ছোটবেলার স্মৃতি আমায় করে নস্টালজিক!

আনিসুর রহমান এরশাদ

ব্যস্ত নাগরিক জীবনে বেড়ে ওঠা নবীন প্রজন্মকে দেশের মাটি-মানুষ-সংস্কৃতিকে চেনানো বেশ কঠিনই বটে। আমরা কত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজ এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। ছোটবেলা যারা গ্রামে কাটাননি তাঁদের পক্ষে সেই পথ জানা মোটেই সহজ নয়। ইট-কংক্রিটের শহরের পরিবেশে ছোটরা সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির মাঝে মুক্ত বিহঙ্গের মত ছুটতে পারে না। উদার আকাশের নিচে নির্মল বাতাসে স্বাধীনতার স্বাদ পায় না।

আমাকে এখনো ছোটবেলার স্মৃতি-নস্টালজিয়া ঘিরে ধরে৷ ‘নস্টালজিয়া’ এর বাংলা প্রতিশব্দ স্মৃতিবিধুরতা। গ্রিক শব্দ নসটস (বাড়ি ফেরা) ও আলজিয়া (আশা বা প্রত্যাশা) নিয়ে নস্টালজিয়া শব্দের উৎপত্তি। নস্টালজিয়া বলতে সুখের স্মৃতি রোমন্থন করা, স্মৃতি মনে করে অতীত সময়ে ফিরে যেতে চাওয়া, আনন্দ-উদাস-ফিরে পাওয়ার মিশ্র অনুভূতি তৈরি। পুরনো বন্ধু, পরিবারিক স্মৃতি, ফেলে আসা গান, ছবি যেকোনো কিছুর স্মৃতিই মানুষকে নস্টালজিক করে তুলতে পারে।

শৈশবের উচ্ছ্বাসে মিশে থাকা স্মৃতির মাঝে আছে- মেঝো মামার কাঁধে চড়ে বালিয়াটায় নানার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, বড় কাকার দরাজ গলায় পুথিঁ পড়া, ছোট ফুফুর মুখে মৌলভী কাকার লেখা কবিতা শুনা, বড় ফুফুর জোর করে গোসল করানো, ঝড়ের দিনে বৃষ্টিতে ভিজে ছোটবোনের সাথে দৌঁড়ে আম কুড়ানো, আমার শরীরে আম্মুর তৈল মাখানো থেকে বাঁচতে প্রাণপণ দৌঁড়ানো, আব্বার সাথে প্রথম ঢাকায় ভ্রমণে চিড়িয়াখানা-স্মৃতিসৌধ-শিশুপার্ক পরিদর্শন ও নৌকায় খাদ্যপ্রেমিক ফয়েজ ভাইয়ের (হাজী মরহুম ফয়েজ উদ্দিন মেম্বার) অবিরত খাওয়া অবাক-বিস্ময়ে দেখা, গোল্লাছুট খেলার সাথী জোৎস্না আপুর বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়া, দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন সহপাঠী কুলসুমের বিয়ে, সহপাঠী সাত্তার ও সালমার মা-বাবা হারানো ইত্যাদি।

কৈশরের উদ্যমে শত স্মৃতির মাঝে আছে- বাইসাইকেলে আব্বুর সামনে-পিছনে বসে রোজিনা ও আমার গোড়াকি বু’র বাসায় বেড়াতে যাওয়া, সেলিম নানার সাথে ঘুড়ি (চং) উড়ানোতে প্রাণচাঞ্চল্য, মতিয়ার ভাইয়ের সাথে পানি সেঁচে মাছ ধরার সুখানুভূতি, হাবিবুরের সাথে লাল গাভির জন্য ঘাস কেটে আনার প্রশান্তি, কাক ডাকা ভোরেও মৃত্যুহীন প্রাণ খলিফা ভাই (হাজী মরহুম আজিজুল ইসলাম) এর সাথে দড়ানীপাড়া জামে মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার আনন্দ, আমগাছের ছায়ায় মাদুর পেতে লেখাপড়া করা, ইব্রাহীম কাকাসহ আমের ঝাঁকা নিয়ে বাসাইলে ফুফুদের বাড়িতে যাওয়া, ছোটভাই আশিকের জন্মে বাধঁ ভাঙ্গা খুশি, টাঙ্গাইলে বৃত্তি পরীক্ষা দিতে বড় ফুফার নিয়ে যাওয়া এবং পরীক্ষার হলে আমাকে ডিস্টার্বকারীর ওপর রেগে অগ্নিশর্মা হওয়া, সহপাঠী ও বন্ধু জয়নালের (জয়নাল আবেদিন জনি) পড়াশুনা ছেড়ে দেয়া, সহপাঠী আব্দুল্লাহেল মিন্টুর গাছ থেকে ঢাল ভেঙ্গে টিনের চালে পড়ে যাওয়া, আমাকে মৌলভী কাকার বেত্রাঘাতে ছোটফুফুর কান্না, দাদির মৃত্যু এবং জানাযা পড়তে না পারা ইত্যাদি।

ছোটবেলার তিক্ত-টক-ঝাল স্মৃতির মাঝে আছে- অভিমান করে জঙ্গলে গাছে লুকানোর পর খুঁজে না পেয়ে আম্মুর পেরেশান হওয়া, ‘এরশাদ জেলের ডালভাত কেমন লাগে’ বলে সফি হুজুরের ক্ষেপানো, আমাকে সা‍ঁতার শেখাতে ছোটকাকা-ছোটফুফা-গণি ভাইয়ের পরিশ্রম, ‘লাল গেঞ্জি’ চেয়ে বড় কাকাকে ঈদের দিনে সারা এলাকা ঘুরানো, কালাচানে (ভূতে) ধরার পর সুন্দরী মেয়ে শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় নরেশ স্যারের (বাবু নরেশ চন্দ্র সরকার) কার্যক্রম, কোলে বা কলাগাছের ভেলায় চড়ে পানি পারাপার, ঘাটে গোদারা (খেয়া) নৌকার জন্য দীর্ঘসময় অপেক্ষা করা ইত্যাদি। রস সংগ্রহের জন্য খেজুর গাছ কাটতে গিয়ে উপর থেকে নীচে পড়ে যাওয়া আহম্মদ হুজুরের অবস্থা ছিল ভীষণ কষ্টকর। দামান্দে (মরহুম রওশন আলী কবিরাজ) অত্যন্ত সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষায় শিক্ষণীয় গল্প-ঘটনা-ইতিহাস বলতেন, শারীরিক-মানসিকভাবে সুস্থ থাকার টিপস দিতেন; আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম।

আসলে আমার বেড়ে ওঠা অনেকের অবদানে ভরপুর। রমজানে মসজিদে খতম তারাবিহর আগে-পরে মাদানী হুজুরের (হাফেজ মাওঃ আনিসুর রহমান আল মাদানী) হৃদয়স্পর্শী বয়ান থেকে ধর্ম-নৈতিকতার (মাসআলা-মাসায়েল) জ্ঞানার্জন হয়েছে। আহম্মদ হুজুরের (ক্বরী আহমাদ আলী) বাসায় ও জুম্মাপাড়া মক্তবে মুন্সি হাফিজ উদ্দিনের কাছে কোরআনের সহীহ তেলাওয়াত শিখতে যেতাম ছোটবোনসহ। ঢাকা থেকে সাঈদ কাকা (হাফেজ মাওঃ সাঈদুর রহমান) গ্রামে আসলে সুমধুর কণ্ঠে কোরআন তেলাওয়াত শুনাতেন-শুনতেন। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য সখিপুর-টাঙ্গাইল-ঢাকায় মৌলভী কাকা (মাওঃ ক্বারী মোঃ শামছুজ্জামান) ও করিম হুজুর (মাওঃ আ.ফ.ম আব্দুল করিম) আমাকে নিয়ে যেতেন। থানা-জেলা-বিভাগীয় পর্যায়ে পুরস্কৃত-বিজয়ী হলে আমার শিক্ষকদেরও অনেক খুশি হতে দেখতাম। ৩য় শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হওয়া, ৫ম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়ায় আত্মিয় স্বজনদেরও আনন্দিত হতে দেখতাম। অর্থাৎ তখন অন্যের সাফল্য-অর্জনেও খুশি হবার মতো মানসিক উদারতা বেশ ছিল।

দাদির সাথে আত্মিয় স্বজনের বাড়িতে বেড়ানো খুব উপভোগ করতাম। আমার যেকোনো সাফল্যে-অর্জনে দাদি খুবই খুশি হতেন। দাদির হাসিমুখ আমার খুবই প্রিয় ছিল। সাংবাদিক আঙ্কেল (মোজাম্মেল হক) টাঙ্গাইলের কয়েকটি পত্রিকায় কবিতা কিংবা ঢাকা থেকে প্রকাশিত সোনালী বার্তায় গল্প না ছাপালে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখির এত আগ্রহ তৈরি হতো কি-না সন্দেহ! আব্বুর হাতের লেখা আমার ভীষণ ভালো লাগতো, নিজেও দূর প্রবাস থেকে বাবার পাঠানো চিঠির লেখার মতো করে লেখা শিখেছিলাম। পরবর্তীতে বড় ফুফার হাতের লেখা, স্মৃতিকথার ভাষা আমাকে চমৎকৃত করেছিল। অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষা দেয়ার সময় নলুয়ার মনির কাকার আন্তরিকতা, দাদা-দাদির ভালোবাসাময় সান্নিধ্য ও সহপাঠী লিটনের (লোকমান হোসেন চান্দু) সাথে সময় কাটানো দারুণভাবে উপভোগ করেছিলাম। মনোরা ফুফুদের (মনোয়ারা আক্তার মুক্তা) বাড়ি থেকে বাহারি ফুল গাছের ঢাল বা বীজ এনে ছোটবোন ও আমি আমাদের উঠানে লাগাতাম।

সেই সময়টাতে যে কী ভীষণ দুরন্তপনা আর ক্ষেপ্যামি ছিল! জোৎস্না রাতে ওঠানে মাদুর পেতে আসর বসতো, ভূত পেত্নীর গল্প শুনতাম। বৃষ্টির পানিতে ভেজা, দলবেঁধে বর্ষায় পানিতে গোসল, নতুন জামা-কাপড় পড়ে ইদগাহে যাওয়া, ইদের নামাযের আগে কবিতা আবৃত্তি-কুরআন তেলাওয়াত-ইসলামিক গান করার স্মৃতি। কামালিয়াচালা-পাথরঘাটা-তক্তারচালা হাটে সদায় কেনা; মৌলভী কাকার চক্ষু এড়িয়ে ডাংগুলি আর মার্বেল খেলা, বৃষ্টিতে ভিজে কর্দমাক্ত শরীরেও ফুটবল খেলা, পিচ্ছিল মাঠেও লবনদারি খেলার স্মৃতি। রিয়াজ উদ্দিন কাকাদের বিশাল তেতুল গাছটা এখনো আছে, জাম গাছটাও কালের স্বাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে; আজও কেউ ঢিল ছুড়ে, আঁকশি বা কোন্টা দিয়ে কিংবা গাছে উঠে-পাড়ে। বালিয়াটায় নানুর বাড়ি যেয়ে- ছিপ-বড়শি দিয়ে মাছ ধরেছি, নৌকায় চড়ে বাকি ভাইয়ের সাথে শাপলা তোলেছি। খালায় বাসায় বেড়াতে গিয়ে আমড়া, কদবেল, বড়ই খেতাম। নাটাই ঘুরিয়ে ঘুড়ির আকাশ দাপিয়ে বেড়ানোর দৃশ্য যে কত আনন্দের তা’ বলে-লিখে বুঝানো অসম্ভব।

ছোটবেলায় দেশি ফল বেশি পেতাম ও বেশি খেতাম। পেয়ারা, জাম, আমলকি, খেজুর, বংকই, গাব, ডেউয়া, বেল, করমচা, শালুক, চালতা, জলপাই, আমলকি, বিচিকলা, কামরাঙ্গা খেয়েছি কাঁচা-পাকা আম ভর্তা আর আচার খেয়ে তৃপ্তির ডেকুর গিলেছি। গাছ থেকে পেড়ে ফল খাওয়ার মজাই আলাদা! এখন আর পূর্ব পার্শ্বের লেবুর বাগান নেই, লালটুকটুকে গাভিটা নেই; মায়ের হাতের তৈরি ঘি-দই নেই, সাদা-কালো ডোরাকাটা বিড়ালটা নেই, হাঁস-মুরগির ছুটাছুটি নেই। তখন হারিকেন ছিল, হাতপাখা ছিল, আখের গুড় আর লেবুর শরবত ছিল, খেজুরের রস, তালের রস, মধু ছিল; নিজেদের গাভীর দুধ, পুকুরের মাছ, চাষকৃত শাকসবজি, পালিত হাস মুরগি ছিল। খুশির ঘটনায় বাতাসা-কদমা-জিলাপি বিলানো হতো, জুম্মার নামায শেষে মুসুল্লিদের মাঝে ঝাল খিচুরি ও মিষ্টি ক্ষীরের মিশ্রণ বিলানো হতো।

ছোটবেলার বন্ধুদের খুব মিস করি যারা ঘর থেকে টেনে বের করে নিয়ে যেতো খোলা সবুজ ঘাসের মাঠে, ছন্দহীন-নিরানন্দ জীবনে আনন্দের জোয়ার যোগ করতো, মনের কথা খুলে বলা যেতো অবলীলায়। অসাধারণ ছিল নির্ভরতা আর বিশ্বাসের সেই গভীর মমতা-মায়া-ভালোলাগা অন্য রকম অনুভূতি! এখন কয়েকজনের (মালেক, বানিজ, আমিনুর ভাই) সাথে ফেসবুকে যুক্ত থাকায় যোগাযোগ মাঝেমাঝে (প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ) হয়। এছাড়া যেসব বড়দের যত্ন-ত্যাগ-আদর আজকের আমার অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে; তাদের ঋণ কখনো শুধ হবার নয়। সেসব মানুষের জন্য ‍অনেক ‍অনেক শুভ কামনা। যারা চিরবিদায় নিয়েছেন তাদের আত্মার মাগফেরাত ও জীবিতদের সুস্থ-সবল-নীরোগ জীবন কামনা করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *