ঝাড়িবাজদের মুখোশ উন্মোচন!

আনিসুর রহমান এরশাদ 

ঝাড়ি কারও ব্যক্তিগত বা একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। তবে মালিক ও উর্ধ্বতনরা বসগিরি দেখাতেই হোক আর নিজেদেরকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যেই হোক ঝাড়ি দেয়াকে খুব মূল্যবান কাজ বলে বিবেচনা করেন। বেড়াতে যেয়ে অফিসে কথায় কথায় ঝাড়ি মারেন এমন এক কর্তা ব্যক্তিকে বন্ধু হওয়ার সুবাধে শক্তভাবে ধরলে সে বলে-‘সবাই ঝাড়ি মারতে পারে না। ঝাড়ি মারতেও যোগ্যতা লাগে। ঝাঁড়ি মারার মধ্যেও আর্ট আছে, স্টাইল আছে।’ তবে অঝথা ঝাড়ি মারা কিংবা অযৌক্তিক ঝাড়ি খেয়েও নিরবে হজম করা দু’টোই আমার কাছে মারাত্মক প্রবণতা বলে বোধ হয়।

সাধারণত তুলনামূলকভাবে ক্ষমতাবান, বিত্তশালী বা শক্তিশালীরা দুর্বল-নির্ভরশীল-অধীনস্তদের ঝাড়ি মারেন। অনেক ক্ষেত্রে ঝাড়ি মারতে পারাটাকেও বিশেষ যোগ্যতা বা পারদর্শিতা বলে বিবেচনা করা হয় । অধীনস্থরা ভয়েই হোক আর না বোঝেই হোক ঝাড়ি মারার বিষয়টিকে অনেক সময় সাপোর্টও করে। কেউ ঝাড়ি দিয়ে মানসিক তৃপ্তি পান আর ঝাড়ি খেয়ে- কেউ তা সহজেই হজম করেন, কেউ ঠিকঠাক ট্যাকল করতে পারেন, কেউ আড়ালে মুচকি হাসেন আবার কেউ চোখের জল ফেলেন। অবশ্য ঝাড়ির প্রয়োগ ও ফলাফলে স্থান-কাল-পাত্র বিশেষে প্রকারভেদ দেখা যায়। বয়স-সম্পর্ক-অবস্থানভেদে যথোপযুক্ত প্রয়োগের মাধ্যমে অনেকে নাকি ঝাড়িটাকেও বেশ মূল্যবান করে তুলেন।

অনেকে ঝাড়ি খেয়ে তা হজম করে হৃষ্টপুষ্ট হন, অনেকে ঝাড়ি খেয়ে আমতা আমতা করেন। আর ঝাড়ি দাতাদের মধ্যে কেউ নরম স্বরে, কেউ গরম স্বরে ঝাড়ি দেন। অনেকে নিজের ভুল অন্যের উপর চাপাতে ঝাড়ির আশ্রয় নেন, অনেকে অতি ভালো হতে চেয়ে বসের উল্টো ঝাড়ির কবলে পড়েন। অনেকেতো ঝাড়ির খনি, কারো ওপর রাগ ঝাড়তে না পারায় ঘুম-খাওয়া-নাওয়া হারাম হয়ে যায়। ঝাড়ি দেয়ার উপায় সম্পর্কে অনেকে যেমন অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন, অযৌক্তিক ঝাড়ি খেয়েও নিরবে সহ্য করার পরও বসের প্রশংসার মাধ্যমে অনেকে তৈলের খনি হিসেবে আবির্ভূত হন। কেউ ঝাড়ি মারে, কেউ ঝাড়ি খায়, কেউ ঝাড়ি মারা-খাওয়া দেখে পুলকিত হন। বসদের মধ্যে রয়েছে গুটিবাজ, ফাপরবাজ ও চাপাবাজ বস। ঝাড়িপট্টি বসেরা অযথা বকাবকি করেন, যম-আতঙ্ক বসেরা যেকোনো সময় চাকরি চলে যাবার ভয় দেখান, আর ঝাড়িবাজ বসেরা ঝাড়ির জোরেই সবকিছু আদায় করতে চান ।

পারস্যের এক কবি বলেছিলেন- যার মুখোশ যত সুন্দর, পৃথিবীর কাছে সে তত আকর্ষণীয়। এই মুখোশ মানে- বাঁশ, কাঠ দিয়ে নিপুণ হাতে তৈরি মুখোশ নয়। তবে আমার মনে হয়- পৃথিবীর কাছে নয়, পৃথিবীর মানুষগুলোর কাছে বললে বেশি যৌক্তিক হতো। কারণ পৃথিবী স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ধারায় চলে, সে মুখোশ এবং স্বাভাবিকের তফাৎ নির্ণয় করতে জানে না। পৃথিবীর নেই অস্বচ্ছতা, অস্পষ্টতা, পাওয়া-হারানোর ভয় কিংবা লুকোচুরির উদ্দেশ্য। কিন্তু মানুষ নিজেকে মানবিক, কোমল,সরল, নিষ্কলঙ্ক, ভালোবাসাধারীর অভিনয় করে যায় অপর মানুষদের সাথে। এই পৃথিবীটা উদার এবং আচরণেও স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক হলেও এই পৃথিবীর সন্তান মুখোশধারীরা বড় বেশি আত্মমুখী ও স্বার্থপর, নিজের বুঝকেই সর্বোচ্চ বুঝ মানে এবং নিজের দেখাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ দেখা বলে ভাবে, যেমন খুশি অন্যকে মাপে, ঠকায়ে হাসে তৃপ্তির হাসি!

কিছু মানুষ খুব দ্রুতই নিজেকে বদলায় নিজের আকর্ষণ বৃদ্ধি ও চাহিদা ধরে রাখার স্বার্থেই। অনেকে রুপ বদলাতে না পেরে অবাক-বিস্ময়ে অন্যের পরিবর্তন দেখে। হাঁটা না শিখেই দৌঁড়াতে গেলে শিশুর যে অবস্থা হয়, চালাক মানুষের বদলে যাওয়াকে সহজে মেনে নিতে না পারলে বোকাদের সেই অবস্থা হয়। চালাক মানুষেরা বোকাদের ভদ্রতাকে ভাবে দূর্বলতা, আন্তরিকতাকে ভাবে তৈল, স্পষ্টবাদী হওয়াকে ভাবে সরলতা, অন্যায়ের প্রতিবাদকে ভাবে অভিজ্ঞতার অভাব হিসেবে।

মুখোশ পড়া মানুষগুলো সবাইকে খুশি রাখতে চায়, স্থান-কাল-পাত্রভেদে এদের চিন্তা-চেতনা-কর্ম-আদর্শ পাল্টে যায়। যারা বিরক্তি কিংবা ঘৃণার কারণে মুখোশধারীদের ধূর্ততা-ঠকবাজি-প্রতারণাপূর্ণ ব্যবহারের জবাব দেয়ার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলেন; তাদেরকে নিতান্ত সাধারণ ভেবে মুখোশধারীরা অদ্ভূত আত্মপ্রশান্তি লাভ করেন। ভদ্রতার মুখোশ পড়ে থাকা মানুষদের ভেতরে যে কতটা পাশবিকতা লুকিয়ে থাকতে পারে তা’ শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্টই প্রকাশ পায়।

মুখোশ পড়া মানুষদের সফলতা ক্ষণস্থায়ী, সম্মান-মর্যাদা সাময়িক; মুখোশ উন্মোচিত হলেই কেউ যায় কারাগারে- কেউ দেশ ছাড়ে-কেউ আত্মগোপন করে। মুখোশধারী সালাম পায়, প্রশংসা পায়, স্বীকৃতিও পায় কিন্তু মুখোশ খুলে গেলেই হাওয়ায় মিলিয়ে যায় তার সকল অর্জন। কারণ মুখোশ পড়া মানুষগুলো একদিন শুধুই মুখোশে পরিণত হয়, মানুষ আর থাকে না। যারা অন্যের চালাকি ধরেও বোকা বোকা ভাব নেয় তারা খুব মজা পায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *