অসুস্থ হলে মনের পরিপূর্ণ সুস্থতা অর্জন বড়ই কঠিন। মন ভালো রাখতে হলে- ভালো পরিবেশ ও ভালো জগতের পাশাপাশি চোখের কোণে-মগজে-আচরণে সাধুতা-সততা-স্বচ্ছতা চর্চার বিকল্প নেই।

একজন সিরিয়াল কিলার যেমন মানুষের লাল রক্ত দেখে বিকৃত সুখ পান, একজন ধর্ষকও তেমনি সমাজ-সংস্কৃতি-ধর্ম আরোপিত বিধিনিষেধ ভুলে গিয়ে সতী-সাধ্বী-চরিত্রবান নারীকেও শিকারের টার্গেট বানাতে পারেন। ধর্ষকের কোনো সমাজ নেই, সংস্কৃতি নেই, ধর্ম নেই। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ ঘটানোর পূর্বে কারো পরিচয় সন্তান-স্বামী-ভাই-ভাতিজা-প্রেমিক-বস-স্যার হিসেবে থাকলেও; ধর্ষণের পরে তার একটাই পরিচয় সে ধর্ষক। ধর্ষণ এমন কোনো অপরাধ নয় যার অর্থপূর্ণ ক্ষতিপূরণ সম্ভব। ফলে ধর্ষক মানেই জগতের নিৎকৃষ্টতম জীব, তার সরব অস্তিত্ব মানেই নরকের প্রতিচ্ছবি, তার উচ্চকণ্ঠ বা অবাধ বিচরণ মানেই সমাজ-সভ্যতার অধঃপতনের চিত্র।

ধর্ষণের মতো মারাত্মক ও সহিংস অপরাধের পর যারা ভিকটিমের ক্ষুদ্র অপরাধ নিয়ে রসালো-অরুচিকর-যৌন সুড়সুড়ি উদ্দীপক আলাপচারিতা চালিয়ে থাকে, তারা মানসিকভাবে অসুস্থ ও রুচিহীন। তারা ধর্ষণের শিকার নারীর মানসিক যে বিপর্যস্ততা তা বুঝেন না কিংবা এসব বর্বর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উৎসারিত সামাজিক বঞ্চনার ব্যাপারকে এড়িয়ে যান। হিংস্র হায়েনা বা বাঘের কবলে পড়লে বিপদগ্রস্ত অসহায় মানুষটিকে বাঁচানোর প্রশ্নই যেমন গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হবে, তেমনি অধিকার বঞ্চিত-শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত- সম্ভ্রম হারিয়ে চরমভাবে অপদস্থ নারীকে নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাটাই অগ্রাধিকার পাবার যোগ্য।

ধর্ষণের শিকার নারী মানুষ, কিন্তু ধর্ষক মানুষরুপী জানোয়ার। ফলে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চেয়ে জানোয়ারের আক্রমণ বা থাবাকে হালকা প্রমাণের চেষ্টা কখনোই যৌক্তিক হতে পারে না। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নারী-পুরুষ বৈষম্য করে একেকজনের জন্য একেকরকম মূল্যবোধ বা নৈতিকতা গড়তে পারে না। অশ্রদ্ধা করুন ধর্ষক পুরুষকে, নারীকে নয়। সমাজ অপরাধীর বিপক্ষে তখনই প্রমাণিত হবে যখন নিরপরাধী ধর্ষণের শিকার নারীকে বিয়ে করতে একজন অবিবাহিত যুবকের আপত্তি থাকবে না। একজন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সমাজ কাঠামোতে বিরাজমান বৈষম্যমূলক সংস্কৃতি, রীতিনীতি, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের কারণে আরো বেশি নিষ্পেষিত হবেন- এটাও কি অস্বাভাবিক নয়। এমন নির্মম ও নিষ্ঠুর বাস্তবতার মধ্যে যে পরিবারে একজন ধর্ষণের শিকার নারী থাকবেন সেই পরিবারের অবস্থা এবং প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত নারীটির মানসিক অবস্থা একটু চিন্তা করে দেখুন। আপনিই ধর্ষণের শিকার নারীর উপর দৈহিক, মানসিক এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া উপলব্ধি করতে পারবেন।

জৈবিক পার্থক্যকে পুঁজি করে বিকৃত রুচির কিছু পুরুষ কর্তৃক নারীকে নির্যাতন- নিপীড়ন করারতো কোনো যুক্তি নেই। নারীতো পুরুষের হাতে বিনিময়ের দ্রব্যমাত্র নয়। কেন একজন নারী স্বামীর পরকিয়ার প্রতিবাদ করতে যেয়ে কিংবা মদ খেয়ে গভীর রাতে বাসায় ফিরতে মানা করার কারণে শারীরিক নির্যাতনের মুখোমুখি হবেন? নারীকে নিয়ন্ত্রণ ও শোষণ করবে পুরুষ আবার পুরুষের অপরাধে শাস্তিও পাবে নারী- নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্যকে বৈধতাদানের এটা কোনো যুক্তি হলো! যারা ভাবেন- পুরুষ বেশি শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান, তাঁদেরও দুর্বলের পাশে দাঁড়ানোটা নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব নয় কি! তা না হলে ধর্ষিতা মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে এসেও এক অর্থে মৃত্যুমুখী হয়েই বেঁচে থাকবেন, স্বাভাবিক চলাফেরায় অক্ষম হবেন, জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে। ধর্ষণের দ্রুত ও কঠোর বিচার হলে নির্যাতনের পরিমাণ কিছুটা হলেও হ্রাস পেতো বলে মনে হয়।

পুরুষ বলপ্রয়োগ করে নারীর স্পষ্ট বা প্রচ্ছন্ন সম্মতি ছাড়াই সঙ্গম করবে, অথচ ‘ইজ্জতহানি’ বা ‘সম্মানহানি’ হবে শুধু নারীর- এটা কেমন কথা। নারী নিপীড়নের চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছেও চরম সহিংসতা প্রদর্শনকারী পুরুষটির দেহে-স্বাতন্ত্র্যতায়-সত্তায়-আত্মপরিচিতিতে-নিরাপত্তাজ্ঞানে ও মর্যাদাবোধে কোনো আঘাত লাগবে না; এটা হতে পারে না। নারীরা ধর্ষণের শিকার হবে বখাটে ছেলেদের দ্বারা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা, নিকটাত্মীয়ের দ্বারা; আর তথাকথিত ভদ্র-নম্র-সুসভ্য পুরুষগুলো তাকিয়ে দেখবে- এ কেমন আচরণ! ধর্ষিতা বিচার চায়তেই পারবে না, চাইলেও পাবে না-এমনটা ধর্ষিতা নারীর জন্য সামাজিকভাবে খুবই বিব্রতকর। যখন একজন নারী ধর্ষিত হয় তখন সমাজের সকলে মিলে এর দায়ভার নারীর উপর চাপিয়ে দেয় এবং সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে ধর্ষিতাকে বারবার ধর্ষণ করা হয়। ‘নষ্ট মেয়ে’ ‘বিয়ে হবে না’-ইত্যাদি মন্তব্য শুনে তার যন্ত্রণা আরো বাড়ে।

সার্বিক দিক বিবেচনা করে- ধর্ষণের মুলোৎপাটনের জন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে সজাগ করতে হবে এর বিরুদ্ধে, নির্যাতনের প্রতিকারের জন্য সাধারণ মানুষের মন-মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে এবং এইসব ঘৃণ্য অপরাধের বিরুদ্ধে প্রবল সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নির্যাতিতাকে নয়, নির্যাতনকারীকে নিন্দা করতে হবে, মানবিকতাবোধ জাগ্রত করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *